সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / ‘আমার বাবারে একটু আমার কোলে দাও’
‘আমার বাবারে একটু আমার কোলে দাও’

‘আমার বাবারে একটু আমার কোলে দাও’

বেলা ঠিক ১১টা। খুলনা নগরের হাদিস পার্ক–সংলগ্ন মান্নান চটপটির গলির শেষ মাথার ছয়তলা বাড়িটির নিচের গ্যারেজের সামনে তখন অনেক মানুষ। স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিতজন সবার চোখ রাস্তার দিকে। অপেক্ষা একটি গাড়ির জন্য। লাশবাহী ফ্রিজার গাড়িটি এসে থামল। ভেতরে ৩০ বছর বয়সী অক্ষর শৌভিক রায়ের নিথর দেহ। কিছুক্ষণ পর পেছনের ডালা খোলা হলো। সঙ্গে সঙ্গে বুকফাটা কান্নার আওয়াজ।

একটু আগেও বাড়িটির সামনে ছিল নিস্তব্ধ অপেক্ষা। লাশ আসার পর সেই অপেক্ষা পরিণত হলো আহাজারিতে। কারও চোখে পানি, কেউ নির্বাক। মা শুক্লা রায় বারবার আহাজারি করছিলেন, ‘আমার অক্ষররে একটু আমার কোলে দাও… আমার বাবারে একটু আমার কোলে দাও…।’

স্বজনেরা শুক্লাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাঁর কান্না থামছিল না। ছেলের নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে বারবার শুধু বলছিলেন, ‘আমার অক্ষররে একটু আমার কোলে দাও…।’ পাশেই ছোট বোন শীর্ষা রায়। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘ও দাদা ভাই, আমার সোনা দাদার কী হলো।’

এই বাড়ির চারতলার ভাড়া ফ্ল্যাটে থাকতেন অক্ষররা। তিন ভাই–বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। বড় বোন মেধা মৃত্তিকা রায়ের বিয়ে হয়েছে, তিনি ঢাকায় থাকেন। মা, ছোট বোন, দাদু ও দিদিমা খুলনার এই বাসায় থাকতেন। অক্ষরের বাবা শেখর রায় মারা যান করোনার সময়। এরপর নানা জটিলতায় নিজেদের বাড়ি ছেড়ে উঠতে হয় এই ভাড়া ফ্ল্যাটে। পরিবারের দায়িত্ব অনেকটাই এসে পড়ে অক্ষরের কাঁধে।

অক্ষরের চাচা–সম্পর্কীয় স্বজন অপু সিংহ বলেন, অক্ষর খুব ভালো ছাত্র ছিল। খুলনা জিলা স্কুলে পড়েছে। এরপর নটর ডেম কলেজ। পরে ভারতের গুজরাট থেকে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে কয়েক বছর আগে দেশে আসে। এরপর পরিবারের হাল ধরে। খুব ভালো ছেলে ছিল ও।

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং ছিটকে পড়ে মৃত্যু হয় পর্যটক অক্ষর শৌভিক রায়ের । মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে প্যারাসেইলিংয়ে ওঠার মুহূর্তে ক্যামেরাবন্দী হন তিনি। গত শনিবার দুপুরে তোলা

বিয়ে করেননি অক্ষর। নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ঢাকার বনানীতে স্টাডি সলিউশন লিমিটেড নামের একটি শিক্ষা ও মাইগ্রেশন কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতেন। তিন বছর আগে সেখানে যোগ দিয়েছিলেন। অপু সিংহ বলেন, অক্ষর ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। তাঁর চলে যাওয়ায় পরিবারটা দিশেহারা হয়ে গেল।

কক্সবাজার যাওয়ার আগে কিংবা সেখানে পৌঁছানোর পর অক্ষরের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কথা হয়েছিল। প্যারাসেইলিংয়ে ওঠার সময়ও তাঁকে নিষেধ করেছিলেন বড় বোন মেধা মৃত্তিকা রায়। তাঁর স্বামী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বারবার মেধা ওকে নিষেধ করেছিল, উঠিস না। এর আগে আমার সঙ্গেও কথা হয়েছিল। আমরা একসময় একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি।’

কিন্তু অক্ষর উঠেছিলেন প্যারাসেইলিংয়ে। সমুদ্রের ওপর আকাশে ওড়ার সেই কয়েক মিনিটই যে তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত হয়ে যাবে, তা তখন কেউ বুঝতে পারেনি। যে সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলেন বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে, সেই সমুদ্রই তাঁকে ফিরিয়ে দিল নিথর করে।

গত শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর সৈকতে এই দুর্ঘটনা ঘটে। অক্ষরসহ ৯ জন বন্ধু ও সহকর্মী কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলেন। দরিয়ানগর সৈকতে গিয়ে ২ হাজার টাকা দিয়ে প্যারাসেইলিংয়ের টিকিট কাটেন অক্ষর। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁকে প্যারাসেইলিংয়ের সরঞ্জামে বেঁধে আকাশে ওড়ানো হয়। প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট ওপরে ওঠার পর হঠাৎ তিনি ছিটকে বঙ্গোপসাগরে পড়ে যান। পরে তাঁকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

অক্ষরের পরিবারের বেদনার পাশাপাশি ক্ষোভও আছে। তাঁদের প্রশ্ন, এমন দুর্ঘটনা কেন ঘটল এবং এটি ঠেকানোর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কোথায় ছিলেন? ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, দড়ি ছিঁড়ে অক্ষর পড়ে গেছে। সেখানে কোনো উদ্ধারকর্মী ছিল না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন এলাকায় এমন অরাজকতা কীভাবে থাকে?

প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে সাগরে পড়ে যান পর্যক শৌভিক রায়

পরিবারটির অভিযোগ, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং চলছিল। সেটা অবৈধ ছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে। অক্ষরের লাশ খুলনায় ফিরিয়ে আনতেও কম ভোগান্তি হয়নি বলে অভিযোগ স্বজনদের। তাঁদের ভাষ্য, থানা-পুলিশের নানা রকম অসহযোগিতা ছিল।

শোকের মধ্যেও পরিবারের কথায় বারবার ফিরে আসছে নিরাপদ পর্যটনের বিষয়টিও। অক্ষরের ভগ্নিপতি বলেন, ‘আমাদের ভাই চলে গেছে। এখন সামনে যাঁরা কক্সবাজারে পর্যটনের জন্য যাবেন, তাঁরা যেন সুস্থ থাকতে পারেন—সেটাই আমাদের চাওয়া-পাওয়া। আর আমরা দাবি করছি, অক্ষরের পরিবার যেন ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পায়। সন্তান হারানোর ক্ষতি কোনো দিন পূরণ হবে না। তারপরও অন্তত তাঁর মা যেন ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পান।’

দুপুর পৌনে ১২টা। লাশবাহী গাড়িটি আবার প্রস্তুত। এবার গন্তব্য রূপসা মহাশ্মশান। কিছুক্ষণ আগেও যে বাড়ির সামনে মা ছেলেকে একবার কোলে নেওয়ার আকুতি জানাচ্ছিলেন, সেই বাড়ি থেকেই এবার অক্ষরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শেষবিদায়ের জন্য। গাড়ি ধীরে ধীরে গলির ভেতর থেকে বেরিয়ে যায়। গাড়িটি চোখের আড়াল হয়ে যাওয়ার পরও বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বজনেরা। ভেতর থেকে ভেসে আসছিল কান্নার শব্দ।

About Editor Todaynews24

Check Also

ঢেউয়ের ধাক্কায় সরে যাচ্ছে সিসি ব্লক, ঝুঁকিতে দেড় শ কোটি টাকার সড়ক

ঢেউয়ের ধাক্কায় সরে যাচ্ছে সিসি ব্লক, ঝুঁকিতে দেড় শ কোটি টাকার সড়ক

বেড়িবাঁধ রক্ষার জন্য পশ্চিম অংশে বাঁধের ঢালুতে সিসি ব্লক বসানো হয়েছিল। এখন সিসি ব্লকের নিচের মাটি ধসে গিয়ে ব্লকগুলো সরে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *