সর্বশেষ খবর
Home / Business / বাংলাদেশের অনেক কর্মক্ষেত্রে এখনো দীর্ঘ সময় অফিসে কাজ করাকে একধরনের গৌরব হিসেবে দেখা হয়,

বাংলাদেশের অনেক কর্মক্ষেত্রে এখনো দীর্ঘ সময় অফিসে কাজ করাকে একধরনের গৌরব হিসেবে দেখা হয়,

বাংলাদেশের অনেক কর্মক্ষেত্রে এখনো দীর্ঘ সময় অফিসে কাজ করাকে একধরনের গৌরব হিসেবে দেখা হয়। যারা অফিসে বেশি সময় থাকেন, তাদের অনেক সময় বেশি দায়িত্বশীল, বেশি নিবেদিতপ্রাণ কিংবা বেশি পরিশ্রমী হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। অনেক নিয়োগকর্তার কাছেও দীর্ঘ সময় অফিসে উপস্থিত থাকা কর্মীর আন্তরিকতা ও কর্মনিষ্ঠার প্রতীক।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—আসলেই কি দীর্ঘ সময় কাজ করলেই কর্মদক্ষতা বাড়ে? নাকি এই ধারণাটিকে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে?

বাস্তবতা হলো, বেশি সময় কাজ করলেই কাজের মান বাড়ে না। বরং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণা, শ্রমনীতি ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, অতিরিক্ত দীর্ঘ কর্মঘণ্টা অনেক ক্ষেত্রেই উল্টো ফল বয়ে আনে। কারণ কর্মদক্ষতার প্রকৃত অর্থ শুধু কত ঘণ্টা অফিসে থাকা নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়কে কতটা দক্ষতা ও মনোযোগের সঙ্গে কাজে লাগানো হচ্ছে, সেটাই মূল বিষয়।

একজন কর্মী যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই দক্ষতার সঙ্গে কাজ সম্পন্ন করতে পারেন, তবে তিনি সেই কর্মীর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর, যিনি অযথা সময় টেনে কাজ করেন শুধু নিজেকে ব্যস্ত প্রমাণ করার জন্য। যখন দীর্ঘ সময় অফিসে থাকার সংস্কৃতি তৈরি হয়, তখন ধীরে ধীরে কাজের গুণগত মানের চেয়ে “উপস্থিতি” বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এতে যেমন অদক্ষতা তৈরি হয়, তেমনি ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও মানসিক ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।

ফলে সমাজে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়, যেখানে কাজই জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। অথচ কাজের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর, নিরাপদ ও স্থিতিশীল করা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বহু আগেই সতর্ক করে বলেছে, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে। এতে সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয় এবং সামগ্রিক সুস্থতা ব্যাহত হয়।

বিশ্ব শ্রমব্যবস্থা এই বিষয়টির গুরুত্ব অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে। ১৯১৯ সালেই আইএলও তাদের কর্মঘণ্টাবিষয়ক সনদে উল্লেখ করেছিল, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক—মানুষ কোনো যন্ত্র নয়।

দীর্ঘ সময় কাজ করলে ক্লান্তি বাড়ে, মনোযোগ কমে যায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। বিশেষ করে উৎপাদনশিল্প, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সৃজনশীল পেশার মতো খাতে এসব ভুল কখনো কখনো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

এর পাশাপাশি দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ধীরে ধীরে একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। অতিরিক্ত কাজের চাপ থেকে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, বার্নআউট, উদ্বেগ ও হতাশার মতো সমস্যা। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা এখনো পর্যাপ্ত নয় বলে এসব বিষয় অনেক সময় গুরুত্বই পায় না। ফলে অনেক কর্মী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার পরও নিরুপায় হয়ে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

সময়ের দাবি হলো—কর্মক্ষেত্রে “বেশি সময় কাজ” নয়, বরং “দক্ষ ও মানবিক কর্মসংস্কৃতি”কে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ সুস্থ, মানসিকভাবে স্থিতিশীল এবং কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম একজন মানুষই দীর্ঘমেয়াদে একটি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের জন্য সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে উঠতে পারেন।

About Editor

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *