কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল রাফির। খুবই বিরক্ত লাগল। এ সময় কেউ আসে? বহুদিন পর একটা বন্ধের দিন পাওয়া গেছে। আরাম করে ঘুমুচ্ছিলাম…দিল ঘুমের বারোটা বাজিয়ে। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখে, একটা বৃদ্ধ লোক দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। পোশাক-আশাকে বোঝা গেল, সে একজন এনলিস্টেড ফেরিওয়ালা। সে দুই হাতে একটা হলুদ রঙের ব্যাগ ধরে আছে।
—শুভ অপরাহ্ণ, ম্যাম।
রাফি ভেবেছিল, লোকটাকে এই মধ্যদুপুরে বিরক্ত করার জন্য একটা কড়া কিছু বলবে। কিন্তু বৃদ্ধ লোকটাকে দেখে একটু মায়া লাগল।
—কী ব্যাপার?
—আমি একজন ফেরিওয়ালা।
এটা বলার দরকার ছিল না। কারণ, তার বাঁ হাতে সবুজ ফিতে বাঁধা দেখেই বোঝা যায়, সে ফেরিওয়ালা। এ এক নতুন কায়দা শুরু হয়েছে। আগের পৃথিবী ফিরিয়ে আনার একটা অতি নিম্নমানের প্রকল্প। বুড়োরা থাকবে ওল্ড হোমে কিংবা স্বেচ্ছামৃত্যুর কেবিনে ঢুকে যাবে…আরামে বিদায় নেবে পৃথিবী থেকে। তা নয়, উনি শেষ বয়সে ফেরিওয়ালা হয়েছেন।
—সেটা বুঝতে পারছি। কী ফেরি করেন?
—শব্দ।
—মানে?
—শব্দ ফেরি করি, ম্যাম। পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া সব শব্দই আমার কাছে আছে। লোকটা তার হাতের হলুদ ব্যাগটার দিকে ইঙ্গিত করে।
—শব্দদূষণ ঠেকাতে পৃথিবীজুড়ে আন্দোলন হচ্ছে আর আপনি ফেরি করেন শব্দ? সোশ্যাল সিকিউরিটিতে আমি আপনার নামে মামলা করব কি না, সেটাই ভাবছি। একটু ভয় দেখানোর চেষ্টা করে রাফি।
—আমার সঙ্গে লাইসেন্স আছে। শব্দ ফেরি করার লাইসেন্স।
—কী শব্দ আছে আপনার কাছে?
—গাছের পাতার ঝিরঝির শব্দ…
শব্দদূষণ ঠেকাতে পৃথিবীজুড়ে আন্দোলন হচ্ছে আর আপনি ফেরি করেন শব্দ? সোশ্যাল সিকিউরিটিতে আমি আপনার নামে মামলা করব কি না, সেটাই ভাবছি। একটু ভয় দেখানোর চেষ্টা করে রাফি।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল রাফি। সত্যি চারদিকে শুধু কংক্রিটের সব বিশাল বিশাল স্কাইস্ক্র্যাপার আকাশ ছুঁয়ে আছে। কোথাও কোনো গাছপালা নেই। পৃথিবীতে নাকি আসলেই এখন আর কোথাও কোনো গাছপালার চিহ্ন পর্যন্ত নেই। এটা হলো…? দুয়েকটা গাছও থাকতে পারত না? কিছু মিউজিয়ামে নাকি আছে বলে শোনা যায়।
—বর্ষার মৌসুমে ব্যাঙের ডাকের শব্দ আছে।
—এগুলো তো মনে হচ্ছে সব মন খারাপ করা নস্টালজিক শব্দ।
—প্রাচীনকালের পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দও আছে।
—কোন পাখি?
—১৫ কোটি বছর আগের থেরোপড গোত্রের… আর্কিওপটেরিক্স…
—হুম। ঠিক আছে। আপাতত আমার কোনো শব্দের প্রয়োজন নেই।
কিন্তু বৃদ্ধ লোকটা যেন নাছোড়বান্দা।
—৬ কোটি বছর আগের সেই যে…সব ডাইনোসরের বিলুপ্তির কারণ চিক্সুলুব ইমপ্যাক্ট…গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার…সেই শব্দও আছে আমার কাছে।
—বললাম তো, আপাতত আমার কোনো শব্দের প্রয়োজন নেই। আপনি এবার আসুন।
তারপরও লোকটা বলে—
—স্পেসের শব্দ আছে, গ্যালাক্সির ছুটে চলার শিহরণজাগানো শব্দ!
লোকটা এখন বিশেষণ জুড়তে শুরু করেছে।
—স্পেসের শব্দ কীভাবে থাকে? স্পেসে তো বাতাসই নেই। শব্দ ক্যারি করতে বাতাস লাগে না?
৬ কোটি বছর আগের সেই যে…সব ডাইনোসরের বিলুপ্তির কারণ চিক্সুলুব ইমপ্যাক্ট…গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার…সেই শব্দও আছে আমার কাছে।
লোকটা রাফির প্রশ্নের উত্তর দিল না। লোকটা নিশ্চয়ই এসব শব্দ সুপার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে তৈরি করেছে। নাহলে এগুলো পাবে কোথায়? ব্যাটা ফ্রড নিশ্চয়ই।
—হ্যামব্যাক তিমির স্মৃতি সংগীত আছে।
—সেটা আবার কী?
—এই তিমিরা তাদের অতীত স্মৃতি নিয়ে একটা গান রচনা করেছে…অতি শ্রুতিমধুর। শুনলে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে।
—ধন্যবাদ আমাকে সময় দেওয়ার জন্য। এবার আপনি সত্যি সত্যি আসুন। আমি এখন ঘুমুব। একটাই ছুটির দিন আমার, সেটা নষ্ট করতে চাই না।

লোকটা হঠাৎ এদিক–ওদিক তাকায়। তারপর গলা নামিয়ে ফেলে একধাপ। ফিসফিস করে বলে, ‘আরও একটা স্পেশাল শব্দ আমার কাছে আছে। যেটা আপনি শুনতে অতি অবশ্য আগ্রহী হবেন, ম্যাম। এই শব্দ এ পর্যন্ত ১০০ জনের কাছে বিক্রি করেছি।’
—কী শব্দ?
লোকটা আবার এদিক–ওদিক তাকাল, যেন অন্য কেউ শুনে ফেললে মহাসর্বনাশ হয়ে যাবে। যদিও এখানে ত্রিসীমানায় শোনার মতো কেউ নেই। দূরে রেলিংয়ের ওপর একটা শালিক পাখি অবশ্য বসে আছে।
—কী শব্দ? আবার প্রশ্ন করে রাফি। ভেতরে–ভেতরে যে একটু কৌতূহল হয়নি, তা নয়।
লোকটা হঠাৎ এদিক–ওদিক তাকায়। তারপর গলা নামিয়ে ফেলে একধাপ। ফিসফিস করে বলে, ‘আরও একটা স্পেশাল শব্দ আমার কাছে আছে। যেটা আপনি শুনতে অতি অবশ্য আগ্রহী হবেন, ম্যাম।’
লোকটা পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাড় মোছে। তারপর ফিসফিস করে বলে, ‘বিগ ব্যাংয়ের ন্যানোসেকেন্ড আগের একটা শব্দ…’
—বিগ ব্যাংয়ের আগের আবার শব্দ কী? বিগ ব্যাংয়ের পরই না সবকিছুর শুরু…সময়, স্থান…আমাদের এই মহাবিশ্ব।
—ওখানেই বিগ ব্যাং নিয়ে আমাদের বিগ মিসটেক…
—আচ্ছা বুঝলাম মিসটেক। তা ১৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন বছর আগের শব্দ মানুষের কাছে আসবে কী করে শুনি?
—মানুষের কাছে তো আসেনি।
—তাহলে কার কাছে এসেছে?
—আমাদের কাছে।
—আমাদের কাছে মানে, আপনারা কারা?
লোকটা মুচকি হেসে পেছনে তাকায়। রাফি হতভম্ব হয়ে দেখে, ঠিক এই লোকটার মতো শত শত ফেরিওয়ালা তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একই ভঙ্গিতে।
—বুঝলেন না, শব্দটা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছানো খুবই জরুরি।
তখনই রাফি খেয়াল করল, লোকটার হলুদ ব্যাগ ধরা দুই হাতে কোনো বুড়ো আঙুল নেই, প্রাচীন প্রাইমেটদের মতো চারটা–চারটা আটটা লম্বা আঙুলে কেমন অদ্ভুতভাবে হলুদ ব্যাগটা ধরে আছে। পেছনের লোকগুলোও তা–ই…
—আমার ল্যাঙ্গুয়েজ কনভার্টারে খুব বেশি চার্জ নেই। লোকটা আবার ফিসফিস করে, ‘জিনিসটা নিলে বলুন, বের করি…মাত্র ২০ মিউরো।’
রাফি যন্ত্রের মতো ২০ মিউরোর একটা নোট বের করে দিল লোকটাকে। টের পেল, তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে যাচ্ছে।