যুক্তরাষ্ট্রে গরুর মাংসের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। দেশটির সুপারমার্কেটে এখন যে দামে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে, এক বছর আগের তুলনায় তা প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। সাধারণ মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় এই বৃদ্ধি তিন গুণেরও বেশি।
এমন পরিস্থিতিতে ধারণা করা স্বাভাবিক, গরুর খামারিরা হয়তো বড় ধরনের লাভ করছেন। কিন্তু সাউথ ডাকোটার গবাদিপশু খামারি এরিক গ্রপার বলছেন, বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। তাঁর দাবি, দাম বাড়লেও খামারিদের মুনাফা তেমন বাড়েনি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাউথ ডাকোটার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ৮ হাজার একর তৃণভূমিতে ৩৫০টি প্রজননক্ষম গাভি পালন করেন এরিক গ্রপার। জমির বেশির ভাগই তিনি পাইন রিজ ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশন থেকে ইজারা নিয়েছেন।
এরিকের খামার থেকে সবচেয়ে কাছের পাকা সড়ক প্রায় সাত মাইল দূরে। এ ছাড়া মোটামুটি বড় কোনো শহরে যেতে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা।
নিলামে ঠিক হয় দাম
গ্রপার নিজে বাছুরের দাম নির্ধারণ করেন না। বছরে একবার তিনি বাছুরগুলো গবাদিপশুর নিলামে তোলেন। সেখানে ক্রেতারা দর হাঁকেন; সর্বোচ্চ দরদাতার কাছেই বিক্রি হয় বাছুর।
এরিক এখন নিলামে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ দাম পাচ্ছেন। প্রায় ৬০০ পাউন্ড (২৭২ কেজি) ওজনের বাছুর বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ডলারে। দুই বছর আগে একই ধরনের বাছুরের দাম ছিল প্রায় ২ হাজার ডলার।
কেন এত বেড়েছে দাম
এই রেকর্ড দামের পেছনে মূল কারণ একটাই—যুক্তরাষ্ট্রে গবাদিপশুর ঘাটতি। অনেক অঙ্গরাজ্যে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও বিভিন্ন রোগের কারণে চলতি বছরের শুরুতে দেশটিতে গরুর সংখ্যা ১৯৫১ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
গ্রপারের খামারের উৎপাদনেও খরার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে। তাঁর খামারের ১৩টি প্রাকৃতিক কূপ শুকিয়ে গেছে, এসব কূপ থেকে গরুর পানির জোগান হতো। ফলে তাঁকে এখন তাঁকে পানির ট্যাংকার ব্যবহার করতে হচ্ছে।
গরুর সংকটের কারণে বাছুরের দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে ঠিক, তবে উৎপাদন ব্যয়ও একইভাবে বেড়েছে। আগে যে পিকআপ ট্রাক কিনতে ৪০ হাজার ডলার লাগত, এখন তার দাম প্রায় ১ লাখ ডলার। কাঠের একটি বেড়ার খুঁটির দাম ৬ থেকে বেড়ে ১৯ ডলারে পৌঁছেছে। ৪০২ মিটার দীর্ঘ কাঁটাতারের রোলের দাম ৬০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩০ ডলার।
গ্রপারের ভাষায়, কোভিড-১৯ মহামারির পর দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্রায় সবকিছুর দামই বেড়ে গেছে। এর ওপর খরায় তৃণভূমিতে ঘাস কমে যাওয়ায় তাঁকে খড় ও অন্যান্য পশুখাদ্য কিনতে হচ্ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশের বেশি গবাদিপশুর খামার খরাকবলিত এলাকায়।
গ্রপার বলেন, ‘বিল পরিশোধ করা যাচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় এত বেড়েছে যে এই রেকর্ড দাম না পেলে আমরা সবাই দেউলিয়া হয়ে যেতাম। করের হিসাব করতে বসলে মনে হয়, অনেক টাকা আয় করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাতে তেমন কিছুই থাকে না।’
এরপর কোথায় যায় গরু
ছয় মাস বয়সী বাছুরগুলো সরাসরি কসাইখানায় যায় না। সেগুলো কিনে নেয় ‘ফিডলট’ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব বড় খামারে ভুট্টা ও অন্যান্য শস্য খাইয়ে তিন থেকে ছয় মাসে গরুগুলোকে মোটাতাজা করা হয়।
সবচেয়ে বড় ফিডলটগুলোয় একসঙ্গে এক লাখেরও বেশি গরু রাখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯৫ শতাংশ গরু এভাবে মোটাতাজা করা হয়।
উইসকনসিন-রিভার ফলস বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক ব্রেন্ডা বোয়েটেল বলেন, ফিডলটগুলো এখন রেকর্ড দামে গরু বিক্রি করছে ঠিকই, তারাও শুরুতে রেকর্ড দামে গরু কিনতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে তাদের মুনাফাও বাড়ছে না।
চাপে মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান
গরু জবাই করে মাংসে রূপান্তর করে যেসব প্রতিষ্ঠান, তাদের বলা হয় মিটপ্যাকার। যুক্তরাষ্ট্রের গরুর মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রায় ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চারটি প্রতিষ্ঠান—টায়সন, জেবিএস, কারগিল ও ন্যাশনাল বিফ।
বাজারে এত বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগও উঠেছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ ধরনের অভিযোগ তুলেছেন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানও যে এখন বড় অঙ্কের মুনাফা করছে, তা নয়।
চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বড় টায়সন গত মে মাসে জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে গরুর মাংসে ৫০ কোটি ডলারের বেশি লোকসান হয়েছে। কারণ হিসেবে তারা বলেছে, রেকর্ড দামে মাংস বিক্রি হলেও গরু কিনতেও হচ্ছে রেকর্ড দামে।
ছোট প্রতিষ্ঠানের সংকট আরও বড়
নর্থ ক্যারোলাইনার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত হার্পলিস মিটপ্যাকিংয়ের মালিক জেমি ক্রামলি বলেন, গত তিন বছরে জীবিত গরু কেনার খরচ প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
মাংসের দাম বাড়ানো গেলেও তার সীমা আছে। সুপারমার্কেট, রেস্তোরাঁ কিংবা সাধারণ ক্রেতারা চাইলে গরুর মাংসের বদলে মুরগি বা তুলনামূলকভাবে সস্তা দামে আমদানি করা গরুর মাংস কিনতে পারেন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, উৎপাদনের সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
হার্পলিসের কারখানায় প্রতিদিন ৪২৫ থেকে ৪৫০টি গরু প্রক্রিয়াজাত করা হয়। কিন্তু গরুর সংকটের কারণে বর্তমানে সেখানে প্রতিদিন মাত্র ৩৫০টি গরু জবাই করা হচ্ছে।
কারখানা, যন্ত্রপাতি ও কর্মীদের খরচ একই থাকায় ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিটি গরু প্রক্রিয়াজাত করতে গিয়ে অনেক সময় ১০০ থেকে ৪০০ ডলার পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে বলে জানান ক্রামলি।
রেস্তোরাঁগুলোর অবস্থাও এক
নেব্রাস্কার ওমাহা শহরের বার্গার রেস্তোরাঁ ব্লক-১৬-এর মালিক পল ও জেসিকা আরবান। তাঁদের রেস্তোরাঁয় প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০০ পাউন্ড (১৩৬ কেজি) কিমা ব্যবহার হয়। মাসে প্রায় ২ হাজার ৮০০টি বার্গার বিক্রি করেন তাঁরা।
২০১০ সালে রেস্তোরাঁটি চালু করেন পল ও জেসিকা। তখন একটি বার্গারের দাম ছিল ৮ দশমিক ৯৫ ডলার। এখন সেই দাম বেড়ে হয়েছে ১১ দশমিক ৯৫ ডলার। তবে কিমার দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা বাড়েনি।
পল বলেন, ‘সর্বোচ্চ মুনাফা করতে চাইলে হয়তো বার্গারের দাম ১৩ ডলার রাখতে হতো। কিন্তু আমরা সেটা করছি না, বিষয়টি স্বস্তিকর নয়। আমিও কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে চিজবার্গারের জন্য ১৩ ডলার দিতে চাইতাম না।’
পল আরও বলেন, ‘আমরা যে পরিমাণ মুনাফা চাই, তা করতে পারি না। তবে মানুষ এখনো আমাদের রেস্তোরাঁয় আসছে। টাকাই সব সময় মুখ্য নয়।’
অতিরিক্ত অর্থ যাচ্ছে কোথায়
খামারি রেকর্ড দামে বাছুর বিক্রি করছেন, কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাঁর লাভ বাড়ছে না। ফিডলটগুলোও রেকর্ড দামে গরু বিক্রি করলেও বেশি দামে তা কিনতে হচ্ছে। মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ ব্যয়ের কারণে লোকসান দিচ্ছে। রেস্তোরাঁ ও সুপারমার্কেটও ইচ্ছেমতো দাম বাড়াতে পারছে না।
অর্থাৎ পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় আগের তুলনায় বেশি অর্থের লেনদেন হলেও অতিরিক্ত অর্থ কারও হাতে থাকছে না। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে গরুর সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এরিক গ্রপারের ভাষায়, গরু তো রাতারাতি তৈরি করা যায় না। বাছুরের জন্ম দিতে অল্পবয়সী গাভির প্রায় দুই বছর লাগে। এরপর সেই বাছুরের খাওয়ার উপযোগী হতে আরও প্রায় এক বছর সময় লাগে। অর্থাৎ বাজারে অতিরিক্ত গরুর মাংস আসতে অন্তত তিন বছর সময় লাগে।