সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / সুন্দর ব্যক্তিত্ব গড়তে মুমিনের ৯ অভ্যাস
সুন্দর ব্যক্তিত্ব গড়তে মুমিনের ৯ অভ্যাস

সুন্দর ব্যক্তিত্ব গড়তে মুমিনের ৯ অভ্যাস

ছোট ছোট ভালো অভ্যাসের ধারাবাহিক চর্চাই একজন মানুষকে ধীরে ধীরে অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী করে তোলে। ইসলাম মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে চরিত্র ও আমলের সৌন্দর্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

রাসুল (সা.) ছিলেন মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, আর তাঁর মহান চরিত্রই ছিল মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার প্রধান কারণ।

এমন ৯টি অভ্যাসের কথা তুলে ধরা হলো, যা মানুষকে সুন্দর ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে সহায়তা করে।

১. সততাকে জীবনের মূলনীতি বানানো

মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার বিশ্বাসযোগ্যতা। আর বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি হলো সত্যবাদিতা। যে সত্য কথা বলে, কথা ও কাজে সততার পরিচয় দেয়, সে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে। মিথ্যাবাদী সাময়িকভাবে অন্যকে ধোঁকা দিতে পারলেও সময়ের সঙ্গে তার আসল রূপ ঠিকই প্রকাশ পায়।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে ইমানদাররা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তওবা, আয়াত : ১১৯)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘সত্য মানুষকে কল্যাণের পথে নিয়ে যায়, আর কল্যাণ পৌঁছে দেয় জান্নাতে। মানুষ যখন সত্যকে জীবনের অভ্যাসে পরিণত করে, তখন আল্লাহর কাছে সে “সিদ্দিক” বা পরম সত্যবাদী হিসেবে মর্যাদা লাভ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৯৪)

তাই আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব গড়তে হলে সত্যবাদিতাকে অভ্যাসে পরিণত করার কোনো বিকল্প নেই।

২. সময়ানুবর্তিতা

সময় পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। অর্থ হারালে তা আবার উপার্জন করা যায়, কিন্তু চলে যাওয়া একটি মুহূর্ত কখনো ফিরে আসে না। যে মানুষ সময়কে সম্মান করতে জানে, সবাই তাকে দায়িত্বশীল ও পরিণত মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে।

সময়ের সঠিক ব্যবহার ও প্রতিটি কাজ নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করার অভ্যাসই একজন মানুষকে সময়ানুবর্তী ও কর্মঠ করে তোলে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত হয়—সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)

৩. প্রতিশ্রুতি রক্ষার অভ্যাস

প্রতিশ্রুতি রক্ষা একজন মানুষের নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে। যারা কথা দিয়ে কথা রাখে, তারা পরিবার ও সমাজে সমানভাবে সম্মান পায়। প্রতিশ্রুতি পূরণের এই অভ্যাস মানুষের ব্যক্তিত্বকে নির্ভরযোগ্য করে তোলে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৪)

রাসুল (সা.) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাকে মোনাফেকের অন্যতম লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩)

রাগের বশে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত পরে অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই বুদ্ধিমান মানুষ আবেগ নয়, বিবেককে অনুসরণ করে। আত্মসংযম মানুষকে মর্যাদাবান করে এবং অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

৪. সুন্দর ব্যবহার

মানুষের হৃদয় জয় করতে সবচেয়ে বেশি দরকার হয় সুন্দর ব্যবহারের। ভদ্র আচরণ কঠিন হৃদয়কেও নরম করতে পারে, আর অহংকার মানুষকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সুন্দর আচরণ মানুষের ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল পরিচয়।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং কেয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী আসনে থাকবে তারা, যাদের চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০১৮)

৫. জ্ঞানচর্চার অভ্যাস

বই পড়া, পঠিত বিষয় নিয়ে ভাবা, অভিজ্ঞদের কাছ থেকে শেখা ও নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া—এসবই একজন মানুষের ব্যক্তিত্বকে পরিণত করে। যে শেখা বন্ধ করে দেয়, তার ব্যক্তিত্বের বিকাশও একসময় থেমে যায়।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৯)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ–তাআলা তার জন্য বেহেশতের পথ সহজ করে দেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)

৬. আত্মসংযম ও রাগ নিয়ন্ত্রণ

রাগের বশে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত পরে অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই বুদ্ধিমান মানুষ আবেগ নয়, বিবেককে অনুসরণ করে। আত্মসংযম মানুষকে মর্যাদাবান করে এবং অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

আল্লাহ–তাআলা মুত্তাকিদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘(মুত্তাকি তারা) যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)

৭. কৃতজ্ঞতা ও ক্ষমাশীলতা

যে আল্লাহর নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকে এবং মানুষের ছোটখাটো ভুল ক্ষমা করতে শেখে, তার ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়। কৃতজ্ঞতা মানুষকে বিনয়ী করে, আর ক্ষমাশীলতা তাকে মহান করে তোলে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)

৮. ইতিবাচক মানসিকতা

আশাবাদী মানুষ ব্যর্থতাকে নতুন শিক্ষার সূচনা মনে করে। অভিযোগে সময় নষ্ট না করে সমাধানের পথ খোঁজে। এমন মানসিকতা আশপাশের মানুষকেও অনুপ্রাণিত করে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করেন।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘মুমিনের ব্যাপারটাই আশ্চর্যজনক। তার প্রতিটি কাজেই তার জন্য কল্যাণ রয়েছে, যা মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্য নেই। সচ্ছলতা এলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তাতে তার কল্যাণ হয়, আর বিপদ এলে সে ধৈর্য ধারণ করে, তাতেও তার কল্যাণ হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)

৯. প্রতিদিন আত্মোন্নয়নের চেষ্টা

ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কাছ থেকে হিসাব নেওয়ার আগে তোমরা নিজেদের হিসাব নাও এবং তোমাদের আমল ওজন করার আগে নিজেদের আমল ওজন করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯-এর অধীনে বর্ণিত)

ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত ব্যক্তিত্বের মানদণ্ড হলো তাকওয়া, উত্তম চরিত্র ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত জীবন। তাই বাহ্যিক চাকচিক্যের পরিবর্তে যদি আমরা পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে নিজেদের অভ্যাস গড়ে তুলি, তবে শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যায়।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ

About Editor Todaynews24

Check Also

চুলায় নাই আগুন কোথায় ভাজি বেগুন?

চুলায় নাই আগুন কোথায় ভাজি বেগুন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *