জার্মানির রাজধানী বার্লিনের প্রাণকেন্দ্রে ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে উপলক্ষে এক আয়োজনে ভিড়ের মধ্যে গাড়ি উঠিয়ে দেওয়া হামলাকারী পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত হয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত ওই যুবকের নাম আবদুল বাল্লাউত (২১)। তিনিই বার্লিনে প্রাণঘাতী হামলা ঘটিয়েছেন।
পুলিশ ও জার্মানির বিশেষ বাহিনীগুলো গত রাত থেকে জার্মানিজুড়ে মরিয়া হয়ে হামলাকারীকে খুঁজছিল। রোববার সন্ধ্যা সাতটার পর পুলিশ জানায়, বার্লিনের স্পান্ডাউ জেলায় এই সন্ত্রাসীকে ধরতে গিয়ে পুলিশের একটি অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় বার্লিন পুলিশের বিশেষ অভিযান ইউনিট এসইকের সদস্যদের সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে পলাতক সন্ত্রাসী আবদুল বাল্লাউত নিহত হন। অভিযানটি বাগানঘর কলোনির একটি প্লটে ছোট কুঠুরিতে পরিচালিত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক ভারী অস্ত্রে সজ্জিত, হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা পুলিশ সদস্য অভিযানে অংশ নেন। গোলাগুলির পর ঘটনাস্থলেই আবদুল বাল্লাউতকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হয় বলে জানা গেছে। তবে সেই চেষ্টা সফল হয়নি। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বার্লিন পুলিশ কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য দিচ্ছে না। তারা জানিয়েছে, তদন্তের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি এ বিষয়ে পরবর্তী তথ্য জানাবেন।
পুলিশ জানিয়েছে, আবদুল বাল্লাউত একজন হিংস্র অপরাধী, যাঁকে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। আবদুল বাল্লাউতের বাবা-মা লেবাননের বাসিন্দা। তিনি ২০০৫ সালে বার্লিনে জন্মগ্রহণ করেন এবং শহরের কেন্দ্রস্থল পটসডামার স্কয়ারে তাঁর একটি ঠিকানা নিবন্ধিত আছে, যা হামলার স্থান থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের হাঁটাপথ।
বার্লিনের টিয়ারগার্টেনে অনুষ্ঠিত ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডের আয়োজনে অংশগ্রহণকারীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার বিষয়ে এখন তদন্ত করছে জার্মানির ফেডারেল প্রসিকিউটর জেনারেলের দপ্তর। রোববার বিকেলে এক ঘোষণায় ফেডারেল বিচারমন্ত্রী স্টেফানি হুবিগ বলেছেন, হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ‘সর্বোচ্চ কঠোরতার সঙ্গে বিচারের আওতায় আনা হবে’।
বার্লিনের পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং আরও ২৯ জন আহত হয়েছেন বলে রোববার জানিয়েছেন জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তি একজন নারী। তবে তাঁর পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বার্লিনের জাইটুং পত্রিকাটি পুলিশের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে জানায়, এ হামলার ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে এবং তারা হামলার সঙ্গে জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। শনিবার রাত প্রায় ১০টার দিকে টিয়ারগার্টেন এলাকায় একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে মানুষের ভিড়ে ঢুকে পড়ে। এরপর গাড়ি থেকে একজন বা একাধিক ব্যক্তি পালিয়ে যায়। এ ছাড়া ধারালো অস্ত্র দিয়ে আরও কয়েকজনকে আহত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, ব্যবহৃত ভ্যানটি আবদুল বাল্লাউত নিজের নামে ভাড়া করেছিলেন। এতে তাঁদের ধারণা, তিনি আগে থেকেই জানতেন যে তাঁর পরিচয় প্রকাশ পেতে পারে। রোববার দুপুরের সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডোব্রিন্টও এই মূল্যায়নের কথা নিশ্চিত করেন। তদন্ত নথি অনুযায়ী, আবদুল বাল্লাউতকে আইএস বা ইসলামিক স্টেট-সমর্থক এবং একাধিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি আগে থেকেই নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরদারিতে ছিলেন।
আবদুল বাল্লাউত ২০২৫ সালে সিরিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু লেবাননে গ্রেপ্তার হন এবং পরে জার্মান নাগরিক হিসেবে বার্লিনে ফেরত পাঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একটি সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডোব্রিন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে টিয়ারগার্টেন জেলা আদালত তাঁকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর সহিংস অপরাধের প্রস্তুতির অভিযোগে এক বছর দশ মাসের কারাদণ্ড দেন। তবে প্রসিকিউশন দুই বছর দশ মাসের সাজা দাবি করে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিল চলাকালে তিনি মুক্ত অবস্থায় ছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি অতীতেও বারবার নজরে এসেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বহু অপরাধের রেকর্ড রয়েছে এবং তিনি ইসলামপন্থী উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডোব্রিন্ট এই হামলাকে ‘ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, সন্দেহভাজনের উদ্দেশ্য ইসলামপন্থী ছিল—এমন ইঙ্গিত ‘সবকিছুতেই’ পাওয়া যাচ্ছে।