সর্বশেষ খবর
Home / অর্থনীতি / মূল্যস্ফীতি কমছে না, মুদ্রানীতি বদলাতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক
মূল্যস্ফীতি কমছে না, মুদ্রানীতি বদলাতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক

মূল্যস্ফীতি কমছে না, মুদ্রানীতি বদলাতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে বর্তমান সুদের হারভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যভিত্তিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বলতে বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১ হাজার বিলিয়ন বা ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হওয়াকে বোঝানো হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য মুদ্রানীতির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামোর মাধ্যমে সুদের হার বাড়িয়ে বা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। তবে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে যেতে ধীরে ধীরে এ কাঠামো থেকে সরে আসতে হবে। এ জন্য মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও যুগোপযোগী ও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

আজ রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে লিখিতভাবে এসব কথা জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এবং মুদ্রানীতি’ শীর্ষক ছয় পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান। বৈঠকে কমিটির সদস্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ মো.নূরুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, মো.শাহাদাত হোসেন, মো. সাইফুল আলম, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, মো. আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ) প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।

বৈঠকে আরও অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হাসানুল মতিন প্রমুখ। বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে শুধু জানায়, এটি অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক এবং এতে কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা প্রায় সবাই সুদের হার বেশি বলে প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকেই বলেছেন মূল্যস্ফীতি কমেনি। তবে এক ঘণ্টার প্রথম বৈঠক হিসেবে খুব বেশি আলোচনা করার সুযোগ ছিল না। ভবিষ্যতের বৈঠকগুলোতে লম্বা আলোচনা হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক বৈঠকে নিয়ন্ত্রণমূলক মুদ্রানীতি কাঠামো, অর্থের জোগানভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামো, সুদের হারভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামো, মুদ্রানীতির হাতিয়ার, মুদ্রানীতির অন্তর্ভুক্তি, মুদ্রানীতি কমিটি গঠন, মুদ্রানীতির সঙ্গে বিনিময় হার ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি এবং মুদ্রানীতি কাঠামোর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেছে।

টানা তিন মাস ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, গত জুন মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই তাদের মুদ্রানীতির মূল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে রাখার পাশাপাশি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে পরামর্শ দেওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ ও কার্যকর পরিশোধব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তদারকিও করে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকে মুদ্রানীতির কাঠামোয় একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। শুরুতে সুদের হার ও ঋণসহ বিভিন্ন আর্থিক উপকরণ সরাসরি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মুদ্রানীতি পরিচালিত হতো। পরে আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বাজারভিত্তিক ব্যবস্থার প্রসারের ফলে মুদ্রানীতির ধরনও পরিবর্তিত হয়। ১৯৯৯ সালে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি ইউনিট গঠন করা হয়, যা পরে মুদ্রানীতি বিভাগে রূপ নেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ২০০৩ সাল থেকে অর্থের জোগানভিত্তিক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন, আর্থিক উদ্ভাবন এবং অর্থবাজারের বিকাশের কারণে ১ জুলাই ২০২৩ থেকে সুদের হারভিত্তিক নতুন মুদ্রানীতি কাঠামো চালু করা হয়। নতুন ব্যবস্থায় সুদের হার করিডরের মাধ্যমে বাজার সুদের হার পরিচালনা করে নীতিগত লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ২০০৬ সালের আগে বাংলাদেশে মুদ্রানীতি প্রণয়নের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক কমিটি ছিল না।

মুদ্রানীতির সঙ্গে বিনিময় হার সমন্বয়ের পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার নয়, বিনিময় হার ও রাজস্ব নীতিরও সমন্বয় প্রয়োজন। শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক আরও বলেছে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আসেনি। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে। তবে অর্থনীতিতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার ঘোষিত ৬৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। যদিও এর একটি অংশ মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

সুদের হারের লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামো ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামোর পার্থক্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সুদের হারের লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত নীতি সুদহার বাড়িয়ে বা কমিয়ে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। বর্তমানে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ। এ কারণে ব্যাংকের ঋণের সুদ বেশি। ফলে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কম ঋণ নিচ্ছে, ব্যয় ও বিনিয়োগ কম এবং বাজারে অর্থের প্রবাহও কম।

ওই কর্মকর্তা বলেন, মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামোর অর্থ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ঘোষণা করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি বলে আগামী দুই বছরে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনবে, তখন সুদের হার, তারল্য, বিনিময় হারসহ সব নীতি সেই ৫ শতাংশ লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিচালিত হবে। অর্থাৎ এখানে সুদের হার লক্ষ্য নয়, বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই লক্ষ্য। সুদের হার হলো সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি মাধ্যম।

তবে এ কাঠামো বাস্তবায়নে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা, মূল্যস্ফীতির নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা, সুদের হার যেন বাজারে ঋণ ও আমানতের সুদকে কার্যকরভাবে প্রভাবিত করে তা নিশ্চিত করা, রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় এবং বিনিময় হারকে অতিরিক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে তুলনামূলকভাবে বাজারভিত্তিক রাখা।

জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত জুন মাসে এক প্রজ্ঞাপনে ব্যবসায়ীদের এককালীন অর্থ পরিশোধের সময় ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দিয়েছে। তিনি তা আরও ছয় মাস বাড়ানোর কথা বলেছেন। ‘ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ক’ নামক শর্তের কারণে ব্যাংক যে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছে, সে কথাও বৈঠকে বলেছেন। পাশাপাশি সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এত সুদ দিয়ে ব্যবসা করা দুরূহ।

About Editor Todaynews24

Check Also

বাণিজ্য সুরক্ষায় প্রস্তুতির ঘাটতি, বাড়াতে হবে সক্ষমতা

বাণিজ্য সুরক্ষায় প্রস্তুতির ঘাটতি, বাড়াতে হবে সক্ষমতা

প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির তাগিদ।সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ে জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠনের সুপারিশ।তথ্য সংরক্ষণে দুর্বলতার কারণে অন্যায্য আমদানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে বাংলাদেশ।বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও গবেষণায় সম্পৃক্ত করার পরামর্শ।ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ বাণিজ্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে।স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *