সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / সন্দ্বীপের ‘রবিন হুড’, কে এই দিলাল রাজা
সন্দ্বীপের ‘রবিন হুড’, কে এই দিলাল রাজা

সন্দ্বীপের ‘রবিন হুড’, কে এই দিলাল রাজা

সন্দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের দ্বীপটি অবস্থিত মেঘনা নদীর মোহনায়। ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক কৌশলগত কারণে গত ১৬ ও ১৭ শতকে মোগল ও আরাকানি শাসক এবং পর্তুগিজ জলদস্যুদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল দ্বীপটি। তাই এর দখল-পাল্টা দখল নিয়ে লেগে ছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এসবের মধ্যেও প্রায় ৫০ বছরের মতো দ্বীপটি স্বাধীন রেখে শাসন করেন মোগলদের দলছুট এক যোদ্ধা। যাঁর নাম দিলওয়ার খান। সে সময় স্বাধীন রাজ্যের মতোই নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল সন্দ্বীপ।

দিলওয়ার খান বেশি পরিচিত ‘দিলাল রাজা’ নামে। সন্দ্বীপের শেষ স্বাধীন রাজা বলা হয় তাঁকে। শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর তিনি দ্বীপে শান্তি–সমৃদ্ধি এনেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। জনশ্রুতি আছে, সে সময় দস্যুতায় লিপ্ত জলদস্যুদের জাহাজ পাকড়াও করে সম্পদ জব্দ করতেন তিনি। আর সে সম্পদ বিলি করতেন দরিদ্র প্রজাদের মধ্যে। যুক্তরাজ্যের শেরউড ফরস্টের লোককথার নায়ক দস্যু ‘রবিন হুডের’ সঙ্গে দিলওয়ারের কর্মকাণ্ডের মিল খুঁজে পেয়েছেন অনেক ইতিহাস লেখক। সে কারণে তাঁকে প্রাচ্যের ‘রবিন হুড’ বলতেও দ্বিধা করেননি তাঁরা। তবে এসব জনশ্রুতির পেছনে অকাট্য কোনো দলিল বা লিখিত বিবরণ পাওয়া যায়নি। এই বীরযোদ্ধাকে নিয়ে নানা কাহিনি এখনো প্রচলিত সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের লোকমুখে। দিলাল রাজাকে নিয়ে আলাপের আগে তখনকার সন্দ্বীপ নিয়ে আরেকটু জানা যাক।

বিশ্বের অন্যতম উর্বর দ্বীপ

বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলার অধীন থাকা সন্দ্বীপের খ্যাতি একসময় দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। সাগরদ্বীপটিতে উৎপাদিত হওয়া লবণ বাইরে রপ্তানি করা হতো তখন। লবণ, চাল, শস্য উৎপাদনের পাশাপাশি সুতির কাপড় উৎপাদনের জন্যও পরিচিত ছিল দ্বীপটি।

ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের এই গ্রন্থটিতে উল্লেখ করা হয়, তখন সন্দ্বীপে মাত্র এক ‘রুপি’ দিয়ে ৫৮০ পাউন্ড চাল অথবা ৬০টি মুরগি পাওয়া যেত। দ্বীপটিতে কাপড়ের দামও ছিল ‘অবিশ্বাস্য রকমের কম’।

দিলাল রাজার ক্ষমতা আরোহণের আগের সময়কার সন্দ্বীপের কিছু বিবরণ পাওয়া যায় ভেনিসীয় পর্যটক সিজার ফ্রেডরিকের ভ্রমণকাহিনিতে। তিনি ছিলেন প্রথম দিকের ইউরোপীয় পরিব্রাজক, যিনি সন্দ্বীপ ভ্রমণ করেছেন। ফ্রেডরিকের ভারত, বাংলা ও পেগু ভ্রমণের বিবরণ স্থান পেয়েছে ইংরেজ পাদরি স্যামুয়েল পার্চাসের একটি গ্রন্থে। ১৬২৫ সালে, ‘পার্চাস হাকলুইটাস পোস্টহুমা’ বা ‘পার্চাসের তীর্থযাত্রা’ নামে এই গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়, ফ্রেডরিকের মতে তখন বিশ্বের সবচেয়ে উর্বর দ্বীপগুলোর একটি হলো ‘সন্দ্বীপ’। যেখানে ‘অস্বাভাবিক কম দামে’ নানা পণ্য বেচাকেনা হতো। অনেক সস্তায় তিনি দ্বীপটি থেকে কেনাকাটা করেছেন। গরুর মাংস, চালসহ নানা জিনিস তিনি কিনেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর এই বিবরণ ১৫৬৯ সালের।

শিল্পীর চোখে চট্টগ্রামে পর্তুগীজদের দাস ব্যবসা

১৬২০ সালের দিকে সন্দ্বীপ থেকে বছরে প্রায় ২০০ জাহাজ লবণ বাইরে রপ্তানি হতো বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। স্কটিশ বণিক ও পরিব্রাজক ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার হ্যামিলটন ১৬৮৮ থেকে ১৭২৩ সালের মধ্যবর্তী দীর্ঘ ৩৫ বছর দক্ষিণ এশিয়া, দূরপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্য করে কাটান। তাঁর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা হয়েছে ‘এ নিউ অ্যাকাউন্ট অব ইস্ট ইন্ডিজ’। ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের এই গ্রন্থটিতে উল্লেখ করা হয়, তখন সন্দ্বীপে মাত্র এক ‘রুপি’ দিয়ে ৫৮০ পাউন্ড চাল অথবা ৬০টি মুরগি পাওয়া যেত। দ্বীপটিতে কাপড়ের দামও ছিল ‘অবিশ্বাস্য রকমের কম’।

রবিন হুডের মতো দিলাল ধনীদের এবং বহিরাগতদের লুণ্ঠন করতেন, কিন্তু নিজের প্রজাদের ও দরিদ্র মানুষের রক্ষক ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয় ইস্টার্ন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্সে। তবে দিলাল যে ‘মগ’-পর্তুগিজদের মতো দস্যুবৃত্তিতে ছিলেন না, তার ইঙ্গিত ইতিহাসে মেলে।

তবে সন্দ্বীপ তখন এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। সেই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর ছিল ‘পূর্ব বাংলার’ প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ফলে সন্দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চট্টগ্রামের পুরো সামুদ্রিক বাণিজ্যকে অবরুদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল। একই কারণে সামরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সন্দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ ছিল ভাগ্যনির্ধারক। যার কারণে এটি দখলে রাখার জন্য তখন মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন মোগল শাসক, আরাকানরাজ, পর্তুগিজ জলদস্যু ও স্থানীয় স্বাধীন শাসকেরা।

মোগল সেনাপতি থেকে স্বাধীন রাজা

দিলওয়ার খান বা দিলাল রাজা আনুমানিক ১৬১৬ থেকে ১৬৬৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে সন্দ্বীপ শাসন করেছেন। দিলালের জন্ম ও সন্দ্বীপ দখল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ১৬৬২ সালে বাংলার সুবাদার মীর জুমলার আসাম-কোচবিহার অভিযানের সময় শিহাবুদ্দিন তালিশ নামের একজন রাজ কর্মচারী সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে একটি গ্রন্থ লেখেন। ‘ফাতিয়া-ই-ইব্রিয়া’ নামের ওই গ্রন্থে সন্দ্বীপের স্বাধীন শাসক দিলওয়ার খানের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মোগল নৌবাহিনীর একজন পলাতক সেনাপতি ছিলেন দিলওয়ার খান। তিনি সুবাদার ইব্রাহিম খাঁর সময় তাঁর অনুগত সৈন্যসামন্তসহ সন্দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেন।

ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারও তাঁর ‘দ্য হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’ (ভলিউম-২, মুসলিম যুগ) গ্রন্থেও দিলওয়ার বা দিলালকে মোগল নৌবাহিনীর পলাতক অধিনায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এখানে মনে রাখা ভালো, শিহাবুদ্দিন তালিশ দিলালের সন্দ্বীপ দখল সুবাদার ইব্রাহিম খাঁর সময় উল্লেখ করেছেন। ইব্রাহিম খাঁ সুবাদার হন ১৬১৮ সালে, যার কারণে বিবরণ অনুযায়ী দিলালের সন্দ্বীপ দখলও এই সময়টাতে হওয়ার কথা। তবে অনেক ঐতিহাসিকের মত, দিলাল সন্দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন মোঘল সুবাদার কাসিম খাঁর সময়ে, সময়টা ১৬১৬।

দিলালের আগে প্রায় এক দশক সন্দ্বীপ শাসন করেছেন সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউ নামের এক পর্তুগিজ জলদস্যু। আরাকানরাজ মিন রাজাগির ছেলে ও উত্তরসূরি মিন খামাউং তাঁকে পরাজিত করেন বলে জানা যায়। এ সময়টাতেই আসাম, ‘ভুলুয়া’ (নোয়াখালী) ও সন্দ্বীপ দখলে মরিয়া হয়ে ওঠেন মোগলরা। মোগল সুবাদার কাসিম খাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আরাকানিদের বিতাড়নে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানটি শেষ পর্যন্ত সফল না হলেও মোগল বাহিনী ত্যাগ করে নিজের অনুগত সৈন্যসামন্ত নিয়ে সন্দ্বীপের দখল নেন দিলাল।

বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁ। তার আমলেই মোগলদের সন্দ্বীপ দখল অভিযান চলে

দিলালের পরিচয় নিয়ে জনশ্রুতি

ঐতিহাসিকদের বেশির ভাগ দিলওয়ার খানকে মোগল সেনাবাহিনীর পলাতক অধিনায়ক উল্লেখ করলেও তাঁর জন্ম-বেড়ে ওঠা নিয়ে ভিন্ন মতও পাওয়া যায়। তাঁর বেড়ে ওঠা ও ক্ষমতায় আরোহণ নিয়ে রয়েছে নানা জনশ্রুতিও।

এসব জনশ্রুতিকে অনুসরণ করে দিলাল রাজাকে নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন মৌলভি মো. আব্দুল হালিম। লেখাটি কলকাতার ইম্পিরিয়াল প্রেস থেকে ১৯০৭ সালে প্রকাশিত ‘জার্নাল অব দ্য মোসলেম ইনস্টিটিউট’–এ ছাপা হয়। মৌলভি আব্দুল হালিম লিখেছিলেন, ‘দিলাল রাজা ছিলেন এক মুসলিম বণিকের সন্তান। বঙ্গোপসাগরে ঝড়ে পণ্যবোঝাই নৌকা বিধ্বস্ত হয়ে তাঁর বাবা প্রাণ হারান। ঘটনার সময় তিনি তাঁর মায়ের গর্ভে ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর দিলালের মা নিঃস্ব হয়ে পড়েন। যার কারণে ১০ বছর বয়সে একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে রাখাল হিসেবে কাজ করতে দিলালকে পাঠান। দিলাল ছিলেন খুবই একগুঁয়ে স্বভাবের। একদিন মনিবের সঙ্গে ঝগড়া করে তিনি মাঠে গরু চরাতে চলে যান। ব্রাহ্মণ নিজে দুপুরের খাবার নিয়ে মাঠে গেলে দেখতে পান, একটি বিশাল গোখরা সাপের ফণার নিচে দিলাল ঘুমাচ্ছেন। পরে বাড়িতে ফিরে এটিকে রাজা হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দিলালের কাছে বর্ণনা দেন ওই ব্রাহ্মণ। এই ভবিষ্যদ্বাণী দিলালের তেজস্বী স্বভাব ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আরও উসকে দেয়। দিলাল ২০ বছর বয়সে কিছু দুঃসাহসী যুবককে নিয়ে দল গঠন করেন। সাগরের ঢেউয়ে ভেসে আসা জাহাজডুবির মালামাল সংগ্রহ করতেন তাঁরা। এ ছাড়া চরে আটকে পড়া নৌকায় লুণ্ঠনও করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় একসময় দিলালের দল সন্দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

ব্রিটিশ আমলে (১৯১১) প্রকাশিত ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স: নোয়াখালী’তেও দিলালের মাথার ওপর গোখরা সাপের ফণা ধরার এই জনশ্রুতির উল্লেখ রয়েছে।

শাসন কেমন ছিল

প্রায় ৫০ বছর সন্দ্বীপ শাসন করেছেন দিলওয়ার খান। বলা হয়ে থাকে, তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। জাতি-ধর্মেও ভেদাভেদ ছিল না তাঁর এবং যোগ্যতা অনুযায়ী মানুষকে রাজকাজে নিয়োজিত করতেন।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ হয়েছে, দিলালের বিচারব্যবস্থা ছিল অনন্য। উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে তিনি বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। স্বজনদের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে তিনি কুণ্ঠাবোধ করতেন না। ধর্ম-জাতের ভেদাভেদ তাঁর বিচারে প্রভাব ফেলত না।

মো. আব্দুল হালিমের লেখায় বলা হয়, দিলালের শাসন ছিল কঠোর ন্যায়বিচারনির্ভর। সামান্য অপরাধের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো, অথবা অপরাধীর হাত কিংবা পা কেটে ফেলা হতো। তবে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে এক অভিনব বৈবাহিক বিধানের জন্য তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন বলে মত দেন আব্দুল হালিম।

এই বিধান সম্পর্কে ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স: নোয়াখালী’—এ উল্লেখ করা হয়, দিলাল হিন্দু সমাজে একই জাতের (কাস্ট) মধ্যে বিবাহ প্রথাকে ক্ষতিকর মনে করতেন। তাই তিনি নিয়ম করেন, বর্ণ বা এমনকি ধর্মের ভেদাভেদ না মেনে বিয়ে হওয়া উচিত। জমিদারদের বংশতালিকাতেও দেখা যায়, একটি কায়স্থ পরিবার বৈবাহিক সূত্রে তাদের মুসলমান প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।

অনেকটা রবিন হুডের মতো দিলাল ধনীদের এবং বহিরাগতদের লুণ্ঠন করতেন, কিন্তু নিজের প্রজাদের ও দরিদ্র মানুষের রক্ষক ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয় ইস্টার্ন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্সে। তবে দিলাল যে ‘মগ’-পর্তুগিজদের মতো দস্যুবৃত্তিতে ছিলেন না, তার ইঙ্গিত ইতিহাসে মেলে। ১৬৬১ সালে সন্দ্বীপের কাছে একটি ডাচ জাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছিল। ‘টারশেলিং’ নামক ওই জাহাজের নাবিকদের একজন ফ্রান্স জ্যান্স ভ্যান ডার হাইডেন। তাঁর লেখা একটি বই রয়েছে, যেটি পরে ‘এ রিলেশন অব অ্যান আনফরচুনেট ভয়েজ টু দ্য কিংডম অব বেঙ্গলা’ নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন গ্লানিয়াস। এতে জাহাজের নাবিকদের সন্দ্বীপে আন্তরিকভাবে তখনকার শাসক গ্রহণ করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। সেখানে লেখা হয়েছে, উদারভাবে নাবিকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। পরে তাঁদের নিরাপত্তাসহ ভুলুয়া যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

দিলাল সন্দ্বীপের ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য দ্বীপের পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত খাল কাটার ব্যবস্থা করেছিলেন। যাতায়াতের সুবিধার জন্য দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণের তথ্যও পাওয়া যায়। তাঁর সময় সাংস্কৃতিকভাবে দ্বীপটি সমৃদ্ধ ছিল বলে ধারণা করা হয়। মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি আবদুল হাকিম যিনি ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’ লিখেছিলেন, তাঁর জন্মও দিলালের সময়কালে সন্দ্বীপে (মতান্তরে নোয়াখালী)। তাঁর জন্মসাল ১৬২০।

অনন্য সমরকৌশল

দিলাল যখন সন্দ্বীপের শাসনভার পরিচালনা করছেন তখন উপকূলজুড়েই পর্তুগিজ ও ‘মগ’ দস্যুদের বিচরণ। দিলাল একই সঙ্গে মোগল শাসক ও আরকানরাজ এবং জলদস্যুদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন। বাংলার সুবাদাররা সমীহ করে চলতেন দিলালকে। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার লিখেছেন, শাহ সুজা বাংলার শাসনকর্তা হওয়ার পর তিনি নিজ পুত্রকে অনেক উপহার নিয়ে দিলওয়ার খানের নিকট পাঠিয়েছিলেন। দিলালও নিজ পুত্র শরীফকে শাহ সুজার কাছে পাঠান। শরীফকে সম্মানসূচক পাঁচ শ অশ্বারোহী সৈন্যের মনসবদার উপাধি দেওয়া হয়েছিল।

শত্রুপক্ষ থেকে সন্দ্বীপকে রক্ষায় দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন রাজা দিলাল। এ লক্ষ্যে তিনি সন্দ্বীপের জলপথ ও প্রাকৃতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়েছেন। যদুনাথ সরকার লিখেছেন, তখন সাগরের একটি ছোট নালা হয়ে সন্দ্বীপে ঢুকতে হতো। নালার চওড়া এত কম ছিল যে শুধু দুটি ‘কুছা নৌকা’ পাশাপাশি চলতে পারত। নালার মুখে একটি দুর্গ ছিল। সেটির মাঝ থেকে ৫ জন বুড়োও যদি বন্দুক চালায়, তবে হাজার জওয়ান যোদ্ধারও সাধ্য ছিল না ওই নালার ভেতরে ঢোকার।

দ্বীপের অভ্যন্তরে দিলালের মহলটিতেও একটি কেল্লা ছিল বলে জানা যায়। এর চারপাশে খাদ এবং পেছনে ঘন জঙ্গল ছিল। দিলাল রাজার সমর দক্ষতার পরিচয় মেলে একাধিক যুদ্ধে। বেশ কয়েকবার তিনি আরকান রাজবাহিনীকে তাঁর কৌশলে পরাজিত করেন। এর মধ্যে ১৬২৪ ও ১৬৪৪ সালের দুটি যুদ্ধে দিলালের দক্ষতায় ব্যাপক প্রাণহানিসহ ক্ষতির মুখে পড়ে আরাকান বাহিনী। বিশেষ করে ১৬৪৪ সালের যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ হাতি, ঘোড়া, কামান ও যুদ্ধাস্ত্র আরাকান বাহিনীকে হারাতে হয় বলে জানা যায়।

দিলালকে পরাজিত করার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম জয়ের পথ প্রশস্ত করেছিলেন মুঘলরা। শিল্পীর আঁকা ছবিতে মুঘলদের চট্টগ্রাম আক্রমণ। শিল্পী আলপ্তগীন তুষারের আঁকা ছবিটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

যেভাবে পরাজয়

শায়েস্তা খাঁ মোগল সুবাদার হয়ে আসেন ১৬৬৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর। চট্টগ্রাম উপকূলের জলদস্যুদের দমন করার উদ্যোগ নেন তিনি। এ লক্ষ্যে নৌকা তৈরি, খাদ্য ও অস্ত্র সংগ্রহ শুরু করেন। মূলত এর লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রাম জয়ের পথকে নিরাপদ করা। মোগলরা ভাবলেন, সন্দ্বীপ নিরাপদ না হলে চট্টগ্রামে এগোনোর পথ নিরাপদ হয় না। তাই আরাকানিদের হাত থেকে চট্টগ্রাম জয়ের পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সন্দ্বীপ জয়ের মনস্থির করেন শায়েস্তা খান। তবে এর আগে দিলাল মোগল বাদশাহর অধীনতা স্বীকার করুক এটি চেয়েছিলেন বলেও ধারণা করা হয়।

যা–ই হোক, ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের বিবরণ অনুযায়ী, মোগল সেনাপতি আবুল হাসানের নেতৃত্বে ১৬৬৫ সালের ৯ নভেম্বর নদীমুখে থাকা সন্দ্বীপের দুর্গটিতে আক্রমণ হয়। দুর্গ রক্ষক প্রস্তুত না থাকায় সহজেই সেটি দখল করেন। এরপর দিলালের বাড়ির দিকে রওনা হয় মোগল বাহিনী। দিলালের তখন বয়স ৮০ বছরের বেশি। তিনি ব্যূহ রচনা করে বীরের মতো যুদ্ধ করতে করতে মোগল সৈন্যদের সম্মুখীন হন। একপর্যায়ে দিলাল আহত হয়ে বাড়ির পাশের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকেন। লুকানোর উদ্দেশ্য ছিল, মোগল সৈন্যরা সেখানে ঢুকলেই আক্রমণ হবে। তবে সেনাপতি আবুল হাসান বিষয়টি বুঝতে পেরে নিজের সৈন্যদের জঙ্গলে ঢুকতে নিষেধ করেন। এরপর কামানসহ প্রভৃতি যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে এবং প্রথম দুর্গটি ধ্বংস করে চলে যান।

প্রথম অভিযানের ৯ দিন পর ১৮ নভেম্বর আবার সন্দ্বীপ আক্রমণ করে মোগল সৈন্যবাহিনী। সেবার আগের চেয়েও বেশি সৈন্য ও অশ্বারোহী নিয়ে হামলা করা হয়। তখনো দিলাল যুদ্ধের এক পর্যায়ে জঙ্গলে ঢুকে গিয়ে একই কৌশল নেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর রক্ষা হয়নি। মোগলদের একটি দল তাঁর পিছু নিয়েছিল। দলটির হাতে ধরা পড়েন তিনি।

বৃদ্ধ দিলালকে শিকলে বেঁধে নেওয়া হয় ঢাকায়। তাঁর পরিবারের সদস্য-স্বজনসহ আরও ৯২ জনকে একই সঙ্গে ঢাকায় নেওয়া হয়েছিল। ঢাকার কারাগারে নেওয়ার পর খুব বেশি দিন বাঁচেননি তিনি। অল্প কদিন পরই কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়।

জড়িয়ে রয়েছেন সড়ক-স্থানের নামে

দিলাল রাজা বা দিলওয়ার খান সন্দ্বীপের দক্ষিণ থেকে উত্তর পর্যন্ত দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন, যা বর্তমানে ‘দেলোয়ার খাঁ’ সড়ক নামে পরিচিত। সন্দ্বীপের একটি এলাকার নাম মুছাপুর, যা দিলওয়ার খানের কন্যা মুছা বিবির নাম অনুসারে। সেখানে একই নামে একটি দিঘিও রয়েছে। সন্দ্বীপের আরেকটি এলাকার নাম ‘মগধরা’। এই স্থানে আরাকানের ‘মগ’ বাহিনীকে দিলাল পরাজিত করেন বলে এলাকাটির এই নামকরণ বলে অভিমত দিয়েছেন সৈয়দ মুর্তাজা আলী।

About Editor Todaynews24

Check Also

ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭। লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার পরামর্শ–১

ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭। লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার পরামর্শ–১

ক্যাডেট কলেজ—সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, উন্নতমানের শিক্ষার পরিবেশে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যোগ্য নাগরিক ও নেতা হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *