পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৯০ কোটি মাইল (৯৫০ কোটি কিলোমিটার) দূরে আছে মানুষের পাঠানো অন্যতম সফল মহাকাশযান নিউ হরাইজন্স। সৌরজগতের এক বরফশীতল ও অন্ধকার প্রান্তে এটি শীতনিদ্রা থেকে আবারও জেগে উঠেছে। প্লুটো এবং সৌরজগতের দূরতম অঞ্চলের রহস্য উন্মোচনকারী এই ঐতিহাসিক মহাকাশযানটি প্রায় ১০ মাসের পরিকল্পিত শীতনিদ্রা শেষে আবার পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। এখন এটি শীতনিদ্রার সময় সংগ্রহ করা বৈজ্ঞানিক তথ্য পৃথিবীতে পাঠাতে প্রস্তুত।
নাসার এই মহাকাশযান ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট থেকে হাইবারনেশন বা শীতনিদ্রায় ছিল। মহাকাশযানটি একেবারে বন্ধ ছিল না। খুব কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে নিরাপদ মোডে কাজ করছিল। ২০২৬ সালের ২৩ জুন আগে থেকে নির্ধারিত একটি স্বয়ংক্রিয় সংকেতের মাধ্যমে এর মূল কম্পিউটার আবার চালু হয় এবং নিউ হরাইজন্স স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের লরেলে অবস্থিত জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লায়েড ফিজিকস ল্যাবরেটরি এই মিশন পরিচালনা করছে। তাঁরা জানিয়েছেন, মহাকাশযানটির সব যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে থাকার পরও এটি পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমানে নিউ হরাইজন্স রয়েছে কুইপার বেল্টে। এটি নেপচুনের কক্ষপথের বাইরের বিশাল বরফাচ্ছন্ন অঞ্চল, যেখানে হাজার হাজার বরফ, পাথর ও জমাট গ্যাসের মহাজাগতিক বস্তু ঘুরে বেড়ায়। এসব বস্তুকে বলা হয় ট্রান্স-নেপচুনিয়ান অবজেক্ট (টিএনও)। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে সৌরজগৎ গঠনের সময় যেসব উপাদান অবশিষ্ট ছিল, সেগুলো থেকেই এসব বস্তু তৈরি হয়েছে। তাই কুইপার বেল্টকে অনেকটা সৌরজগতের প্রাচীন ইতিহাসের ভান্ডার বলা যায়।
নিউ হরাইজন্সের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০১৫ সালে। সে বছর এটি ইতিহাসের প্রথম মহাকাশযান হিসেবে প্লুটো ও তার পাঁচটি উপগ্রহের খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়। অভিযানে পাঠানো অসাধারণ ছবি ও তথ্য বিজ্ঞানীদের জানিয়ে দেয়, প্লুটো নিছক একটি বরফের পিণ্ড নয়। সেখানে রয়েছে বিশাল বরফের সমভূমি, সুউচ্চ বরফের পাহাড়, পাতলা বায়ুমণ্ডল এবং আশ্চর্য রকম সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য।
এরপর ২০১৯ সালে নিউ হরাইজন্স আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করে। এটি অ্যারোকথ নামের তুষারমানবের মতো আকৃতির একটি প্রাচীন মহাজাগতিক বস্তুর খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়। সৌরজগৎ সৃষ্টির পর প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকা এই বস্তুটি পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা গ্রহ তৈরির প্রাথমিক ধাপ সম্পর্কে নতুন ধারণা পান।
এর পর থেকে নিউ হরাইজন্স কুইপার বেল্টের আরও গভীরে এগিয়ে যেতে যেতে একের পর এক নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করছে।
অজানা জগতের খোঁজে
বর্তমানে মহাকাশযানটি কুইপার বেল্টের বরফময় বস্তুগুলোর ঘূর্ণনের গতি, ঘূর্ণনের দিক এবং আকৃতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন, কীভাবে কোটি কোটি বছর আগে মহাজাগতিক ধূলিকণা ও ক্ষুদ্র পাথরের টুকরা একত্র হয়ে ধীরে ধীরে গ্রহের জন্ম দিয়েছিল।
নিউ হরাইজন্স প্রকল্পের বিজ্ঞানী পন্টাস ব্র্যান্ড বলেন, কুইপার বেল্টে অ্যারোকথের মতো জোড়া আকৃতির বস্তু বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি থাকতে পারে। যদি সত্যিই তা হয়, তাহলে এসব বস্তুর মাধ্যমেই হয়তো পৃথিবীসহ বড় বড় গ্রহ তৈরি হয়েছিল।
মহাকাশযানটি একই সঙ্গে সূর্যের বিশাল প্রতিরক্ষাবলয় হেলিওস্ফিয়ার সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করছে। সূর্য থেকে অবিরাম ছুটে আসা আধানযুক্ত কণার প্রবাহ বা সৌর বাতাস এই বিশাল গ্যাসীয় বুদ্বুদ তৈরি করে। এটি অনেকটা ঢালের মতো কাজ করে এবং মহাকাশ থেকে আসা ক্ষতিকর বিকিরণের বড় অংশ সৌরজগতের বাইরে আটকে দেয়।
নিউ হরাইজন্সে থাকা পেপসি (PEPSSI) যন্ত্রটি কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মিও পরিমাপ করছে। দূরবর্তী নক্ষত্র বিস্ফোরণের সময় সৃষ্টি হওয়া এসব উচ্চশক্তির কণা ভবিষ্যতের মহাকাশচারীদের জন্য বড় হুমকি হতে পারে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, হেলিওস্ফিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষতিকর কসমিক রে প্রতিহত করে। নিউ হরাইজন্সের তথ্য সেই সুরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দেবে।
তবে মহাকাশযানটির আরেকটি যন্ত্র বিজ্ঞানীদের নতুন এক ধাঁধার সামনে দাঁড় করিয়েছে। ধারণা করা হয়েছিল, কুইপার বেল্টের বাইরের দিকে ধূলিকণার পরিমাণ দ্রুত কমে যাবে। কিন্তু নিউ হরাইজন্স দেখাচ্ছে, পরিচিত সীমানা অতিক্রম করার পরও সেখানে ধূলিকণার ঘনত্ব বেশ বেশি।
এর অর্থ হতে পারে, কুইপার বেল্ট আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। বিজ্ঞানীদের মতে, সৌরজগতের দূরতম অঞ্চল সম্পর্কে আমরা এখনো খুব সামান্যই জানি। সেখানে হয়তো শত শত অজানা বামন গ্রহ এবং হাজার হাজার ছোট মহাজাগতিক বস্তু আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ২০২৬ সালের আগস্টে উৎক্ষেপণ হতে যাওয়া ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ কুইপার বেল্টের আরও বাইরের অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করে এসব রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শীতনিদ্রার কারণ
২০০৬ সালের জানুয়ারিতে পৃথিবী ছেড়ে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই নিউ হরাইজন্সের দীর্ঘ অভিযানের অন্যতম কৌশল হলো মাঝেমধ্যেই শীতনিদ্রায় চলে যাওয়া।
এই সময় মহাকাশযানটি খুব কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে নিরাপদ মোডে থাকে। তবে এর প্রধান কম্পিউটার সব যন্ত্রের ওপর নজর রাখে এবং প্রতি সপ্তাহে পৃথিবীতে একটি সংক্ষিপ্ত স্ট্যাটাস রিপোর্ট পাঠায়। ফলে পৃথিবীতে থাকা বিজ্ঞানীরা সব সময় নিশ্চিত হতে পারেন যে মহাকাশযানটি ঠিকঠাক কাজ করছে।
মজার বিষয় হলো, ঘুমন্ত অবস্থাতেও নিউ হরাইজন্সের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রগুলো কাজ বন্ধ করে না। তারা তথ্য সংগ্রহ করে মহাকাশযানের মেমোরিতে জমা রাখে। পরে ঘুম ভাঙার পর সেই তথ্য পৃথিবীতে পাঠানো হয়। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় হয় এবং মহাকাশযানটির আয়ুও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নিউ হরাইজন্স ২০ বারের বেশি বিভিন্ন মেয়াদের শীতনিদ্রায় গেছে। কখনো কয়েক দিনের জন্য, কখনো কয়েক সপ্তাহ, আবার কখনো কয়েক মাসের জন্য।
বর্তমানে নিউ হরাইজন্স তার দ্বিতীয় বর্ধিত মিশনে রয়েছে, যা ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার কথা। তবে মহাকাশযানটি যদি ভালো থাকে এবং মূল্যবান বৈজ্ঞানিক তথ্য পাঠাতে থাকে, তাহলে এর মিশনের মেয়াদ আরও বাড়ানো হতে পারে।
সেটি হলে নিউ হরাইজন্স একদিন কিংবদন্তি ভয়েজার মহাকাশযানগুলোর পথ অনুসরণ করবে। কারণ, এর বর্তমান গতিপথ একসময় এটিকে সূর্যের প্রভাববলয়ের শেষ সীমা, অর্থাৎ হেলিওস্ফিয়ারের বাইরে নিয়ে যাবে। তখন এটি প্রবেশ করবে ইন্টারস্টেলার স্পেসে। মানে নক্ষত্রগুলোর মধ্যবর্তী বিশাল মহাশূন্যে পৌঁছে যাবে। এখানে আজ পর্যন্ত মানুষের পাঠানো হাতে গোনা কয়েকটি মহাকাশযানই শুধু পৌঁছাতে পেরেছে।
সূত্র: সিএনএন