বহু বছর ধরে মানুষের ধারণা ছিল মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো পৃথিবীটা বুঝি একদম সুন্দর গোল একটি বলের মতো। কিন্তু বিজ্ঞানীদের নতুন এক গবেষণায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্যি সামনে এসেছে।
বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের নিখুঁত হিসাব করে একটি থ্রিডি মডেল বানিয়েছেন। যেখানে তাঁরা দেখেছেন, আমাদের পৃথিবী মোটেও একদম গোল বা মসৃণ নয়। একে দেখতে বরং অনেকটা এবড়োখেবড়ো আলুর মতো মনে হয়।
মহাকর্ষের মতো এই অদৃশ্য শক্তি কীভাবে পৃথিবীর আকার বদলে দিচ্ছে এবং কেন এই অদ্ভুত আকৃতি আমাদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?
ছবিতে আমরা আসলে কী দেখছি? সম্প্রতি ইন্টারনেটে পৃথিবীকে এবড়োখেবড়ো আলুর মতো দেখতে একটি ছবি বেশ ভাইরাল হয়। যা সবাইকে বেশ অবাক করেছে। তবে এটি কিন্তু মহাকাশ থেকে তোলা পৃথিবীর আসল কোনো ছবি নয়। পৃথিবী এখনো প্রায় একটি গোল বলের মতোই। শুধু নিজের চারপাশে ঘোরার কারণে এর উত্তর ও দক্ষিণ মেরু কিছুটা চ্যাপটা।
আসলে এই ছবিতে ‘জিওয়েড’ (Geoid) নামের একটি মডেল দেখানো হয়েছে। সহজ কথায়, সাগরে যদি কোনো বাতাস, জোয়ার-ভাটা বা পানির স্রোত না থাকত, তবে শুধু মহাকর্ষ বলের টানে পৃথিবীর পানি কোথায় কতটুকু থাকত এই মডেলটি সেটাই দেখায়।
জিওয়েড মডেল বিজ্ঞানীদের অদৃশ্য মহাকর্ষ শক্তি বুঝতে সাহায্য করে। সাধারণ গ্লোবে আমরা পৃথিবীকে একদম মসৃণ গোলক দেখলেও, এই মডেলের মাধ্যমে বোঝা যায় পৃথিবীর সব জায়গায় মহাকর্ষ বলের টান সমান নয়।
নাসার মডেলে পৃথিবীর গায়ে যে উঁচু-নিচু অংশ দেখা যায়, এর আসল কারণ মাটির নিচে সব উপাদান সমানভাবে নেই। পৃথিবীর কোনো কোনো জায়গায় ভারী পাথর বা খনিজ এক জায়গায় বেশি জমে আছে। ফলে সেসব জায়গায় মহাকর্ষের টান কিছুটা বেশি থাকে। এই বেশি টানের কারণে মডেলে সমুদ্রের পানি কিছুটা ওপরে উঠে আসে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন গ্র্যাভিটি হিল বা মহাকর্ষীয় পাহাড়।
আবার যেসব জায়গায় মাটির নিচের পদার্থের ঘনত্ব কম, সেখানে মহাকর্ষের টানও দুর্বল। ফলে ওই এলাকাগুলো নিচু হয়ে মহাকর্ষীয় উপত্যকা তৈরি করে। বাস্তবে এই তফাতগুলো খুবই কম। তবে এই হিসাব থেকে বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে কী আছে ও ভারী জিনিসগুলো কীভাবে ছড়িয়ে আছে, তা বুঝতে পারেন।
মহাকর্ষের এই না দেখা তফাতগুলো আমাদের সহজে বোঝানোর জন্য বিজ্ঞানীরা মডেলে উঁচু-নিচু অংশগুলোকে অনেক বাড়িয়ে দেখিয়েছেন। বাস্তবে এই পার্থক্যগুলোকে প্রায় ১০ হাজার গুণ বড় করে দেখানো হয়েছে। সত্যি বলতে, বাস্তবে উঁচু-নিচু জায়গার তফাত মাত্র কয়েক মিটারের মতো, যা মহাকাশ থেকে খালি চোখে একদমই বোঝা সম্ভব নয়।
উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেক বছরের গবেষণার পর পৃথিবীর এই নিখুঁত ‘জিওয়েড’ মডেলটি তৈরি করা হয়েছে। ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির ‘গোস’ (GOCE) ও নাসার ‘গ্রেস’ (GRACE) স্যাটেলাইটের পাঠানো তথ্য থেকে মহাকর্ষ বলের সূক্ষ্ম তারতম্যগুলো এক জায়গায় জমা করেন বিজ্ঞানীরা।
প্রায় ১৫ বছর ধরে পাওয়া ১০০ কোটির বেশি ডেটা বিশ্লেষণ করে তাঁরা পৃথিবীর মহাকর্ষীয় রূপের সবচেয়ে নিখুঁত একটি থ্রিডি মানচিত্র বানিয়ে ফেলেছেন।
এই মানচিত্র থেকে দেখা যায়, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় পাহাড় বা উঁচু জায়গাটি রয়েছে আইসল্যান্ডের কাছে। সেখানে মহাকর্ষীয় টানের মান গড়ের চেয়ে প্রায় ২৭৯ ফুট ওপরে। আবার ভারতের নিচের দিকে ভারত মহাসাগরের একটি জায়গায় মহাকর্ষের টান সবচেয়ে কম। এই জায়গাটি গড়ের চেয়ে প্রায় ৩৪৮ ফুট নিচে নেমে গেছে।
THE GEOID pic.twitter.com/BCz4NJ7yOb
— SpaceWeatherNews (@SunWeatherMan) July 16, 2026
সাধারণ মানচিত্র এখন আর কেন কাজে আসছে না? অনেক বছর ধরে মানচিত্র তৈরিকারীরা পৃথিবীকে একটি সামান্য চ্যাপটা মসৃণ গোলক ধরে নিয়ে হিসাব করতেন। কেননা সেই মানচিত্র বানাতে কিংবা সহজ দূরত্ব হিসাবের জন্য বেশ সুবিধাজনক ছিল।
তবে সাধারণ দেয়াল-মানচিত্রের জন্য এই পুরোনো ধারণা কাজ করলেও, আজকের আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কেবল এই সহজ মডেলে নির্ভর করলে চলে না। এখন সব ক্ষেত্রে অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত তথ্যের প্রয়োজন হয়।