ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল মতবিনিময় বা সংবাদ সম্মেলন করার ঘটনায় বিএনপি সরকারের কড় সমালোচনা করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, এ ঘটনায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে ডেকে কঠোরভাবে নিন্দা জানানো উচিত ছিল সরকারের।
আজ শুক্রবার বিকেলে ‘জুলাই এখনো শেষ হয় নাই’ শিরোনামে রাজধানীর মিন্টো রোডে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘুরে দেখার পর সাংবাদিকদের এ কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক। এ সময় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ জামায়াত ও এনসিপির কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘৫ আগস্ট দুঃখজনকভাবে আমরা দেখলাম, দিল্লিতে বসে সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ পাচ্ছে পতিত স্বৈরাচার শক্তি। এটা যে হঠাৎ করে হয়ে গেছে, এ রকম নয়। সরকারের জায়গা থেকে যথাযথ ব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক পদক্ষেপ না নেওয়ার ফলেই পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদী শক্তি এটা করার সুযোগ পাচ্ছে।’
এনসিপির আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বাহবা পাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাংলা ভাষায় একটা কথা আছে—বাগাড়ম্বর, চলতি ভাষায় আমরা বলি গলাবাজি। আপনি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে-বক্তব্যে বড় বড় কথা বলছেন; কিন্তু কোনো কূটনৈতিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। ফলে এটা হওয়ারই কথা ছিল।’
ঘোষণা দিয়েই শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় ভারতের হাইকমিশনারকে ডাকা উচিত ছিল সরকারের। ডেকে কঠোরভাবে এটার নিন্দা জানানো উচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে এ ধরনের ঘটনায় সরকার কী বা কোন ধরনের কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেবে, সেটা জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা উচিত ছিল।’
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘আমাদের সরকারি দলের বন্ধুরা বারবার জাতীয় ঐক্যের কথা বলেন; ফ্যাসিবাদের প্রশ্নেও তাঁরা নাকি আছেন! কিন্তু আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, সংস্কার প্রশ্নে যে রকম তাঁরা জুলাই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন, বিচার প্রশ্নে এবং পতিত স্বৈরাচার শক্তিকে ঠেকানোর প্রশ্নেও এই সরকার আসলে আপসকামী।’
তবে সরকার আপসকামী হলে জনগণ বসে থাকবে না মন্তব্য করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ১১–দলীয় ঐক্যের পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তিগুলো মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে স্বৈরাচার শক্তিকে প্রতিরোধ করা হবে।
জুলাইয়ের ইতিহাস বিকৃতি ও দলীয়করণের অভিযোগ
এ বছর জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদ্যাপনে ইতিহাস বিকৃতি থেকে শুরু করে দলীয়করণ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ওই অভ্যুত্থানের প্রথম সারির নেতা নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, এবার কোনো ধরনের সর্বজনীন বক্তব্য ছিল না। অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ, জুলাই যে সবার—সেই বার্তা দেওয়া হয়নি।
এনসিপির আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পদ-পদবিতে যে রকম দলীয়করণ হচ্ছে, একইভাবে ইতিহাসকে দলীয়করণের চেষ্টা হচ্ছে; ঠিক যেভাবে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয়করণের চেষ্টা করেছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিভিন্ন জেলায় সরকারি আয়োজনে বিএনপির বাইরে কিছু জুলাই যোদ্ধা ও সমন্বয়ককে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাঁরা সেখানে অংশ নিতে গেলে বাধা দেওয়া হয়েছে, কিছু জায়গায় হামলা করা হয়েছে।
পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আবারও দলীয়করণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। তিনি বলেন, ‘তারা নিরপেক্ষ আচরণ করছে না। অর্থাৎ এই কাঠামো ও এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন হবে না, যদি গোড়ায় আমরা পরিবর্তন না করি, মৌলিক পরিবর্তন না করি।’
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, কোনো সরকারপ্রধানের ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় না। যদি কাঠামোগত সংস্কার না করা হয়, বর্তমান সরকারও স্বৈরাচারী হবে। তাদের ভেতর সেই প্রবণতা আছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ইতিহাসেও আমরা দেখেছি, তারা (বিএনপি) একটা ব্যর্থ আওয়ামী লীগ। তারা বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ হওয়ার চেষ্টা করেছে; কিন্তু পারেনি, জনগণের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। ১৯৯৬ সালেও এটা হয়েছে। এখনো যদি আবার চেষ্টা করে, তারা আবার জনগণের প্রতিরোধের মুখে পড়বে। ইনশা আল্লাহ, আমরা সেটার জন্য ঐক্যবদ্ধ আছি।’
‘দেশ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না’
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে এবং সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করে বর্তমান বিএনপি সরকার বৈধতা হারিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘তারা জনগণের আস্থা হারিয়েছে। জনগণের আস্থা যখন একটা সরকার হারায়, তখন তাদের টিকে থাকতে হয় ক্ষমতার দাপট ও সন্ত্রাসের ওপর ভিত্তি করে। সেটা বিগত ১৬ বছরে দেখা গেছে। এখন আমরা দেখছি, এই সরকারও সেটা শুরু করেছে ক্যাম্পাসগুলোর মাধ্যমে।’
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের ক্যান্টনমেন্ট বা দুর্গ ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো। ফলে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ও ১১ দলের পক্ষে যেসব ছাত্রনেতা রয়েছেন—ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তি থেকে শুরু করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের বিভিন্ন শক্তিকে তারা ক্যাম্পাসে ঢুকতে দিচ্ছে না। তারা আক্রমণ করছে নির্বিচার। সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত করে ক্যাম্পাসগুলোকে আবারও দখল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সরকারের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব দাবি যদি তারা বাস্তবায়ন না করে, তাদের পক্ষে দেশ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।’
এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে দলটির ব্যানারে আয়োজিত প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির নেতারা। এনসিপির সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ, মাহমুদা আলম মিতু ছাড়াও দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ছাড়াও এ সময় দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মা’ছুম, ঢাকা মহানগরের শীর্ষ নেতা নূরুল ইসলাম বুলবুল, সেলিম উদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।