ফুটবলে শেষ মুহূর্তে কত ম্যাচের ফল বদলে যায়। জিয়ান্নি ইনফান্তিনোও যেন একটা ম্যাচ খেলছিলেন। যেখানে ৯০ মিনিটের কাছাকাছি চলে আসা সময় পর্যন্ত তিনি ৩-০ গোলে এগিয়ে ছিলেন। ২০২৭ সালে চতুর্থ মেয়াদে ফিফা সভাপতি হওয়াটা তাঁর জন্য স্রেফ সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল। প্রতিপক্ষ নেই, বিকল্প নেই। কিন্তু শেষ কয়েকটা মিনিট আর যোগ হওয়া সময়ে পরপর কয়েকটি আত্মঘাতী গোল। ব্যস, তিন গোলের লিভ একলহমায় উধাও! ইনফান্তিনো এখন হারের শঙ্কায়।
গত পরশু রাতেই ফিফা ঘোষণা দিয়েছে, বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির যে পরিকল্পনা, সেটা তারা বাতিল করছে। সিদ্ধান্তটা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য যতটা স্বস্তির, একই সঙ্গে ইনফান্তিনোর জন্য ততটাই বিপদের বার্তা। ফিফার এই ঘোষণা যেন একটা স্বীকারোক্তি—ইনফান্তিনো একটা যুদ্ধে হেরে গেছেন, যে যুদ্ধে আসলে তাঁর নামারই কথা ছিল না।
বিশ্বকাপের আগেও মরক্কোয় আগামী মার্চের ফিফা কংগ্রেসে ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচিত হওয়া মনে হচ্ছিল স্রেফ আনুষ্ঠানিকতা। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না ছবিটায়। তারপর এল শ্বাসরুদ্ধকর তিনটা দিন। বিশ্বকাপ বিক্রি করে টাকা জোগাড়ের সেই প্রস্তাব সামনে আসার পর মাত্র তিন দিনেই সেই ছবি বদলে গেল আমূল। সবচেয়ে অনুগত কনফেডারেশনগুলোও ফুঁসে উঠল, কোনো পরামর্শ ছাড়াই এমন একটা প্রস্তাব কীভাবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে? অভিযোগ উঠল, ফুটবলের আত্মাটাই বিক্রি করে দিচ্ছেন ইনফান্তিনো। ইনফান্তিনোর সবচেয়ে কাছের মানুষেরাও দূরে সরে যেতে শুরু করলেন।

২০১৬ সালে দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে সেপ ব্লাটারের ১৭ বছরের শাসনের অবসান হওয়ার পর ফিফার চেয়ারে বসেছিলেন ইনফান্তিনো। মুখে ছিল স্বচ্ছতার বুলি, আশার বাণী। বলেছিলেন, ‘ফিফার টাকা আপনাদের টাকা, কোনো সভাপতির নয়।’ কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, ইনফান্তিনোর স্বৈরাচারী ও একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব ততই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২০১৮ সালে ক্লাব বিশ্বকাপে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের একটা পরিকল্পনা থেকে উয়েফার প্রবল বিরোধিতায় পিছু হটতে হয়েছিল তাঁকে। ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক কাতারের পক্ষে নানা সময়ে তাঁর সাফাই গাওয়া অনেকের বিরক্তি কুড়িয়েছে। এমনকি ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ কোনো রকম সুষ্ঠু দরপত্র ছাড়া একক সিদ্ধান্তে সৌদি আরবের হাতে তুলে দেওয়া কিংবা লিওনেল মেসিকে খেলানোর উদ্দেশ্যে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে ইন্টার মায়ামির জন্য বিশেষ পথ তৈরি করার মতো স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তেও তাঁর গায়ে টোকা লাগেনি। ফিফার কোষাগার সব সময় ভরিয়ে রাখার ক্ষমতা তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছে বারবার।
ক্ষমতার মোহে ইনফান্তিনো হয়তো হারিয়ে ফেলেছিলেন সংগঠক পরিচয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর অতিরিক্ত মাখামাখি, ফিফার নিজস্ব ‘পিস প্রাইজ’ তৈরি করে ট্রাম্পের হাতে তুলে দেওয়া, সবকিছুই বিশ্ব ফুটবলের কর্তাদের চোখে বিঁধছিল। তারপর বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড প্রত্যাহার করাতে ট্রাম্পের সরাসরি ইনফান্তিনোকে ফোন এবং ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটির সেই শাস্তি মওকুফের সিদ্ধান্ত প্রবল সমালোচিত হয়। এরপর ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে এই বিশ্বকাপ বিক্রির মেগা-ডিল সাজানোর গুঞ্জন সেই আগুনে ঘি ঢেলে দেয়।

কোষাগার ভরিয়ে তোলার যে চাল তিনি সব সময় দিয়ে এসেছেন, এবার সেটা ফিরে এসেছে বুমেরাংয়ের মতো। প্রস্তাব বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও গতকাল উয়েফা তাদের বিবৃতিতে বলেছে, ‘অদৃশ্য ব্যক্তিদের দিয়ে প্রস্তুত করা গোপন কোনো নীলনকশা আর বরদাশত করা হবে না। এই অপকর্মের পেছনের কারিগরদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বর্তমান ফিফা নেতৃত্ব কেবল উয়েফার নয়, ফুটবল পরিবারের সিংহভাগ সদস্যের আস্থা হারিয়েছে।’
তবু ইনফান্তিনোকে এখনই ‘শেষ’ ধরে নেওয়াটা তাড়াহুড়ো হবে। ৫৬ বছর বয়সী এই সুইস-ইতালীয় প্রশাসককে সরাতে হলে দরকার ৪৩টি সদস্যদেশের অনাস্থা প্রস্তাব, আর তার সঙ্গে দরকার একজন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। আপাতত সামনে এ রকম কেউ আসেননি। সভাপতি হিসেবে প্রার্থিতা ঘোষণার শেষ সময় এ বছরের ১৮ নভেম্বর; ভোট হবে আগামী বছরের ১৮ মার্চ, মরক্কোর রাবাতে ফিফা কংগ্রেসে।
এখনো ইনফান্তিনোর পাশে ট্রাম্প, কাতারের রাজপরিবার, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আছেন। যত দিন তাঁদের সমর্থন থাকবে, ইনফান্তিনোকে অবজ্ঞা করাটা হবে বোকামি। কিন্তু যাঁরা আর কাজে লাগে না, ক্ষমতাবানেরা সচরাচর সেই মানুষগুলোকেই ছুড়ে ফেলে দেন। ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা সত্যিই যদি ধোঁয়া হয়ে উড়ে গিয়ে থাকে, তাহলে হয়তো তিনিও শিগগিরই টের পাবেন, প্রভাবশালী বন্ধুরা আর তাঁর ফোন ধরছেন না।
ইনফান্তিনোর সামনে এখন তাই কঠিন লড়াই। তিনি এখন যোগ হওয়া সময়ে খেলছেন। আর একটা সামান্য ভুলই তাঁর সিংহাসন কেড়ে নিতে পারে।