সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / গ্রামের উঠান থেকে লাখো মানুষের হৃদয়ে রাহেদুল
গ্রামের উঠান থেকে লাখো মানুষের হৃদয়ে রাহেদুল

গ্রামের উঠান থেকে লাখো মানুষের হৃদয়ে রাহেদুল

একটি মাটির উঠান। চুলায় জ্বলছে আগুন। পাশে টাটকা মাছ, লাউ আর কাঁচা মরিচ। রান্না করছেন এক তরুণ। কিন্তু তাঁর হাতের প্রতিটি ভঙ্গি যেন নৃত্যের অংশ। সেই দৃশ্যই থামিয়ে দেয় লাখো দর্শককে। রংপুরের পীরগাছার প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে রাহেদুল ইসলাম ওরফে নাহিদের ভিডিও এখন শুধু রান্নার নয়, গ্রামবাংলার জীবন, স্মৃতি ও শৈল্পিকতার এক অনন্য দলিল। তাঁর এমন ভিডিওই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে লাখো মানুষের হৃদয়ে।

পীরগাছার কল্যাণী ইউনিয়নের হরগোবিন্দ গ্রামের রাহেদুল ইসলাম এখন বাংলাদেশের পরিচিত গ্রামীণ কনটেন্ট নির্মাতাদের একজন। ‘নাহিদ অফিসিয়াল’ নামে তাঁর ফেসবুক পেজে অনুসারী প্রায় ৩১ লাখ। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁর ভিডিওর মোট ভিউ ছাড়িয়েছে এক শ কোটির বেশি। অনেক ভিডিওই দেখেছেন কয়েক কোটি মানুষ।

রাহেদুলের জনপ্রিয়তার এই গল্প ক্যামেরা দিয়ে শুরু হয়নি। শুরু হয়েছিল নাচ দিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দর্শকেরা তাঁকে ‘ড্যান্সিং কুক’ বলেই চেনেন। কারণ, তাঁর ভিডিওতে রান্নার প্রতিটি মুহূর্ত যেন একটি নৃত্য পরিবেশনা। হাঁড়ি ধোয়া, সবজি কাটা, মসলা বাটা বা মাটির চুলায় আগুন জ্বালানো—সবকিছুতেই থাকে এক অদ্ভুত ছন্দ।
রাহেদুলের সঙ্গে কথা হয়, তাঁর সেই পরিচিত মাটির রান্নাঘরেই। চুলায় তখন ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে। কড়াইয়ে ফুটছে মাছের ঝোল। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে কখনো মসলা বাটেন, কখনো চুলায় কাঠ ঠেলে দেন তিনি। ১৯৯৭ সালে জন্ম তাঁর। বাবা মৃত আবদুস সামাদ ছিলেন এলাকার একটি প্রভাবশালী পরিবারের বড় ছেলে। দাদার রেখে যাওয়া জমির ২৫ বিঘা অংশ ভাগে পেয়েছিল তাঁদের পরিবার। চার বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। একসময় সংসারে অভাব ছিল না, ছিল সচ্ছলতা আর নিশ্চিন্ত জীবন। তাঁর জন্মের পরই যেন ভাগ্যের চাকা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে। জন্মের কিছুদিন পর এক দুর্ঘটনায় তাঁর মা সুফিয়া বেগম মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ছোট্ট রাহেদুলকে বুকে আগলে বড় করেন দাদি সোবাতন নেছা। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে সংসার সামলাতে গিয়ে বাবা একের পর এক বিক্রি করতে থাকেন পৈতৃক সম্পত্তি। ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যায় জমি।

২০১৫ সালে, রাহেদুলের বয়স তখন ১৮ বছর, সেই সময় তাঁদের পরিবারের সম্বল বলতে ছিল শুধু বসতভিটা। বড় ভাই সুমনের আয় আর বাবা মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে যে সামান্য সম্মানী পেতেন, তা দিয়েই কোনোমতে চলত সংসার। একপর্যায়ে অভাবে থেমে যাওয়ার উপক্রম হয় লেখাপড়া। অনেক কষ্টে বাবার আয়ের টাকায় আবার পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। অভাব, অবহেলা আর বৈষম্য তাঁকে প্রতিদিন ভেতর থেকে পোড়াত।

স্মৃতিচারণা করে রাহেদুল আরও বলেন, সংগ্রামের মধ্যেই ২০১৪ সালে এসএসসি পাস করেন তিনি। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই গান, নাচ ও সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু নিজের পরিবারের ভাঙন, দারিদ্র্য আর অসহায়ত্বের সামনে সেই প্রতিবাদ অনেক সময় বুকের ভেতরেই চাপা পড়ে থাকত। এসএসসি পাসের পর, ২০১৪ সালের শেষ দিকে, বুকভরা স্বপ্ন আর না-বলা কষ্ট নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন তিনি। ভর্তি হন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। রাজধানীতে শুরু হয় জীবনের আরও কঠিন অধ্যায়। প্রথমে আশ্রয় মেলে খালার বাসায়। একসময় সেখানেও অস্বস্তি তৈরি হয়। সারা দিন বাইরে থাকতাম। রাতে ফিরে খালাকে বলতাম, টিউশনি করছি। টাকা পেলেই সংসারের খরচ দেব। তখনো কোনো টিউশনি পাননি তিনি। সেই দুশ্চিন্তার দিনগুলোতে একজন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি তাঁর সংগ্রামের কথা শুনে কয়েক মাস আর্থিক সহায়তা করেন। এরপর জোটে টিউশনি। ধীরে ধীরে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে প্রতি মাসে কিছু টাকা বাড়িতে পাঠাতে শুরু করেন। টাকা পেয়ে মা–বাবা খুব খুশি হতেন।। ছবি: প্রথম আলো

রান্নার কাজে ব্যস্ত রাহেদুল ইসলাম। সম্প্রতি রংপুরের পীরগাছা উপজেলার হরগোবিন্দ গ্রামে

ঢাকায় একা থাকায় নিজের রান্নাও নিজেকেই করতে হতো। তখনো রাহেদুল জানতেন না জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় একদিন এই রান্নাঘর থেকেই তৈরি হবে। ২০২৩ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, শুধু রান্না নয়; গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর হারিয়ে যেতে বসা জীবনযাপনকে ক্যামেরায় তুলে ধরবেন। টিউশনির জমানো টাকা দিয়ে শুরু করেন ভিডিও নির্মাণ। প্রতিটি ভিডিওর পেছনে ছিল অগণিত পরিশ্রম, ধৈর্য আর প্রবল আকাঙ্ক্ষা। ২০২৪ সালে বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারেননি তিনি। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও তেমন সাড়া মেলেনি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার অভাবেই বাবাকে হারান।

কথাগুলো বলতে বলতে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যান রাহেদুল। চুলায় তখনো আগুন জ্বলছে, হাঁড়িতে ফুটছে ঝোল। বাবাকে হারানোর সেই শোকের মধ্যেই অদ্ভুত এক মোড় নেয় তাঁর জীবন। একের পর এক ভাইরাল হতে শুরু করে রান্নার ভিডিও। আজ সেই ভিডিও দেখেন লাখ লাখ মানুষ। কনটেন্ট নির্মাণই এখন তাঁর পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। যে ছেলে একদিন বাবার চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে পারেননি, আজ তিনিই পরিবারের ভরণপোষণ, চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত হওয়ার বহু আগে রাহেদুল ভরতনাট্যম নাচের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ছায়ানটে শেখা সেই শাস্ত্রীয় নৃত্যের তাল, লয়, শৃঙ্খলা আর নিখুঁত অঙ্গভঙ্গিই আজ তাঁর রান্নার ভিডিওকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে। হয়তো এ কারণেই তাঁর প্রতিটি ভিডিওতে শুধু রান্নার সুবাস নেই; আছে হারিয়ে যাওয়া শৈশব, মায়ের নীরবতা, বাবার অসমাপ্ত সংগ্রাম, দারিদ্র্যের দীর্ঘশ্বাস আর এক তরুণের অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

কোটি মানুষের ভালোবাসা পেয়েও রাহেদুলের সবচেয়ে বড় ভয়, একদিন যদি হ্যাকড হয় তাঁর ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল। তখন তিনি কী করবেন। কারণ, এই আয়েই তো চলে তাঁর পরিবারের ১০ সদস্যের সংসার। ছোটবেলার দারিদ্র্য আজও তাঁকে তাড়া করে ফেরে।

ভিডিও দেখে রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া নুর আলম বলেন, ‘রাহেদুলের ভিডিওর শুরুতেই সাধারণত রান্না হয় না। প্রথমে দেখা যায় তিনি উঠান ঝাড়ু দিচ্ছেন। হাঁড়িপাতিল ধুচ্ছেন। রান্নার জায়গা পরিষ্কার করছেন। মাটির মেঝে নতুন করে লেপা হচ্ছে। এরপর একে একে সাজানো হচ্ছে রান্নার উপকরণ। এই দীর্ঘ প্রস্তুতিও তাঁর ভিডিওর অন্যতম আকর্ষণ। ভিডিওগুলো দেখলে গ্রামের বাড়ির কথা মনে পড়ে।’

রাহেদুলের এই সাফল্যকে এলাকার জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। কল্যাণী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আবদুল হামিদ বলেন, রাহেদুল শুধু একজন কনটেন্ট নির্মাতা নন, তিনি তাঁদের এলাকার গর্ব। তিনি ভিডিওর মাধ্যমে গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনযাপন দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। তরুণদের জন্যও তিনি অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে গ্রামের মাটি থেকেও বিশ্বমঞ্চে পৌঁছানো সম্ভব।

তবে রাহেদুলের সাফল্যের মধ্যেই আসে বড় ধাক্কা। একদিন তাঁর ইউটিউব চ্যানেল হ্যাকড হয়। বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা ভিডিও, দর্শক আর আয়ের উৎস—সবকিছুই মুহূর্তে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরে চ্যানেল ফিরে পেলেও তাঁর বিশ্বাস, ওই ঘটনায় তিনি অনেকটা পিছিয়ে পড়েন।

কোটি মানুষের ভালোবাসা পেয়েও রাহেদুলের সবচেয়ে বড় ভয়, একদিন যদি হ্যাকড হয় তাঁর ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল। তখন তিনি কী করবেন। কারণ, এই আয়েই তো চলে তাঁর পরিবারের ১০ সদস্যের সংসার। ছোটবেলার দারিদ্র্য আজও তাঁকে তাড়া করে ফেরে। আর কখনো যেন সেই অভাবের দিনগুলো ফিরে না আসে—সেই স্বপ্ন নিয়েই প্রতিদিন আবার জ্বলে ওঠে তাঁর মাটির চুলা, আর নতুন আরেক গল্প ছড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষের হৃদয়ে।

About Editor Todaynews24

Check Also

প্রতীকী কবর, ভাস্কর্যসহ যা যা দেখা যাবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে

প্রতীকী কবর, ভাস্কর্যসহ যা যা দেখা যাবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে

দুই বছর আগেও রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ১৭ একর জায়গার ওপর এই আবাসিক ভবনের নাম ছিল ‘গণভবন’। এটি ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন। ছাত্র–জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দোর্দণ্ড প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বাসভবন ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এর পরপরই হাজারো বিক্ষুব্ধ জনতা ভবনটিতে ঢুকে লন্ডভন্ড করে দেন। ভবনটি এখন ‘জুলাই ৩৬…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *