সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / বিপদ কি আল্লাহর দেওয়া দুনিয়ার শাস্তি
বিপদ কি আল্লাহর দেওয়া দুনিয়ার শাস্তি

বিপদ কি আল্লাহর দেওয়া দুনিয়ার শাস্তি

আমাদের জীবনে কখনো কখনো এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ–মুসিবত ও একাকিত্ব আসে, বাহ্যিকভাবে যেখান থেকে বের হওয়ার আর কোনো উপায় চোখে পড়ে না। তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, আল্লাহ কি আমার ওপর অসন্তুষ্ট?

এই দ্বিধাগ্রস্ততার সুযোগ নিয়ে শয়তান মানসিকভাবে প্রবঞ্চনা দেয় যে এই বিপদ শুধুই আল্লাহর গজব বা অসন্তুষ্টির ফল। আর এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে তীব্র হতাশা আমাদের গ্রাস করে ফেলে। কখনো কখনো এই হতাশার দরুন আমরা আল্লাহর পথ থেকে অনেক দূরে সরে যাই।

প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যিই কি বিপদ–মুসিবত কিংবা একাকিত্ব বান্দার জন্য শাস্তি? ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রশ্নের কোনো একক বা সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। আমাদের পক্ষে কোনো দিনই নিশ্চিত করে জানা সম্ভব নয়, আল্লাহ কেন এই নির্দিষ্ট বিপদটি পাঠিয়েছেন; কারণ এর প্রকৃত হেকমত একমাত্র তিনিই জানেন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই আপতিত হয় না।’ (সুরা আত-তাগাবুন, আয়াত: ১১)।

এ প্রসঙ্গে কালজয়ী চিন্তাবিদ ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) চমৎকার একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, একই বিপদ বা কষ্ট একজনের জন্য রহমত হতে পারে, আবার অন্যজনের জন্য শাস্তি হতে পারে। এর প্রকৃতি মূলত নির্ধারিত হয় বিপদের সময় মানুষের অভ্যন্তরীণ অবস্থান ও তার প্রতিক্রিয়ার ওপর।

তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো, যদি কোনো বিপদ মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে—তওবা, দোয়া, ইস্তিগফার ও ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করে এবং অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয়, তবে সেই বিপদটি তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত ও কল্যাণ। আর যদি সেই বিপদ মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাকে অহংকারী ও অভিযোগকারী করে তোলে কিংবা পাপে ও হতাশায় নিমজ্জিত রাখে, তবে তা অবশ্যই তার জন্য শাস্তি বা দুর্ভাগ্যের কারণ।

তিনি আরও বলেন, আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত যেমন কারও জন্য পরীক্ষা বা শাস্তির কারণ হতে পারে, তেমনি বিপদও কারও জন্য আত্মিক উন্নতির সোপান কিংবা ধ্বংসের কারণ হতে পারে। তাই কোনো ঘটনা নিজ থেকে সরাসরি রহমত বা শাস্তি নয়; মানুষের হৃদয়ের অবস্থা ও তার চূড়ান্ত পরিণতিই সেটি নির্ধারণ করে। (ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়াহ, আল-ফাওয়ায়েদ, পৃষ্ঠা: ৮২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৭৩)

আমাদের পার্থিব জীবনে পরীক্ষা আসবেই। আর এই সংকটের সময়েই মানুষের ইমানের দৃঢ়তার আসল পরীক্ষা হয়। কারণ সচ্ছল ও ভালো সময়ে আল্লাহ সম্পর্কে শুভচিন্তা পোষণ করা সহজ, কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫)

এই আয়াতে বিপদের সময় ধৈর্যধারণকারীদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কারের সুস্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

যদি জীবনের দুঃখ–কষ্ট, বিপদ কিংবা একাকিত্ব মানেই শুধু আল্লাহর শাস্তি হতো, তবে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানব নবী–রাসুলদের জীবনে কোনো দুঃখ–যন্ত্রণা কিংবা একাকিত্ব থাকার কথা ছিল না। আমরা সবাই জানি, আমাদের নবী–রাসুলগণই সবচেয়ে বেশি দুঃখ–যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। 

কিন্তু তাঁরা এক আল্লাহর ওপরই পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন, ফলে আল্লাহ তাঁদের সর্বোত্তম প্রতিদান দান করেছেন।

হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ বলেছেন, ‘আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা পোষণ করে, আমি তার সাথে ঠিক তেমন আচরণই করি। সে যখন আমার প্রতি উত্তম ধারণা রাখে, সে আমার কাছ থেকে উত্তম আচরণই পাবে। আর সে যখন নেতিবাচক ধারণা রাখবে, তখন সে তেমনটাই পাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৪০৫)

জীবনের সংকটময় মুহূর্তে আমাদের উচিত আল্লাহর রহমত ও দয়ার প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস ধরে রাখা। বিপদের সময় যদি আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা যায়, তবে ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি জীবনকে সৎপথ দেখাবেন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যে কেউ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, আল্লাহ তার হৃদয়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন।’ (সুরা তাগাবুন, আয়াত: ১১)

জীবনে সুখ, সাফল্য ও স্বাচ্ছন্দ্য থাকতে পারে, তবুও হৃদয় যদি আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তবে সেই গভীর শূন্যতা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হয় না। 

সংকট ও একাকিত্বের সময়ে আল্লাহর দিকে ফিরলে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে হেদায়েত কামনা করলে তিনি হৃদয়কে সঠিক পথ দেখান। এতে বিপদ হয়তো রাতারাতি পুরোপুরি দূর হবে না, কিন্তু অন্তর প্রশান্ত থাকবে; যা জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার।

আল্লাহ মানুষকে সম্পদ ও শান্তি দিয়েও পরীক্ষা করেন। তবে প্রকৃত প্রাচুর্য তখনই আসে, যখন হৃদয় শান্ত থাকে। আর মুমিনের হৃদয়ের প্রশান্তির সবচেয়ে বড় উৎস হলো আল্লাহর নৈকট্য।

জীবনে সুখ, সাফল্য ও স্বাচ্ছন্দ্য থাকতে পারে, তবুও হৃদয় যদি আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তবে সেই গভীর শূন্যতা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হয় না। 

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রা’দ, আয়াত: ২৮)

যে হৃদয় আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে যায়, সে প্রাচুর্যের মাঝেও অশান্ত থাকে। আর তা-ই হলো সেই ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।

আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, তার জন্য থাকবে সংকীর্ণ জীবন।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১২৪)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন তাঁর কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন দুনিয়াতেই তাকে দ্রুত কষ্টে ফেলেন (যাতে তার পাপ দূর হয়ে যায়)।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৯৬)

এতে বোঝা যায়, দুনিয়ায় দুঃখকষ্টের শিকার হলে তার বিনিময়ে মানুষের পাপ ক্ষমা হয়ে যায়। আল্লাহ আমাদের শাস্তি দিতে চান না; তিনি চান আমরা যেন আন্তরিকতার সাথে ক্ষমা প্রার্থনা করি।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহ কি করবেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো এবং ইমান আনো?’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪৭)

তাই আল্লাহর শাস্তির জন্য নিষ্ক্রিয়ভাবে অপেক্ষা না করে, ভুল হলেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই মুমিনের কাজ। বিপদ যদি মানুষকে পরম সত্তার নিকটবর্তী করে, তবে তা আশীর্বাদ; আর যদি দূরে সরিয়ে দেয়, তবেই তা কঠিন সতর্কবার্তা।

  • সাদিয়া শারমীন ঠাকুর: লেখক ও সংবাদকর্মী

About Editor Todaynews24

Check Also

হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষে নেপালে নিহত ৩, শান্ত থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষে নেপালে নিহত ৩, শান্ত থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

গত মার্চে কার্যভার গ্রহণের পর থেকে জনসমক্ষে খুব একটা আসেননি প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। দীর্ঘদিনের সেই নীরবতা ভেঙে গতকাল জাতির উদ্দেশে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *