কেএফসির ইন্সপেকশন শেষে আমরা রিপোর্ট নিয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে আলোচনা করলাম। গতবারের সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে কি না, সেটা যাচাই-বাছাই করে নিল অমুদা। দুজনের কথোপকথনের সময় লক্ষ করলাম ম্যানেজার বেশ অমায়িক প্রকৃতির মানুষ। মনোযোগ সহকারে সবকিছু শুনছেন এবং এবার খুঁজে পাওয়া সমস্যাগুলো পরবর্তী সময়ে যাতে আর না হয়, তা নিশ্চিত করবেন বলে আশ্বস্ত করলেন।
মোটামুটি দুই ঘণ্টার মধ্যেই কাজ সেরে আমরা অফিসে ফেরত এলাম। এরপর ম্যানেজার আমাদের কাছে জানতে চাইলেন প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল। কথাবার্তা চলছিল। একপর্যায়ে আমাদের জানানো হলো মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমরা এখান প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার পথের দূরত্বের আরেকটি শহরে ট্রেনিংয়ের কাজে যাব—দ্য পাস (ইংরেজিতে এর উচ্চারণ দ্য পা)। ওখানকার বর্তমানে দায়িত্বরত অফিসার আমাদের প্রশিক্ষণের ভার নেবেন। এক সপ্তাহ ট্রেনিং শেষে ফিরে আসব থম্পসনে।
মনে মনে কিছুটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে! প্রথমবার শহরের বাইরে কোথাও যাচ্ছি! যেহেতু এখনো আমাদের অফিস থেকে গাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি, তাই অমুদাই আমাদের ওখানে পৌঁছে দিয়ে আসবে। ফিরতি পথে দ্য পা-এর অফিসার নিয়ে আসবেন। প্রতিদিনের পরিদর্শনই যেন একেকটা গল্প হয়ে রয়ে যাবে। কারণ, প্রতিটা জায়গারই নিজস্ব গল্প থাকে। এর আবেগ, গন্ধ বা স্বাদ অন্যটা থেকে সব আঙ্গিকেই আলাদা। এই অফিসের ভেতরকার নকশাটা একটু অদ্ভুতুড়ে। আমাদের মূল অফিসকক্ষে ওয়াশরুম বা লাঞ্চরুম নেই। ওই দ্বিতল ভবনের নিচতলায় পাশাপাশি দুটি ঘরে দুটি সরকারি অফিস। একটি আমাদের, আরেকটি ট্রান্সপোর্ট অথরিটির। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ওই অফিসরুমেই ওয়াশরুম, লাঞ্চরুম আছে। ওপরের তলায় অফিসে বিমান বিভাগের কাজকর্ম হয়ে থাকে। তবে যতটা বুঝতে পারছি, মূলত অফিশিয়াল কিছু কাজ করতে লোকজন আসা-যাওয়া করেন। অফিসের কর্মকর্তা ছাড়া কোনো সাধারণ মানুষ আপাতত চোখে পড়েনি।
কাজ শেষে বাসায় ফিরে পরের দিনের রান্নাবান্নার কাজ করো। কী রাঁধব এটা আগেই ঠিক করে না রাখলে আবার সমস্যা। মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থাও আগের দিনই করে রাখা চাই। যে বিল্ডিংয়ে আমি বর্তমানে থাকছি, সে জায়গারও পাশাপাশি একটা গৌরবোজ্জ্বল এবং কালো অধ্যায় আছে। ডরমিটরির পাশাপাশি নর্থ ও সাউথ টাওয়ার নামে স্থানীয় লোকে জানে। নর্থ টাওয়ারের গোড়াপত্তন হয়েছিল থম্পসন শহরের জৌলুশ থাকাকালীন। এলাকার সব নামীদামি ব্যক্তিদের বসবাস ছিল। মূল প্রবেশপথ থেকে ক্রমে ভেতরের দিকে যেতে থাকলে দেখা মিলত সুইমিংপুলের! ভবনের নকশা, গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা, নর্থ টাওয়ারের কোল ঘেঁষে সাউথ টাওয়ার পেরিয়ে কচিকাঁচাদের খেলার জায়গা, টেনিস কোর্ট, ভলিবল খেলার কোর্ট, পাশেই মনোরম পরিবেশে বসার জন্য বেঞ্চ রাখা, কাছাকাছি দূরত্বে গার্বেজ বিন—সবই নিপুণ প্রকৌশলে করা হয়েছিল, যা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পড়ন্ত বিকেলে ছোট্টমণিরা যেমন দোলনায় চড়ে বসত, স্লাইডারে খেলত, ঘূর্ণমান ঢেঁকিকলে চড়ে ওঠানামা করত, রংবেরঙের ঘুড়ি ওড়াত; ওপাশে ভলিবল খেলার কোর্টে হয়তো দুই দলের মধ্যে চলত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। তবে একই সময়ে ভলিবল আর টেনিস খেলা যেত কি না, এটা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ তো থেকেই যায়। বাচ্চাকাচ্চাদের অভিভাবক এবং বয়স্কদের কথা বিবেচনা করেই বেঞ্চ বসানো হয়েছিল, যাতে ওনারা বসে গল্পগুজব করার পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের খেলাও দেখতে পান। শোনা যায়, তখনকার ইউনিভার্সিটির প্রফেসর, ইঞ্জিনিয়ারসহ এলাকার সব চাঁদের হাটের বসবাস ছিল নর্থ ও সাউথ টাওয়ারের ডরমিটরিতে। একসময় সুইমিংপুলে বাচ্চাকাচ্চাসহ সবার কলতানে যে জায়গা মুখরিত হতো, সে জায়গাটাই একেবারে উধাও বর্তমান সময়ের নকশা থেকে! খেলাধুলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল সব বয়সের ছেলেমেয়েদের কথা মাথায় রেখে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com
ভাবছিলাম কত স্বপ্ন ছিল সবার। কিন্তু এরপর শুরু হলো মন্দা। খনির আবিষ্কারের পর কাজে আসা প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শহরছাড়া হতে শুরু করলেন। এর প্রভাব পড়ল শহরজুড়ে।
রাহুগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় যেমন চাঁদের রুপালি আলো হারিয়ে গিয়ে কালচে তামাটে বর্ণের হয়ে যায়, তেমনি এই শহরের সোনালি দিনগুলো ক্রমে ঘোর অমানিশায় রূপ নিল। পুরো থম্পসনজুড়ে মাদকদ্রব্যের পাচারকারীদের আধিপত্য বাড়তে লাগল। নর্থ আর সাউথ টাওয়ারে আগমণ ঘটল তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের। যে ডরমিটরির বারান্দায় মানুষজনের বাসায় একসময় শোভা বর্ধন করত নানা রকমের অর্কিডগাছ, সেই একই জায়গায় হরেক রকমের গাঁজার সেবন চলতে লাগল হরদম। আরও অনেক রোমাঞ্চকর গল্প শুনেছিলাম সাদিকুল ভাইয়ের কাছে। বর্তমানে আমি আরও দুজনের সঙ্গে ঘর ভাগাভাগি করে রয়েছি। হারহামেশা ব্যাচেলর মানুষজন যেভাবে থাকেন। সাদিকুল ভাই থম্পসনের অনেক পুরোনো মানুষ। আর আনু ভাইয়ের এই শহরে থাকার অভিজ্ঞতা বছরখানেকের। দুজনেই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত থাকেন। ওনাদের দুজনকে একসঙ্গে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। শনি, রোববারে থাকলেও আনু ভাইয়ের কাজ থাকে ভোরবেলা থেকেই। মাঝেমধ্যে সন্ধ্যায় দুজনকে একসঙ্গে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। তখন থম্পসনের রোমহর্ষ সব গল্পের হাট খুলে বসেন সাদিকুল ভাই। আমি আর আনু ভাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনি।
পরদিন সকাল। প্রতিদিনের মতো আজও কর্নফ্লেক্স খেয়ে অফিসের পথে বেরিয়ে পড়লাম। বাসা থেকে অফিস দেখা যায়, দূরত্ব মাত্র পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যে। গিয়ে জুলিয়েটের কাছে জানতে পারলাম আমরা যাব হাউজিং ইন্সপেকশনে। সকালে ওর কাছে কমপ্লেইন্ট কল এসেছে। আমরা পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্ট থেকে কারও বাসায় সরাসরি যাই না। অভিযোগের ভিত্তিতে যখন ডাক পড়ে তখন দায়িত্ব পালন করি। ট্রেনিংয়ে এসে আমারও প্রথমবার যাওয়া হবে। প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি বলতে সঙ্গে নিলাম টর্চলাইট, মাস্ক, গ্লাভস, মেজারিং টেপ আর ইন্সপেকশন কিটব্যাগ তো আছেই। আমি সব সময় ছোট্ট ডায়েরি আর কলম সঙ্গে রাখতাম। যদি গুরুত্বপূর্ণ নোট নিতে হয় তখন চটজলদি লিখব। আজ অফিসের সবাই যাচ্ছি।

অফিস লক করে সিকিউরিটি কোড দিয়ে বের হওয়ার নিয়মটাও রপ্ত করা হলো। জুলিয়েট একাই যাচ্ছে আর অমুদা আমাদের নিয়ে ওকে পেছন থেকে অনুসরণ করতে করতে এগোবে। শুনলাম ওই ঘরের মূল সমস্যা আরশোলার উৎপাত। মালিককে বারবার বলা হলেও তেমন একটা সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না বলেই ভদ্রমহিলা আমাদের শরণাপন্ন হয়েছেন। আমরা ইন্সপেকশনের পর অভিযোগের সত্যতার ভিত্তিতে মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠাব। এরপর টনক নড়বে! যেতে যেতে অমুদা আমাদের এসব শোনাচ্ছিল। আগের অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটা বেশ অস্বস্তিকর ভিডিও দেখাল। এক বাসায় টয়লেটের কমোড ভরে উপচে পানি পড়ছে। আরেক বাসার নিচতলায় ফ্লোরজুড়ে দেখলাম ছত্রাকে ভরপুর! দুটোই বাড়িওয়ালার অবহেলার কারণে হয়েছিল। ক্রমশ…