সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / গুলিবিদ্ধ শিশু কাউছার এখন চতুর্থ শ্রেণিতে, দুই বছরেও গেজেটে ওঠেনি নাম
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে উত্তরায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিল তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র কাউছার খাঁ। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আহত জুলাই যোদ্ধা হিসেবে সরকারি গেজেটে নাম না ওঠায় কোনো সরকারি সহায়তা পায়নি কাউছারের পরিবার।

গুলিবিদ্ধ শিশু কাউছার এখন চতুর্থ শ্রেণিতে, দুই বছরেও গেজেটে ওঠেনি নাম

২০২৪ সালের ৩০ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গুলিবিদ্ধ এক শিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে চুমু দেন এবং ওই শিশুর সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

তখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ–সংক্রান্ত ছবি প্রচারিত হয়। ছবির ওই শিশুর নাম কাউছার খাঁ। তখন সে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিল। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই উত্তরার ৮ নম্বর সেক্টরে পূবালী ব্যাংকের সামনে তার মেরুদণ্ডের হাড়ের কাছে গুলি লেগে সামনের পেট দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের দেওয়া ছাড়পত্র অনুযায়ী, কাউছার ১৯ জুলাই থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ছিল। ছাড়পত্রে ‘গানশট ইনজুরি’র কথাও লেখা আছে।

এই কাউছার খাঁর নাম এখনো জুলাই যোদ্ধা হিসেবে সরকারের গেজেটে ওঠেনি। কাউছারের বাবা মনর খাঁ বাসাবাড়ির ময়লা ফেলার গাড়িতে দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে কাজ করেন। গতকাল মঙ্গলবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকা-সিলেটের ডিসি অফিসসহ বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াইছি। আর কত জায়গায় দৌড়াব? দৌড়াইতে তো টাকাও লাগে। গ্রামের বাড়ি, আমার বস্তিতেও লোকজন আইস্যা ইনকুয়ারি কইরা গেছে। তারপরও কিছু হয় নাই। আমি গরিব মানুষ; এত কিছু তো বুঝিও না।’

মনর খাঁ স্ত্রী রিনা বেগম দুই ছেলেকে নিয়ে আবদুল্লাহপুরের কাছে এক বস্তিতে থাকেন। একসময় দেশের বাইরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সিলেটের ওসমানীনগর থানায় বাড়িতে বাবার কাছে টাকা পাঠাতেন। তবে দেশে ফেরার পর জানতে পারেন, তাঁর পাঠানো সব টাকা খরচ করে ফেলা হয়েছে। প্রায় ১১ বছর আগে রাগ করে সিলেট থেকে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। ১৬ বছর বয়সী বড় ছেলেও মাঝেমধ্যে বাবার সঙ্গে ময়লার গাড়িতে কাজ করে, কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করে। ছোট ছেলে কাউছারকে আবদুল্লাহপুরের এক স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। এখন কাউছার পড়ছে চতুর্থ শ্রেণিতে।

মনর খাঁ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কোনো রাজনীতি করি না। পেটনীতি করি, কাজ করে খাই। আমার ছেলেসহ ছাত্রদের যেভাবে গুলি করা হইছিল, তা ছিল নজিরবিহীন ঘটনা। আমার ছেলেরও তো আন্দোলন বোঝার বয়স হয় নাই। তারপরও গুলি লাগছে তার শরীরে। গুলিটা মেরুদণ্ডে না লাগায় ছেলে জানে বেঁচে গেছে। এ নিয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান মনর খাঁ।

মনর খাঁ জানান, আহত যোদ্ধা হিসেবে গেজেটে ছেলের নাম নেই, তাই সরকারি সহায়তা পাননি। বেসরকারি জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকেও কোনো সহায়তা পাননি। শেখ হাসিনা হাসপাতালে দেখতে গিয়ে খামের মধ্যে ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন ছেলেকে ‘ফলফ্রুট’ খাওয়ানোর জন্য। এলাকার এক এমপি পাঁচ হাজার দেন। এর বাইরে ফেসবুকভিত্তিক জুলাই রেভোল্যুশনালি অ্যালায়েন্সের প্রেসিডেন্ট সালেহ মাহমুদ রায়হান বিভিন্ন সময় আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি গেজেটে নাম তোলার জন্য বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের ঘটনার কথা উল্লেখ করে মনর খাঁ বলেন, ‘আহ, কী যে দিন গেছে, মরার আগ দিন পর্যন্ত মনে থাকব।’ তিনি জানান, সেদিন দুপুরে কাউছার ভাত খাচ্ছিল। ছেলের বয়সী কয়েকজন এসে আন্দোলনের কথা জানায়। কাউছার ভাত না খেয়েই বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। তারপর ছাত্ররা তাঁকে ফোন করে খবর দেন, ছেলের শরীরে গুলি লেগেছে। মুঠোফোনে ছেলের ছবি ছিল। বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে সেই ছবি দেখিয়ে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে ছেলেকে খুঁজে পান। তবে ওই হাসপাতালে ছেলের চিকিৎসা হয়নি। সেখান থেকে অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতাল, শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে নেওয়া হলে ভর্তিও নেয়নি। তারপর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গেলে সেখানকার চিকিৎসকেরা একমুহূর্ত দেরি না করে চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। সরকারিভাবে চিকিৎসা হওয়ার কথা থাকলেও হাসপাতালের বিভিন্ন ওষুধ কিনে দিতে হয়েছে। তখন চিকিৎসা, হাসপাতালে থাকা, যাতায়াতসহ সব মিলে খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। ধারদেনা করার পাশাপাশি সুদে স্থানীয় এক সমিতি থেকে ঋণ নিয়েছেন। হাসপাতাল ছাড়ার পরও ফলোআপের জন্য বিভিন্ন সময় চিকিৎসক দেখানো, ছেলেকে একটু ভালো খাবার খাওয়ানোসহ খরচের তো শেষ নেই।

গেজেটে নাম তোলার ক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়, তা জানতে চাইলে মনর খাঁ বলেন, ছেলের জন্মনিবন্ধন সনদ ছিল না। শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালানোর পর এলাকায় চেয়ারম্যান, মেম্বার কেউ নেই। জন্মনিবন্ধনের কাগজ পেতেই কয়েক মাস লেগে যায়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেলে জানায়, সার্ভার বন্ধ। এভাবে বিভিন্ন দপ্তরে নাম তালিকাভুক্তির আবেদনের জন্য ঘুরেছেন তিনি।

গত বছরের ১১ আগস্ট ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সিলেট জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনটি আবেদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মনর খাঁ জানান, এ তিন আবেদনের একটি হলো তাঁর ছেলের আবেদন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে দেখা করেছিলেন মনর খাঁ। এই প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপে আদিলুর রহমান খানের সঙ্গে ছেলের একটি ছবিও পাঠিয়েছেন মনর খাঁ। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করার পরও কোথায় যে গেজেটে নাম তোলার বিষয়টি আটকে আছে, তা মনর খাঁ জানেন না বলে প্রথম আলোকে বলেন।

মনর খাঁর মুঠোফোনেই কথা হলো কাউছারের সঙ্গে। কাউছার বলে, ‘বন্ধুরা বলতেছিল আন্দোলন হইতেছে। ভাত খাওয়া শেষ না কইরা বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলন দেখতে যাই। গুলাগুলি লাগলে আমি দৌড় দিতে পারি নাই। খালি মনে আছে, কী যেন আইস্যা আমারে উড়াইয়্যা নিয়া গেল। দুই ছাত্র কোলে কইরা আমারে হাসপাতালে নেয়।’

About Editor Todaynews24

Check Also

মন খারাপ হলেই খাবার? জেন–জির ‘ইমোশনাল ইটিং’ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ

পরীক্ষা খারাপ হয়েছে? চলুন, একটা পাস্তা খেয়ে আসি। বন্ধুর সঙ্গে মনোমালিন্য? এক স্কুপ আইসক্রিম হয়তো মনটা একটু ভালো করে দেবে। আবার কোনো কোনো দিন বিশেষ কোনো কারণই নেই, তবু হঠাৎ করেই বার্গার, পিৎজা কিংবা ওয়াফল খেতে ইচ্ছা করে। শুধু ক্ষুধা মেটানোর জন্য নয়, বরং মন ভালো করার জন্য খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ার এই প্রবণতার নাম…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *