সর্বশেষ খবর
Home / কলাম / নারী কর্মীদের বিদেশ যাওয়া কমে যাচ্ছে কেন
নারী কর্মীদের বিদেশ যাওয়া কমে যাচ্ছে কেন

নারী কর্মীদের বিদেশ যাওয়া কমে যাচ্ছে কেন

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতিটি সংকটে একটি শব্দ বারবার উচ্চারিত হয়—রেমিট্যান্স। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেলে, আমদানি ব্যয় বাড়লে কিংবা অর্থনীতি চাপের মুখে পড়লে প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো অর্থই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় ভরসা।

প্রবাসী আয়ের নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই রেমিট্যান্সের গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশি নারীদের যাত্রা ধারাবাহিকভাবে কমছে। অথচ বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্বেগ, নীতিগত বিতর্ক কিংবা জন-আলোচনা—কোনোটিই প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই।

একসময় সরকার নারী অভিবাসনকে নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য হ্রাস ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বিপদের সংকেত স্পষ্ট। ২০২২ সালে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গিয়েছিলেন ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ নারী। এক বছরের ব্যবধানে সে সংখ্যা নেমে আসে ৭৬ হাজার ১০৮-এ। ২০২৪ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৬১ হাজার ১৫৮ জনে। ২০২৫ সালে সামান্য বেড়ে ৬১ হাজার ৯৭৭ হলেও তা এখনো ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ কম।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া ১১ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশের মতো (তথ্যসূত্র: বিএমইটি, ২০২৬)। অথচ একই সময়ে সামগ্রিক শ্রম অভিবাসন উল্লেখযোগ্যভাবে অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ বিদেশে শ্রমিক যাচ্ছেন, কিন্তু নারী কর্মী যাচ্ছেন না। এই পতন নিছক বাজারের ওঠানামা কিংবা পরিসংখ্যানের পরিবর্তন নয়। এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজার, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতির একটি মৌলিক দুর্বলতার সংকেত। প্রশ্নটি তাই হওয়া উচিত—নারীরা কেন বিদেশে কম যাচ্ছেন? তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি এই পরিবর্তনকে সঠিকভাবে বুঝতে পারছে?

নিরাপত্তাহীনতা নয়, নীতির সীমাবদ্ধতাই মূল সমস্যা

বাংলাদেশে নারী অভিবাসন নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ সামনে আসে। বাস্তবতাও সেটিই বলে। গত এক দশকে সৌদি আরব, জর্ডান, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, বেতন না দেওয়া, পাসপোর্ট আটকে রাখা, জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা কিংবা অস্বাভাবিক মৃত্যুর বহু ঘটনা ঘটেছে। বহু নারী প্রতারিত হয়ে, নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। অনেকেই ফিরে এসেছেন ঋণের বোঝা নিয়ে, কেউ শারীরিকভাবে অসুস্থ, কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

এসব ঘটনা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ নয়; এগুলো রাষ্ট্রকে বিব্রত করেছে, সমাজে আতঙ্ক তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য নারী অভিবাসীদের কাছেও একটি নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। বহু পরিবার মেয়েদের বিদেশে পাঠাতে নিরুৎসাহিত হয়েছে। কিন্তু এখানেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভুলটি স্পষ্ট।

দুঃখজনকভাবে, নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নিয়ন্ত্রণ; সুরক্ষা নয়। তাই নিরাপত্তাহীনতার সমাধান হিসেবে আমরা নিরাপদ অভিবাসনের কাঠামো শক্তিশালী করিনি; বরং অতিরিক্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও নানা বিধিনিষেধ দিয়ে নারী কর্মীদের জন্য অভিবাসনকেই কঠিন করে তুলেছি বিভিন্ন সময়ে। কখনো বয়সসীমা-সংক্রান্ত শর্ত, কখনো প্রশাসনিক অনুমোদন, কখনো নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিনিষেধ—নীতির ভাষা হয়ে উঠেছে নিয়ন্ত্রণের ভাষা। যেন সমস্যার মূল কারণ বিদেশের শোষণ নয়; বরং নারীর বিদেশ যাওয়া।

বাংলাদেশের নারী শ্রম অভিবাসনের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো এর একমুখী চরিত্র। বিদেশগামী অধিকাংশ নারী এখনো গৃহকর্মী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে যান। সৌদি আরব, জর্ডান, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবানন—এই সীমিত বাজারের বাইরে আমরা কার্যকরভাবে নতুন গন্তব্য খুঁজে বের করতে পারিনি।

মৌলিকভাবে ভুল এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলে সমস্যার সমাধান হয়নি, হওয়ার কথাও নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের চলাচল সীমিত করা নয়; বরং তাঁর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। একজন নারী বিদেশে কাজ করতে চাইলে রাষ্ট্রের কাজ তাঁকে থামানো নয়, নিরাপদভাবে কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা।

সঠিক তথ্যের অভাব নীতিগত দুর্বলতাকে আরও প্রকট করেছে। বিদেশে গিয়ে নারী কর্মীরা কী কাজ করছেন, কত আয় করছেন, কতজন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, কতজন দক্ষতা বাড়িয়ে অন্য খাতে যাচ্ছেন, দেশে ফিরে কী করছেন—এসব বিষয়ে সমন্বিত ও উন্মুক্ত ডেটাবেজ এখনো নেই। ফলে নীতিনির্ধারণ অনেকাংশেই অনুমাননির্ভর থেকে যাচ্ছে।

প্রবাসী শ্রমিক

নারী অভিবাসন এখনো গৃহকর্মীর গণ্ডিতে বন্দী

বাংলাদেশের নারী শ্রম অভিবাসনের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো এর একমুখী চরিত্র। বিদেশগামী অধিকাংশ নারী এখনো গৃহকর্মী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে যান। সৌদি আরব, জর্ডান, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবানন—এই সীমিত বাজারের বাইরে আমরা কার্যকরভাবে নতুন গন্তব্য খুঁজে বের করতে পারিনি।

ফলে কোনো একটি দেশে চাহিদা কমে গেলে, রাজনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন হলে কিংবা নিয়োগনীতি বদলালে পুরো নারী অভিবাসনব্যবস্থাই সংকটে পড়ে। এটি কেবল বাজারের ঝুঁকি নয়; এটি নীতির ব্যর্থতা। গুটিকয় দেশের ওপর অতিনির্ভরতা কখনোই টেকসই অভিবাসননীতি হতে পারে না।

দক্ষতা আমাদের নারী কর্মীদের জন্য একটি বড় সীমাবদ্ধতা। বিদেশগামী নারী কর্মীদের বড় অংশের আনুষ্ঠানিক দক্ষতা সীমিত। ভাষাজ্ঞান দুর্বল, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ অপর্যাপ্ত, দক্ষতার স্বীকৃতি নেই। এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ঘাটতি। বিশ্বের শ্রমবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী বাড়ছে।

এসব দেশে স্বাস্থ্যসেবা, কেয়ার ইকোনমি, প্রবীণ পরিচর্যা, আতিথেয়তা, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা খাতে দক্ষ নারীর চাহিদা বাড়ছে। প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার, নার্সিং সহকারী, হোটেলকর্মী, প্রযুক্তিনির্ভর সেবাকর্মী এবং দক্ষ টেকনিক্যাল কর্মীদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ নারী কর্মী তৈরি করতে পারেনি। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি নারীরা মূলত নিম্ন দক্ষতার, কম মজুরির, ঝুঁকিপূর্ণ ও সীমিত সুযোগের কাজেই আটকে থাকছেন।

দক্ষতা ছাড়া মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন সম্ভব নয়। অথচ আমাদের অভিবাসননীতিতে শ্রমবাজার বিশ্লেষণের চেয়ে মানুষ পাঠানোর প্রবণতা বেশি। আমরা এখনো দক্ষতা নয়, সংখ্যাকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখি। যে দেশ উচ্চ আয়ের শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে চায়, তাকে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতেই হবে। শুধু বিমানবন্দরে বিদায় জানিয়ে, আরামপ্রদ লাউঞ্জ নির্মাণ করে কিংবা চমকপ্রদ রেমিট্যান্সের হিসাব প্রকাশ করে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

ফিরে আসা নারী কর্মীদের জন্যও রাষ্ট্রের দায় আছে

নারী অভিবাসনের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয় জড়িয়ে আছে—পুনর্বাসন। অভিবাসনকে আমরা এখনো বিদেশে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখি। অথচ অভিবাসন একটি পূর্ণ জীবনচক্র। বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসা হাজারো নারী নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন না।

সামাজিক কুসংস্কার, মানসিক আঘাত, আর্থিক অস্থিরতা এবং দক্ষতার স্বীকৃতির অভাবে তাঁরা আবার দারিদ্র্যের চক্রে ফিরে যান। তাঁদের দক্ষতার মূল্যায়ন হয় না, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সীমিত, পুনর্বাসন দুর্বল, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অনুপস্থিত। অর্থাৎ রাষ্ট্র বিদেশে যাওয়ার আগপর্যন্ত কিছুটা সক্রিয় থাকলেও ফিরে আসার পর প্রায় অনুপস্থিত। যেন বিদেশে কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রের দায়িত্বও শেষ। অথচ পুনর্বাসন কর্মসূচি হওয়া উচিত ছিল অভিবাসননীতির একটি বাধ্যতামূলক অংশ।

সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরছেন নারী গৃহকর্মীরা। ফাইল ছবি

প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

বাংলাদেশ এখন বছরে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স অর্জন করছে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সাফল্যের আলোচনায় নারী কর্মীদের অবদান প্রায় অদৃশ্য। অথচ বিভিন্ন গবেষণা বলছে, নারী অভিবাসীরা তাঁদের আয়ের বড় অংশ পরিবারে পাঠান, সন্তানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করেন এবং দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্র্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব পুরুষ অভিবাসীদের তুলনায়ও অনেক ক্ষেত্রে বেশি।

এত কিছুর পরও বাংলাদেশে নারী অভিবাসন নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকট পরিসংখ্যানের নয়, চিন্তার। আমাদের অভিবাসননীতিতে নারীদের প্রায়ই ‘ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী’ হিসেবে দেখা হয়, ‘অর্থনৈতিক সম্পদ’ হিসেবে নয়। ফলে নারী অভিবাসনবিষয়ক পুরো আলোচনাই ঘুরপাক খায় নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা কিংবা উদ্ধারকাজকে কেন্দ্র করে। কিন্তু খুব কম আলোচনা হয় বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রম অধিকার, উচ্চ মজুরির বাজার কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গঠনের বিষয়ে। আমরা নারী কর্মীদের সুরক্ষার কথা বলি, কিন্তু তাঁদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা কম বলি। আমরা তাঁদের বিদেশে পাঠাই, কিন্তু বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করি না। আমরা রেমিট্যান্সের অঙ্ক উদ্‌যাপন করি, কিন্তু সেই অঙ্ক তৈরির পেছনের নারীদের প্রায় ভুলেই যাই। এই মানসিকতা বদলানো ছাড়া নারী অভিবাসনের সংকট কাটবে না।

এখন কী করা দরকার

বাংলাদেশের বিদেশগামী নারী কর্মীদের জন্য নীতিগতভাবে এখন অন্তত ছয়টি বড় পরিবর্তন জরুরি:

প্রথমত, নারী অভিবাসনকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের গৃহকর্মী বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। নতুন গন্তব্য, নতুন দক্ষতা এবং নতুন পেশার দিকে কৌশলগতভাবে অগ্রসর হতে হবে। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য উচ্চ আয়ের দেশে দক্ষ নারী কর্মী পাঠানোর জন্য বিশেষ কৌশল নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বিদেশে যাওয়ার আগে নারী কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের ভাষাশিক্ষা, কেয়ারগিভিং, স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল দক্ষতা ও কারিগরি প্রশিক্ষণে বড় ধরনের সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দালালনির্ভরতা কমাতে হবে। স্বচ্ছ ও ডিজিটাল নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে অভিবাসন ব্যয় কমে এবং প্রতারণার ঝুঁকি হ্রাস পায়।

চতুর্থত, গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তিকে শুধু কর্মী পাঠানোর চুক্তি হিসেবে নয়, শ্রম অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা, অভিযোগ নিষ্পত্তি, বিমা, আইনি সহায়তা, এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের কাঠামো হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে।

পঞ্চমত, বিদেশফেরত নারী কর্মীদের পুনর্বাসনকে কল্যাণমূলক প্রকল্প নয়, অর্থনৈতিক পুনর্বিনিয়োগ কর্মসূচি হিসেবে দেখতে হবে। তাঁদের জন্য দক্ষতার স্বীকৃতি, সহজ ঋণ, উদ্যোক্তা সহায়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। পুনর্বাসন কর্মসূচিকে জাতীয় অভিবাসননীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।

ষষ্ঠত, নারী অভিবাসনকে সামাজিক কল্যাণের বিষয় হিসেবে নয়, জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নারীকে ঝুঁকি হিসেবে দেখার নীতি থেকে বের হয়ে সম্পদ হিসেবে দেখার নীতিতে যেতে হবে।

সবশেষে, বাংলাদেশের নারী কর্মীরা কেবল রেমিট্যান্স পাঠান না; তাঁরা বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, লাখো পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলেন এবং সমাজে নারীর সক্ষমতার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেন। তাঁদের পথ সংকুচিত হওয়া মানে বাংলাদেশের সম্ভাবনার পথ সংকুচিত হওয়া। বিদেশে নারী কর্মীদের সংখ্যা কমে যাওয়া কোনো অর্জন নয়। এই পতনের পেছনে রয়েছে ভয়, অনিরাপত্তা, দক্ষতার ঘাটতি, সীমিত শ্রমবাজার এবং নীতিগত অদূরদর্শিতা। সব মিলিয়ে এটি আত্মতুষ্টির নয়, আত্মসমালোচনার বিষয়। আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কি বিদেশে নারী পাঠানো কমিয়ে দেওয়াকেই সাফল্য ধরে নেব, নাকি নিরাপদ, দক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন নিশ্চিত করব?

আমরা বিদেশে মানুষ পাঠাই, কিন্তু শ্রমবাজার বিশ্লেষণ করি না। আমরা রেমিট্যান্স গুনি, কিন্তু দক্ষতায় বিনিয়োগ করি না। আমরা সমস্যা হলে উদ্ধার করি, কিন্তু সমস্যা হওয়ার আগেই প্রতিরোধ গড়ে তুলি না।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একটি হলো, বর্তমান নীতিকে সামান্য সংস্কার করে সমস্যাকে সাময়িকভাবে আড়াল করা। অন্য পথটি হলো, নারী অভিবাসনকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের কৌশল হিসেবে পুনর্বিবেচনা করা, যেখানে নারীরা শুধু রেমিট্যান্স আয়ের উৎস নন, তাঁরা দক্ষ মানবসম্পদ, বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রতিনিধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের চালিকা শক্তি। দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেওয়ার সময় এসেছে। কারণ, নিরাপদ, দক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ নারী অভিবাসন নিশ্চিত করা শুধু নারীর অধিকার রক্ষার প্রশ্ন নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষারও প্রশ্ন।

  • ড. সেলিম রেজা সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক, সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

    মতামত লেখকের নিজস্ব

About Editor Todaynews24

Check Also

ইসরায়েল ও ইউরোপের ডানপন্থীদের নতুন সাংস্কৃতিক যুদ্ধ

ইসরায়েল ও ইউরোপের ডানপন্থীদের নতুন সাংস্কৃতিক যুদ্ধ

এটি আলোচনাকে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার দিক থেকে সরিয়ে যারা সমালোচনা করছে তাদের পরিচয়ের দিকে ঘুরিয়ে দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *