সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / কোরআনের পাখি ‘হুদহুদ’
কোরআনের পাখি ‘হুদহুদ’

কোরআনের পাখি ‘হুদহুদ’

পবিত্র কোরআনে পাখির কথা বারবার এসেছে। একবচনে ‘তাইর’ (পাখি) শব্দটি এসেছে ৫ বার এবং বহুবচনে ‘তুয়ূর’ (পাখিকুল) শব্দটি এসেছে ১৩ বার। এই বিস্তৃত পাখিকুলের মধ্যে একটি বিশেষ পাখির নাম কোরআনে স্পষ্ট ও বিশদভাবে উচ্চারিত হয়েছে—তা হলো ‘হুদহুদ’ পাখি।

সুরা নামলে এই পাখির নাম ও ভূমিকা নিয়ে একটি অনন্য ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। নবী সোলাইমানের রাজত্ব এবং সাবা রাজ্যের ঐতিহাসিক রূপান্তরের পেছনে এই ছোট্ট পাখির ভূমিকা আশ্চর্যজনক।

হুদহুদ অত্যন্ত দূরদর্শী এবং মাটির তলদেশের সূক্ষ্ম জিনিস বা পানির উপস্থিতি টের পাওয়ার ক্ষেত্রে এদের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

জীববিজ্ঞানের চোখে হুদহুদ পাখি

প্রাকৃতিক জগতেরও এক অদ্ভুত সুন্দর ও বুদ্ধিমান পাখি হুদহুদ। ইংরেজিতে একে বলা হয় হুপো (Hoopoe) এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম ইউপুপা এপপ্স (Upupa epops)। পাখিটির বিশেষ ডাকের শব্দ ‘হুপ-হুপ’ বা ‘হুদ-হুদ’ অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। (এডওয়ার্ড উইলিয়াম লেন, অ্যারাবিক-ইংলিশ লেক্সিকন, ৮/২৮৮৯, উইলিয়ামস অ্যান্ড নার্গেট, লন্ডন, ১৮৬৩)

আরবি অভিধানে লেখা হয়েছে, এটি মাথায় ঝুঁটি থাকা একটি বিশেষ পরিচিত পাখি, যা ‘হুপ-হুপ’ শব্দ করে ডাকে এবং ভূগর্ভস্থ পানির গভীরতা অনুভব করতে পারে। (ইবনে মানজুর, লিসানুল আরব, ৩/৩৫০, দার সাদির, বৈরুত, ১৯৯০)

মাথায় আকর্ষণীয় পাখার মতো ঝুঁটি থাকায় বাংলায় একে বলে মোহনচূড়া পাখি। পাখিটি মূলত এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকার ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে।

হুদহুদ অত্যন্ত দূরদর্শী এবং মাটির তলদেশের সূক্ষ্ম জিনিস বা পানির উপস্থিতি টের পাওয়ার ক্ষেত্রে এদের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

মাথায় আকর্ষণীয় পাখার মতো ঝুঁটি থাকায় বাংলায় একে বলে মোহনচূড়া

নবী সোলাইমানের যুগে হুদহুদ

আল্লাহ–তাআলা নবী সোলাইমানকে অতুলনীয় এক বাদশাহি দান করেছিলেন। তৎকালীন সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অঞ্চল শাসনকারী এই মহান নবীর সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছিল মানুষ, জিন এবং পাখিকুল নিয়ে।

আকাশে দ্রুত উড়তে পারা এবং দূর-দূরান্তের খবর এনে দেওয়ার ক্ষমতার কারণে পাখিদের মূলত সংবাদ আদান-প্রদান, বার্তা বহন ও বিশেষ নজরদারির কাজে ব্যবহার করা হতো। (আল-কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৩/১৭৫-১৮২, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ২০০২)

একদিন সোলাইমান (আ.) তাঁর অধীনস্থ পাখিকুলকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, হুদহুদ পাখিটি তার নির্দিষ্ট স্থানে নেই। তিনি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন, “কী ব্যাপার, আমি হুদহুদকে দেখছি না কেন? নাকি সে অনুপস্থিত?” (সুরা নামল, আয়াত: ২০)

একজন সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল শাসক হিসেবে সোলাইমান (আ.) অসন্তোষ প্রকাশ করলেন এবং বললেন, উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য কারণ দর্শাতে না পারলে এই অনুপস্থিতির জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।

হুদহুদ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সাবা রাজ্যের অবস্থা বর্ণনা করল। সে জানাল, সাবা অঞ্চলে ‘বিলকিস’ নামের এক নারী বিপুল ধন-সম্পদ ও জাঁকজমকপূর্ণ সিংহাসন নিয়ে রাজত্ব করছেন

সাবা রাজ্যের সংবাদ

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই হুদহুদ পাখি উপস্থিত হলো। সে কোনো ভয় না পেয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, “আমি এমন একটি বিষয় অবগত হয়েছি যা আপনি জানেন না। আমি ইয়েমেনের ‘সাবা’ রাজ্য থেকে আপনার জন্য একটি নিশ্চিত ও সত্য সংবাদ নিয়ে এসেছি।” (সুরা নামল, আয়াত: ২২)

হুদহুদ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সাবা রাজ্যের অবস্থা বর্ণনা করল। সে জানাল, সাবা অঞ্চলে ‘বিলকিস’ নামের এক নারী বিপুল ধন-সম্পদ ও জাঁকজমকপূর্ণ সিংহাসন নিয়ে রাজত্ব করছেন। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, সেই নারী ও তাঁর প্রজারা এক অদ্বিতীয় মহান আল্লাহকে বাদ দিয়ে সূর্যের পূজা করছে।

সে অনুযোগ করে বলল, শয়তান তাদের এই বিভ্রান্তিকর কাজকে সুন্দর করে দেখিয়েছে, ফলে তারা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে (সুরা নামল, আয়াত: ২৪)।

সোলাইমান (আ.) হুদহুদের কথার যথার্থতা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বললেন, “আমরা এখন দেখব তুমি সত্য বলছ না মিথ্যা বলছ।” (সুরা নামল, আয়াত: ২৭)

তিনি একটি পত্র লিখে হুদহুদের হাতে দিলেন এবং তা সাবা রাজ্যের রানির প্রাসাদে পৌঁছে দিয়ে আড়ালে থেকে তাদের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ দিলেন। (সুরা নামল, আয়াত: ২৮)

এভাবে একটি ছোট পাখির মাধ্যমেই পুরো সাবা রাজ্য সত্যের পথ খুঁজে পাওয়ার সুযোগ লাভ করে।

এই পাখি ‘হুপ-হুপ’ শব্দ করে ডাকে এবং ভূগর্ভস্থ পানির গভীরতা অনুভব করতে পারে

হুদহুদ কি সত্যি পাখি ছিল

কোরআনের এই ঘটনা পাঠ করে আধুনিক যুগের কিছু ব্যাখ্যাকার দাবি করার চেষ্টা করেছেন যে, ‘হুদহুদ’ কোনো পাখির নাম নয়, বরং নবী সোলাইমানের কোনো মানুষ গোয়েন্দার উপাধি ছিল। কেননা, একটি সাধারণ পাখির পক্ষে রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনুধাবন করা, নারীর শাসন চিহ্নিত করা কিংবা একত্ববাদের মতো গভীর ধর্মীয় দর্শন বোঝার কথা নয়।

তবে আলেমগণ এই যুক্তি খারিজ করে দিয়েছেন। (মুফতি মুহাম্মদ শফি, মাআরিফুল কুরআন, ৬/৫৬২-৫৭০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০১৩)

প্রথমত, মহান আল্লাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি নবী সোলাইমানকে পশুপাখির ভাষা ও অনুভূতি বোঝার বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা দান করেছিলেন (সুরা নামল, আয়াত: ১৬)।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক জীববিজ্ঞান ও প্রাণিবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে মানুষের বাইরে অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যেও প্রখর বুদ্ধিমত্তা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং যোগাযোগের জটিল ব্যবস্থা রয়েছে। (জেনিফার আকিয়ারম্যান, দ্য জিনিয়াস অব বার্ডস, পৃষ্ঠা ৪৫-৮০, পেঙ্গুইন প্রেস, নিউ ইয়র্ক, ২০১৬)

হোয়েন এলিফ্যান্টস উইপ–এর মতো গবেষণামূলক বই–পুস্তকে কুকুর, হাতি, পিঁপড়া কিংবা পাখিদের অসাধারণ বিচারবুদ্ধি, চিন্তা ও অনুভূতির নানা প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। (জেফ্রি মুসাইয়েফ মাসন ও সুসান ম্যাককার্থি, হোয়েন এলিফ্যান্টস উইপ: দ্য ইমোশনাল লাইভস অব অ্যানিম্যালস, পৃষ্ঠা ৭২-৯৮, ডেল পাবলিশিং, নিউ ইয়র্ক, ১৯৯৫)

সুতরাং, সৃষ্টিকর্তা যে পাখিকে বিশেষ প্রজ্ঞা দিয়েছেন, সে পাখি অন্য দেশের রাজত্ব বা ধর্ম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে—তা অবিশ্বাসের কোনো সুযোগ নেই।

নবী সোলাইমানের মতো শক্তিশালী বাদশাহও একটি ছোট পাখির যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য শুনেছেন এবং নিরপেক্ষভাবে তা পরীক্ষা করেছেন। এটি আমাদের শাসক ও সুশীলদের বিনয়ী ও দায়িত্বশীল হতে শেখায়। 

পাখির ঘটনা থেকে শিক্ষা

হুদহুদ পাখির এই বিস্ময়কর ঘটনা থেকে আমরা বেশ দুটো মহৎ শিক্ষা লাভ করতে পারি।

প্রথমত, সত্য ও জ্ঞানের সন্ধান যেকোনো স্থান বা মাধ্যমের কাছ থেকে গ্রহণ করা যায়; সেখানে মাধ্যমের আকারের চেয়ে বার্তার সত্যতাই মুখ্য।

দ্বিতীয়ত, নবী সোলাইমানের মতো শক্তিশালী বাদশাহও একটি ছোট পাখির যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য শুনেছেন এবং নিরপেক্ষভাবে তা পরীক্ষা করেছেন। এটি আমাদের শাসক ও সুশীলদের বিনয়ী ও দায়িত্বশীল হতে শেখায়। 

পরিশেষে, হুদহুদের এই গল্প প্রমাণ করে যে আল্লাহর সৃষ্টির প্রতিটি উপাদান, তা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন—নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও অসীম প্রজ্ঞা নিয়ে এই ধরণীতে বেঁচে থাকে।

About Editor Todaynews24

Check Also

ঢেউয়ের ধাক্কায় সরে যাচ্ছে সিসি ব্লক, ঝুঁকিতে দেড় শ কোটি টাকার সড়ক

ঢেউয়ের ধাক্কায় সরে যাচ্ছে সিসি ব্লক, ঝুঁকিতে দেড় শ কোটি টাকার সড়ক

বেড়িবাঁধ রক্ষার জন্য পশ্চিম অংশে বাঁধের ঢালুতে সিসি ব্লক বসানো হয়েছিল। এখন সিসি ব্লকের নিচের মাটি ধসে গিয়ে ব্লকগুলো সরে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *