সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / ধর্ম ও দর্শনের মেলবন্ধনে কী ছিল ইবনে রুশদের দাবি
ধর্ম ও দর্শনের মেলবন্ধনে কী ছিল ইবনে রুশদের দাবি

ধর্ম ও দর্শনের মেলবন্ধনে কী ছিল ইবনে রুশদের দাবি

স্পেনের কর্দোবা নগরী ছিল তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম সেরা বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এই কর্দোবায় ১১২৬ খ্রিষ্টাব্দে (৫২০ হিজরি) জন্মগ্রহণ করেন ইসলামি চিন্তা ও দর্শনের অন্যতম পুরুষ আবু আল-ওয়ালিদ মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে রুশদ, যিনি পশ্চিমা বিশ্বে ‘অ্যাভারোস’ নামে সমধিক পরিচিত। 

তিনি এমন এক আভিজাত্যপূর্ণ পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন যা বংশপরম্পরায় জ্ঞানচর্চা, ইসলামি ফিকহ ও বিচারকার্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। তাঁর পিতা ও পিতামহ উভয়েই ছিলেন কর্দোবার প্রধান বিচারপতি (কাজি)।

নিজ পরিবারে তিনি মালিকি ফিকহের পাঠ গ্রহণ করেন এবং ইমাম মালিকের মুয়াত্তা গ্রন্থটি মুখস্থ করে পিতার থেকে হাদিস বর্ণনার সনদ লাভ করেন। (বিদায়াতুল মুজতাহিদ ওয়া নিহায়াতুল মুকতাসিদ, ১/১৫, দারুস সালাম, কায়রো, ২০০০)

পাশাপাশি তিনি আশআরি কালামশাস্ত্র, চিকিৎসা, গণিত, যুক্তিবিদ্যা এবং দর্শনে অগাধ পণ্ডিত্য অর্জন করেন। ১১৯৮ খ্রিষ্টাব্দে মরক্কোর মারাকেশে মৃত্যুবরণ করেন। পরে এই মহামতি মনীষীকে নিজ জন্মভূমি কর্দোবায় এনে সমাহিত করা হয়।

ইবনে রুশদের মেধা ও দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে মুওয়াহহিদুন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাকর্তা শাসক আবদুল মুমিন ইবনে আলি তাঁকে মারাকেশে আমন্ত্রণ জানান স্পেনের আদলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য।

মারাকেশের রাজদরবারে আমন্ত্রণ

ইবনে রুশদ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে ‘মহাভাষ্যকার’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের কালজয়ী গ্রন্থগুলোর অত্যন্ত নির্ভুল ও গভীর ব্যাখ্যা উপস্থাপন করার জন্য। এছাড়া তিনি প্লেটোর বিখ্যাত গ্রন্থ রিপাবলিক গ্রন্থের চমৎকার সারসংক্ষেপও রচনা করেছিলেন।

ইবনে রুশদের মেধা ও দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে মুওয়াহহিদুন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাকর্তা শাসক আবদুল মুমিন ইবনে আলি তাঁকে মারাকেশে আমন্ত্রণ জানান স্পেনের আদলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য। পরে খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফ ইবনে আবদুল মুমিনের আমলে দার্শনিক ইবনে তোফাইলের মাধ্যমে ইবনে রুশদ রাজদরবারে পরিচিত হন।

খলিফা তাঁকে সম্মানজনক উপহার দেন এবং এরিস্টটলের বইগুলোর ব্যাখ্যা লেখার দায়িত্ব অর্পণ করেন।

বই পোড়ানোর ট্র্যাজেডি

পণ্ডিতদের জীবনের সঙ্গে রাজক্ষমতার সম্পর্ক বরাবরই কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। খলিফা আবু ইউসুফ ইয়াকুব আল-মানসুরের আমলেও ইবনে রুশদের উচ্চ মর্যাদা বহাল ছিল, কিন্তু ঈর্ষান্বিত ফকিহ ও রক্ষণশীল মহলের চক্রান্তে তাঁর জীবনে নেমে আসে ঘোর দুর্যোগ।

প্রতিপক্ষরা খলিফার কাছে ইবনে রুশদের বিরুদ্ধে নাস্তিকতা ও গ্রিক দর্শনে অন্ধ অনুরাগের মিথ্যা অভিযোগ তোলে। খলিফা রাজনৈতিক কারণে ওলামা ও সাধারণ মানুষকে সন্তুষ্ট রাখতে তাঁকে ইহুদি অধ্যুষিত এলাকা ‘আল-ইউসুফিয়াহ’-তে নির্বাসিত করেন এবং তাঁর দর্শন বিষয়ক গ্রন্থগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।

অবশ্য জীবনের শেষভাগে খলিফা নিজের ভুল বুঝতে পেরে ইবনে রুশদের ওপর থেকে নির্বাসন তুলে নেন এবং তাঁকে রাজক্ষমা করেন, যদিও তার কিছুদিন পরই এই জ্ঞানসাধক মৃত্যুবরণ করেন।

ধর্ম ও দর্শনের সমন্বয়

ইবনে রুশদের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তি ছিল ইসলামি শরিয়ত এবং যুক্তিদর্শনের মধ্যকার কৃত্রিম বিরোধ দূর করে এ দুয়ের চমৎকার সমন্বয়সাধন করা। ফকিহদের একাংশ দর্শন চর্চাকে কুফরি বা ধর্মের জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করতেন।

এর জবাবে ইবনে রুশদ তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফাসলুল মাকাল’-এ প্রমাণ করেন যে খাঁটি যুক্তিদর্শন এবং আসমানি বিধানের মধ্যে কোনো অমিল থাকতে পারে না।

ইবনে রুশদ তাঁর এই সমন্বয়বাদী আলোচনার ভিত্তি স্থাপন করেন তিনটি মৌলিক নীতিমালার ওপর:

দর্শনচর্চা শরিয়তেরই নির্দেশ: শরিয়ত মানুষকে সৃষ্টিজগৎ ও আল্লাহ সম্পর্কে গভীর চিন্তাভাবনা ও যুক্তিভিত্তিক অনুধ্যানের নির্দেশ দেয়। কোরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, “অতএব হে দৃষ্টিমানেরা, তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো” (সুরা হাশর, আয়াত: ২)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “তারা কি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সার্বভৌম ক্ষমতা এবং আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা পর্যবেক্ষণ করে দেখে না?” (সুরা আ’রাফ, আয়াত: ১৮৫)

ইবনে রুশদ যুক্তি দেন যে বিশ্বজগৎ পর্যবেক্ষণ ও বিবেচনা করার অর্থই হলো জানা বিষয় থেকে অজানা বিষয়কে জানার জন্য বুদ্ধি প্রয়োগ করা, আর এটিই তো দর্শনের মূল কাজ। ফলে শরিয়তের দৃষ্টিতে দর্শনচর্চা শুধু বৈধই নয়, বরং এক ধরনের ধর্মীয় কর্তব্য। (ইবনে রুশদ, ফাসলুল মাকাল ফি মা বাইনাল হিকমাতি ওয়াশ-শরিয়াহ মিনাল ইত্তিসাল, পৃষ্ঠা: ২৫, দারুল মাশরিক, বৈরুত, ১৯৯৯)

শরিয়তের সাধারণ ও গভীর রূপ: ধর্মীয় পাঠ্যের দুটি রূপ রয়েছে—একটিকে বলা হয় প্রকাশ্য অর্থ, আর অন্যটি হলো গূঢ় অর্থ। সাধারণ মানুষ জটিল রূপক না বুঝে প্রকাশ্য অর্থে বিশ্বাস করবে, কিন্তু গভীর প্রজ্ঞাবান আলেমগণ রূপক ও গূঢ় অর্থ ব্যাখ্যার মাধ্যমে অনুধাবন করবেন।

ইবনে রুশদ স্পষ্ট করে বলেন, কোনো বিষয়ে যদি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট সত্য অর্জিত হয় এবং আপাতদৃষ্টিতে শরিয়তের কোনো পাঠ্যের বাহ্যিক অর্থের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক মনে হয়, তবে বুঝতে হবে সেই বাহ্যিক অর্থটি রূপক। সে ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক সত্যের আলোকে তার ব্যাখ্যা (তাবিল) করতে হবে।

কারণ “সত্য কখনো অপর সত্যের বিরোধী হতে পারে না, বরং সত্য সত্যের সত্যায়ন করে এবং তার অনুগামী হয়।” (ইবনে রুশদ, ফাসলুল মাকাল ফি মা বাইনাল হিকমাতি ওয়াশ-শরিয়াহ মিনাল ইত্তিসাল, পৃষ্ঠা: ৩১, দারুল মাশরিক, বৈরুত, ১৯৯৯)

তিনি বিশ্বকে শিখিয়েছেন যে গভীর ধর্মীয় নিষ্ঠা এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা দুটি বিপরীতমুখী বিষয় নয়। পরে তাঁর আলোকিত চিন্তা ইউরোপে রেনেসাঁ বা নবজাগরণের ভিত্তি নির্মাণ করেছিল, যা ইতিহাসে ‘অ্যাভারোইজম’ নামে খ্যাতি পায়।

ইমাম গাজালির সঙ্গে বিতর্ক

ইবনে রুশদের আরেকটি কাজ ছিল দর্শনের ওপর ইমাম গাজালির আক্রমণের জবাব দেওয়া।

ইমাম গাজালি তাঁর তাহাফুতুল ফালাসিফাহ (দার্শনিকদের অসংলগ্নতা) গ্রন্থে প্রাচীন দার্শনিকদের আক্রমণ করে বিশটি বিষয়ে তাঁদের ভুল ধরেন এবং তিনটি বিষয়ে (বিশ্বজগতের অনাদিত্ব, আল্লাহর শুধু সার্বিক বিষয় জানার দাবি এবং শারীরিক পুনরুত্থানের অস্বীকৃতি) তাঁদের ধারণাকে ইসলামি বিশ্বাসের পরিপন্থী আখ্যা দেন। (আল-গাজালি, তাহাফুতুল ফালাসিফাহ, পৃষ্ঠা: ৭২, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৫৮)

ইবনে রুশদ ইমাম গাজালির এই গ্রন্থের জবাব দিয়ে লেখেন তাহাফুতুত তাহাফুত (অসংলগ্নতার অসংলগ্নতা)।

সেখানে তিনি বিনয়ের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে দেখান যে গাজালি দার্শনিকদের মূল বক্তব্য পুরোপুরি না বুঝে তাঁদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেন যে আল্লাহবিশ্বাসী সত্য দর্শন কখনোই ধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং তা ধর্মেরই সহায়তাকারী। (ইবনে রুশদ, তাহাফুতুত তাহাফুত, ১/১০২, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৬৪)

চিরন্তন আলোর মিনার

ইবনে রুশদ শুধু অতীত ঐতিহ্যের সংরক্ষক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার এক নির্ভীক প্রতীক। তিনি বিশ্বকে শিখিয়েছেন যে গভীর ধর্মীয় নিষ্ঠা এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা দুটি বিপরীতমুখী বিষয় নয়। পরে তাঁর আলোকিত চিন্তা ইউরোপে রেনেসাঁ বা নবজাগরণের ভিত্তি নির্মাণ করেছিল, যা ইতিহাসে ‘অ্যাভারোইজম’ নামে খ্যাতি পায়।

আজ যখন বিজ্ঞান, আধুনিকতা ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন ওঠে, তখন ইবনে রুশদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারে।

About Editor Todaynews24

Check Also

আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে রাজুকে গুলি করে আনসার-পুলিশ: জবানবন্দিতে রকিবুল

আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে রাজুকে গুলি করে আনসার-পুলিশ: জবানবন্দিতে রকিবুল

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় পুলিশ সদস্যরা আন্দোলনকারী রাজু আহম্মেদকে ঘিরে ধরেছিলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন সাক্ষী মো. রকিবুল ইসলাম। রাজুর চাচাতো ভাই রকিবুল জবানবন্দিতে বলেন, তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে রাজুর পায়ে একজন আনসার সদস্য গুলি করেন। পরে একজন পুলিশ সদস্য এসে রাজুর পিঠের বাঁ দিকে গুলি করেন। রাজু তখন পড়ে যান।আন্তর্জাতিক অপরাধ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *