সর্বশেষ খবর
Home / কলাম / রাকসু জিএসের কাজ কী
রাকসু জিএসের কাজ কী

রাকসু জিএসের কাজ কী

বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ কিংবা ছাত্রদের ইউনিয়ন রয়েছে। এসব সংগঠন মূলত অরাজনৈতিক, একই সঙ্গে তারা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে।

শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও মানবিক গুণাবলির বিকাশের জন্য ছাত্রসংসদগুলো নানা ধরনের ক্যারিয়ার উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করে থাকে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদগুলোর জন্ম হয়েছে মূলত এসব মূলনীতি ঘিরেই। রাজনৈতিক ছায়াতলের বাইরে গিয়ে, শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে ছাত্রসংসদগুলো তৎপর থাকবে—এই আশায় শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়ে তাঁদের নেতৃত্ব ঠিক করেন।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের বেশ কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রসংসদের নির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচনে ছাত্রদের ভোটেই প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছে। ছাত্রসংসদের নেতৃত্বের কাছ থেকে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার পরিবেশ ঠিক কতটা লাভবান হচ্ছে, তা হিসাব কষতে কিছুটা হলেও সময় লাগবে।

শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে কো-কারিকুলাম কর্মকাণ্ডে সহায়তা করা যে সংগঠনটির মূল দায়িত্ব, সেই সংগঠনটির নেতারা একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে তাঁদের মূল দায়িত্বের কথা একবারে ভুলে গেছে।

তবে বছরজুড়েই পত্রিকার শিরোনামে আলোচনায় থাকছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নেতারা। এখনকার নেতারা কখনো পত্রিকা অফিসে আগুন লাগানোর উসকানি দিচ্ছেন, কখনো ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীকে পেটানো হচ্ছে, কখনো বা শিক্ষকদের নাজেহাল করার খবর গণমাধ্যমে এসেছে।

অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় সংসদে নেতারা শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁদের কাজ রাকসুর গঠনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। রাকসুর গঠনতন্ত্রে বলা আছে—১. শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ ক্যাম্পাস-জীবন গড়ে তোলা, যাতে তাঁদের দূরদর্শী সক্রিয় নেতৃত্ব সমাজ ও জাতির জন্য প্রস্তুত হয়, ২. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবং বাংলাদেশ ও বিদেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা, বোঝাপড়া ও সৌহার্দ্যবোধ গড়ে তোলা এবং ৩. শিক্ষার্থীদের মধ্যে বক্তৃতা, লেখালেখি, বিতর্ক ইত্যাদি দক্ষতা উন্নয়নের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করার কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে কো-কারিকুলাম কর্মকাণ্ডে সহায়তা করা যে সংগঠনটির মূল দায়িত্ব, সেই সংগঠনটির নেতারা একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে তাঁদের মূল দায়িত্বের কথা একবারে ভুলে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে এক শিক্ষার্থীকে মারধর করছেন শিবির ও রাকসু নেতা

২৭ ও ২৮ জুলাই প্রথম আলোর অনলাইনে প্রকাশিত খবর বলছে, প্রেমঘটিত বিষয়ের সমাধানের জন্য অভিযুক্তদের নিয়ে রোববার রাতে নিজ কার্যালয়ে বৈঠকে বসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। অভিযুক্ত শিক্ষার্থী মহসিন আলমের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস, হাসিব, সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসান। একপর্যায়ে তাঁদের সঙ্গে প্রক্টরের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরদিন সোমবার দুপুরে আবার বৈঠক বসলে সেখানে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন নেতা আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী বলে দাবি করেন। এ সময় তাঁর মুঠোফোনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে মারধর করা হয়। এর প্রতিশোধ হিসেবে পরবর্তী সময়ে ওই শিক্ষার্থীরা রাকসু ভবনে গিয়ে আম্মারসহ কয়েকজনের ওপর হামলা করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, রাকসু নেতা আম্মার ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে আরেক দফা মারধর করেন, যেখানে প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশের উপস্থিতিও দেখা যায়। এমনকি আহত ছাত্রদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসা অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানো হলেও পরবর্তী সময়ে টেনেহিঁচড়ে পেটানোর ভিডিও দেখা যায়।

প্রশ্ন হলো, রাকসুর জিএসের কাজ কী? তাঁর দপ্তরে কি ভুক্তভোগী ওই নারী শিক্ষার্থী কোনো অভিযোগ দিয়ে সমাধান চেয়েছিলেন? যদি না চান, তিনি কেন প্রক্টর অফিসে গিয়ে হাঙ্গামা করলেন? নিষিদ্ধ থাকা ছাত্রলীগ তালাশের দায়িত্বই বা তাঁকে কে দিয়েছে? পুলিশ নাকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন?

একজন স্বাধীন নাগরিকের মুঠোফোন তল্লাশির দায়িত্ব এই নেতাকে কে দিয়েছে? অথচ তাঁরাই চব্বিশের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের মুঠোফোন যখন তল্লাশি পুলিশ করেছিল, তখন প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু আজ তাঁরা অন্যের ফোন তল্লাশি করে কে ছাত্রলীগ তা বের করেন।

আমরা এক বছর ধরে রাকসুর জিএসের এই উদ্ভূত ক্ষমতা চর্চার খবর পত্রিকায় পড়ছি, জানছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্ক বনে যাওয়া এই নেতা বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরিতে কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন তা আমি নিশ্চিত নই, তবে গণমাধ্যমে যেসব খবর এসেছে, সেই খবরগুলোকে যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমলে নেয়, তাহলে নিশ্চিত প্রক্টরিয়াল বডির আইন অনুযায়ী তাঁর শাস্তি হওয়ার কথা ছিল।

গত বছর ১০ নভেম্বর আমরা পত্রিকায় দেখলাম, এই গুণধর নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন, নিজেকে রাকসুর নির্বাচিত জিএস বলে দাম্ভিকতা দেখান (প্রথম আলো ১০ নভেম্বর, ২০২৫)।

এর পরের মাসে বিশ্ববিদ্যালয়টির ছয়টি অনুষদের আওয়ামী লীগপন্থী ডিনদের জন্য নিজে পদত্যাগপত্র তৈরি করেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক। প্রশাসন ভবনের উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, প্রক্টর, রেজিস্ট্রারসহ সব দপ্তরের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে শেষ পর্যন্ত শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করান এই নেতা (প্রথম আলো ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫)।

এই বছরের শুরুতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শিক্ষক ও জিয়া পরিষদ নেতার টানানো ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন রাকসুর এই নেতা (প্রথম আলা ১৮ জানুয়ারি, ২০২৫)।

কোথায় ছাত্রসংসদের নেতৃত্বে বিতর্ক প্রতিযোগিতা হবে, আন্তবিশ্ববিদ্যালয় খেলাধুলার আয়োজন করবে, শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার-বিষয়ক সেমিনারের আয়োজন করবে, কিন্তু সেগুলোতে তাঁরা মনোযোগ না দিয়ে সম্পূর্ণ এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের পদত্যাগের দায়িত্ব স্বীয় ইচ্ছায় কাঁধে নিয়েছেন। তাঁরা একটিবার নিজেদের প্রশ্ন করেন না, তাঁদের মূল দায়িত্বটা কী?

শুধু ছাত্রলীগ করার অপরাধে কারও শাস্তি হতে পারে এমন চিন্তাচেতনা যাঁরা ধারণ করেন, তাঁরা কিছুতেই চব্বিশের মূল চেতনা ধারণ করতে পারেন না। কেউ যদি একান্তভাবে ছাত্রলীগে থাকা অবস্থায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, যার বিরুদ্ধে মামলা আছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল বডিতে অভিযোগ আছে, নিশ্চয় সেটি দেশের প্রচলিত আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। কিন্তু এটা কিছুতেই রাকসুর নেতাদের কাজ নয় যে আপনি শিক্ষার্থীদের ধরে ধরে ছাত্রলীগ ট্যাগ দেবেন, মারধর করবেন, প্রশাসনকে চাপ দিয়ে গ্রেপ্তার করাবেন।

মনে রাখবেন, এমন কাজ অতীতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল, যাঁদের বিরুদ্ধে আপনারা আন্দোলন করেছিলেন, তাঁদের নেতৃত্ব এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এখন আপনারাও যদি একই কাজ করেন, তাহলে আপনারাও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ঘৃণিত হয়ে উঠবেন। নেতার নেতৃত্বগুণ আর মাস্তানির গুণের মধ্যে তফাৎ আছে। বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই মাস্তানির জায়গা নয়। আমরা রাকসুর কাছ থেকে এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ছাড়া এমন কোনো খবর পত্রিকায় দেখতে পাইনি, যা নিয়ে আপনাদের নেতৃত্বকে প্রশংসা করব।

রাকসুর জিএসের এমন আচরণ পুরো বাংলাদেশের মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত হবে, নিজেদের মেরুদণ্ডটা দেখানো। উপাচার্যের চেয়ারটিতে বসা মানুষটির কাছ থেকে সব শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নিরপেক্ষ বিচার আশা করে। মনে রাখতে হবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকলে শিক্ষার পরিবেশ কেবল বিঘ্নিত হবে না, ভঙ্গুর উচ্চশিক্ষালয় তৈরি হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সরকারকে অবশ্যই কার্যকর ভূমিকায় আসতে হবে।

কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের নেতাদের কাছ থেকে এই জাতি অনেক কিছু আশা করে। বিশেষ করে সাম্য ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য ছাত্রসংসদগুলোর কাছ থেকে শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, সমগ্র জাতিই আরও বেশি সহনশীল ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ প্রত্যাশা করে।

  • ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: nadim.ru@gmail.com

মতামত লেখকের নিজস্ব

About Editor Todaynews24

Check Also

ইরান যেভাবে নতুন মধ্যপ্রাচ্যের কল্পনা করছে

ইরান যেভাবে নতুন মধ্যপ্রাচ্যের কল্পনা করছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বাস্তবসম্মত নিরাপত্তাব্যবস্থা করতে হলে একটি পারস্পরিক ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ দরকার, যেন রাজনৈতিক আদর্শের সংঘাত সহিংসতায় রূপ না নেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *