‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?’
—এই চিরন্তন আহ্বান শুধু একটি গানের পঙ্ক্তি নয়; এটি মানবতার এক অনন্ত দর্শন। দুর্যোগ যখন মানুষের ঘরবাড়ি, স্বপ্ন ও স্বাভাবিক জীবনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তখন একটি সহানুভূতির হাত, একটি আন্তরিক স্পর্শ কিংবা ভালোবাসায় ভরা একটি খাদ্যসামগ্রীর প্যাকেটও হয়ে ওঠে নতুনভাবে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। সেই বিশ্বাস থেকেই পটিয়া বন্ধুসভার সহযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘বন্ধুত্বের উপহার’ কার্যক্রম।

তৃতীয় ধাপে ২০ জুলাই প্রথম আলো ট্রাস্টের সহযোগিতায় পটিয়ার বিভিন্ন বন্যাদুর্গত এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বন্ধুত্বের উপহার। প্রায় ৮০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার সামগ্রী। এর আগে টানা তিন থেকে চার দিন দুই দফায় চলে খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ, বাছাই, প্যাকেটজাত ও বিতরণের কাজ। দিন শেষে ক্লান্তি নয়, মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রত্যয়ই ছিল বন্ধুসভার স্বেচ্ছাসেবকদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সন্ধ্যা নামার পর পিকআপভর্তি খাদ্যসামগ্রী নিয়ে স্বেচ্ছাসেবীরা ছুটে যান দুর্গম জনপদের পথে। কোথাও কাদামাখা রাস্তা, কোথাও জলাবদ্ধতা—সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত তাঁরা পৌঁছে দেন ভালোবাসার উপহার। পটিয়া উপজেলার দক্ষিণ বরিয়া স্লুইসগেট খালসংলগ্ন এলাকা, কুরাংগিরি, আলমদারপাড়া, মৌলভীবাড়ি, চাটরা নৌমানিয়া, কচুয়াই, ভাটিখাইনসহ প্রায় আটটি গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এই মানবিক উদ্যোগ।

বন্যাদুর্গত মানুষের প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় প্রতিটি ‘বন্ধুত্বের উপহার’–এ রাখা হয় চাল, আলু, পেঁয়াজ, সয়াবিন তেল, মুড়ি, চিনি, বিস্কুট, খাওয়ার স্যালাইন, নাপা ট্যাবলেট, মশার কয়েল, ডেটল সাবান ও নারীদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার সামগ্রী।
উপহার পেয়ে দক্ষিণ বরিয়ার স্লুইসগেট খালসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা সমুদা বেগম আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘এবার খালর জোয়ারর ফানিরলাই আঁর মেডির ঘরগান ফরি ও বাই গেয়্যি। আঁর বোইনর ঘরত আশ্রয় লঁই। আঁর ওগ্গো ফোঁয়া প্রতিবন্ধী। এ রহম বড়ো প্যাকেটে এত জিনিস কেউ আঁরারে ন দে।’

কথাগুলো বলতে বলতে সমুদা বেগমের চোখে জল চলে আসে। বন্যার পানিতে হারিয়ে যাওয়া ঘর হয়তো ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু মানুষের আন্তরিকতা তাঁর মনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। একইভাবে কুরাংগিরি এলাকার এক বৃদ্ধা বিধবা নারী বলেন, ‘আঁরারে এমপির কিছু মানুষ ছুড়া, মুড়ি, ও মিডা দিইয়্যি। কিন্তু এগিন নৌকারত্তুন ছুঁড়ে মাইরগি, কেউ ফাইয়্যি, কেই ন ফাই।’
মানবিক এই কার্যক্রমে পাশে ছিলেন প্রথম আলোর পটিয়া প্রতিনিধি ও বন্ধুসভার উপদেষ্টা আবদুর রাজ্জাক, কাজী সোহেল, প্রান্ত বড়ুয়া চৌধুরী, পটিয়া বন্ধুসভার সভাপতি আইরিন সুলতানা, সাধারণ সম্পাদক মোকারেম আলী, বন্ধু সূফি মোহাম্মদ, তানাস চৌধুরী, জেবু চৌধুরী, মো. রাশেদুল্লাহ, আবদুল হাসনাত, আহনাফ হাসনাইন, আবু নয়ন, মিশকাত হোসেন, মারুফ হোসেন, নাফিস উদ্দীন, মো. আসহাব, খাইরুল মোস্তফা, শুভ ধর, মো. নিশান, সাজ্জাদ হোসেন, রানা হামিদ, মো. ওহী, আস–আদ নুর, রবিউল আশিক ও সাইদ আলভি। তৃতীয় ধাপের কার্যক্রম সফল করতে সহযোগিতা করা সব উপদেষ্টা, শুভাকাঙ্ক্ষী ও দাতার প্রতিও পটিয়া বন্ধুসভার বন্ধুরা গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সভাপতি, পটিয়া বন্ধুসভা