সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / হামের চিকিৎসায় হাজেরাদের খরচ ৭০ হাজার, ১০ পরিবারের ৯টিই ঋণ নিচ্ছে
হামে আক্রান্ত প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় ৯টিই চিকিৎসা-সংক্রান্ত খরচ মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রতি ১০টি পরিবারের ৬টি তাদের সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে।

হামের চিকিৎসায় হাজেরাদের খরচ ৭০ হাজার, ১০ পরিবারের ৯টিই ঋণ নিচ্ছে

রংপুর থেকে ১১ মাসের মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন হাজেরা খাতুন। শিশুকন্যাটি হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আছে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনা মূল্যে হলেও তাঁদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত খরচ ইতিমধ্যে ৭০ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। শুধু অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আনতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। এরপর প্রতিদিনের খাবার, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় যোগ হয়ে খরচ আরও বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছে।

হাজেরা খাতুন বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনা মূল্যে হলেও এর বাইরের অনেক খরচ আমাদের বহন করতে হয়। শুধু অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আসতেই প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রতিদিন খাবার কিনতে হচ্ছে, বিভিন্ন চিকিৎসা পরীক্ষা করাতে হচ্ছে, সঙ্গে রয়েছে নিত্যদিনের অন্যান্য ব্যয়। আমি ইতিমধ্যে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করেছি। আমার স্বামী সৌদি আরবে কাজ করেন, কিন্তু এ মাসে তিনি বেতন পাননি। এতে আমাদের আর্থিক সংকট আরও বেড়েছে।’

হাজেরা খাতুনের মতো অভিজ্ঞতা এখন হাজারো পরিবারের। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) যৌথ এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় ৯টিই চিকিৎসা-সংক্রান্ত খরচ মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রতি ১০টি পরিবারের ৬টি তাদের সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে।

গত বুধবার প্রকাশিত এই মূল্যায়নে দেশের ১২টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২ হাজার ৭৪৬টি হামে আক্রান্ত পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

চিকিৎসা ফ্রি, কিন্তু কমছে না ব্যয়

মূল্যায়নে দেখা গেছে, চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় বাবদ প্রতিটি পরিবারের গড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আলাদা অর্থ দিতে না হলেও যাতায়াত, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, খাবার এবং হাসপাতালে দীর্ঘদিন অবস্থানের খরচ পরিবারগুলোর জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, অসুস্থ শিশুর পাশে হাসপাতালে থাকতে গিয়ে তাঁরা নিয়মিত কাজে যেতে পারেননি। ফলে কারও আয় বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কেউ চাকরিও হারিয়েছেন।

২ হাজার ৭৪৬ পরিবারের ওপর মূল্যায়ন

হামের প্রাদুর্ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝা এবং জরুরি নগদ সহায়তার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে এই মূল্যায়ন পরিচালনা করা হয়।

এ জন্য দেশের ১২টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারকে মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়। নির্ধারিত ঝুঁকিপূর্ণতার মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের মধ্য থেকে ২ হাজার ৪০০টি পরিবারকে জরুরি নগদ সহায়তার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিটি পরিবারই জানিয়েছে, তাদের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ পরিবার ওষুধকে সবচেয়ে জরুরি সহায়তা হিসেবে উল্লেখ করেছে। ৩৩ শতাংশ নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত (ওয়াশ) সহায়তা এবং ২২ শতাংশ খাদ্যসহায়তার প্রয়োজনের কথা বলেছে।

নিম্ন আয়ের পরিবারই সবচেয়ে বিপদে

যেসব পরিবার তাদের পেশার তথ্য দিয়েছে, তাদের মধ্যে ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। এসব পরিবারের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেসব শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত পরিবারের। গবেষণায়ও দেখা যাচ্ছে, এসব পরিবারের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। এমন আয়ের পরিবারের জন্য চিকিৎসা-সংক্রান্ত এই ব্যয় অত্যন্ত বড় বোঝা। সরকারি হাসপাতালে অন্তত চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচের একটি অংশ যদি সরকার বহন করত, তাহলে এসব পরিবার কিছুটা হলেও স্বস্তি পেত।’

সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, নিম্নবিত্ত মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ে সহায়তার জন্য ‘জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল’ গঠন করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এ ধরনের একটি সরকারি তহবিল থাকলে জনস্বাস্থ্য–সংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতিতে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো দ্রুত আর্থিক সহায়তা পেতে পারে। এতে চিকিৎসার খরচ মেটাতে ঋণ নেওয়া বা সঞ্চয় ভেঙে ফেলার প্রবণতাও কমবে।

‘এটি শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়’

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মহাসচিব ডা. কবির এম আশরাফ আলম বলেন, ‘এই মূল্যায়ন দেখায়, অনেক পরিবার শুধু স্বাস্থ্যগত সংকটই নয়, তীব্র আর্থিক চাপেরও মুখোমুখি হয়েছে। আমাদের জরুরি সাড়া কার্যক্রমের আওতায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কমিউনিটিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।’

বাংলাদেশে আইএফআরসির প্রতিনিধিদলের প্রধান আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, ‘হামের এই জনস্বাস্থ্য সংকটের প্রভাব হাসপাতালের দরজায় শেষ হয়ে যায় না। অসুস্থ শিশু বা পরিবারের সদস্যের সেবা দিতে গিয়ে পরিবারগুলো কঠিন আর্থিক সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। এই মূল্যায়নের ফলাফল দেখায়, জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থায় মানবিক সহায়তা ও শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা—উভয়ই অপরিহার্য। আমাদের কার্যক্রম তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই পরিচালিত হওয়া উচিত।’

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, হামের চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে হলেও পরিবারের ওপর পড়া এই অতিরিক্ত ব্যয় কমাতে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো আরও গভীর আর্থিক সংকটে পড়বে। হাজেরা খাতুনের মতো হাজারো পরিবারের অভিজ্ঞতাই সেই বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘হামের ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের মানুষদের যে অভিজ্ঞতা, তাকে আমরা “চিকিৎসার কারণে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া” বলে চিহ্নিত করি। এটা এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা একটি পরিবারের জন্য। বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিনা খরচে প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিতের কথা বলেছিল। কিন্তু হামের এই দুঃসময়ে তার তো কোনো প্রতিফলন দেখলাম না। এমন সংকটের সময়ই তো এসব দরকার।’

About Editor Todaynews24

Check Also

ঢেউয়ের ধাক্কায় সরে যাচ্ছে সিসি ব্লক, ঝুঁকিতে দেড় শ কোটি টাকার সড়ক

ঢেউয়ের ধাক্কায় সরে যাচ্ছে সিসি ব্লক, ঝুঁকিতে দেড় শ কোটি টাকার সড়ক

বেড়িবাঁধ রক্ষার জন্য পশ্চিম অংশে বাঁধের ঢালুতে সিসি ব্লক বসানো হয়েছিল। এখন সিসি ব্লকের নিচের মাটি ধসে গিয়ে ব্লকগুলো সরে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *