চলতি বছরের গ্রীষ্ম মৌসুমে উত্তর গোলার্ধের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেশির ভাগ অঞ্চলে বইছে তীব্র তাপপ্রবাহ। আর তাতেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন গরম পড়ার রেকর্ড। কিন্তু ঠিক একই সময়ে পৃথিবীর একেবারে দক্ষিণে, অর্থাৎ দক্ষিণ গোলার্ধের বরফে ঢাকা মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকায় দেখা যাচ্ছে ঠিক উল্টো। সেখানে তাপমাত্রা নেমে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক নতুন সর্বনিম্ন রেকর্ডের।
১৮ জুলাই অ্যান্টার্কটিকার কনকর্ডিয়া গবেষণাকেন্দ্রের তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ১১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা দ্য ওয়েদার চ্যানেলের তথ্যমতে, ২০১২ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত পুরো পৃথিবীতে রেকর্ড করা তাপমাত্রার মধ্যে এটিই সবচেয়ে কম। এমনকি কনকর্ডিয়া গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেখানকার নিজস্ব সর্বকালের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার যে রেকর্ড রয়েছে, ১৮ জুলাইয়ের তাপমাত্রা তার চেয়ে মাত্র আধা ডিগ্রি দূরে ছিল।
আমেরিকার সল্ট লেক সিটিতে ১২ জুলাই তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৭৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১০৯ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছায়, যা শহরটির ইতিহাসের সবচেয়ে গরম দিন ছিল। উত্তর গোলার্ধে যখন এমন গরম পড়ছে, ঠিক তখনই অ্যান্টার্কটিকায় চলছে কনকনে শীত।
কনকর্ডিয়া স্টেশনটি ভৌগোলিকভাবেই তীব্র ঠান্ডার জন্য উপযুক্ত এক জায়গায় তৈরি। কনকর্ডিয়া স্টেশনটি অ্যান্টার্কটিকায় অবস্থিত একটি বিশ্বখ্যাত ফরাসি-ইতালীয় যৌথ বিজ্ঞান ও গবেষণা কেন্দ্র। বরফের বিশাল স্তরের ওপর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুটেরও বেশি উঁচুতে এটি অবস্থিত। সেখানকার বাতাস খুব পাতলা এবং অত্যন্ত শুষ্ক। বাতাসে আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্প না থাকায় সূর্য বা পরিবেশের সামান্য তাপটুকুও তা ধরে রাখতে পারে না, ফলে চারপাশ দ্রুত হিমশীতল হয়ে পড়ে।
মাইনাস ১১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস শুনলেই তো শীত লাগার কথা। কেননা আমাদের দেশে শীতকালে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। আর সেখানে মাইনাস ১১৯। বোঝাই যাচ্ছে কত ঠান্ডা। তবে এটি কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে কম তাপমাত্রা নয়। আজ থেকে বহু বছর আগে, ১৯৮৩ সালের ২১ জুলাই অ্যান্টার্কটিকায় অবস্থিত রাশিয়ার ভস্তক গবেষণা কেন্দ্রে তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল মাইনাস ১২৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এটিই এখন পর্যন্ত পুরো পৃথিবীতে রেকর্ড করা সর্বকালের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।
চলতি মাসের শুরুর দিকে আমেরিকার ডেথ ভ্যালির তাপমাত্রা পৌঁছায় ১২১ ডিগ্রি ফারেনহাইটে। অর্থাৎ একই মাসের মধ্যে পৃথিবীর দুই প্রান্তের তাপমাত্রার পার্থক্য ছিল প্রায় ২৪০ ডিগ্রি। ন্যাশনাল সেন্টারস ফর এনভায়রনমেন্টাল ইনফরমেশনের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১৯১৩ সালের ১০ জুলাই। সেদিন এই ডেথ ভ্যালির তাপমাত্রাই পৌঁছেছিল ১৩৪ ডিগ্রিতে।
দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত হওয়ায় অ্যান্টার্কটিকায় যখন শীতকাল চলে, তখন সেখানে শুরু হয় মেরু রাত্রি। মানে টানা কয়েক মাস ধরে আকাশে সূর্য ওঠে না এবং পুরো মহাদেশটি সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢাকা থাকে। রোদ না থাকায় পরিবেশ ক্রমাগত তাপ হারাতে থাকে এবং চারপাশ তীব্র হিমশীতল হয়ে পড়ে। যেহেতু অ্যান্টার্কটিকায় শীত মৌসুম এখনো শেষ হয়নি, তাই সামনের দিনগুলোতে এখানকার আবহাওয়া আরও চরম রূপ নিতে পারে।
সাধারণত আগস্টের শেষ দিকে, দীর্ঘ অন্ধকারের পর সূর্য ওঠার ঠিক আগের সময়টাতে সেখানকার তাপমাত্রা সবচেয়ে নিচে নেমে যায়। এ কারণেই আবহাওয়াবিদেরা ধারণা করছেন, অ্যান্টার্কটিকার তাপমাত্রা সামনে আরও কমে নতুন রেকর্ড তৈরি করতে পারে।