ইন্টারনেটে নানা বিষয় নিয়ে গুঞ্জন তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি রিলস বেশ ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে অ্যান্টার্কটিকাতেও নাকি মিসরের মতো পিরামিড রয়েছে।
তবে এই গুঞ্জনের শুরু ২০১৬ সালে। সে বছর স্যাটেলাইট ছবিতে বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকায় পিরামিডের মতো আকৃতির একটি পাহাড় দেখা যায়। মহাকাশ থেকেও পাহাড়টি স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল। ছবিগুলো ইন্টারনেটে আসার পর থেকেই মানুষ এটি নিয়ে নানা কল্পকাহিনি তৈরি করতে শুরু করে।
অনেকে ভাবতে শুরু করেন, বরফে ঢাকা এই দুর্গম অঞ্চলে কি তবে হাজার বছর আগে কোনো প্রাচীন সভ্যতা গড়ে উঠেছিল? কেউ কেউ আবার এক ধাপ এগিয়ে দাবি করে বসেন, এটি নিশ্চয়ই ভিনগ্রহের প্রাণী বা এলিয়েনদের কাজ।
কিন্তু অ্যান্টার্কটিকায় পিরামিডের মতো দেখতে পাহাড়টি আসলে কী?

ভিনগ্রহের প্রাণীরা কি সত্যি অ্যান্টার্কটিকায় পিরামিড বানিয়েছিল
অ্যান্টার্কটিকার বরফে ঢাকা এই পর্বতটি ওপর থেকে দেখলে ঠিক প্রাচীন মিসরের পিরামিডের মতোই মনে হয়। তবে এই আকৃতি তৈরির পেছনে মানুষ বা কোনো এলিয়েনের হাত নেই। মূলত বহু বছর ধরে বরফ জমে যাওয়া, গলে যাওয়া এবং বাতাসের কারণে পাথর ক্ষয়ে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মেই এই পাহাড়ে এমন পিরামিড রূপ এসেছে।
পিরামিডের মতো দেখতে হলেও এই পাহাড়টির কোনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক নাম নেই। ২০১৬ সালের এই ছবি ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়ার পর এটি পরিচিতি পায়। তবে আমেরিকার নিকোলস কলেজের পরিবেশবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাউরি পেল্টো জানান, সাধারণ মানুষ জানার অনেক আগেই বিজ্ঞানীরা এই পাহাড়ের বিষয়ে জানতেন। কারণ, পাহাড়টির ঠিক দক্ষিণেই ‘প্যাট্রিয়ট হিলস’ নামে একটি গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে, যেখান থেকে জলবায়ুবিজ্ঞানীরা নিয়মিত কাজ করেন এবং সেখান থেকেই এই পর্বতটি স্পষ্ট দেখা যায়।
তবে এই বিশেষ পাহাড়টি দক্ষিণ এলসওয়ার্থ পর্বতশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ‘হেরিটেজ রেঞ্জ’-এর একটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানচালক লিংকন এলসওয়ার্থের নামে এই পর্বতশ্রেণি পরিচিত। অ্যান্টার্কটিকার এই পিরামিড পর্বতটির উচ্চতা প্রায় ৪ হাজার ১৫০ ফুট (১ হাজার ২৬৫ মিটার)। উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে উঁচু পর্বত ডেনালির সঙ্গে তুলনা করলে, এটি ডেনালির উচ্চতার প্রায় ৫ ভাগের ১ ভাগ। দক্ষিণ এলসওয়ার্থ পর্বতমালায় অবস্থিত পাহাড়টির চারটি দিকই বেশ খাড়া।
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের ২০০৭ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই পর্বতমালায় এ রকম অনেকগুলো খাঁজকাটা চূড়া রয়েছে। ১৯৩৫ সালে বিমানে উড়ে যাওয়ার সময় আমেরিকান বৈমানিক লিংকন এলসওয়ার্থ প্রথম এটি দেখতে পেয়েছিলেন।
ভূতাত্ত্বিক দিক থেকেও অঞ্চলটি বেশ প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৫০ কোটি বছর আগের ক্যামব্রিয়ান যুগের ট্রাইলোবাইটসহ নানা প্রাচীন জীবের জীবাশ্ম বা ফসিল পাওয়া গেছে এই পাহাড়ি এলাকায়।
আরও ৩টি পিরামিড আকৃতির পর্বত
অ্যান্টার্কটিকার মতো পৃথিবীর আরও কিছু স্থানে পিরামিড আকৃতির পাহাড় দেখতে পাওয়া যায়। তবে এগুলো কোনোটিই লাখ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে ভেঙে পড়া ভিনগ্রহের যান বা এলিয়েনদের তৈরি কাঠামো নয়। বরং সবই প্রকৃতির নিজস্ব সৃষ্টি।

১. পেরুর আলপামায়ো
পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার ‘কর্ডিলেরা ব্লাঙ্কা’ পর্বতশ্রেণির সৌন্দর্য সত্যিই অনন্য। এটি ওই অঞ্চলের সর্বোচ্চ পর্বত না হলেও প্রায় ২০ হাজার ফুট (৬ হাজার ১০০ মিটার) উঁচু এই পাহাড়চূড়াটিতে বরফের এমন এক কৌণিক আকৃতি তৈরি হয়েছে, যা মিসরের গিজা পিরামিডের মতো দেখায়।
২. যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো পিরামিড পর্বত
অ্যান্টার্কটিকার পাহাড়টির মতোই প্রাকৃতিকভাবে পর্বতটি পিরামিডের মতো আকৃতি পেয়েছে। তবে এটা তৈরিতে কাজ করেছে বরফ আর আগুন। হাজার হাজার বছর আগে একটি বিশাল বরফের স্তূপের নিচে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছিল। বরফ ও লাভার সেই পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলেই প্রাকৃতিকভাবে এই বিশেষ পাহাড়টি তৈরি হয়।

৩. বুলগেরিয়ার পিরিন পর্বত
এই পর্বতমালায় ইউরোপের দক্ষিণ অঞ্চলের কয়েকটি হিমবাহ অবস্থিত। এখানেও বরফ জমাট বাঁধা ও গলে যাওয়ার কারণে প্রাকৃতিকভাবে পাহাড় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। যার ফলে চূড়াগুলো পিরামিডের মতো কোনাকুনি আকৃতি ধারণ করেছে।