Home / সকল আপডেট / শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর সামনে এলে ক্যাম্পাসে আলোচনা হয়, কিছুদিন পর সবাই নীরব
শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর সামনে এলে ক্যাম্পাসে আলোচনা হয়, কিছুদিন পর সবাই নীরব

শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর সামনে এলে ক্যাম্পাসে আলোচনা হয়, কিছুদিন পর সবাই নীরব

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে গত সাড়ে ছয় মাসে। দুটি মৃত্যুই ‘আত্মহত্যা’ বলে ধারণা করছেন শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা। করোনা সংক্রমণের সময় থেকে গত ছয় বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আট শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রেম ও সম্পর্কের টানাপোড়েন, শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হওয়া, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করছে অনেকের মধ্যে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কোনো শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর যখনই সামনে আসে, তখনই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ক্যাম্পাসে আলোচনা হয় এবং স্থায়ী মনোরোগবিশেষজ্ঞ নিয়োগের দাবি ওঠে। কিছুদিন পর সবাই নীরব হয়ে যান।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন খালপাড় এলাকার একটি মেস থেকে ২১ জুলাই রাতে ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী উচ্ছ্বাস কর্মকারের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বরিশাল মহানগরের বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেন ২২ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, কক্ষটি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। দরজা ভেঙে অর্ধগলিত মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটা আত্মহত্যা।

এর আগে গত ৪ জানুয়ারি নিজ বাড়ি থেকে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শুভ বৈরাগীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হয়।

২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা ও আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে বলে মনে করছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষক। তাঁরা বলেন, আত্মহত্যা ও আত্মহত্যার চেষ্টার পেছনে মহামারির দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অভিঘাত কাজ করতে পারে। সম্পর্কের টানাপোড়েন, শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হওয়া এবং চাকরির বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টিও শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে থাকতে পারে। শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় জনবল ও স্থায়ী কাউন্সেলিং ব্যবস্থা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এ বিষয়ে কার্যকর সমাধানের উদ্যোগ আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি শুধু বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারা দেশেই একটি নতুন উদ্বেগ। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার তথ্য নিয়ে প্রতিবছর সমীক্ষা প্রকাশ করে আঁচল ফাউন্ডেশন। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৭৭ জন। 

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. রাজিব প্রথম আলোকে বলেন, ‘যখনই কোনো শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন, তখনই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং স্থায়ী মনোরোগবিশেষজ্ঞ নিয়োগের দাবি ওঠে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই দাবি বাস্তবায়ন করতে পারেনি।’

৬ বছরের চিত্র

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২ আগস্ট নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী সুপ্রিয়া দাস। এরপর ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই রাতে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী শাহরিন রিভানার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হয় বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন একটি ছাত্রীনিবাসের কক্ষ থেকে।

২০২৪ সালে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার চিত্র উদ্বেগজনক আকার ধারণ করে। ওই বছর চারজন আত্মহত্যা করেন, সবাই ছাত্রী। 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও ১১ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তবে সহপাঠীদের তৎপরতায় তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যেভাবে নিজেদের জীবননাশের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা শিক্ষক হিসেবে আমাদের পীড়া দিচ্ছে এবং উদ্বিগ্ন করছে। আমরা কীভাবে একজন মনোরোগবিশেষজ্ঞ স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া যায়, সে বিষয়ে চেষ্টা করব।’

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া

মনোরোগবিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ থাকে না। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সম্পর্কজনিত, শিক্ষাজীবন, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগসহ নানা বিষয় কাজ করতে পারে। কারও ক্ষেত্রে আকস্মিক আবেগের বশে আত্মহানির প্রবণতা তৈরি হতে পারে, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সংকটের মধ্যে থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এ বিষয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগবিশেষজ্ঞ মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিষণ্নতা, মাদকাসক্তি, ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা ও অন্যান্য মানসিক রোগ দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মানসিক সমস্যায় থাকা ব্যক্তিকে অবহেলা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করে তাঁর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সহপাঠী ও শিক্ষকদের এগিয়ে আসতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, ২০২৪ সালের মার্চে ‘মেন্টাল হেলথ কাউন্সেলিং অ্যান্ড গাইডেন্স সেন্টার’ চালু হয়েছিল। এর আওতায় ঢাকা থেকে একজন মনোরোগবিশেষজ্ঞ এসে শিক্ষার্থীদের নিয়ে সেমিনার ও কাউন্সেলিং করতেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে থাকা একজন মনোরোগবিশেষজ্ঞ অনলাইনে পরামর্শ দিতেন। তবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকায় এ কার্যক্রমে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে কার্যক্রমটিও বন্ধ হয়ে যায়।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. মামুন অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, স্থায়ী মনোরোগবিশেষজ্ঞ নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ইউজিসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেটি অনুমোদন পেলেই মনোরোগবিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হবে।

About Editor Todaynews24

Check Also

জার্মানির নতুন কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ

জার্মানির নতুন কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ

জার্মানির ছেলেদের জাতীয় ফুটবল দলের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে ইয়ুর্গেন ক্লপের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। আজ সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেয় জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফবি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *