কাব্যে কালজয়ী প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সাহিত্যাঙ্গনে বিশ্বকবিরূপে আসীন করেছে। তিনি শুধু বাংলা সাহিত্যের কবিদের নয়, বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় প্রতিষ্ঠিত কবিদেরও গুরু। কাব্য চর্চা করে প্রথম এশিয়ান হিসেবে ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
উপমহাদেশে গুরুদেব বলতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেই বোঝায়। তাঁর এই পরিচিতি বহির্বিশ্বের সুধী সমাজেও পরিব্যাপ্ত। তিনি বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর কাব্যপ্রতিভা স্ফুরিত হয়; যা সুদীর্ঘ সাত দশকের অধিক সময় বিকশিত হয়ে বাংলা কাব্যসাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্য অঙ্গনে মর্যাদার আসনে আসীন করেছে।
কবিগুরুর সুবিশাল সাহিত্যকীর্তির মধ্যে কাব্যরচনাই শীর্ষে। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৫৬টি। বিশাল কাব্যসৃষ্টি ছাড়াও সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাঁর সাফল্য সবার শীর্ষে। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, নাট্যকার, ভ্রমণকাহিনিকার, প্রাবন্ধিক ও পত্রলেখক। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও তিনি রেখেছেন অসামান্য অবদান। তিনি গীতিকার, সুরকার, গায়ক, অভিনেতা ও চিত্রকর। সংগীতে করেছেন নতুন ধারার সূচনা।
সাহিত্য–সংস্কৃতির বাইরেও রবীন্দ্রপ্রতিভা বিস্তৃত। তিনি একাধারে সমাজসেবী, সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক, সর্বোপরি মানবতাবাদী দার্শনিক। শিক্ষা ও কৃষির ক্ষেত্রে তিনি যে চিন্তাভাবনা করে গেছেন তা শতবর্ষ পরে এসেও প্রাসঙ্গিক ও ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ উপযোগী। তিনি জমিদার ছিলেন। জমিদারি পরিচালনার জন্য তাঁকে আসতে হয়েছিল গ্রামবাংলার সান্নিধ্যে। গ্রামীণ বাংলার সমস্যা চিহ্নিত করে তা নিরসনকল্পে যে কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বা সমাধানের পথ বাতলে গেছেন, বাংলাদেশের গ্রামোন্নয়নে বর্তমানেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
রবীন্দ্রনাথের জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকোর প্রভাবশালী ও অভিজাত ঠাকুর পরিবারে। বিত্তশালী এই পরিবারের চৌদ্দ সন্তানের মধ্যে তিনি অষ্টম। তাঁর পিতা রাজা রামমোহন রায় সূচিত নবজাগরণ আন্দোলনের প্রভাবে জাগ্রত বাঙালি সমাজের অগ্রগণ্য ব্যক্তি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর রামমোহনের বন্ধু। তাঁর পরিবারের সবাই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন এবং শিক্ষার্জন করেছেন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ভর্তি করানো হয় কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে। এরপর পাঠানো হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নর্মাল স্কুলে ও তারপর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্সে। কিন্তু দুটি কারণে এখানে তাঁর পড়াশোনা হয়নি। এক. অনিয়মিত উপস্থিতি। দুই. প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতি তাঁর ভালো লাগেনি। এই ভালো না লাগাই পরবর্তী জীবনে তাঁকে শিক্ষা সংস্কার এবং বিস্তারের জন্য প্রভূত খ্যাতি এনে দেয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিবর্তে গৃহশিক্ষকের কাছে সংস্কৃত, ইংরেজি, সাহিত্য, গণিত, ভূগোল, পদার্থবিজ্ঞান, ইতিহাস, চিত্রাঙ্কনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর শিক্ষার্জন চলতে থাকে।
বাইরের পরিবেশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম পরিচয় হয় ১৮৭৩ সালে, যখন তিনি পিতার সঙ্গে হিমালয় ভ্রমণে যান। এই ভ্রমণের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। প্রকৃতির নির্জন, শান্ত ও গম্ভীর পরিবেশের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি এখানে তাঁর পিতার কাছে সংস্কৃত পাঠ শেখেন। প্রচলিত শিক্ষায় আগ্রহ না থাকায় তাঁর মেজ দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ভারতীয় রীতি অনুসারে তাঁকে ব্যারিস্টারি পড়ানোর উদ্যোগী হন। কিন্তু তা সমাপ্ত হওয়ার আগেই তিনি দেশে ফিরে আসেন। তবে ব্রিটেনে থাকা অবস্থায় তিনি ইংল্যান্ডের সমাজ ও জীবনযাত্রা বিশেষ মনোযোগসহ পর্যবেক্ষণ করেন। এই নিগূঢ় পর্যবেক্ষণ পরবর্তী জীবনে সংগীত রচনা ও সুরকার হতে তাঁকে সাহায্য করে।
দ্বিতীয় দফায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য পাঠালে তিনি মাদ্রাজ থেকে ফিরে আসেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বীরভূম জেলার বোলপুর স্টেশনের সন্নিহিত জনবসতিহীন স্থানে জমি কিনে বাড়ি করে নামকরণ করেন ‘শান্তিনিকেতন’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন সহজ শান্ত পরিবেশে শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদানে অনুরাগী। তিনি ভারতীয় তপোবন ও গুরু–শিষ্য সম্পর্কের ছিলেন অনুরাগী। এই পরিবেশগত আবহে তিনি পিতার অনুমতিক্রমে ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাপর্বে এই স্কুলের নাম ছিল ব্রহ্মাচর্যাশ্রম, যা পরে শান্তিনিকেতন নাম করা হয়।
এই বিদ্যালয়ই ১৯২১–এ বিশ্বভারতীতে উন্নীত হয়। বিশ্বভারতীর শিক্ষার আদর্শ সম্পর্কে ১৯১৯ সালে কবিগুরু বলেন, ‘ভারতবর্ষে যদি সত্যি বিদ্যালয় স্থাপিত হয় তবে গোড়া হইতেই সে বিদ্যালয় তাহার অর্থশাস্ত্র, তাহার কৃষিতত্ত্ব, তাহার স্বাস্থ্যবিদ্যা, তাহার সব ব্যবহারিক বিজ্ঞানকে আপন প্রতিষ্ঠানের চতুর্দিকবর্তী পল্লীর মধ্যে প্রয়োগ করিয়া দেশের জীবনযাত্রার কেন্দ্রস্থান অধিকার করিবে। এই বিদ্যালয় উৎকৃষ্ট আদর্শে চাষ করিবে, গো–পালন করিবে, কাপড় বুনিবে এবং নিজের আর্থিক সম্বল–লাভের জন্য সমবায় প্রণালী অবলম্বন করিয়া ছাত্রশিক্ষক ও চারদিকের অধিবাসীদের সঙ্গে জীবনকারযোগে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হইবে। এরূপ আদর্শ বিদ্যালয়কে আমি বিশ্বভারতী নাম দিবার প্রস্তাব করিয়াছি।’
বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার এক বছর পরেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের কাছে সুরুল গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীনিকেতন। এটা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও পল্লিসংগঠন–সংক্রান্ত অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।
কাব্যভাবনার বাইরের আরেকটি অবশ্য উল্লেখ্য রাবীন্দ্রিক বৈশিষ্ট্য হলো তিনি একজন সফল সমাজসংস্কারক, বিশেষত পল্লি সমাজসংগঠক। তাঁর দৃষ্টিতে গ্রামই ভারতবর্ষে প্রাণ এবং গ্রামোন্নয়নেরই এর প্রবৃদ্ধ। তাই ১৮৯৬ সালের ৮ আগস্ট, শিক্ষানবিশ শেষে আমমোক্তারনামা মূলে পিতার কাছ থেকে জমিদারির কর্তৃত্ব লাভের পর থেকেই তিনি গ্রামীণ সমাজের সংস্কারের জন্য মনোনিবেশ করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রামীণ সমাজের নানা সমস্যা চিহ্নিত করেন এবং তা সমাধানের জন্য এককাতারে কাজ করে যান। কৃষকদের নানা সংকট মোকাবিলায় তাঁর সে সময়ের পদক্ষেপগুলো ছিল যুগান্তকারী। ধনীর দুলাল হয়েও পল্লিসমাজের কৃষকের কল্যাণে, গ্রামের রাস্তাঘাট, পানীয় সংকট নিরসনের জন্য কূপ খনন, পুকুর সংস্কার, দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র, শিক্ষার বিস্তার, যান্ত্রিক চাষাবাদ, কৃষি সমবায়, ক্ষুদ ঋণদান, স্বাস্থ্যসেবাভিত্তিক সমবায় প্রথার প্রচলন, জমিতে জৈব রাসায়নিক সার ব্যবহার, বৃক্ষরোপণ, শস্য বহুমুখীকরণ ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ এবং তা সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করেন।
আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে রাজশাহীর পতিসরে ও কুষ্টিয়ার শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত আদর্শ কৃষিখেত সেচপাম্প, কলের লাঙল বা ট্রাক্টর, উন্নত বীজ ও জৈবসারের ব্যবহার প্রবর্তিত করেন। নামমাত্র সুদে কৃষকদের ঋণদানের লক্ষ্যে ব্যাংক চালু করা হয়। এর ঋণদান ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তিনি তাঁর নোবেল পুরস্কারের অর্থও এখানে বিনিয়োগ করেন। জমিদারি সেরেস্তার সেরেস্তাদারি বিকেন্দ্রায়িত করে তিনি মন্ডলি প্রথা প্রবর্তন করেন। এতে সেরেস্তাদের উৎপীড়ন ও ভোগান্তি থেকে রায়তগণ অব্যাহতি পান। তিনি কুষ্টিয়া থেকে শিলাইদহ পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেন। তিনি কৃষকদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে উৎসাহিত করেন। জমির বাঁধে তিনি কৃষকদের শাকসবজি আবাদে উৎসাহিত করেন। বাঙালি বা ভারতবিদ্বেষী ব্রিটিশ আমলা কবিগুরুর কাব্যভাবনার বহির্ভূত কল্যাণমূলক ও সমাজসংস্কারধর্মী কাজের প্রতিভূ প্রশংসা করেছেন।
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ঢাকা কলেজ