পটভূমি: লু সুন ও তাঁর বন্ধু ফ্যান আইনং
দুনিয়ার সাহিত্যসংসারে চৈনিক লেখক লু সুনের (১৮৮১–১৯৩৬) নাম সুবিদিত। জীবনকাল সংক্ষিপ্ত হলেও তাঁর কর্মপরিসর ছিল বহুবিস্তৃত। এই স্বল্প পরিসরে সেই আলোচনার সূত্রপাত ঘটানোর সুযোগ নেই। যেই গল্প আমরা তরজমার দুঃসাহস দেখিয়েছি সেই গল্পের পটভূমি নিয়ে বরং দু–এক কথা বলা যেতে পারে।
‘শুঁড়িখানায়’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালের ২৫ মে সাংহাইয়ের দ্য শর্ট স্টোরি ম্যাগাজিন নামের একটি সাময়িক পত্রিকায়। যদিও গল্পের নিচে উল্লেখিত তারিখ থেকে বোঝা যায়, তিনি গল্পটি লেখা শেষ করেছিলেন একই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। এই গল্পের আদি থেকে অন্ত পুরোটা লেখক স্বয়ং হাজির; আর আছেন তাঁর এক পুরোনো বন্ধু, গল্পে যার নাম উই-ফু। উত্তরকালের গবেষকেরা জানাচ্ছেন, এই উই-ফু আসলে তারই স্বল্পায়ু বন্ধু ফ্যান আইনং, যিনি মারা গেছেন এই গল্প লেখার এক যুগ আগে, ১৯১২ সালে। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত লু সুনের স্মৃতিকথার সংকলন ‘সন্ধ্যায় তুলে ফেলা সকালের ফুল (ডন ব্লজমস প্লাকড অ্যাট ডাস্ক)’ থেকেও এর সত্যতা মেলে। এই গ্রন্থের ‘ফ্যান আইনং’ শীর্ষক লেখায় যে মানুষটিকে পাওয়া যায়, তার সঙ্গে মিল রয়েছে উই-ফুর।
ফ্যান আইনংয়ের (১৮৮৩–১৯১২) সাথে লু সুনের পরিচয় ঘটে ১৯০৭ সালে, জাপানের টোকিওতে। দুজনই তখন বিদ্যাশিক্ষার জন্য জাপানে অবস্থান করছেন। ফ্যান আইনং ছিলেন শাওশিংয়ের বিপ্লবী সু সি-লিনের ছাত্র। সু সি-লিনই ১৯০৫ সালে ফ্যান আইনংকে জাপানে নিয়ে আসেন। নবীন শিক্ষার্থীদের আসার খবর পেয়ে লু সুন তাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলেও ফ্যান আইনংকে তিনি আলাদাভাবে খেয়াল করেননি। তার দুই বছর পর, ১৯০৭ সালে চীন থেকে আগত এক টেলিগ্রাম মারফত লু সুন ও অন্য ছাত্ররা জানতে পারেন, আনহুই প্রদেশের গভর্নর এনমিংকে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যাকারী সু সি-লিনকে আটক করা হয়েছে।
এর কয়েক দিন পরই এক বর্বরতম খবর আসে—সু সি-লিনের কলিজা খুলে আগুনে পুড়িয়ে খেয়েছে এনমিংয়ের দেহরক্ষীরা। এই খবর শুনে ক্ষুব্ধ হয় লু সুন ও জাপানে অবস্থানরত অন্য শিক্ষার্থীরা। একজন প্রস্তাব করেন, মানচু সরকারের এই বর্বরতা সম্পর্কে পিকিংকে অবহিত করতে এবং এই ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়ে তারা পিকিং বরাবর একটি টেলিগ্রাম পাঠাতে পারে। এই প্রস্তাবে এক দল রাজি হয়, আরেক দল রাজি হয় না। লু সুন ছিলেন টেলিগ্রাম পাঠানোর পক্ষে। এই বাদানুবাদের মাঝখানে হঠাৎ একজন বলে ওঠে, ‘যাদেরকে মারা হয়েছে, তাদেরকে তো মারাই হয়েছে, যারা মারা গেছে তারা তো মারাই গেছে, এখন আর এসব ঝামেলা বাধানোর টেলিগ্রাম পাঠানোর কি মানে আছে!’
লু সুন তাঁর সহপাঠীদের জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, এই বক্তব্য প্রদানকারীর নাম ফ্যান আইনং, যিনি সু সি-লিনের শিষ্যদের একজন। গুরুর মৃত্যুতে শিষ্যের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যে ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত হন লু সুন। যার ফলে বহুদিন পর্যন্ত ফ্যান আইনংয়ের প্রতি তাঁর ঘৃণা জারি ছিল। ফ্যানের সঙ্গে লু স্যুনের আবার দেখা হয় প্রায় চার বছর পর, ১৯১১ সালের বিপ্লবের প্রাক্কালে। এবারের দেখা হওয়ার উপলক্ষ অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক বন্ধুর বাসায় মদ্যপান করতে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে তাঁদের দেখা হয়ে যায়। মজার বিষয় হলো এই দেখায় তাঁরা দুজনই আগেকার সেই রেষারেষি ভুলে যান। তাঁরা দুজনই দুজনকে ভালোভাবে গ্রহণ করেন। দ্রুতই তাঁরা একে অপরের আড্ডা, মদ্যপান, সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে ওঠেন। দুজন একই স্কুলে চাকরিও করেন কিছুদিন। লু সুন ছিলেন অধ্যক্ষ; আর ফ্যান আইনং সুপারভাইজার। এ সুবাদে ফ্যানের জীবন কিছুদিন বেশ স্থিতিশীল কাটে। তাঁর চেহারাসুরত ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আসে, তাঁর মদ্যপান কমে যায়, একজন নিবেদিতপ্রাণ চাকরিজীবী হয়ে ওঠে সে; কিন্তু এই স্থিতিশীল সময় ফুরিয়ে আসতে খুব বেশি সময় লাগে না।
শাওশিংয়ে একটি পত্রিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে বেশকিছু ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন লু সুন। একসময় তাকে বদলি করা হয় নানকিংয়ে। কিছুদিন নানকিংয়ে চাকরি করার পর তাঁকে পাঠানো হয় পিকিংয়ে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। লু সুন শাওশিং ত্যাগের পর তাঁর জায়গায় নিয়োগ দেওয়া হয় কনফুসিয়ান লিগের এক সদস্যকে। নতুন অধ্যক্ষ আসার কিছুদিনের মাথায় চাকরি যায় ফ্যানের। তাঁর জীবনে ধীরে ধীরে নেমে আসে অসীম দুর্দশা। কিছুদিন বন্ধুর বাড়িতে থাকেন তো কিছুদিন থাকেন পথে পথে। তাঁর মদ্যপান বেড়ে যায়। চেহারাসুরত ও জীবনযাপনে নেমে আসে আগেকার মলিনতা। এই করে তাঁর কিছুদিন কাটে; কিন্তু দুর্দশাকে কাটিয়ে জীবনে সফল হওয়ার যে প্রক্রিয়া, সেই প্রক্রিয়ায় প্রবেশের আগেই একদিন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মদ্যপ অবস্থায় অপেরা থেকে ফেরার পথে নৌকা থেকে পড়ে মাত্র ২৯ বছর বয়সে প্রাণ হারান ফ্যান আইনং।
ফ্যান আইনংয়ের এই মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু—এ নিয়ে দ্বিধা ছিল লু সুনের মনে। লু সুনের একটা অনুমান হলো, ফ্যান আত্মহত্যাই করেছেন; কেননা, লু সুনের মতে, সে ছিল একজন দুর্দান্ত সাঁতারু। তাঁর পক্ষে আর যা–ই হোক পানিতে ডুবে মৃত্যু অস্বাভাবিক।
ফ্যানের কাছে সব সময়ই ভরসার জায়গা ছিল লু সুন। তাঁর সব সময়ই মনে হতো, লু সুন তাঁর জন্য পিকিংয়ে কোনো একটা চাকরিবাকরির ব্যবস্থা করবে। লু সুন অবশ্য চেষ্টাও করেছিলেন; কিন্তু নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় সে চেষ্টা সফল হয়নি। মারা যাওয়ার সময় ফ্যান ছিলেন কপর্দকশূন্য দশায়। তাঁর স্ত্রী ও শিশুকন্যাটির জন্য বড় আফসোস করতে দেখা গেছে লু সুনকে। মেয়েটির লেখাপড়ার জন্য এক তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয় কয়েকজন মিলে; কিন্তু এই তহবিল কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে সেই বিতণ্ডায় তহবিলটি আর আলোর মুখ দেখেনি। এ নিয়েও দুঃখ প্রকাশ করতে দেখা যায় লু সুনকে। বোঝা যায়, বন্ধুর অকালবিয়োগ এবং দুর্দশাকালে বন্ধুর জন্য কিছু করতে না পারার বেদনা প্রতিনিয়তই লু সুনকে দগ্ধ করেছে। সেই যাতনাই সম্ভবত তাঁর লেখালেখির কেন্দ্রে বারবার নিয়ে এসেছে ফ্যানকে।
ফ্যানকে বাঁচতে দেয়নি তাঁর নিষ্ঠুর সমাজ আর তাঁর স্বভাবজাত সারল্য। মুখ ও অন্তরের মধ্যে পার্থক্য করা শিখতে পারেননি ফ্যান। তাঁর পক্ষে শেখা সম্ভব হয়নি ছলনা, যেই ছলনার ওপর আশ্রয় করে টিকে থাকে সমাজ ও সেই সমাজের নানা স্তরের মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক। ছলনা রপ্ত করতে পারেনি বলে কোথাও নিজেকে মানিয়ে নিতে পারত না ফ্যান। সর্বত্রই সে ছিল অনুপযুক্ত। শ্রেণি, শিক্ষা, আমলাতান্ত্রিক অবস্থান, বয়স ও ধনসম্পদগত যে ভেদাভেদ তার সমাজে বিদ্যমান ছিল, তা কখনো আমলে নিতেন না ফ্যান। এসব তাঁর মাথায় কখনো কাজই করত না।
ফ্যানের এক শ্রেণিভেদজ্ঞানহীনতা বুঝতে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। যেই মিলিটারি গভর্নরের আমলে ফ্যান ও লু সুনের চাকরি হয়েছিল, তাঁর নাম ছিল ওয়াং জিনফা। ঘটনাক্রমে তিনিও ছিলেন ফ্যানের গুরু সু সি-লিনের শিষ্য। সেই সুবাদে দুই জনের মধ্যে সামান্য চেনা-পরিচয় ছিল; কিন্তু এমন কোনো বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল না। একদিন ওয়াং সাহেবের অফিসে গিয়ে ফ্যান তাঁকে ‘পুরোনা বন্ধু’ হিসেবে সম্বোধন করতে লাগলেন। শুধু তা–ই না, ওয়াং সাহেবের মুণ্ডিত মাথা দুই হাত দিয়ে ঘষতে ঘষতে বললেন, বন্ধু তুমি তো ভালোই উন্নতি করছ, এ গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তোমাকে অভিনন্দন।
ফ্যানের এই ভেদাভেদজ্ঞানহীনতা ও সরলতাই লু সুনকে মুগ্ধ করেছিল বলে ধারণা করেন অনেকে। কারণ, সমাজে বিদ্যমান যে আধিপত্যপরম্পরা (হায়ারার্কি) একেই চীনা সমাজের মৌলিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন লু সুন। ফ্যানের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিতে একাধিক কাব্য রচনা করেন লু সুন। তার মধ্যে একটি কবিতার কয়েক চরণ স্মরণ করা যাক:
‘যখন জমিনের ওপর দিয়া ঝড় বয়ে যায়
স্মৃতির চক্ষু তখন ফ্যান আইনংয়ের দিকে ধায়:
ধূসর চুল, আলুথালু, পাতলা পাতলা,
ঘৃণায় ভরে উঠছে চোখের শ্বেতমণ্ডল
পদ-পদবির লাগি ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে থাকা পা-চাটাদের দেখে দেখে।
যেই খাবারের স্বাদ তিতা
চিরকালই দুনিয়ার কাছে তা না-পছন্দ
যেই মানুষের মত ও পথ সরলসিধা
তারে বেশি দিন বরদাশত করবে না ভয়াল দুনিয়া।
তারপরও, কে জানত
আমাদের বিচ্ছেদের মাত্র তিন মাসের মাথায়
এই ভয়াল দুনিয়া ছেড়ে তুমি চলে যাবা
যেখানে কোনো দিন নিজেরে তুমি মানাইয়া নিতে পারো নাই?’
কোনো কোনো স্থান থাকে, যেখানে মানুষ আর ফিরতে চায় না। ফিরলে কেবলই বেদনা বাড়ে। তারপরও কোনো এক অলৌকিক কারণে সেখানে তার ফিরতে হয়। এক যুগ পর শাওশিংয়ে ফেরার ব্যাপারটি লু সুনের জন্য তেমনই ছিল। এখানে ফেরার পর তাকে জেঁকে ধরে ফ্যান আইনংয়ের স্মৃতি। তারপর পুরোনো সেই শুঁড়িখানা, যেখানে বহুরাত মদ পিয়ে আর আড্ডা দিয়ে পার করেছে লু সুন ও তাঁর প্রয়াত বন্ধু ফ্যান আইনং।
উই-ফুর মুখ দিয়ে লু স্যুন যেসব কথা বলিয়েছেন, আদতে দেখা যায়, সেসব তাঁরই সব চিন্তা বা দুশ্চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। কারণ, ফ্যান আইনং তাঁর মা-বাবাকে হারিয়েছেন খুবই ছোটবেলায়। দাদা-দাদির কাছেই সে মানুষ। তাঁকে আর্থিক সহায়তা দিতেন তাঁর এক চাচা; যদিও জাপানে পড়াশোনারত অবস্থায় এক পর্যায়ে তাঁর চাচা অর্থকড়ির জোগান দেওয়া বন্ধ করে দেন। অর্থাভাবে শেষ পর্যন্ত লেখাপড়া শেষ না করেই তাঁকে চীনে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু গল্পের প্রোটাগনিস্ট হিসেবে যে উই-ফুকে আমরা পাই সব সময়, তাঁর মধ্যে মাকে খুশি করার একটা বাসনা বিদ্যমান। মাকে খুশি করার জন্য সে মিথ্যা বলে, অভিনয় করে, যা ঘটার নয়, তা–ই ঘটায়। মায়ের প্রতি লু সুনের যে ভক্তি ছিল এবং মাকে খুশি করার তাঁর যে বাসনা ছিল, তা-ই তিনি সম্ভবত মূর্ত করার প্রয়াস পেয়েছেন উই-ফুর মধ্য দিয়ে।
লু সুনের মৃত্যুর পর ১৯৩৭ সালে প্রদত্ত এক ভাষণে তৎকালীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সে–তুং বলেছিলেন, ‘কনফুসিয়াস যদি প্রাচীন চীনের সিদ্ধপুরুষ হয়ে থাকেন, তবে আধুনিক চীনের মহান সিদ্ধপুরুষ হলেন লু সুন।’ প্রশ্ন হলো আপসপ্রবণ উই-ফুকে নিয়ে কেন গল্প লিখলেন চীনের মহান বিপ্লবী মাও সে–তুংয়ের নয়নের মণি লু সুন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতেই পড়া যেতে পারে ‘শুঁড়িখানা’য় গল্পটি। ব্যক্তি যে কেবল আশাবাদের মধ্যেই থাকতে পারে না, জীবনের নানা ঘটনা যে নানাভাবে তাকে দাগা দিয়ে যায়, তা-ই মূলত এই গল্পের ছত্রে ছত্রে আমরা দেখতে পাব।
ধারণা করি, বিপ্লবকেন্দ্রিক আশাবাদের মধ্যে ব্যক্তির নিজের আশাবাদী হওয়ার যে ব্যাপার, তা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশাগ্রস্ত ছিলেন লু সুন। এক লেখায় তিনি জানাচ্ছেন, ‘আশা হলো সেই বস্তু, যারে আপনি ভাবতে পারেন আছে, অথবা নেই। আশা হলো বিরানমাঠের মাঝখান দিয়ে বহমান সেই পথটার মতো, যার শুরু কীভাবে হলো কেউ জানে না, যখন বহু লোক একইভাবে একই গন্তব্যের দিকে আগাইয়া গেল, তখনই শূন্য মাঠে একটা পথ মূর্ত হয়ে উঠল।’ বহুলোকের হেঁটে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট পথ দিয়ে ব্যক্তি যখন একা হেঁটে যায়, তখন সমষ্টির আশা কি ব্যক্তির মধে৵ সদা দেদীপ্যমান থাকে? নাকি ব্যক্তির হাঁটার পথ সব সময়ই অন্ধকারময়, নৈরাশ্যপূর্ণ? ব্যক্তিগত জীবন, আশা-নৈরাশার দোলাচল, সমষ্টির মধে৵ ব্যক্তির বিলীন হওয়া—এসবও তো নাকচ করার উপায় নেই। লু সুনের লেখাজোখায় নানা ছুতায় প্রায়ই প্রকটিত হয় ব্যক্তির এসব সংকট।
তরজমা প্রসঙ্গে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে আলাদা করে অনুবাদের হয়তো আর প্রয়োজন পড়বে না। কিছুদিন পর এআই-ই আমাদের সামনে অর্থ হাজির করে দেবে। আমরাই হয়তো শেষ প্রজন্ম, যারা কিনা এই সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছি। অনাগত দিনে এই শিল্পের ভার মানুষের হাতে আর থাকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। আমাদেরও প্রিয় পেশাটি দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এই হতাশার মুহূর্তেও একটা জায়গায় একটু আশার আলো এখনো দেখতে পাই। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স হয়তো আমাদের দেখাতে পারবে একজন লেখক কী লিখেছেন; কিন্তু সেই লেখার পেছনে অনুভূতির যেই খেলা, তা সম্ভবত এআইর পক্ষে কোনোদিন আবিষ্কার করা সম্ভব হবে না; কেননা, মানবজীবনের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করা তো আর তার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠবে না।
এক মানুষ যখন আরেক মানুষের লেখা তরজমা করে, তখনো তো অনেক কিছু হারিয়ে যায়, না হয় তো ‘লস্ট ইন ট্রান্সলেশন’ শব্দবন্ধের আগমন ঘটত না। এই তরজমার ক্ষেত্রেও নিঃসন্দেহে এই কথা সত্য। চীনা ভাষায় অপরাগতা হেতু মূল ভাষা থেকে এ অনুবাদ করা সম্ভব হয়নি। অনুবাদের জন্য আশ্রয় নেওয়া হয়েছে ইংরেজি অনুবাদের। অনুবাদ থেকে অনুবাদের ফলে হয়তো মূলের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। তারপরও অনুবাদক হিসেবে চেষ্টা করেছি, লেখক কী লিখছেন, শুধু তাতে গুরুত্ব না দিয়ে কীভাবে লিখছেন বা কোন অনুভূতি পশ্চাতে খেলা করেছে, তা বোঝার।
যতদূর জানি লু সুন ছিলেন তার গুরু নিকোলাই গোগলের মতোই স্টাইলিস্ট, যার ফলে তাঁর বক্তব্য প্রদানের ধরনে রয়েছে বিশেষ ভিন্নতা। তিনি কী বলছেন, শুধু তা-ই গুরুত্বপূর্ণ নয়, কীভাবে বলছেন তা–ও গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গাগুলো বোঝার প্রয়াস পেয়েছি। কোথাও কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে আশা করি পাঠক তা ধরিয়ে দেবেন।
শুঁড়িখানায়
উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণ–পূর্ব দিকে সফরকালে ঘুরপথে একবার বাড়ির দিকেও গেলাম, তারপর আসলাম ‘শ’তে (১)। ‘শ’ শহরটি আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র ১০ মাইল দূরে; ছোট ডিঙিযোগে আধা দিনের কম সময়ে এই শহরে পৌঁছা যায়। এখানকার একটা স্কুলে আমি এক বছর পড়িয়েছি। বরফ কেটে যাওয়ার পর এখানে এখন তীব্র শীত। প্রকৃতি বিষণ্ণ। ‘লো স্যু’ নামের একটি হোটেলের দেখা পেলাম। আলস্য আর স্মৃতিকাতরতা মিলিয়ে মনে হলো আপাতত এখানেই ওঠা যাক। আমি যখন এখানটায় থাকতাম, তখন অবশ্য এ হোটেলটা দেখিনি। শহরটাও তখন আরও ছোট ছিল।
মনে মনে পুরোনা কলিগদের খোঁজ করতে লাগলাম। ভাবছিলাম, হয়তো কারও না কারো দেখা পেয়ে যাব; কিন্তু কারোই দেখা পাওয়া গেল না। বহু আগেই তারা নানা দিকে ছড়িয়ে গেছে। স্কুলের গেটটা পার হতেই দেখি, এর নাম চেহারা সব বদলে গেছে। এই দৃশ্য দেখার পর নিজেকে একদমই আগন্তুক মনে হলো। দুই ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে আমার যাবতীয় উৎসাহ ফুরিয়ে গেল। কেন এলাম ভেবে নিজেকেই নিজে ভর্ৎসনা করতে লাগলাম।
যে হোটেলটায় উঠলাম, তারা শুধু থাকার ঘরটাই দিল, খাবারের কোনো ব্যবস্থা করল না। ভাত ও অন্যান্য খাবার চাইলে বাইরে থেকে আনিয়ে নেওয়া যায়; কিন্তু সেগুলো পুরোপুরি অখাদ্য, স্বাদে মাটির লাহান। জানালার ওপারে শুধু শুকনা শেওলায় ঢাকা একটা পাংশুল দেয়াল। ওপরে ধূসর আকাশ, রংহীন বিবর্ণ। হালকা তুষারপাত শুরু হয়েছে। দুপুরের খাবারটা খুব বাজে ছিল। এদিকে সময় কাটানোর কোনো উপায় পাচ্ছি না। এখানে থাকার সময় ‘এক পিপা ঘর’ নামের একটা অখ্যাত শুঁড়িখানায় আমার বেশ গতায়াত ছিল। হোটেল থেকে খুব একটা দূরে হওয়ার কথা না। ভাবলাম, সেখানেই যাওয়া যাক। দরজা বন্ধ করে দ্রুতই শুঁড়িখানার উদ্দেশে বের হয়ে পড়লাম। আসলে আমি কেবল চাচ্ছিলাম একঘেয়েমি থেকে রেহাই পেতে। মদ্যপানের কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না।
ভাগ্য সুপ্রসন্ন। ‘এক পিপা ঘর’ এখনো আছে। এর সরু, জীর্ণশীর্ণ সম্মুখভাগ আর মরিচাধরা সাইনবোর্ডটি এখনো আগের মতোই আছে; কিন্তু মালিক থেকে শুরু করে ওয়েটার পর্যন্ত একটা লোককেও চিনতে পারলাম না। এখানেও আমি পুরোপুরি আগন্তুকে পরিণত হলাম। তারপরও ঘরের কোনার সেই পরিচিত সিঁড়িটি বেয়ে ওপরতলার ছোট কক্ষটিতে উঠে এলাম। কাঠের ছোট পাঁচটি টেবিল এখনো আগের মতোই আছে। শুধু পেছনের জানালাটায় কাঠের জালি পাল্টিয়ে কাচের শার্সি লাগানো হয়েছে।
ওয়েটারকে বললাম, ‘এক ক্যাটি হুয়াংজিয়ু, ১০ স্লাইস টফু আর বেশি করে পিপার সস।’ অর্ডার করে পেছনের দিকটায় গিয়ে জানালার পাশের টেবিলটায় বসলাম। উপরতলার এ কামরাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। ফলে নিচের জনশূন্য আঙিনাটা যে টেবিল থেকে সবচেয়ে ভালো দেখা যায়, সহজেই গিয়ে সেখানে গিয়ে বসতে পারলাম। এ ফাঁকা জায়গাটা সম্ভবত এ দোকানের না। অতীতেও বহুবার এ টেবিলটায় বসে আমি এ আঙিনার পানে চোখ রেখেছি, কখনো কখনো তুষারাবৃত আবহাওয়াতেও। আমার চোখে এখনো উত্তরাঞ্চল ভাসছে, তারপরও জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য বেশ আকর্ষণীয় লাগল; বরফের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে কিছু বরই গাছ। নতুন কুঁড়িতে সতেজ গাছগুলো দেখে মনে হচ্ছে, যেন এই তীব্র শীতকে তারা থোড়াই কেয়ার করছে। জীর্ণশীর্ণ চাতালটার পাশে এখনো রয়েছে একটি ক্যামেলিয়া গাছ। তুষারমাঝে অগ্নিকুণ্ডের মতো জ্বলজ্বল করছে গাছটার ভারী-গাঢ় সবুজ পাতার ওপর ফুটে থাকা ডজনখানেক রক্তবর্ণ অত্যুগ্র উদ্ধত ফুল। যেন এক পর্যটকের ভ্রমণতৃষাকে তারা অকাতরে উপহাস করছে। আমার হঠাৎ এখানকার জমাটবাঁধা বরফের আর্দ্রতার কথা মনে পড়ল। এখানকার বরফ উত্তরের শুকনা বরফ থেকে আলাদা: জমাটবাঁধা, ঝকঝকে ও উজ্জ্বল। খুব বাতাস হলে উত্তরের বরফ উড়তে থাকে এবং কুয়াশার মতো আকাশে ছড়িয়ে পড়ে…
এরই মধ্যে ওয়েটার এসে অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘আপনার ওয়াইন, স্যার…।’ বলেই সে টেবিলে একে একে পেয়ালা, চপস্টিক, পানপাত্র ও খাবার নামিয়ে দিল। শরাব এসে গেছে দেখে টেবিলের দিকে ঘুরলাম। সব ঠিকঠাক করে পেয়ালায় মদ ঢাললাম। আমার মনে হয়েছিল উত্তর আসলে আমার জন্য উপযুক্ত জায়গা না; কিন্তু দক্ষিণে এসেও আমার নিজেকে আগন্তুকই মনে হলো। উত্তরের পাউডারসদৃশ শুকনো বরফ আর এখানকার দীর্ঘক্ষণ জমাট বেঁধে থাকা কোমল বরফ আমার কাছে একই রকম অচেনা ঠেকতে লাগল। কিছুটা মনমরা ভাব নিয়ে আস্তে–ধীরে মদের পেয়ালায় একটি চুমুক দিলাম। মদটা ছিল একদম খাঁটি; আর টফুটাও খুব ভালোমতো ভাজা হয়েছে। একমাত্র দুঃখের বিষয় হলো মরিচের সসটা খুব হালকা। হাহ, শহরের লোকগুলো কড়া ঝাঁজের মজাটা কোনো দিন বুঝতে পারল না!
সম্ভবত বিকেল হওয়ার কারণে এখানে পানশালার ভাবটা এখনো আসেনি। এর মধ্যে তিন পেগ মদ খেয়ে ফেললাম; কিন্তু আশপাশে চারটা খালি চেয়ার ছাড়া আর কারও দেখা পেলাম না। ফাঁকা মাঠটার দিকে তাকিয়ে নিঃসঙ্গ বোধ করতে লাগলাম। তারপরও আমি চাচ্ছিলাম না আর কোনো খরিদ্দার এসে ভিড় করুক। সিঁড়ি ভেঙে কেউ একজন উঠে আসছে মনে হলো। তার পায়ের শব্দে বেশ বিরক্ত হচ্ছিলাম; কিন্তু শেষমেশ যখন দেখলাম, এ আর নতুন কেউ নয়; বরং এখানকার ওয়েটার, তখন বেশ স্বস্তি বোধ করলাম। তারপর আরও দুই পেগ মদ মেরে দিলাম।
কিন্তু এবার মনে হচ্ছে আর রক্ষা নেই। পায়ের শব্দ শুনে মনে হলো, এবার নিশ্চয়ই কোনো কাস্টমার। কারণ, লোকটা ওয়েটারের চেয়ে ধীরে পা ফেলছিল। একসময় বুঝতে পারলাম, লোকটা উপরে উঠে এসেছে। অনেকটা আশঙ্কা নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত সেই সঙ্গীর দিকে উঁকি মারলাম। লোকটাকে দেখে রীতিমতো ভিমরি খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমি কখনো ভুলেও ভাবিনি এখানে কোনো বন্ধুর দেখা পেয়ে যাব—অবশ্য লোকটা যদি আমার ‘বন্ধু’ বলাটাকে অনুমোদন করে। এই লোকটা ছিল আমার এককালের সহপাঠী। শিক্ষকতা করার সময়ও তাকে আমি সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি। দেখার পরপরই খেয়াল করলাম, আমি তাকে সর্বশেষ যেমন দেখেছিলাম, তার তুলনায় সে খুব একটা বদলায়নি। শুধু চলার গতিটা ধীরস্থির হয়ে পড়েছে। আগেকার সেই চঞ্চল ও চটপটে লু উই-ফুর সঙ্গে তার যেন মিল নেই।
‘আহ্, তুমি উই-ফু না? এখানে তোমার দেখা পাব একদমই ভাবিনি।’
‘আরে তুমি? আমিও একেবারেই ভাবি নাই…’
উই-ফুকে আমার টেবিলে বসতে বললাম। বসবে কি বসবে না সংকোচ করতে করতে সে বসল। তার এই সংকোচ করার বিষয়টা প্রথমে আমি নিতে পারছিলাম না। তার এমন আচরণে কিছুটা কষ্ট পেলাম, বিরক্তও হলাম। ভালোমতো তাকানোর পর খেয়াল করলাম, তার চুল-দাঁড়ি-গোফ এখনো আগের মতোই অগোছালো, মুখটা আয়ত বিষণ্ণ; তবে আগের চেয়ে শুকনা ও রোগাসোগা। তাকে খুব চুপচাপ দেখাচ্ছিল, কিংবা বিষাদগ্রস্ত। কালো মোটা ভুরুর নিচে চোখজোড়ায় আগের সেই তৎপরতা আর নেই। স্কুলে পড়ানোর সময় তার চোখে প্রায় সব সময় একটা তীক্ষ্ণ চাহনি ফুটে উঠতে দেখতাম। পাশের শূন্য মাঠটার দিকে তাকানোর পর হঠাৎ মনে হলো তার চোখ ঠিকরে পড়ছে সেই পুরোনো চাহনি।
ইচ্ছা না করলেও হাসিমুখে তাকে বললাম, ‘প্রায় ১০ বছর আমাদের দেখা নেই। অনেক দিন আগে শুনেছিলাম তুমি সিনানে আছ; কিন্তু আলস্যবশত তোমাকে চিঠিপত্র লেখা হয়নি…’
সে বলল, ‘আমারও একই অবস্থা। দুই বছরের বেশি হয় মায়ের সাথে তাইওয়ানে আছি। মাকে আনার জন্য যখন ফিরে গেলাম, তখন জানতে পারলাম তুমি এরই মধ্যে চলে গেছ, একেবারে চলে গেছ।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাইওয়ানে কী করছ?’
‘এখানকার একটা রাজপরিবারে পড়াচ্ছি।’
‘তার আগে কী করতে?’
‘তার আগে?’ বলেই সে পকেট থেকে একটা সিগারেট নিল, সিগারেটটা জ্বালিয়ে মুখে নিল, তারপর মুখ থেকে বের হওয়া কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে চিন্তামগ্নভাবে বলল, ‘একদমই অর্থহীন কাজ, কিছুই না করার মতো।’
হঠাৎ খেয়াল করলাম উই-ফুর চোখ লাল হয়ে গেছে। তবে বুঝতে পারলাম এটা মদ্যপানের প্রভাব। সে কদাচিৎ খাবার স্পর্শ করছে, অবিরত মদ গিলছে। এরই মধ্যে সে এক ক্যাটির বেশি মদ খেয়ে ফেলেছে এবং তার চাহনি ও অঙ্গভঙ্গি আরও ক্ষিপ্র হয়ে উঠেছে। বহুদিন আগে আমি যে লু উই-ফুকে চিনতাম, ধীরে ধীরে সে তার মতো হয়ে উঠছে। ওয়েটারকে ডেকে আরও দুই ক্যাটি মদ গরম করতে বললাম। বলেই ঘাড় ঘুরিয়ে মদের পেয়ালা হাতে নিলাম, তার মুখোমুখি হলাম, সে যা বলতে চায় নীরবে তা শুনতে লাগলাম।
এবার সে আমার বিষয়ে জানতে চাইল। জানতে চাইল, সবাই দলছুট হয়ে পড়ার পর থেকে এখন অবধি কী করলাম–টরলাম। আমি তাকে একটা খসড়া ধারণা দিলাম। একই সঙ্গে ওয়েটারকে বললাম, আরেকটা কাপ ও চপস্টিক নিয়ে আসতে। আরও দুই ক্যাটি গরম মদ আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ। আমরা খাবারও অর্ডার করলাম। অতীতে আমাদের মধ্যে ফরমালিটি ব্যাপারটা একদমই ছিল না; কিন্তু আজ আমরা খুব ফরমাল আচরণ করতে লাগলাম। কেউই নিজ থেকে কোনো খাবার বাছাই করলাম না এবং শেষমেশ ওয়েটারের পরামর্শেই চারটি আইটেম অর্ডার করলাম: মৌরির ডাল, ঠান্ডা মাংস, টফু ভাজা আর নোনতা মাছ।
এক হাতে সিগারেট ও আরেক হাতে মদের পেয়ালা নিয়ে একটা তেতো হাসি হেসে সে বলল, ‘অনেক দিন পর ফের এখানে এসে নিজেকে খুব বোকা মনে হলো। ছোটবেলায় দেখেছিলাম, মৌমাছি কিংবা মাছি কী করে ঘুরেফিরে সেই একই জায়গায় এসে জড়ো হয়। ভয় পেলে তারা উড়ে যায়; কিন্তু একটা ছোট বৃত্তে কিছুক্ষণ ঘুরেফিরেই তারা হয়তো আবার আগের জায়গায় থিতু হওয়ার জন্য ফিরে আসে। তাদের এই ফিরে আসাকে আমার সত্যিই খুব বোকামিসুলভ এবং কষ্টদায়ক মনে হতো; কিন্তু আমি কখনো ভাবিনি, একটা ছোট বৃত্তে ঘুরপাক খেয়ে আমি নিজেও এ রকম একই জায়গায় ফিরে আসব। তোমার ক্ষেত্রেও আমি কখনো এমনটা ভাবিনি। তুমি কি বৃত্তের বাইরে গিয়ে আরেকটু বেশি উড়তে পেরেছিলে?’
আমিও তেতো হাসি দিয়ে বললাম, ‘এটা বলা একটু কঠিন। সম্ভবত আমিও একই ক্ষুদ্র বৃত্তেই উড়ে বেড়িয়েছি। কিন্তু তুমি কেন এত দিন পর আবার এখানে এলে?’
‘একদমই অর্থহীন কিছুর প্রয়োজনে।’ কথাটি বলেই এক ঢোকে পেয়ালার সবটুকু মদ সাবাড় করে সিগারেটটায় কয়েক টান দিল সে। তারপর চোখ দুটো আরও খানিকটা টানা টানা করে নিল। বলল, ‘ব্যাপারটা অর্থহীন, তবে আমি সম্ভবত আগেও তোমাকে এ বিষয়ে বলেছি।’
মাত্র গরম করা মদ ও খাবার এনে টেবিলে রাখল ওয়েটার। ফ্রায়েড টফুর ধোঁয়া আর সুবাসে ওপরতলার কক্ষটা যেন ম–ম করছে। এদিকে বাইরে এখন আরও ঘন তুষারপাত হচ্ছে।
সে আবার বলতে শুরু করল, ‘তোমার সম্ভবত মনে আছে, আমার একটা ছোট ভাই তিন বছর বয়সে মারা গেছে এবং তাকে এখানটায় সমাহিত করা হয়েছে। আমি নিজেই আসলে মনে করতে পারছি না সে দেখতে কেমন ছিল। কিন্তু আমার মাকে বলতে শুনেছি, সে খুবই মায়াবী এক শিশু ছিল এবং আমাকে সে বড়ই পছন্দ করত। তার কথা বলতে গিয়ে এখনো আমার মায়ের চোখে পানি আসে। এই বসন্তে আমাদের এক কাজিন চিঠি দিয়ে জানালেন, আমার ভাইয়ের কবরের আশপাশের মাটি ধীরে ধীরে নদীতে ভেসে যাচ্ছে, শিগগিরই কবরটাও ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের শিগগিরই সেখানটায় যাওয়া উচিত এবং এ ব্যাপারে কিছু একটা করা উচিত। এ খবর শোনার পর আমার মা খুব ভেঙে পড়লেন, কয়েক রাত ঘুমাতে পারলেন না। তুমি তো জানো তিনি নিজেই চিঠি পড়তে পারেন। কিন্তু আমি কী করব? আমার হাতে টাকা নেই, সময় নেই। আমার আসলে করার মতো কিছুই নেই।’
‘নতুন বছরের ছুটি পাওয়ায় তার কবরটা অন্যত্র সরানোর জন্য আমার দক্ষিণে আসার সুযোগ হলো,’ বলেই সে আরেক পেয়ালা মদ পিয়ে নিল। তারপর জানালার দিকে তাকিয়ে বিস্ময় নিয়ে বলল, ‘তুমি কি উত্তরে কখনো এমনটা দেখেছ? জমাট তুষারাবৃত ফুল, অথচ ভূতল বরফমুক্ত! যাহোক, গত পরশু একটা ছোট কফিন কিনলাম, কারণ আমার অনুমান ছিল, মাটির নিচের কফিনটা নিশ্চয়ই বহু আগেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। তা ছাড়া কিছু তুলা ও বিছানাপত্র নিলাম, চারজন মজুর ভাড়া করলাম, কবর সরাতে এখানকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা করে নিলাম। এ কাজগুলো করতে গিয়ে আমি হঠাৎ খুব আনন্দ বোধ করতে লাগলাম। কবর খুঁড়তে এবং যে ছোট ভাইটি আমায় খুব পছন্দ করত তার মৃতদেহ দেখতে আমি খুবই উদ্গ্রীব হয়ে পড়লাম। এ ছিল আমার জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক অনুভূতি। কবরে পৌঁছানোর পর দেখলাম ঠিক ঠিকই নদীটা প্রায় কবর ছুঁই ছুঁই, বড়জোর দুই ফুট দূরে। ভাঙাচোরা কবরটায় দুই বছর ধরে কোনো মাটি দেওয়া হয়নি। যার ফলে এটি প্রায় হারিয়ে যাওয়ার দশায়। বরফে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত হয়ে কবরটার দিকে আঙুল তাক করে শ্রমিকদের বললাম, “খোঁড়া শুরু করো”।
‘আমি আসলেই একজন সাধারণ গোছের লোক। নিজের এমন গলার আওয়াজ নিজের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হলো। এবং জীবনে আমি যত আদেশ-নির্দেশ প্রদান করেছি, এটিই ছিল তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। কিন্তু আমার এহেন আদেশে শ্রমিকেরা একটুও বিচলিত হলো না, তারা স্বাভাবিকভাবেই কবর খোঁড়ার কাজে লেগে গেল। খোঁড়াখুঁড়ি প্রায় শেষ হতেই উঁকি দিয়ে দেখি, কফিনের কাঠগুলো সব একেবারে ক্ষয়ে গেছে, শুধু রয়ে গেছে একগাদা স্প্লিন্টার আর কাঠের ছোট ছোট টুকরা। আমার হৎস্পন্দন বেড়ে গেল। নিজেই সাবধানে সবকিছু এক পাশে সরিয়ে ছোট ভাইটিকে দেখতে চাইলাম। কিন্তু যা দেখলাম তার জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। বিছানাপত্র, কাপড়চোপড়, হাড়গোড়, সবকিছু উধাও! আমারও ধারণা ছিল, এত দিনে সবকিছু ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কিন্তু আমি সব সময় শুনে এসেছি, চুল সহজে মাটির সঙ্গে মেশে না। ভেবেছিলাম, আর কিছু পাওয়া না গেলেও কিছু চুল হয়তো এখনো পাওয়া যাবে। কবরের যে জায়গাটায় বালিশ থাকার কথা ছিল, কুঁজো হয়ে সে জায়গার মাটিগুলো দেখলাম। কিন্তু ওখানেও কিছুই পেলাম না। কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট রইল না।’
হঠাৎ খেয়াল করলাম উই-ফুর চোখ লাল হয়ে গেছে। তবে বুঝতে পারলাম এটা মদ্যপানের প্রভাব। সে কদাচিৎ খাবার স্পর্শ করছে, অবিরত মদ গিলছে। এরই মধ্যে সে এক ক্যাটির বেশি মদ খেয়ে ফেলেছে এবং তার চাহনি ও অঙ্গভঙ্গি আরও ক্ষিপ্র হয়ে উঠেছে। বহুদিন আগে আমি যে লু উই-ফুকে চিনতাম, ধীরে ধীরে সে তার মতো হয়ে উঠছে। ওয়েটারকে ডেকে আরও দুই ক্যাটি মদ গরম করতে বললাম। বলেই ঘাড় ঘুরিয়ে মদের পেয়ালা হাতে নিলাম, তার মুখোমুখি হলাম, সে যা বলতে চায় নীরবে তা শুনতে লাগলাম।
‘আসলে এরপর আর বেশি একটা এগোনোর একদমই প্রয়োজন ছিল না। আমি শুধু কবরটা ভরাট করে কফিনটা বিক্রি করে দিলেই পারতাম। ঘটনাটা এখানেই শেষ হতে পারত। যদিও কফিন বিক্রি করতে যাওয়াটা একটু ঝামেলার বিষয় ছিল, তারপরও যে দোকান থেকে কিনেছিলাম সেখানেই এটা বিক্রি করা যেত। কেনা দামের চেয়ে কম দাম পাওয়া গেলেও অন্তত মদ খাওয়ার জন্য কিছু টাকা রক্ষা করতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। তার মৃতদেহটা যেখানে শায়িত ছিল সেখান থেকে কিছু মাটি হাতে তুলে নিলাম। তারপর বিছানাপত্র সাজিয়ে তুলার ওপর কিছু মাটি রাখলাম, তারপর মাটিগুলো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলাম। নতুন কফিনে পুরে আমার বাবাকে যেখানে সমাহিত করা হয়েছিল সেখানে গেলাম এবং কফিনে মোড়ানো মাটির দলাকে বাবার পাশে সমাহিত করলাম। গতকাল ইট দিয়ে কবরের চারপাশটা ঘিরে দিলাম। এ নিয়েই গতকাল প্রায় সারা দিন ব্যস্ততায় কেটেছে। যেভাবেই হোক কাজটার একটা সুরাহা করতে পারলাম। অন্তত মাকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য এবং তার আত্মার শান্তির জন্য এটুকু আমার করা লাগল।
‘তুমি আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছ! তুমি কি এতটা বদলে যাওয়ার জন্য মনে মনে আমাকে গালমন্দ করছ? হ্যাঁ আমার এখনো সেই সময়ের কথা মনে আছে, যখন টুটেলারি মন্দিরে গিয়ে আমরা মূর্তিগুলোর দাড়িগোঁফ উপড়ে ফেলতাম। মনে আছে, সশরীর লড়াইয়ে নামার আগে কী করে সারা দিন চীনকে বিপ্লবী দেশ হিসেবে গড়ে তোলার উপায় নিয়ে আমরা আলোচনা করতাম। কিন্তু এখন আমি এমনই। যা যেভাবে চলছে তাকে সেভাবেই চলতে দিতে এবং সবকিছুর সঙ্গে আপস করে চলারই পক্ষপাতী। মাঝেমধ্যে আমি ভাবি, আমার পুরোনা বন্ধুরা আমাকে এখন দেখলে সম্ভবত আর বন্ধু হিসেবে স্বীকার করবে না। কিন্তু যেমন দেখছ, এটাই এখন আমি।’
সে আরেকটা সিগারেট হাতে নিল, মুখে নিয়ে সিগারেটটা জ্বালাল।
উই-ফু কিছুক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে সে এক পেয়ালা মদ গিলল আর সিগারেটে কয়েকটা টান দিল এবং আবার বলতে শুরু করল, ‘সিনানে গিয়েই কেবল নকল ফুলের মালা কিনতে পারলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম না ঠিক এই মালার জন্যই তাকে মার খেতে হয়েছিল কি না। তবে মায়ের বর্ণনার সঙ্গে আমার কেনা মালার অন্তত একটা মিল ছিল: ফুলগুলো ছিল মখমলের। আমি ঠিক জানতাম না তার হালকা রং পছন্দ নাকি গাঢ়। ফলে দুই ধরনের মালাই কিনলাম; একটা লাল, আরেকটা গোলাপি।
তারপর বলল, ‘তোমার চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে আমার ব্যাপারে এখনো তোমার আশা আছে। প্রকৃতির নিয়মেই আমি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছি। তারপরও কিছু বিষয় আমি এখনো অনুভব করতে পারি। যার কারণে তোমাদের প্রতি এখনো আমি কৃতজ্ঞতা অনুভব করি। একই সঙ্গে বিব্রতও বোধ করি। আমার ভয় হয়, আমার পুরোনো বন্ধুদের মধ্যে যাদের এখনো আমার ব্যাপারে ক্ষীণ আশা রয়েছে, তাদের আমি কেবলই নিরাশ করে চলছি কি না।’ সে থামল এবং আবার শুরু করার আগে সিগারেটটায় একসঙ্গে কয়েক টান দিয়ে নিল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে লাগল: ‘আজকেও, এখানে আসার আগেই, আমি একটা বৃথা কাজ করে এলাম। এবং কাজটি করতে গিয়ে আমি বেশ আনন্দই পাচ্ছিলাম। পুবের দিকটায় থাকার সময় চ্যাং ফু নামে আমার এক পড়শি ছিল। পেশায় সে ছিল একজন মাঝি। আহ শুন নামে তার এক কন্যা ছিল। আমার এই বাড়িটায় সেই সময় তুমিও এসেছিলে। মেয়েটাকে তোমার চোখে পড়ার কথা। কিন্তু তুমি হয়তো মেয়েটাকে খেয়াল করোনি। কারণ, সে তখন খুব ছোট ছিল। বড় হওয়ার পর সে দেখতে খুব একটা সুন্দর হয়নি। তার মুখটা ছিল সাদামাটা, শুকনা ও গোলগাল আর ত্বক ছিল পাণ্ডুর। তার চোখ জোড়া ছিল অস্বাভাবিক রকম বড়, পাপড়িগুলো লম্বা লম্বা এবং চোখের সাদা অংশটুকু ছিল রাতের মেঘহীন আকাশের মতো স্বচ্ছ। এখানকার আকাশ নয়, আমি উত্তরের মেঘহীন আকাশের কথা বলছি, যখন বাতাস একদমই থাকে না। এখানকার আকাশ খুব একটা স্বচ্ছ নয়।
‘মেয়েটা ছিল বেশ শক্তসমর্থ। কৈশোরেই সে তার মাকে হারিয়েছে। ছোট এক ভাই ও এক বোনের দেখাশোনা তারই করতে হতো। এ ছাড়া পিতার দেখভালও তাকেই করতে হতো। এ সবকিছুই সে খুবই দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করত। বেশ হিসাবিও ছিল সে, যার কারণে পরিবারে ক্রমেই সমৃদ্ধি আসতে লাগল। তার প্রশংসা করত না, এমন পাড়া–প্রতিবেশী খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। এমনকি চ্যাং ফু নিজেও প্রায় সময় তার মেয়ের প্রশংসা করত।
‘এবার যখন সফরে বের হলাম তখন মা আমাকে এই মেয়েটার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। প্রবীণ লোকদের স্মরণশক্তি বেশ প্রখর। স্মৃতি হাতড়ে মা জানালেন, একবার আহ শুন একজনকে চুলে নকল লাল ফুলের মালা পরতে দেখেছিল। দেখে তারও খুব পরতে মন চাইল। পিতার কাছে সে আবদার করল, সে যেন তাকে এমন একটা মালা এনে দেয়। কিন্তু পিতা মালা না নিয়েই বাড়ি এল। ফুলের মালা না পেয়ে সে প্রায় সারা রাত কান্নাকাটি করল। এমন অযৌক্তিক আবদার এবং রাতভর কান্নাকাটি করায় তার পিতা তাকে মারধর করল। দুই কি তিন দিনের মতো তার চোখ লাল হয়ে ফুলে ছিল। এই ফুলের মালাগুলো পাওয়া যেত অন্য প্রদেশে, “শ”–তে এগুলো কিনতে পাওয়া যেত না। সুতরাং বাবার কাছে এ রকম আবদার করাটাই ছিল বোকামি। আমি যেহেতু এবার দক্ষিণের দিকে আসছিলাম, তাই মা বললেন, মেয়েটার জন্য যেন দুটি নকল ফুলের মালা কিনে নিয়ে যাই।
‘এই দায়িত্ব পেয়ে আমি বিরক্ত হওয়ার পরিবর্তে বরং খুশিই হলাম। আহ শুনের জন্য কিছু করতে পারব, এটা ভেবে আমার আনন্দই হলো। গত বছরের আগের বছর আমি যখন মাকে আনতে গিয়েছিলাম তখন একদিন চ্যাং ফুর সঙ্গে আলাপ হলো। চ্যাং ফু তার বাড়িতে এক বাটি বাজরার জাউ খাওয়ার জন্য আমাকে দাওয়াত করতে চাইল। জানাল, জাউয়ে তারা সাদা চিনি ব্যবহার করে থাকে। বলা ভালো, একজন মাঝির বাড়িতে সাদা চিনি থাকার মানে হলো সে নিশ্চয়ই গরিব নয় এবং বেশ ভালো খাবারই খায়।
‘আমি রাজি হলাম এবং দাওয়াত গ্রহণ করলাম। তবে তাকে বিনয়ের সঙ্গে জানালাম, আমাকে যেন ছোট এক বাটি জাউ খেতে দেওয়া হয়। সে আমার আরজ বুঝতে পারল এবং আমি যখন দাওয়াত খাওয়ার জন্য তার বাড়িতে গেলাম তখন সে আহ শুনকে বলল, “এই পণ্ডিত সাহেবদের কোনো খিদে নেই। তুমি ছোট বাটিতে দিতে পারো, তবে চিনি কিন্তু বাড়িয়ে দেবে!” যাহোক, সে যখন খাবারটা বানিয়ে নিয়ে এল তখন আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। কারণ, সেই বাটিটা ছিল বিশাল। এত খাবার সারা দিনেও আমি খাই না। কিন্তু এইটা সত্য, চ্যাং ফুর বাটির তুলনায় আমার বাটিটা দেখতে ছোটই ছিল। জীবনে কোনো দিন আমি বাজরার জাউ খাইনি। এই প্রথম এই খাবার পরখ করলাম। সত্যি বলতে, প্রচণ্ড মিষ্টি হওয়া সত্ত্বেও ওটা ছিল খাওয়ার অযোগ্য। অনেকটা অন্যমনস্কভাবেই কয়েকবার জাউ মুখে পুরলাম এবং আর না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদের থেকে একটু দূরে, ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে আহ শুন। তার চোখে চোখ পড়ার পর আমি আর চপস্টিক দুটি হাত থেকে নামিয়ে রাখতে পারলাম না। তার চোখেমুখে আমি ভয় ও আশা দুই–ই দেখলাম। ভয় পাচ্ছে, কারণ তার মনে হচ্ছে খাবারটা নিশ্চয়ই ভালো হয়নি। অন্যদিকে আমাদের হয়তো খাবারটা ভালোই লাগছে, এই ভেবে সে ভরসা পাচ্ছে। আমি জানি, আমি যদি আমার খাবারের বেশির ভাগটাই না খেয়ে ফেলে রাখি তাহলে সে আশাহত হবে এবং এর জন্য নিজের ভুলকেই দায়ী করবে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আমি মনে যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে নিলাম এবং বড় করে হাঁ করে একেবারে চ্যাং ফুর মতোই দ্রুতগতিতে মুখে খাবার পুরতে শুরু করলাম। কাউকে জোর করে খাওয়ালে তার কী দশা হয় আমি সেবারই তা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। খাওয়ার সময় আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। ছোটবেলায় পেটের কৃমি তাড়াতে লাল চিনির সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে যখন খেতে দিত, তখন আমি ঠিক এ রকম জটিল একটা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতাম। খাওয়া শেষে যখন সে খালি বাটিগুলো নিতে এল, তার মুখে তখন একটা অর্ধস্ফুট সন্তুষ্টির হাসি দেখতে পেলাম। তার সেই হাসি দেখে আমার সব বিরক্তি মুহূর্তেই উবে গেল। আমার অস্বস্তিকে ছাপিয়ে গেল তার সেই তৃপ্তির হাসি। সেই রাতে বদহজমের কারণে আমার ভালো ঘুম হয়নি এবং সারা রাত দুঃস্বপ্ন আমাকে তাড়িত করেছে। তারপরও আমি মন থেকে কামনা করেছিলাম, আহ শুন যেন জীবনে সুখী হয়। আশা করেছিলাম, অন্তত তার ভালোর জন্য হলেও দুনিয়ায় একদিন পরিবর্তন আসবে। হা হা। সেই সময় আমি কেমন ভাবালুতায় ভুগতাম, এসব তারই প্রমাণ। কিছুদিন পরই অবশ্য নিজের এসব ভাবনার কথা ভেবে নিজেরই হাসি পেতে লাগল। দ্রুতই তাদের ভুলে গেলাম।
‘আমি অবশ্য আগে জানতাম না যে একটা নকল ফুলের মালার জন্য তাকে মার খেতে হয়েছে। মায়ের কাছ থেকে যখন এই ঘটনা শুনলাম তখন আমার জাউ খাওয়ার ঘটনাটাও মনে পড়ল এবং অকারণেই তার জন্য নকল ফুল কেনার ব্যাপারে আমার মধ্যে একটা অস্থিরতা শুরু হলো। এই ফুলের জন্য আমি প্রথমে গেলাম তাইওয়ান, কিন্তু সেখানকার কোনো দোকানে পেলাম না। সিনানে গিয়েই কেবল…’
জানালার বাইরের ক্যামেলিয়া গাছটা থেকে হুড়মুড় করে এক খণ্ড তুষার ঝরে পড়ল। তুষারের ভারে গাছের ডালগুলো চাপা পড়ে ছিল। এখন ডালগুলো আগের মতো সোজা হতে পারল। তাদের গাঢ় সবুজ পাতা আর রক্তলাল ফুলগুলো এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আকাশের রং আগের চেয়ে ধূসর। সন্ধ্যা ঘনিয়েছে, তাই সম্ভবত চড়ুই পাখিদের কিচিরমিচির বেড়ে গেছে। সবকিছু তুষারে ঢাকা পড়ায় এখন আর তাদের খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। হয়তো তাই দ্রুত বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়ার কথা ভাবছে।
উই-ফু কিছুক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে সে এক পেয়ালা মদ গিলল আর সিগারেটে কয়েকটা টান দিল এবং আবার বলতে শুরু করল, ‘সিনানে গিয়েই কেবল নকল ফুলের মালা কিনতে পারলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম না ঠিক এই মালার জন্যই তাকে মার খেতে হয়েছিল কি না। তবে মায়ের বর্ণনার সঙ্গে আমার কেনা মালার অন্তত একটা মিল ছিল: ফুলগুলো ছিল মখমলের। আমি ঠিক জানতাম না তার হালকা রং পছন্দ নাকি গাঢ়। ফলে দুই ধরনের মালাই কিনলাম; একটা লাল, আরেকটা গোলাপি।
আমরা একসঙ্গে বেরিয়ে এলাম। এখান থেকে যেদিকে আমার হোটেল তার বিপরীত দিকে তার হোটেল। সুতরাং দরজায় দাঁড়িয়েই আমরা একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। একা একা হোটেলের দিকে হাঁটছি; ঠান্ডা বাতাস ও তুষার এসে আমার মুখে বাড়ি খাচ্ছে, বেশ চাঙা অনুভূত হচ্ছে। আকাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। ভাসতে থাকা সাদা জমাটাবাঁধা তুষারগুলো যেন সুতা হয়ে আকাশ, ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটগুলোকে একই মালায় গেঁথে রেখেছে।
‘চ্যাং ফুর সঙ্গে দেখা করব বলেই একদিন বেশি থাকলাম। দুপুরের খাওয়া সেরে বিকেলের দিকে রওনা হলাম চ্যাং ফুর বাড়ির উদ্দেশে। তার বাড়ি ঠিক আগের জায়গায়ই ছিল, খালি বাড়িটাকে দেখে একটু মরা মরা মনে হলো, এটা আমার কল্পনার কারণেও হতে পারে। তার ছেলে ও দ্বিতীয় কন্যা আহ চাওকে বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। দুজনই বড় হয়ে গেছে। আহ চাও ছিল তার বোনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। দেখতে খুব সাদাসিধেই ছিল সে। আমাকে তাদের বাড়ির দিকে এগোতে দেখে সে এক দৌড়ে ভেতরে চলে গেল। ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, চ্যাং ফু বাড়িতে নেই। তারপর প্রশ্ন করলাম, তোমার বড় বোন কোথায়? এ প্রশ্ন শুনেই সে আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাল এবং জানতে চাইল কেন আমি তাকে খুঁজছি। মনে হলো সে প্রচণ্ড রেগে যাচ্ছে এবং এখনই আমার দিকে তেড়ে আসবে। আর কথা না বাড়িয়ে ইতস্তত করতে করতে হাঁটা দিলাম। ইদানীং আমি কোনো কিছু নিয়ে খুব বেশি ঘাঁটাই না…
‘তুমি চিন্তাই করতে পারবে না ইদানীং আমি লোকজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতে কী পরিমাণ ভয় পাই। আমার ভালোমতোই জানা হয়ে গেছে, সবখানেই আমি আসলে অনাহূত। এমনকি আমার নিজের কাছেও। কেন আমি অন্যের ওপর অনধিকার চর্চা করতে যাব? কিন্তু চ্যাং ফুর বাড়ি থেকে কেন জানি সোজা ফিরে আসতে পারলাম না। এবার আমার কেন জানি মনে হলো আমার অর্থহীন অনধিকার চর্চা করা উচিত। কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে ওদের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকের কাঠের দোকানটায় গেলাম। ভাগ্য ভালো, দোকানদারের মা বেগম ফা ওখানে ছিলেন এবং আমাকে চিনতে পারলেন। তিনি আমাকে দোকানের ভেতরে গিয়ে বসতে বললেন। ভদ্রতাসূচক বাক্য বিনিময়ের পর আমি তাকে “শ”–তে আসার কারণ জানালাম এবং চ্যাং ফুর খোঁজ করলাম। তিনি যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথা বলা শুরু করলেন, আমি তখন বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়লাম।
‘বৃদ্ধা বললেন, “আহা! আপনি যে ফুলগুলো নিয়ে এলেন সেগুলো পরার মতো ভাগ্য আহ শুনের নেই।”
‘তারপর তিনি পুরো ঘটনার বর্ণনা দিলেন: সম্ভবত গত বসন্ত থেকে আহ শুনের চেহারা বিবর্ণ হতে শুরু করল, তার শরীর শুকিয়ে যেতে শুরু করল। হঠাৎ হঠাৎ সে কেঁদে উঠত। কেউ কারণ জানতে চাইলে কিছু বলত না। মাঝেমধ্যে সারা রাত কান্না করত। চ্যাং ফু মেজাজ হারিয়ে তাকে গালাগালি শুরু করত; বলত, আইবুড়ি হয়ে এত দিন বসে থাকায় সে পাগল হয়ে গেছে। চ্যাং ফুর গালাগালির পর সে হয়তো কান্না থামাত। শরৎ আসার পর তার সামান্য ঠান্ডা লাগে। কিছুদিন পরই সে শয্যাশায়ী হয় এবং আর কখনো সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। মরার মাত্র কিছুদিন আগেই সে চ্যাং ফুকে জানায়, অনেক আগেই সে তার মায়ের রোগে আক্রান্ত হয়েছে। মায়ের মতো প্রায়ই তার রক্তবমি হতো এবং রাতে তার শরীর ঘামত। পিতা দুশ্চিন্তা করবে ভেবে এত দিন সে বিষয়টি গোপন রাখে। এই অসুস্থতার মধ্যেই এক সন্ধ্যায় তার চাচা চ্যাং কেং তার কাছে টাকা চাইতে আসে। সব সময়ই সে এ রকম টাকা চাইতে আসত। যখনই আহ শুন টাকা দিতে পারত না তখনই এক গাল হাসি দিয়ে দিয়ে বলত, “এত চ্যাটাং চ্যাটাং করিস না; তোর নাং কিন্তু আমার চাইতে খারাপ লোক!” প্রায়ই সে আহ শুনকে এ রকম কথা শোনাত। তার এ কথা আহ শুনকে বড়ই পীড়িত করত। কিন্তু সে এতটাই লাজুক ছিল যে পাল্টা কোনো প্রশ্ন করত না, শুধুই কাঁদত। চ্যাং ফু যখন এ বিষয়ে জানতে পারল তখন সে মেয়েকে জানাল যে তার হবু স্বামী খুবই ভদ্র ছেলে। কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তা ছাড়া বাপের কথা সে বিশ্বাসও করল না। বাপকে সে বলল, “ভালো হলো যে আমি এখন এই অবস্থায় আছি। এখন কোনো কিছুতেই আমার কিছু আসে–যায় না।”
‘বৃদ্ধা বলে চললেন: যদি তার প্রেমিক ছেলেটা আসলেই চ্যাং কেংয়ের চেয়ে খারাপ লোক হতো তবে তা আসলেই একটা ভয়াবহ ব্যাপার হতো। চ্যাং কেং ছিল মুরগি চোর। এর চেয়ে খারাপ হওয়া মানে সত্যিই ভয়ংকর ব্যাপার। কিন্তু ছেলেটা যখন আহ শুনের অন্ত্যেষ্টিতে যোগ দিতে এল আমি তখন তাকে নিজ চোখে দেখেছি। তার কাপড়চোপড় ছিল বেশ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন। সে ছিল খুবই সুদর্শন। ছলছল চোখে ছেলেটা বলল, বিয়ে করার জন্য টাকা জমাতে এই কয় বছর সে নৌকায় কঠোর পরিশ্রম করেছে; কিন্তু এখন যাকে বিয়ে করবে সে-ই নেই। ছেলেটা নিঃসন্দেহে ভালো ছিল। চ্যাং কেং যা বলত তার সবই ছিল ডাহা মিথ্যা। হায়, এই দুঃখ কই রাখি! মেয়েটা এই অসভ্য মিথ্যুক লোকটার কথাই বিশ্বাস করল এবং অকারণেই মারা গেল। কিন্তু এখন আর কাউকে দোষ দেওয়া সমীচীন হবে না। এটাই আহ শুনের নিয়তি।
‘এই যেহেতু ঘটনা, সুতরাং আমার তো কিছু করার নেই। কিন্তু ফুলের মালা দুটির কী হবে? বুড়িকে বললাম, আপনি এই ফুলগুলো আহ শুনের বোন আহ চাওকে দেবেন। আহ চাও মেয়েটা আমাকে দেখেই এক দৌড়ে পালিয়ে গেছে; যেন আমি একটা নেকড়ে কিংবা দৈত্য। আমার খুব একটা ইচ্ছা হচ্ছিল না তাকে ফুলগুলো দিই। দিলাম অন্য একটা কারণে। বাড়ি ফিরে মাকে বলব, আহ শুন ফুল পেয়ে খুবই খুশি হয়েছে। এই তো। এসব মামুলি ঘটনা নিয়ে এত মাথাব্যথার সময় কই? কোনো একভাবে একটা সমাধান করা আরকি। আমার কর্তব্য আমি পালন করেছি। নববর্ষের ছুটিটা পার করে আবার কনফুসীয় ক্ল্যাসিক পড়াতে ফিরে যাব।’
আমি একটু অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, ‘তুমি কি এখন এই সব পড়াচ্ছ?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই। তুমি কি ভাবছিলে আমি ইংরেজি পড়াই? প্রথমে আমার দুজন ছাত্র ছিল। একজন পড়ত “শিচিং”(২), আরেকজন “মেনসিউস” (৩)। সম্প্রতি একজন নতুন ছাত্রী পেলাম, সে পড়ছে “রমণীকুলের জীবনবিধান” (৪)। আমি এখন গণিতও পড়াই না। এমন না যে আমি ইচ্ছা করে পড়ানো বাদ দিয়েছি, তারাই পড়তে চায় না।’
‘আমি সত্যিই কখনো ভাবিনি তুমি কোনো দিন এসব বই পড়াবা।’
‘তাদের পিতারা চায় তারা এসব বই পড়ুক। আমি এখানে আগন্তুক, সুতরাং আমার কাছে সবই সমান। তা ছাড়া এসব অনর্থক বিষয় নিয়ে এত মাথা ঘামানোর সময় কই? এসবকে এত সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই।’
তার চেহারা টকটকে লাল হয়ে আছে, মনে হচ্ছে পুরোপুরি মাতাল। কিন্তু চোখ দুটি নিষ্প্রভ হয়ে এসেছে। আমি হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কিছুক্ষণ বলার মতো কিছু পেলাম না। সিঁড়ি থেকে ঠকঠক শব্দ আসছে। কয়েকজন মদ্যপায়ী ওপরে উঠে আসছে। প্রথমজন বেঁটে মতো, গোলগাল ফুলাফালা মুখ; দ্বিতীয়জন বেশ লম্বা, তার নাকটা চোখে পড়ার মতো লাল। তাদের পেছনে বাকিরা। তাদের ওপরে উঠে আসার কারণে ছোট্ট ওপরতলাটা কেঁপে উঠল। আমি লু উই-ফুর দিকে ফিরলাম, সেও আমার চোখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছে। আমি ওয়েটারকে ডেকে বিল দিতে বললাম।
উঠে যেতে যেতে তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘যে বেতন পাও তাতে চলে তোমার?’
‘আমি মাসে ২০ ডলার পাই, চলার জন্য পুরোপুরি যথেষ্ট নয়।’
‘সামনে তাহলে কী করার কথা ভাবছ?’
‘সামনে? জানি না। আচ্ছা ভাবো তো আমরা অতীতে যা আশা করেছিলাম কিংবা পরিকল্পনা করেছিলাম, তার একটাও কি পূরণ হয়েছে? আমি এখন কোনো কিছুর ব্যাপারেই নিশ্চিত নই; আগামীকাল কী করব তা–ও জানি না, এমনকি এক মিনিট পর কী করব তা–ও না…’
ওয়েটার বিল এনে আমার হাতে দিল। উই-ফু আগের মতো ফর্মালিটি করার চেষ্টা করল না; শুধু একপলক আমার দিকে তাকিয়ে সিগারেট ফুঁকতে থাকল এবং আমাকেই বিল দিতে দিল।
আমরা একসঙ্গে বেরিয়ে এলাম। এখান থেকে যেদিকে আমার হোটেল তার বিপরীত দিকে তার হোটেল। সুতরাং দরজায় দাঁড়িয়েই আমরা একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। একা একা হোটেলের দিকে হাঁটছি; ঠান্ডা বাতাস ও তুষার এসে আমার মুখে বাড়ি খাচ্ছে, বেশ চাঙা অনুভূত হচ্ছে। আকাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। ভাসতে থাকা সাদা জমাটাবাঁধা তুষারগুলো যেন সুতা হয়ে আকাশ, ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটগুলোকে একই মালায় গেঁথে রেখেছে।
১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৪
টিকা:
১. লু সুনের জন্ম পূর্বচীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের শাওশিং অঞ্চলে। জেলার নাম ইউচেং। গুগল মানচিত্র থেকে জানা যায়, ইউচেং থেকে শাওশিং শহরের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। ১৯০১ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত লু সুন বিদ্যাশিক্ষার জন্য জাপানে অবস্থান করেন। ১৯০৯ সালে দেশে ফিরে প্রথমে এক বছর ঝেজিয়াং নরমাল স্কুলে শারীরতত্ত্ব ও রসায়ন পড়ান, তারপর এক বছর শাওশিং উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। লু সুনের অনেক গল্পেই শাওশিং শহরের উল্লেখ পাওয়া যায়; যদিও সর্বত্রই তিনি শহরের পুরো নাম না লিখে আদ্যক্ষর ব্যবহার করেছেন।
২. ‘শিচিং’ চীনের প্রাচীন উপদেশমূলক কাব্য সংকলন। এ গ্রন্থে ৩০৫টি প্রাচীন লোককবিতা সংকলিত হয়েছে। মূলত নীতিশিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে এ গ্রন্থ প্রণীত হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, কনফুসিয়াস স্বয়ং এই সংকলন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। ইংরেজিতে এর পরিচিতি ‘বুক অব সংস’ নামে।
৩. মেনসিউস (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭২–২৮৯) ছিলেন কনফুসীয় ধারার একজন প্রভাবশালী দার্শনিক। কনফুসিয়াসের চতুর্থ প্রজন্মের শিষ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে বলা হতো ‘দ্বিতীয় সাধু’, অর্থাৎ কনফুসিয়াসের পরপরই তাঁর অবস্থান। কনফুসিয়াসের দর্শন প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
৪. এ বইয়ের মাধ্যমে মেয়েদের সামন্ত আচার-ব্যবহার শিক্ষা দেওয়া হয়। রাজপরিবারের নারী হিসেবে তাদের কী ধরনের গুণ থাকা উচিত, তা এ বইয়ের মাধ্যমে শেখানো হয়।