Today News 24 – আজকের খবর
ধান কাটায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে স্বস্তি পেলেন কৃষকরা
টিটন হাসান, নাজমুল হোসেন ও আলমগীর হোসেন—তারা কেউ পেশাদার কৃষিশ্রমিক নন। তারা স্থানীয় বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী। তবে পড়ালেখার পাশাপাশি ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিকসংকটে থাকা কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তারা। মাঠে নেমে ধান কেটে একদিকে কৃষকদের দুর্ভোগ কমাচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের অবসর সময় কাজে লাগিয়ে কিছু বাড়তি আয়ও করছে।
ঝিনাইদহ জেলার ছয়টি উপজেলায় এখনো প্রায় অর্ধেক পাকা ধান মাঠে পড়ে রয়েছে। সময়মতো শ্রমিক না পাওয়ায় অনেক কৃষক চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। সম্প্রতি টানা বৃষ্টি ও শ্রমিকসংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন অবস্থায় জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার কয়েকজন স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী স্বেচ্ছায় কৃষিকাজে অংশ নিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এতে কৃষকেরা যেমন উপকৃত হচ্ছেন, তেমনি শিক্ষার্থীরাও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি আয় করার সুযোগ পাচ্ছে।
স্থানীয় ঘোড়দহ গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম জানান, কাপাহাটিয়া বাঁওড়ের পাশে তাঁর দেড় বিঘা জমির ধান কয়েক দিন আগেই পাকলেও শ্রমিকের অভাবে কাটতে পারছিলেন না। যেকোনো সময় বৃষ্টি শুরু হলে পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল। আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়েও শ্রমিক পাননি তিনি। পরে গ্রামের কয়েকজন স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী এগিয়ে আসে। তাদের সঙ্গে কথা বলে খড়ের আঁটি বাঁধা ও কাটা ধান গুছিয়ে রাখার জন্য পাঁচ হাজার টাকায় চুক্তি করেন। মাত্র এক বিকেলের মধ্যেই চারজন শিক্ষার্থী পুরো কাজ শেষ করে দেয়।
একই গ্রামের কৃষক খয়বর আলী বলেন, এ বছর প্রায় সব জমির ধান একসঙ্গে পেকে যাওয়ায় শ্রমিক পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকায়। এর সঙ্গে তিন বেলার খাবারের ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে। এত কিছুর পরও সময়মতো শ্রমিক মিলছে না। এ অবস্থায় এলাকার শিক্ষার্থীরা মাঠে নেমে ধান কাটার কাজে সহায়তা করায় কৃষকেরা অনেকটাই স্বস্তি পেয়েছেন।
ভালকি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী টিটন হাসান জানায়, তারা সবাই কৃষক পরিবারের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে পরিচিত। সাধারণত বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটালেও এবার শ্রমিকসংকট দেখে তারা কয়েকজন মিলে মাঠে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কৃষকদের কষ্ট দেখে তাদের পাশে দাঁড়াতে পেরে নিজেদেরও ভালো লাগছে বলে জানায় সে।
একই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র নাজমুল হোসেন বলে, কৃষকের সন্তান হওয়ায় এসব কাজ তাদের কাছে নতুন নয়। বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দের মধ্য দিয়েই তারা ধান কাটা, খড়ের আঁটি বাঁধা ও ধান গুছিয়ে রাখার কাজ করছে। এতে যেমন কৃষকদের উপকার হচ্ছে, তেমনি তারা নিজেরাও পরিশ্রমের মূল্য বুঝতে শিখছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ঝিনাইদহ জেলায় প্রায় ৯০ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কিছু সমস্যা থাকলেও এ বছর ধানের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। তবে একসঙ্গে অধিকাংশ জমির ধান পেকে যাওয়ায় শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, কৃষকেরা প্রায় দুই সপ্তাহ আগে থেকেই ধান কাটা শুরু করেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে অনেকেই কিছুদিন কাজ বন্ধ রেখেছিলেন। এখন আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় একসঙ্গে ধান কাটার চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে শ্রমিকের সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের কৃষিকাজে অংশগ্রহণ কৃষকদের জন্য বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করছে।
স্থানীয়দের মতে, পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ভবিষ্যতেও এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে কৃষকের শ্রমসংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছেন তারা।