‘কোনটা কে?’—যমজ সন্তানের মায়েদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত প্রশ্ন। মজার এই বিভ্রান্তি কেবল বাইরের মানুষের নয়। শুরুর দিকে মা-বাবাও যমজ সন্তানদের আলাদা করতে হিমশিম খান। তবে মায়েদের সঙ্গে ঘটে এক আশ্চর্য বিষয়। কয়েক দিনের মধ্যেই মায়েদের এই বিভ্রান্তি মিলিয়ে যায়। শিশুদের মুখের গড়ন একই থাকে। তবু দুজনের কান্না, হাসি এমনকি চোখের ভাষাও আলাদা করে বুঝতে পারেন মা। আমিও যমজ সন্তানের মা। অভিনব ও অভিরূপ—এই দুই সন্তান আর আমার গল্প শুনুন।
আমার অভিনব আর অভিরূপ
চিকিৎসক জানালেন, আমার গর্ভে একটি নয়; দুটি সন্তান। কী যে আনন্দ হলো! খুব করে মায়ের কথা মনে হলো। কয়েক মাস আগেই মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমার স্বামী সুদীপ্ত বলল, ‘নাতির মুখ দেখতে পারলে মা সবার চেয়ে বেশি খুশি হতেন।’
হাসপাতালের দিনটি এখনো চোখের সামনে স্পষ্ট। অস্ত্রোপচার হলো। জানলাম, আমাদের ঘরে এসেছে ফুটফুটে দুটি ছেলেশিশু। আমার অভিনব আর অভিরূপ। যমজ দুই ভাই। সবার মধ্যে আনন্দ। তবে সেই সঙ্গে শুরু হলো এক মজার বিভ্রান্তি।

প্রথম কয়েক সপ্তাহ দুই ভাইকে আলাদা করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কখনো অভিনবকে অভিরূপ বলে ডাকছি তো কখনো অভিরূপকে অভিনব। ডায়াপার বদলাতে গিয়ে পড়তাম দ্বিধায়। মনে হতো, একটু আগেই তো বদলে দিলাম। পরে দেখতাম, সেটা ছিল অন্যজন!
বাসায় আসা অতিথিদের প্রথম প্রশ্ন, ‘কোনটা অভিনব, কোনটা অভিরূপ?’

আমরা দেখিয়ে দিতাম। কয়েক মিনিট পরই আবার একই প্রশ্ন! দেখা যেত, কেউ একজনকে কোলে নিয়ে অন্যজনের নামে ডাকছেন। কেউ আবার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছেন, ‘এবার কিন্তু ঠিক চিনেছি!’ তারপরই ভুল প্রমাণিত হতেন। অমনি হাসির রোল পড়ে যেত ঘরে।
দুই ভাইকে ঠিকমতো চিনতে পারা নিয়ে মোটামুটি একটা প্রতিযোগিতা শুরু হলো।
চোখের ভাষাও চিনে ফেলি
অভিনব আর অভিরূপের বয়স এখন ছয় মাস। চেহারার মিল এখনো আছে। তবে আমি খুব সহজেই আলাদা করে ফেলতে পারি। দুজনের গলার স্বর, কান্নার ধরন, এমনকি চোখের ভাষাও আলাদা করে চিনে ফেলি। একজনের হাসি দুষ্টু–মিষ্টি তো আরেকজনের শান্ত–কোমল। দুজনের ঘুমের ভঙ্গিও আলাদা। ক্ষুধা পেলে ওদের কান্না আমার কান আলাদা করে ফেলতে পারে। হয়তো মা বলেই!

উদ্যোক্তা সোনিয়া শারমিনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল এসব নিয়েই। তাঁর যমজ দুই ছেলে-মেয়ে। ধ্রুব আর তারা। ছেলে-মেয়ে হলেও ওদের আলাদা করা যেত না। সোনিয়া বলছিলেন, ‘প্রথম কয়েক দিন আমরা ভুল করতাম। হাসপাতালে ওদের হাতে থাকা রিস্টব্যান্ডই ছিল একমাত্র ভরসা।’
তবে মায়ের সেই বিভ্রান্তি বেশি দিন থাকেনি। সোনিয়া বলছিলেন, ‘ধীরে ধীরে ওদের হাসি দেখে আলাদা করতে শিখেছি’।
মজার এই বিভ্রান্তি এড়াতে
আইফোন এক্সে প্রথম ‘ফেস আইডি’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। বাজারে আসার পর অনেকেই এটি যমজদের ওপর পরীক্ষা করতে শুরু করেন। তাতে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই যমজরা একজন আরেকজনের মুঠোফোনের লক খুলে ফেলতে পারে।
আইফোন জানায়, ‘অভিন্ন যমজ’–এর ক্ষেত্রে ফেস আইডি কিছুটা কম নিরাপদ। শুধু যন্ত্র নয়, মানুষকেও যমজদের আলাদা করতে খাবি খেতে হয়। তার ওপর আবার এই শিশুদের একই রকম কাপড় পরানোর চল আছে। এতে বিভ্রান্তি আরও বাড়ে। বিশেষ করে পারিবারিক ছবির অ্যালবামে দুজনকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলামের দুই মেয়ে আসিফা ও সায়েফা। ওদের বয়স ৮ বছর। স্কুল থেকে আরিফুলের মুঠোফোনে প্রতিদিন কোনো না কোনো মেয়ের অনুপস্থিতির বার্তা আসত। স্কুলে ‘ফেস আইডি’ দিয়ে উপস্থিতি নেওয়া হয়। যমজ দুই বোনের চেহারা এক হওয়ায় বিভ্রান্ত হতো উপস্থিতি নেওয়ার যন্ত্র। সেই থেকে স্কুলে আলাদা করে কাগজে–কলমে দুই বোনের উপস্থিতি নেওয়া হয়।
তবে কেবল যন্ত্র নয়, এমন বিড়ম্বনায় পড়েছিলেন আরিফুল নিজেও। হাসপাতাল থেকে শিশুদের একই রঙের চাদরে মুড়িয়ে বাসায় এনে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। পরে একজনের হাতের ছোট্ট দাগ দেখে চিনতে পারেন।
আরিফুল এখন সহজেই দুই মেয়েকে আলাদা করতে পারেন। তবু বিভ্রান্তি তৈরি হলে খেয়াল করেন মেয়েদের খাবার। দুই মেয়ের খাবারের পছন্দ একেবারে আলাদা। তিনি বলছিলেন, ‘খাবারের বেলায় ওদের পছন্দ একেবারে আলাদা। বেশির ভাগ যমজ শিশুর মধ্যেই এটা থাকে। ওরা কে কোন খাবার পাতে তুলছে, সেটা দেখেই ওদের আলাদা করে ফেলতে পারি।’
এই বিভ্রান্তি এড়াতে মানতে পারেন মজার কিছু নিয়ম। বিশেষ করে পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোয়।
-
ডান অথবা বাঁ—ছবি তোলার ক্ষেত্রে একজনকে সব সময়ই একই পাশে রাখুন।
-
দুজনের জন্য ভিন্ন ধরনের কাপড় বেছে নিন।
-
আলাদা রং বেছে নিতে পারেন। একজনের ব্যবহার্য সব জিনিস লাল হলে অন্যজনের জন্য সবুজ ব্যবহার করুন।
-
নখে আলাদা রঙের নেইল পলিশও ব্যবহার করা যেতে পারে।
-
জন্মদাগ বা তিলের মতো কোনো সূক্ষ্ম চিহ্ন থাকলে সেটি খেয়াল করুন।