সচরাচর ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরই আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে বেশি খবর তৈরি করে থাকে। সম্প্রতি মনোযোগ কাড়ছে পাকিস্তানের অধীনে থাকা কাশ্মীরের অপরাংশ। ‘আজাদ কাশ্মীর’ নামে উল্লিখিত এই অংশে এ সপ্তাহে নির্বাচন শুরু হয়েছে। সেটা হচ্ছে কারফিউতুল্য পরিবেশে। অনেক জায়গায় গোলাগুলি চলছিল নির্বাচনকালে। এ সময় জনসমাজের অবস্থা ছিল বাংলাদেশের হরতালের মতো। সরকার ইন্টারনেট বন্ধ রাখায় প্রথম দিনের নির্বাচনে হতাহতের নির্ভরযোগ্য খবর মিলছিল না। তবে সব পক্ষ সহিংসতার কথা স্বীকার করছে।
আজাদ কাশ্মীরের বর্তমান লোকসংখ্যা ৪০ লাখের মতো। একদা ‘আজাদ’ (মুক্ত) হতে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়, সেই সূত্রেই ওই নাম। ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু–কাশ্মীরের চেয়ে অনেক ছোট এলাকা এটা। খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার আগে এই উভয় অংশের সঙ্গে গিলগিট ও লাদাখও ছিল। সেটা বিবেচনায় নিলে আজাদ কাশ্মীরের আয়তনের হিসাব ভিন্ন দাঁড়ায়। তবে ভাগ-বাঁটোয়ারাকারীরা কাশ্মীরের কোনো দিকেই যে শান্তি দিতে পারেনি, তার সর্বশেষ নজির আজাদ কাশ্মীরের অবস্থা।
এখানকার শাসনব্যবস্থা কাগজে–কলমে বেশ মুক্ত ধাঁচের। সাংবিধানিকভাবে স্বায়ত্তশাসন রয়েছে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে রাজস্বব্যবস্থাও আলাদা। কিন্তু তার ভেতর বেশ ফাঁকিজুকি আছে। এই নিয়েই গত দুই–তিন বছর বেশ অসন্তোষ চলছে। তার মাঝেই ভোট চলছে এবং সহিংসতাও।
নিজস্ব প্রতিনিধি পরিষদ থাকলেও আজাদ কাশ্মীরের অর্থনৈতিক ও ভূসম্পদ বিষয়ে ‘সুপারিশ করে’ আজাদ কাশ্মীর কাউন্সিল নামের সংস্থা। এর দপ্তর ইসলামাবাদে। এর চেয়ারম্যান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। ১৪ সদস্যের এই পরিষদের ৫ জনকেই মনোনয়ন দেন চেয়ারম্যান। বাকি ব্যক্তিরা স্থানীয় প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হয়ে থাকেন। সেই পরিষদের আসনসংখ্যা ৫৩। এর মাঝে ৮টি আসন নারীসহ কয়েক ক্যাটাগরির মানুষেদের জন্য সংরক্ষিত। নির্বাচনের মাধ্যমে পূরণযোগ্য বাকি আসনগুলোর আবার ১২টি ‘শরণার্থী’দের জন্য নির্দিষ্ট। শরণার্থী বলতে বোঝানো হচ্ছে যারা ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে গিয়ে পাকিস্তানে আছে।
এ রকম ভোটার আছে ১২ আসন মিলে ৫ লাখের কম। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তারা আজাদ কাশ্মীরের বাইরে, পাকিস্তানের অন্যান্য শহরেও। ফলে ওই ১২ আসনের বিন্যাস পাকিস্তানজুড়ে। এসব আসনের মধ্যে ৬টি রাখা হয়েছে কাশ্মীর থেকে আসাদের জন্য। বাকি ৬টি জম্মু থেকে আসাদের জন্য।
আজাদ কাশ্মীরের চলতি অবস্থা ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ নিয়ে পাকিস্তানের এত দিনকার রাজনৈতিক বয়ানের নৈতিক শক্তি বেশ কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে উভয় দিকের এখনকার প্রায় কাছাকাছি পরিস্থিতি কাশ্মীরে গণভোট আয়োজনের পুরোনো স্থানীয় দাবির ন্যায্যতাও সামনে নিয়ে আসছে। আসন্ন আগস্টে সেই দাবির ৭৮ বছর হচ্ছে।
প্রতিনিধি পরিষদের এ শেষোক্ত কোটাব্যবস্থা নিয়েই এ মুহূর্তে সহিংসতা চলছে। স্থানীয় লোকজন এর বিরুদ্ধে। এ নিয়ে কয়েক মাস ধরে প্রতিবাদ করছে ‘জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’। তাদের বক্তব্য, এতে প্রতিনিধি পরিষদে স্থানীয় মানুষদের হিস্যা কমে গেছে। বাস্তবে ৫৩ আসনের পরিষদে সরাসরি নির্বাচনের জন্য আসন থাকছে মাত্র ৩৩।
নথিপত্র অনুযায়ী কাশ্মীর থেকে আসা শরণার্থী ভোটার ৩০ হাজার এবং জম্মু থেকে আসা ভোটার ৪ লাখ ৩৪ হাজার। এই অল্পসংখ্যক মানুষ এখন আজাদ কাশ্মীর অ্যাসেম্বলির ১২টি আসনের সুবিধা ভোগ করছে। অ্যাকশন কমিটি মনে করে, এই আসনব্যবস্থা আসলে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার একটা কৌশল।
বাস্তবে এই ১২ আসনে যারা জেতে, তারা সরকার গঠনে এগিয়ে যায়। সচরাচর কেন্দ্রীয় পাকিস্তানের দলগুলোই ওই ১২ আসনে জয়ী হয়। যেমন এই ১২ আসনের ৯টি পাঞ্জাবভিত্তিক। ফলে সেখানকার প্রভাবশালী দলগুলো এই নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। যখন যে দল পাঞ্জাবে ও কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকে, তারা এসব আসন পায়। এমনকি বাকি আসনের বেলাতেও তাদেরই প্রভাব থাকে। ইসলামাবাদে যারা ক্ষমতায় আসে, আজাদ কাশ্মীরের রাজধানীতেও তারাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তিশালী হয়ে যায়।

২৭ জুলাই হয়ে যাওয়া প্রথম দফা ভোটেও পাঞ্জাবকেন্দ্রিক নওয়াজ শরিফদের মুসলিম লীগ ১৩টি আসনের মধ্যে ৯টি পাচ্ছে বলে জানা গেছে।
কোনো নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সরকারি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের বেলায় এবং আজাদ কাশ্মীরবিষয়ক নৈমিত্তিক নীতিনির্ধারণে শরণার্থী কোটার এমএলএদের বিশেষভাবে ব্যবহার করে। স্থানীয় অ্যাকশন কমিটির আপত্তির জায়গাটা এখানে। তারা পরিষদের এই আসনবিন্যাসকে দেখছে একধরনের সূক্ষ্ম ঔপনিবেশিক কাঠামো হিসেবে। পরিষদের এমএলএদের পাকিস্তান সরকার যে ব্যাপক আর্থিক সুবিধা দেয়, সেটা কমিয়ে সাধারণদের সুবিধা বাড়ানোরও দাবি রয়েছে তাদের।
অ্যাকশন কমিটি হলো কাশ্মীরের এই অংশের নাগরিক সমাজের একটা মোর্চা। ২০২৩ সালে এটা গড়ে ওঠে। আজাদ কাশ্মীরের এই আন্দোলনের সাংগঠনিক দিকের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান ও ভারতের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বেশ মিল আছে। কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে এই আন্দোলন হচ্ছে না। বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরা মিলে উল্লিখিত অ্যাকশন কমিটি গঠন করেছে।
এই জোট তৈরি হওয়া মাত্র এখানে আন্দোলন-সংগ্রাম অনেক বেড়ে গেছে। তবে গত জুনে সরকার অ্যাকশন কমিটিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। চলতি নির্বাচনেও অংশ নিতে দেওয়া হয়নি তাদের। এমনকি মোর্চার কেউ স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করতে পারছে না। এর নেতা শওকত নাওয়াজ মিরকেও আটক করা হয়েছে।
প্রতিবাদ আন্দোলনে কেবল এই জুন-জুলাইয়ে প্রায় ৪০ জন মারা গেছেন। নির্বাচনকালীন মৃত্যুর সঠিক হিসাব পাওয়া গেলে এই তালিকা আরও লম্বা হবে। সহিংসতা ও মৃত্যুই আজাদ কাশ্মীরের প্রতি বহির্বিশ্বের আগ্রহ বাড়ার কারণ। এটা এখন স্পষ্ট, শওকত মিরকে মুক্তি না দিলে পরিস্থিতি অস্থিতিশীলই থাকবে। আবার তাঁকে ছেড়ে দিলে সরকারকে আলোচনায় বসতে হবে। দুই মাস ধরে নিয়মিতই রাজধানী মুজাফফরাবাদে রাস্তাঘাট বন্ধ থাকছে।
প্রতিনিধি পরিষদের শরণার্থী কোটা বাতিলসহ অ্যাকশন কমিটির দাবিদাওয়া ৩৮ দফা। এর মাঝে দুই ধরনের দাবি আছে। কিছু চাওয়া অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা হিসেবে; কিছু প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য। যেমন তারা চায় বিদ্যুতের দাম কমানো হোক। যেহেতু এখানকার মিরপুরের ঝিলম নদীর জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী গিলগিটের মতোই কাশ্মীরের বাসিন্দারা ভর্তুকি দামে খাদ্যশস্যও চায়। দাবিদাওয়ার তালিকা থেকে কিছু কিছু মেনে নেওয়ার পরও বাস্তবায়ন করা হয়নি। সেসব ক্ষোভ জমে শেষমেশ এমএলএ-কোটার বিরুদ্ধে জনবিস্ফোরণ ঘটেছে।
কেন্দ্রীয় সরকার খুব কঠোরভাবে এই প্রতিবাদ দমন করছে। কড়া সেন্সরশিপ রয়েছে এখানে। ফলে আন্দোলনের খবরাখবর পাকিস্তানের অন্যান্য অংশের মানুষও কম জানছে। ইন্টারনেটও বন্ধ। শওকত মিরকে গ্রেপ্তারের আগে তিনি ও অ্যাকশন কমিটির অপর তিন নেতাকে ধরিয়ে দিতে এক কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। অনেক কাশ্মীরির কাছে এ রকম ঘোষণা বেশ অপমানকর ঠেকেছে।
২ আগস্ট মুজাফফরাবাদে এবং ১০ আগস্ট তৃতীয় দফায় ভোট হবে পুঞ্চ বিভাগে। গত কয়েক মাস পুঞ্চেই উত্তেজক বিক্ষোভ বেশি হচ্ছে। অনেকের ধারণা, পুঞ্চে কঠোর নিরাপত্তার মাঝে ভোট করতে হবে। আজাদ কাশ্মীরে পুঞ্চ হলো রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় এবং অর্থনৈতিকভাবে মিরপুরের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে। মিরপুর যতটা পাঞ্জাবমুখী, পুঞ্চ ততটাই উল্টো চরিত্রের জাতীয়তাবাদী। সে কারণেই শেষ দফা ভোটে সহিংসতার শঙ্কা বেশি।
আজাদ কাশ্মীরের চলতি অবস্থা ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ নিয়ে পাকিস্তানের এত দিনকার রাজনৈতিক বয়ানের নৈতিক শক্তি বেশ কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে উভয় দিকের এখনকার প্রায় কাছাকাছি পরিস্থিতি কাশ্মীরে গণভোট আয়োজনের পুরোনো স্থানীয় দাবির ন্যায্যতাও সামনে নিয়ে আসছে। আসন্ন আগস্টে সেই দাবির ৭৮ বছর হচ্ছে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য আজাদ কাশ্মীরের চলতি অসন্তোষ ব্যাপক বাড়তি সামরিক চাপও তৈরি করেছে। কারণ, বেলুচিস্তান ও খাইবার অঞ্চলে দুটি শক্তিশালী বিদ্রোহ মোকাবিলায় নিয়োজিত আছে তারা। এত ফ্রন্টে নিজ দেশের জনগণের অসন্তোষের মুখে প্রতিদিন গোলাগুলি ছুড়ে টিকে থাকা নিশ্চিতভাবে সুখকর নয়।
-
আলতাফ পারভেজ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ে গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব