সর্বশেষ খবর
Home / অর্থনীতি / বাণিজ্য সুরক্ষায় প্রস্তুতির ঘাটতি, বাড়াতে হবে সক্ষমতা
বাণিজ্য সুরক্ষায় প্রস্তুতির ঘাটতি, বাড়াতে হবে সক্ষমতা

বাণিজ্য সুরক্ষায় প্রস্তুতির ঘাটতি, বাড়াতে হবে সক্ষমতা

  • প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির তাগিদ।

  • সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ে জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠনের সুপারিশ।

  • তথ্য সংরক্ষণে দুর্বলতার কারণে অন্যায্য আমদানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে বাংলাদেশ।

  • বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও গবেষণায় সম্পৃক্ত করার পরামর্শ।

  • ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ বাণিজ্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। এ বাস্তবতায় অন্যায্য আমদানির বিরুদ্ধে দেশি শিল্পকে রক্ষায় অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আর এ সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) করা ‘বাণিজ্য প্রতিরক্ষা পদ্ধতি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এমন সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরিতে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক হাফিজুর রহমান। তিনি সম্প্রতি বিটিটিসির কর্মকর্তাদের কাছে এ সুপারিশ তুলে ধরেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা। শুল্ক-সুবিধা কমে যাওয়ায় বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়বে। অন্যায্য আমদানির কারণে বাড়বে দেশি শিল্পের ঝুঁকি। তাই বাণিজ্য প্রতিরক্ষামূলক উপায় ব্যবহারে সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

বাণিজ্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা শুধু অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড—এই তিন ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো—যার মধ্যে আইন, তদন্ত, তথ্য সংগ্রহ, বাজার পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক মামলা পরিচালনা এবং দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত।

কোনো দেশ উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে তাকে ডাম্পিং বলা হয়। ডাম্পিং ঠেকাতে আরোপ করা হয় অ্যান্টি–ডাম্পিং শুল্ক। আবার কোনো দেশের সরকার রপ্তানিকারকদের বিশেষ ভর্তুকি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যায্য সুবিধা দিলে তার বিরুদ্ধে কাউন্টারভেইলিং ব্যবস্থা নেওয়া যায়। অন্যদিকে কোনো পণ্যের আমদানি হঠাৎ বেড়ে গিয়ে দেশি শিল্পের ক্ষতি করলে সাময়িক সুরক্ষার জন্য নেওয়া হয় সেফগার্ড ব্যবস্থা।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা কোনো সংরক্ষণবাদী নীতি নয়। বরং এটি বৈধ প্রতিকার, যার মাধ্যমে কোনো দেশ অন্যায্য বাণিজ্যিক আচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

বিটিটিসির প্রতিবেদনে সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করার পাশাপাশি জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাণিজ্য সুরক্ষা সহায়তা কেন্দ্র, যৌথ বাণিজ্য সুরক্ষা সেল, তথ্য বিনিময়ের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে একটি একাডেমিক কনসোর্টিয়াম গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।

বদলে যাবে বাণিজ্যের বাস্তবতা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, ওষুধ, পাটপণ্য, প্লাস্টিক, সিরামিক ও কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান তৈরি করছে। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে বিদ্যমান শুল্ক-সুবিধা কমে যাবে। ফলে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। এ অবস্থায় শুধু নতুন বাজার খোঁজা বা রপ্তানি বাড়ানোর কৌশল যথেষ্ট হবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম মেনে দেশি শিল্পকে অন্যায্য প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠনসহ যেসব পরামর্শ এসেছে, এগুলো এখন বাস্তবায়নের পথে যেতে হবে। এলডিসি উত্তরণ তো হবেই। উত্তরণের পর ভবিষ্যতে অনেক সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। সবার আগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা টিকিয়ে রাখা হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড ব্যবস্থা—এ তিনটির যথাযথ ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

তথ্য ছাড়া তদন্ত সফল নয়

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাণিজ্য প্রতিকারমূলক তদন্তের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো তথ্য। বিদেশি পণ্য কত কম দামে বিক্রি হচ্ছে, তার ফলে দেশীয় উৎপাদন কতটা কমেছে, কত শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কত কমেছে বা বাজারের কত অংশ বিদেশি পণ্যের দখলে গেছে, এসব তথ্যই তদন্তের মূল ভিত্তি।

কিন্তু এসব তথ্য সরকারের বদলে থাকে মূলত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছে। তাই শিল্প খাতকে বাণিজ্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়, বিক্রি, বাজার হিস্যা, কর্মসংস্থান ও আর্থিক ক্ষতির তথ্য নিয়মিত সংরক্ষণ এবং ডাম্পিং বা ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্যের প্রবণতা সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অনেক শিল্প সমিতি এখনো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তথ্য সংরক্ষণ করে না। ফলে ক্ষতির অভিযোগ থাকলেও তা প্রমাণ করা কঠিন হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডব্লিউটিওকে না মানলেও আমাদের মানতে হবে। এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠনসহ যেসব প্রস্তাব বা সুপারিশ এসেছে, সেগুলো খারাপ নয়। এগুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্ত হওয়া কেন জরুরি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়। এতে অর্থনীতি, পরিসংখ্যান, হিসাববিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক আইনের সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সুপারিশ করেছে বিটিটিসি। সংস্থাটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটি নিরপেক্ষ ‘থিঙ্কট্যাংক’ হিসেবেও ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে।

বিটিটিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশে বাণিজ্য সুরক্ষা তদন্তের আইনি ভিত্তি থাকলেও কার্যকর প্রয়োগের জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য যাচাই, আন্তর্জাতিক শুনানিতে অংশ নেওয়া এবং ডব্লিউটিওর বিধান মেনে তদন্ত পরিচালনার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

অন্য দেশের অভিজ্ঞতা

প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্তে শিল্প খাতের সঙ্গে নিয়মিত তথ্য বিনিময় করে। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক তদন্ত শুরু হয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে। ভারতে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক ও আইনি বিশ্লেষণ তদন্তে ব্যবহার করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখনো তথ্য ভাগাভাগির সংস্কৃতি দুর্বল। অনেক ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছে প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যান নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাও নীতিনির্ধারণে নিয়মিত ব্যবহৃত হয় না। আবার সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। ফলে কোনো শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দ্রুত তদন্ত শুরু করা বা আন্তর্জাতিক মানের মামলা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির প্রথম আলোকে বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণ ও তার প্রভাব নিয়ে আমরা সচেতন। এ কারণে অনেক খাত নিয়ে কাজ করছি। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটকে নতুনভাবে সাজাচ্ছি। এ ছাড়া ডব্লিউটিওর নিয়মনীতিগুলো নিয়ে কাজ করার জন্য প্যানেল তৈরি এবং ইইউসহ অনেক দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।’

জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল কি গঠন করা হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক সুপারিশই অনেকে করছেন। সব বাস্তবায়ন করা যাবে না। যেসব প্রস্তুতি নিচ্ছি, আশা করছি এক বছরের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়বে।’

About Editor Todaynews24

Check Also

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের কাজ করছে। দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ ও ব্যবসা প্রসারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক এফআইসিসিআই বিনিয়োগ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *