সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা এখন কেমন আছেন
বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা এখন কেমন আছেন

বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা এখন কেমন আছেন

২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বাংলাদেশ–ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় হয়েছিল।

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়ের আগে নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে বঞ্চিত থাকার অভিজ্ঞতা এখনো ভুলতে পারেননি সিরাজুল ইসলাম। তাঁর ভাষায়, ২০১৫ সালের আগে তাঁদের ঠিক মানুষের মর্যাদা ছিল না; ছিটমহল বিনিময়ের পর মানুষের খাতায় নাম উঠেছে।

সিরাজুল ইসলাম কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দা। সাইকেল মেরামতের কাজ করেন। গত ২৫ জুলাই কালীরহাট বাজারে তাঁর সঙ্গে কথা হয়।

২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময়ের পর দাসিয়ারছড়ায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। বেশির ভাগ সড়ক পাকা হয়েছে, বাড়িতে পৌঁছেছে বিদ্যুৎ, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কালীরহাট বাজারের একটি চায়ের দোকানে কথা হয় রসুল আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ছিটমহল বিনিময়ের আগে এখানে কেউ মন খুলে হাসতে পারেনি। এখন আমরা মন খুলে হাসতে পারি।’

অবশ্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বুঝতে হলে ১১ বছর আগের চিত্রটি দেখতে হবে। তখন ছিটমহলবাসী তাঁদের দেশের নাগরিকত্ব থাকলেও ভিন্ন দেশের ভৌগোলিক সীমায় বসবাস করায় কার্যত শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপদ চলাচলসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

পরবর্তী প্রটোকল ও দুই দেশের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয়। অর্থাৎ ১ আগস্ট ছিটমহলগুলো হস্তান্তর হয়।

কেমন ছিল তাঁদের জীবন

ছিটমহল ছিল এক দেশের ভেতরে থাকা অন্য দেশের বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড, যার চারপাশ ঘিরে থাকত প্রতিবেশী রাষ্ট্র। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এমন ছিটমহল ছিল ১৬২টি। এর মধ্যে বাংলাদেশের ভেতরে ছিল ভারতের ১১১টি এবং ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল। ২০১১ সালের যৌথ জনগণনা অনুযায়ী, এসব ছিটমহলে বাস করতেন ৫১ হাজারের বেশি মানুষ।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে ছিটমহলবাসীর জীবন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। মূল ভূখণ্ডে যাতায়াত ছিল কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ থেকে তাঁদের বড় অংশ বঞ্চিত ছিলেন। বাজারে যাওয়া, পণ্য বিক্রি করা কিংবা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রেও পরিচয় ও ঠিকানা নিয়ে নানা বাধার মুখে পড়তে হতো।

পরিচয়পত্র ও বৈধ ঠিকানার অভাবে ছিটমহলের বাসিন্দাদের অনেককে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ পেতে মিথ্যা পরিচয়ের আশ্রয় নিতে হতো। কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দাদের বাবা-মা পরিচয় দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করতেন, আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে ব্যবহার করতেন অন্য ঠিকানা। তাঁদের পরিচয় ছিল ‘ছিটের মানুষ’। এ দুটি শব্দ দিয়ে ছিটমহলবাসীকে আলাদা করে ফেলা হতো। বাজরে যেকোনো কিছু বিক্রি করতে গেলে ‘ছিটের মানুষের’ পণ্যের দাম ছিল কম। বেঁচে থাকা এবং ন্যূনতম নাগরিক সেবা পাওয়ার জন্য এমন চিত্র ছিল তাঁদের দৈনন্দিন বাস্তবতা।

বড় ছিটমহলগুলোর কোথাও কোথাও বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে সীমিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া ছিল বড় ছিটমহল। সেখানে ৮-১০ হাজার মানুষের উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে বিচারব্যবস্থা চালু ছিল এবং একটি টিনের ঘরের দুটি কক্ষকে কারাগার হিসেবে ব্যবহার করা হতো বলে জানা যায়। তবে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার অনুপস্থিতির সুযোগে কোনো কোনো ছিটমহলে চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও জুয়ার আসরও গড়ে উঠেছিল।

অবশ্য ছিটমহল বিনিময়ের অভিজ্ঞতা সবার জন্য এক রকম ছিল না। অধিকাংশ বাসিন্দা নিজেদের বসতভিটায় থেকে গেলেও একটি অংশ পরিচিত জনপদ ছেড়ে ভারতে চলে যান। নতুন দেশে নাগরিকত্ব ও পুনর্বাসনের সুযোগ পেলেও তাঁদের কারও কারও জন্য শিকড় ছেড়ে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়নি।

ছিটমহল বিনিময়ের উদ্যোগ

ছিটমহল বিনিময়ের উদ্যোগ ছিল দীর্ঘদিনের। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খান নুন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন, তবে তা কার্যকর হয়নি। পরে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্থলসীমান্ত চুক্তি করেন। পরবর্তী প্রটোকল ও দুই দেশের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয়। অর্থাৎ ১ আগস্ট ছিটমহলগুলো হস্তান্তর হয়।

বিনিময়ের সময় বাসিন্দাদের নিজ নিজ অবস্থানস্থলে থেকে যাওয়ার অথবা পছন্দের দেশে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। অধিকাংশ মানুষ নিজেদের বসতভিটায় থেকে যান। বাংলাদেশ থেকে কিছু পরিবার ভারতে চলে যায়। এর মধ্য দিয়ে প্রায় সাত দশক ধরে চলা ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও রাষ্ট্রীয় অনিশ্চয়তার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।

অবশ্য ছিটমহল বিনিময়ের অভিজ্ঞতা সবার জন্য এক রকম ছিল না। অধিকাংশ বাসিন্দা নিজেদের বসতভিটায় থেকে গেলেও একটি অংশ পরিচিত জনপদ ছেড়ে ভারতে চলে যান। নতুন দেশে নাগরিকত্ব ও পুনর্বাসনের সুযোগ পেলেও তাঁদের কারও কারও জন্য শিকড় ছেড়ে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়নি।

ছিটমহল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ৫১ হাজারের বেশি মানুষ নাগরিক হিসেবে মর্যাদা পেয়েছেন। দেশ খুঁজে পেয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের চেষ্টায় বাংলাদেশ অংশে থাকা বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টাও আছে।

ভারতে গিয়ে কেমন আছেন

ছিটমহল বিনিময়ের সময় বাংলাদেশ থেকে যেসব পরিবারের বাসিন্দা ভারতে চলে যান, তাঁদের একজন নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশের ভেতরে থাকা সাবেক ভারতীয় ছিটমহল দাসিয়ারছড়া ছেড়ে ভারতে গিয়েছিলেন। সম্প্রতি মাসখানেকের জন্য বাংলাদেশে এসেছেন। গত ২৫ জুলাই দাসিয়ারছড়ায় হাবিবুর রহমানের দোকানের সামনে তাঁর সঙ্গে কথা হয়।

নজরুল ইসলাম জানালেন, নিজ জন্মভূমি, চেনাজানা জগৎ ছেড়ে গিয়ে অনেকের মন বসেনি। তাঁর ভাষ্য, হিন্দুরা যত সহজে সেখানে নিজেদেরকে মানিয়ে নিয়েছেন, মুসলমানরা তত সহজে মানিয়ে নিতে পারেননি। সুযোগ পেলে অনেকে বাংলাদেশে ফিরতে চান। তবে ভারত সরকার তাঁদের কোনো অসুবিধার কারণ নয় বলেও জানিয়েছেন।

ছিটমহল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ৫১ হাজারের বেশি মানুষ নাগরিক হিসেবে মর্যাদা পেয়েছেন। দেশ খুঁজে পেয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের চেষ্টায় বাংলাদেশ অংশে থাকা বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টাও আছে।

বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমরা এখন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক। এটা আমাদের গর্ব, অহংকার। অতি অল্প সময়ে এত সুবিধা পাব, ভাবতে পারিনি। ভূমিবিষয়ক এবং নাগরিকত্বের সামান্য সমস্যা আছে। আমরা আশা করি সরকার তা সমাধান করবে।’

দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনা চাইলেই দূর করা সম্ভব নয়। উভয় দেশের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার কারণে এত দিনের সীমাহীন দুর্ভোগে থাকা এসব নাগরিকের জন্য সর্বোচ্চ বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা।

  • তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক।

  • ই–মেইল: wadudtuhin@gmail.com

About Editor Todaynews24

Check Also

‘ইরান যুদ্ধে জিতেছে’

ইরান যুদ্ধে জয়লাভ করেছে, তবে এই বিজয়কে আরও সুসংহত ও দৃঢ় করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার এবং শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সেইসঙ্গে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য জাতিকে অবশ্যই আশা বাঁচিয়ে রাখতে হবে বলে তিনি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *