Home / সকল আপডেট / চিতল মাছের কালো দাগ কী সুবিধা দেয়
চিতল মাছের কালো দাগ কী সুবিধা দেয়

চিতল মাছের কালো দাগ কী সুবিধা দেয়

বাজারে যে চিতল মাছ পাওয়া যায়, তার গায়ে পেছনের পাখনার ওপরের দিকে একসারি কালো দাগ দেখা যায়। অনেক লেখায়, এমনকি কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক লেখাতেও এগুলোকে ‘নকল চোখ’ বলা হয়। কিন্তু বিষয়টা এমন নয়। ক্লাউন নাইফফিশের মতো এগুলো স্পষ্ট ‘নকল চোখ’ (ocelli) নয়। তাই চিতলের এই দাগের কাজ নিয়ে বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যাও আলাদা।

গোলমালটা শুরু হয় দেখতে খুব মিল থাকা দুটি মাছকে নিয়ে। থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের নদীতে থাকে চিতলের এক আত্মীয় ক্লাউন নাইফফিশ (Chitala ornata)। দেখতে আমাদের চিতলের (Chitala chitala) সঙ্গে বেশ মিল। তবে লেজের দাগে পার্থক্য স্পষ্ট। ক্লাউন নাইফফিশের দাগগুলো গোলাকার, চারপাশে হালকা বলয় থাকে এবং দেখতে অনেকটা চোখের মতো। এ ধরনের দাগকেই জীববিজ্ঞানে ‘ওসেলি’ বলা হয়। আমাদের চিতলের দাগ তুলনামূলক অনিয়মিত, চারপাশে তেমন বলয়ও থাকে না। অ্যাকুয়ারিয়ামের ব্যবসায়ীরাও প্রায়ই দুটি মাছ গুলিয়ে ফেলেন। সম্ভবত সেই বিভ্রান্তি থেকেই চিতলের দাগকেও একইভাবে ‘নকল চোখ’ বলা শুরু হয়েছে।

ক্লাউন নাইফফিশের ওই চোখের মতো দাগের কাজ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। শিকারি মাছ সাধারণত মাথা লক্ষ্য করেই আক্রমণ করে। কিন্তু লেজের কাছে যদি চোখের মতো বড় দাগ থাকে, তাহলে শিকারি একমুহূর্তের জন্য বিভ্রান্ত হতে পারে। একে বলা হয় ‘ডিফলেকশন হাইপোথিসিস’। বিভিন্ন মাছের ওপর করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে শিকারির আক্রমণ মাথার বদলে লেজের দিকে সরে যায়। ফলে শিকার প্রাণে বেঁচে যাওয়ার সুযোগ পায়।

আমাদের চিতলের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে। গবেষকেরা মনে করেন, শরীরের কালো দাগ এবং গায়ের সোনালি-রুপালি ডোরাগুলো মিলিয়ে মাছটির শরীরের আসল সীমারেখা ভেঙে দেয়। জীববিজ্ঞানে একে বলা হয় ডিসরাপটিভ কালারেশন। এর উদ্দেশ্য শিকারিকে অন্যদিকে তাক করানো নয়; বরং মাছের শরীরটাকেই আশপাশের আলো-ছায়া, ডুবো গাছপালা আর ঘোলা পানির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া। ফলে দূর থেকে পুরো মাছকে আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। চিতলের শরীরের এই সোনালি ডোরাগুলো বয়স ও পানির অবস্থার ওপর নির্ভর করে কখনো স্পষ্ট, কখনো আবার ম্লান দেখা যায়।

শুধু রং নয়, চিতলের চলাফেরার ধরনও একে আড়াল থাকতে সাহায্য করে। এর লম্বা পায়ু-পাখনা লেজের পাখনার সঙ্গে মিলিয়ে প্রায় একটানা একটি ফিতা তৈরি করেছে। এই পাখনায় ঢেউ তুলে চিতল সামনে বা পেছনে চলতে পারে। শরীর খুব বেশি না নাড়িয়েই মুহূর্তের মধ্যে দিক পরিবর্তন করতে পারে সে। তাই পানির ভেতরে তার চলাফেরা হয় বেশ নীরব ও মসৃণ।

চিতলের আরেকটি বিশেষ অভিযোজন হলো এর বায়ুথলি। এটি এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যে প্রয়োজনে মাছটি বাতাস গিলেও অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে। গ্রীষ্মকালে খাল-বিলের পানিতে অক্সিজেন কমে গেলেও তাই চিতল তুলনামূলক ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে।

একই গণের দুটি মাছ, কিন্তু বাঁচার কৌশল আলাদা। ক্লাউন নাইফফিশের চোখের মতো দাগ শিকারির আক্রমণ ভিন্ন দিকে সরিয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে। আর আমাদের চিতলের ক্ষেত্রে কালো দাগ, ডোরা এবং শরীরের গঠন—সব মিলিয়ে তাকে আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকতে সাহায্য করে বলেই ধারণা করা হয়।

তবে এসব কৌশলও আজ মানুষের সামনে খুব একটা কাজে আসছে না। বাঁধ নির্মাণ, নদী-খালের আবাসস্থল নষ্ট হওয়া, দূষণ এবং অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে বাংলাদেশের জলাশয়ে চিতলের সংখ্যা কমছে। পরেরবার বাজারে চিতল দেখলে লেজের কালো দাগগুলোর দিকে আরেকবার তাকিয়ো। সেগুলো হয়তো ক্লাউন নাইফফিশের মতো স্পষ্ট ‘নকল চোখ’ নয়, কিন্তু মাছটির টিকে থাকার জন্য এই দাগ গুরুত্বপূর্ণ।

About Editor Todaynews24

Check Also

কূটনীতির অন্দরমহলে নির্মোহ দৃষ্টি

কূটনীতির অন্দরমহলে নির্মোহ দৃষ্টি

বাংলাদেশের কূটনীতি–সাহিত্যে একটি লক্ষণীয় সংযোজন ঘটল ইউপিএল প্রকাশিত অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত মাহমুদ হাসানের স্মৃতিকথা সেরেনডিপিটি ডিপ্লোমেসি: বিটুইন প্রটোকল অ্যান্ড পলিটিকস: আ মেমোয়ার–এর মাধ্যমে। আমলাদের আত্মজীবনীতে আত্মপক্ষ সমর্থন, সতর্ক শব্দচয়ন বা ক্ষমতাকেন্দ্রকে অস্বস্তিতে না ফেলার প্রবণতা দেখা যায়। মাহমুদ হাসান এর বাইরে গিয়ে অভিজ্ঞতাকে নির্মোহ ও বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে দেখেছেন। বাংলাদেশের অন্য কূটনীতিকদের স্মৃতিকথার সঙ্গে তুলনা করলে প্রথমেই ধরা…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *