Home / সকল আপডেট / ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অস্বচ্ছ ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং
ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অস্বচ্ছ ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং

ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অস্বচ্ছ ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অস্বচ্ছ ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২৮ জুলাই ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।

আলোচনা

কাজী ইমদাদুল হক

মহাপরিচালক (সচিব), বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)

বিএসটিআই ২০১৩ সালের ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইনের আওতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। ভোজ্যতেলের লাইসেন্স দেওয়ার সময় ভিটামিন ‘এ’-এর উপস্থিতির পাশাপাশি প্যাকেজিংয়ের মানও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বাজারে আসার আগে প্রতিটি প্যাকেজ বিএসটিআইয়ের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে যায় এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সময়ের সঙ্গে ভিটামিন ‘এ’-এর মাত্রা কমে যেতে পারে। সে কারণে আমরা উৎপাদকদের শুধু আইনগত ন্যূনতম মাত্রা পূরণে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বেশি ভিটামিন ‘এ’ ব্যবহার করতে উৎসাহ দিই। একই সঙ্গে নিয়মিত বাজার তদারকির মাধ্যমে যাচাই করি, ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত ভিটামিন ‘এ’-এর মান বজায় থাকছে কি না। ফুড-গ্রেড প্যাকেজিংয়ের মান নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্যাকেজিং এমন হতে হবে, যাতে খাদ্যের সংস্পর্শে কোনো দূষণের ঝুঁকি তৈরি না হয় এবং ভিটামিন ‘এ’-এর গুণগত মান অক্ষুণ্ন থাকে। বাজারে বড় ড্রাম থেকে ছোট বোতলে তেল ভরে বিক্রির বাস্তবতা রয়েছে, কিন্তু এ ধরনের চর্চা থেকে নিরাপদ ব্যবস্থায় উত্তরণ প্রয়োজন।

ভোজ্যতেল এমন একটি পণ্য, যা দেশের সব মানুষ প্রতিদিন ব্যবহার করেন। তাই ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অস্বচ্ছ ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করা শুধু মান নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, এটি জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষারও বিষয়। উৎপাদক, প্যাকেজিং শিল্প, ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

সেবাষ্টিন রেমা

মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর

ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। অনেকেই ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’-এর প্রয়োজনীয়তা বোঝেন না। একইভাবে ‘ফুড-গ্রেড’ শব্দটিও সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য নয়। নিরাপদ ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং সহজে চেনাতে নির্দিষ্ট প্রতীক বা চিহ্ন বাধ্যতামূলক ব্যবহারের বিষয়টি ভাবা প্রয়োজন।

খোলা তেল কেনার ক্ষেত্রে এখনো মানুষের মধ্যে তেমন আপত্তি নেই। ফলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ, আলো প্রতিরোধক অস্বচ্ছ ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং কিংবা পণ্যের উৎস শনাক্ত করার বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। এই জায়গায় আমাদের আরও কার্যকরভাবে পৌঁছাতে হবে।

উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি। উৎপাদককে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ, আলো প্রতিরোধক অস্বচ্ছ ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং ব্যবহার এবং ড্রামে তেল বাজারজাত না করা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের নিয়ম মেনে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করতে হবে।

বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে তদারকি জোরদার করতে হবে। গত এক বছরে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ও গেইন যৌথভাবে ১৫টির বেশি সচেতনতামূলক কর্মশালা করেছে। এ সময়ে বাজার তদারকি চললেও খোলা তেল বা ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ নিয়ে জরিমানার বদলে সচেতনতা বাড়ানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করলে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত ভোজ্যতেল ব্যবহারে আমরা আরও এগিয়ে যেতে পারব।

সুলতান আলম

যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা), শিল্প মন্ত্রণালয়

আইন করে সরকার শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে লবণ ও ভোজ্যতেল সমৃদ্ধকরণ বাধ্যতামূলক করেছে। প্রায় দুই বছর কাজের অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন গবেষণায় দেখেছি, ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংমিশ্রণের উদ্দেশ্য অনেকটাই সফল হয়েছে। তবে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কাজ প্রয়োজন।

মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ খোলা তেলের বাজার। এতে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ব্যাহত হয় এবং দূষণের ঝুঁকি বাড়ে। খোলা তেলে লাভ বেশি হওয়ায় এর বিক্রি বেশি, আবার ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ বোতলজাত তেলের চাহিদাও কম। তাই এ সমস্যার সমাধানে সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা ও ভোক্তা সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিরাপদ প্যাকেজিং। কেমিক্যালের ড্রামে তেল সংরক্ষণ স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ এবং পণ্যের উৎস শনাক্ত করাও কঠিন। তাই বিটাকের সঙ্গে ট্রেসেবল, ফুড–গ্রেড কনটেইনার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্লাস্টিকশিল্প ও রিফাইনারিগুলোর সহযোগিতায় এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণে অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং কার্যকর হলেও, এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

আগের তুলনায় বোতলজাত তেলের ব্যবহার বেড়েছে। তবে তেলের অপচয় ও অতিরিক্ত ব্যবহার কমাতে হবে। পরিমিত তেল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে মানুষের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, তেমনি তেলের চাহিদা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপও কমবে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব

সদস্য (খাদ্যশিল্প ও উৎপাদন), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ

ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে আমাদের তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে—ভিটামিন ‘এ’, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং। শুধু ভিটামিন ‘এ’ সংযোজন নয়, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত নিরাপদ প্যাকেজিং ও সংরক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে। এটি একই সঙ্গে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপদতার (এই শব্দ আমরা বাংলা একাডেমি থেকে অনুমোদন করে নিয়েছি) বিষয়।

খাদ্য নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে এমন ফুড–গ্রেড কনটেইনার ব্যবহার করতে হবে, যাতে প্যাকেজিং থেকে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক খাদ্যে মিশে না যায়। এ বিষয়ে ২০১৯ সালের খাদ্যস্পর্শক প্রবিধানমালায় নির্দেশনা রয়েছে।

আমরা শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, উৎস পর্যায়েও নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করছি। ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করে খোলা তেল বিক্রি কমানোর চেষ্টা চলছে। গেইন, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিএসটিআই এ কাজে যুক্ত আছে। গত বছর ১৭৯টি নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, খোলা তেলের তুলনায় বোতলজাত তেলে ভিটামিন ‘এ’–এর উপস্থিতি বেশি। তাই শতভাগ অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করে খোলা তেল বিক্রি বন্ধ করা দরকার। একই সঙ্গে এ বিষয়ে মানুষের সচেতনতাও বাড়াতে হবে।

একই তেল বারবার বা অতিরিক্ত তাপে ব্যবহার করলে ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাট ও অন্যান্য যৌগ তৈরি হতে পারে, যা হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। তাই তেল পরিমিত তাপে ব্যবহার এবং একই তেল বারবার ব্যবহার না করার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী

সভাপতি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ

অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি। সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। তেল আমাদের খাদ্যের অপরিহার্য অংশ, তবে অতিরিক্ত তেল খাওয়ার অভ্যাস কমাতে হবে। একই সঙ্গে তেলের মানও ঠিক রাখতে হবে। অনেকের মধ্যে এখনো ধারণা রয়েছে, স্বচ্ছ বোতলে থাকা স্বচ্ছ তেলই ভালো। এই ধারণা বদলাতে হবে।

অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং তেলকে আলোজনিত ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দেয়। যদিও গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভিটামিন ‘এ’–এর মাত্রা গ্রহণযোগ্য থাকে। তারপরও আমি মনে করি, অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং গ্রহণ করা উচিত।

শুধু আলো নয়, তাপও তেলের বড় শত্রু। অতিরিক্ত তাপে তেলের অক্সিডেশন বাড়ে, যা তেলের গুণগত মান নষ্ট করে। তাই উৎপাদনের পর পরিবহন ও সংরক্ষণের সময়ও তেলকে অতিরিক্ত তাপ থেকে রক্ষা করতে হবে। এ বিষয়ে তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আরও উদ্যোগ নিতে পারে।

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারিও প্রয়োজন। তবে ছোট ব্যবসায়ীদের পেছনে না ছুটে তেল উৎপাদনকারী কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকর নজরদারি জোরদার করলে এর সুফল পুরো বাজারেই পৌঁছাবে।

নিরাপদ তেল ব্যবহারে ভোক্তা সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। মানুষ নিরাপদ তেল বেছে নিলে এবং অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিংয়ের গুরুত্ব বুঝলে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ, নিরাপদ খাদ্য এবং জনস্বাস্থ্য—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী 

বিভাগীয় প্রধান, রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট

স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য শুধু তেল কম খেলেই হবে না, আমরা যে তেল খাই সেটিও স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে। তেলে ট্রান্সফ্যাট থাকবে না এবং প্রচলিত বিধান অনুযায়ী ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের দেশে ভিটামিন ‘এ’–এর ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ ভোজ্যতেল চালুর বিষয়েও কাজ চলছে।

তেলের গুণগত মানের পাশাপাশি নিরাপদ প্যাকেজিংও নিশ্চিত করতে হবে। খোলা তেল ও স্বচ্ছ বোতলে রাখা তেলে ভিটামিন ‘এ’ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণে অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং চালু করা প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোক্তাদের ধারণা। আমাদের দেশে এখনো অনেকেই মনে করেন, যত স্বচ্ছ তেল, তত ভালো। এই ধারণা বদলানো প্রয়োজন। বস্তত, সঠিকভাবে পরিশোধিত তেল কম স্বচ্ছ হয়। আমার জানামতে, তুলনামূলক গাঢ় রঙের তেলে ভিটামিন ‘ই’-সহ প্রয়োজনীয় কিছু উপাদান বেশি থাকে। অথচ ভোক্তারা স্বচ্ছ তেলের প্রতিই বেশি আগ্রহী। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ যথেষ্ট হবে না।

তাই শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে যেমন নিরাপদ পাত্রে তেল বাজারজাত করতে হবে, তেমনি ভোক্তাদেরও বুঝতে হবে যে তেলের স্বচ্ছতা নয়, এর পুষ্টিগুণ ও নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ, অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে পারলেই ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া সম্ভব।

মুশতাক হাসান মুহ. ইফতিখার

সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ   

ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণে আলোপ্রতিরোধী ও ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখনো খোলা তেল কেমিক্যালের ড্রামে বিক্রি হয়, আর বর্তমানে ব্যবহৃত স্বচ্ছ বোতল ফুড–গ্রেড কি না, তা-ও ভোক্তার জানার উপায় নেই। এতে ভিটামিন ‘এ’ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে।

স্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ে আলো প্রবেশ করায় ভিটামিন ‘এ’ কমে যায় এবং তেলের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নন–ফুড–গ্রেড কেমিক্যালের ড্রাম এবং রিসাইকলড পিইটি বোতল আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে হবে।

বিএসটিআইয়ের বর্তমান মানদণ্ডে ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং ব্যবহার উল্লেখ থাকলেও অস্বচ্ছ প্যাকেজিং বাধ্যতামূলক করা হয়নি। এ ঘাটতি দূর করে ফুড–গ্রেডের স্বীকৃত প্রতীক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভোক্তারা সহজেই নিরাপদ প্যাকেজিং চিনতে পারেন।

আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ খোলা ভোজ্যতেল বিক্রি বন্ধের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ভোজ্যতেল ফোর্টিফিকেশন, মান নিয়ন্ত্রণ ও নীতি সমন্বয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে। এখন সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নই সবচেয়ে জরুরি।

ভালো উদ্যোগ না নেওয়ার খেসারত, উদ্যোগটি বাস্তবায়নের ব্যয়ের চেয়েও বেশি। ব্যবসায় টিকে থাকে ভোক্তার আস্থায়। তাই ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ডা. মুশতাক হোসেন

জনস্বাস্থ্যবিদ ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)

নিরাপদ খাদ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে খোলা তেল বড় উদ্বেগের বিষয়। খোলা অবস্থায় তেল রাখলে ভিটামিন ‘এ’ ধীরে ধীরে নষ্ট হতে পারে। এতে বিশেষ করে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও স্বাভাবিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি খোলা তেলে ভেজাল, দূষণ ও অক্সিডেশনের ঝুঁকিও বেশি, যা তেলের গুণগত মান নষ্ট করে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো একই তেল বারবার ব্যবহার করা। অতিরিক্ত তাপে বারবার ব্যবহার করলে তেলের রাসায়নিক গঠন বদলে যায়। এতে হৃদ্‌রোগ, মস্তিষ্ক, লিভার ও কিডনির ক্ষতিসহ দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ–২ ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, কিডনির সমস্যা ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই নিরাপদ তেল ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণে নিরাপদ, অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভিটামিনের মাত্রাও বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে ঘাটতি যেমন পূরণ হয়, তেমনি অতিরিক্ত গ্রহণের ঝুঁকিও না থাকে। ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ তেল শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নিরাপদ তেল উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থা পদ্ধতিগতভাবে সুনিশ্চিত করতে হবে। শুধু জরিমানা করে এ সমস্যার সমাধান হবে না। কেউ ইচ্ছা করে নিয়ম ভাঙলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সচেতনতা ও সবার সহযোগিতায়ই নিরাপদ প্যাকেজিং এবং ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা সম্ভব।

শহীদুজ্জামান ফারুকী

সাবেক মহাপরিচালক, খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট (এফপিএমইউ) 

ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা। শুধু আইন প্রয়োগ বা জরিমানা নয়, মানুষকে বুঝতে হবে কেন ভিটামিন ‘এ’ এবং নিরাপদ প্যাকেজিং জরুরি। আয়োডিনযুক্ত লবণের মতো এ ক্ষেত্রেও কার্যকর জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বা জরিমানা করে স্থায়ী পরিবর্তন আনা যায় না। প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিদের অনেক সময় চিহ্নিত করা যায় না। যেমন খোলা তেল যেসব ড্রামে বিক্রি হয়, সেগুলো দেখে বোঝার উপায় থাকে না কোন প্রতিষ্ঠানের, ভেতরে কী তেল আছে বা ড্রামটি ফুড–গ্রেড কি না। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।

এ ধরনের আলোচনা রাজধানীতে সীমাবদ্ধ না রেখে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে। বিএসটিআই, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে, কিন্তু জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।

ভোক্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাজার বা সুপারশপে গিয়ে একজন ক্রেতা সহজে বুঝতে পারেন না বোতলটি কতটা নিরাপদ, সেটি ফুড–গ্রেড কি না বা অস্বচ্ছ প্যাকেজিং ব্যবহার করা হয়েছে কি না। আবার ভিটামিন ‘এ’ কত দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে, সেটিও তাঁর জানার সুযোগ নেই। তাই নিরাপদ ও অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং সম্পর্কে ভোক্তাকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ, নিরাপদ ভোজ্যতেল নিশ্চিত করা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।

এ এস এম কামাল উদ্দিন

সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স 

নিরাপদ প্যাকেজিং সম্পর্কে জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খোলা তেল বিক্রি বন্ধ করে অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড কনটেইনারে তেল বাজারজাত করা প্রয়োজন। এটি বাস্তবায়ন সহজ এবং প্রান্তিক খরচও খুবই সামান্য।

অস্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ে অবশ্যই ফুড–গ্রেড রং ও কাঁচামাল ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট উপাদানও যোগ করা সম্ভব। এটি বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত কোনো বাধা নেই। রিসাইকেল করা প্লাস্টিক ব্যবহারে পণ্যের মান কমে যেতে পারে। তাই অস্বচ্ছ বোতল ব্যবহারের ক্ষেত্রে রিসাইকেল উপকরণের ব্যবহারে কঠোর তদারকি করা প্রয়োজন।

আমার অভিজ্ঞতায় দেশে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান খুব বেশি নয়। তারা চাইলে দ্রুত অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড বোতলে যেতে পারে। একই সঙ্গে বিএসটিআইকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। খোলা তেলের বাল্ক পরিবহনেও বড় সমস্যা রয়েছে। একই প্লাস্টিকের ড্রাম বারবার ব্যবহার করা হয়, কিন্তু সেগুলো কতটা পরিষ্কার বা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাই শুধু বাল্ক প্যাকেজিং নয়, পুরো সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভোক্তাদের জানাতে হবে যে আমরা বোতল নয়, নিরাপদ তেল কিনি। সে সচেতনতা তৈরি হলে এই পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা আরও সহজ হবে। খাদ্যসংস্পর্শে ব্যবহৃত নিম্নমানের পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

ড. রোকেয়া বেগম 

অধ্যাপক, ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল

২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ ভোজ্যতেল নিয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বেশির ভাগ মানুষ জানেন না তাঁরা ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ তেল ব্যবহার করছেন কি না। যেহেতু সরকার ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংযোজন বাধ্যতামূলক করেছে, এটি সব তেলেই নিশ্চিত করতে হবে।

গবেষণার অংশ হিসেবে আমরা খোলাবাজার, গ্রামীণ এলাকা ও সুপারশপ থেকে তেলের নমুনা সংগ্রহ করি। পরীক্ষায় দেখা যায়, অনেক নমুনাতেই বিএসটিআই নির্ধারিত মাত্রার ভিটামিন ‘এ’ ছিল না। এরপর আমরা বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিং ও বিভিন্ন সংরক্ষণ পরিবেশে এক বছর ধরে তেলের ভিটামিন ‘এ’-এর উপস্থিতি পরীক্ষা করি।

আলোতে রাখা স্বচ্ছ প্যাকেজের তেলে ৯ মাসের মধ্যে ভিটামিন ‘এ’ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু অস্বচ্ছ প্যাকেজে অন্ধকার পরিবেশে রাখা তেলে এক বছর পরও ভিটামিন ‘এ’–এর ক্ষতি অতি সামান্য। তাই আমি মনে করি, ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণে অস্বচ্ছ প্যাকেজিং অত্যন্ত জরুরি।

আমরা খোলা তেলেও ভিটামিন ‘এ’ পেয়েছি। তবে বড় উদ্বেগ কনটেইনারের মান। কনটেইনার ফুড–গ্রেড না হলে সেখান থেকে বিসফেনল, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর মতো ক্ষতিকর উপাদান তেলে মিশে দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি।

ড. মু. নাজমুস সাকিব

সহকারী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ ফোর্টিফিকেশন চালু হওয়া সরকারের একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। ভবিষ্যতে ভিটামিন ‘ডি’ যুক্ত করার দিকেও আমরা যেতে পারি। তবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদনে নয়, বিতরণ ও সংরক্ষণে। গবেষণায় প্রমাণিত, শুধু সূর্যের আলো নয়, ঘরের সাধারণ আলোর প্রভাবেও ভিটামিন ‘এ’ ধীরে ধীরে নষ্ট হতে পারে। তাই উৎপাদনের পর থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে নিরাপদ রাখা জরুরি।

আমার মতে, এ জন্য অস্বচ্ছ ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে হবে। ছোট পরিমাণে বিক্রির জন্য অস্বচ্ছ পাউচ বা বোতল এবং বড় ব্যবহারকারীদের জন্য ফুড-গ্রেড টিন বা উপযুক্ত বাল্ক প্যাকেজিং ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ সহজ হবে এবং ভোক্তা প্রকৃত উপকার পাবেন। অতীতে পাউচে তেল বাজারে এলেও তা জনপ্রিয় হয়নি। কিন্তু খোলা তেল বিক্রি বন্ধ করে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে মানুষ নিরাপদ প্যাকেটজাত তেলই ব্যবহার করবে। আয়োডিনযুক্ত লবণের ক্ষেত্রেও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একই পরিবর্তন এসেছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যমান পরীক্ষাগারগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে ভিটামিন ‘এ’-এর মাত্রা ও তেলের গুণগত মান নিয়মিত পরীক্ষা করা যায়। কার্যকর মনিটরিং ছাড়া নীতির বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বাজারে যদি সবই অস্বচ্ছ প্যাকেজিং থাকে, তাহলে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ নিয়ে এই সমস্যারও অনেকটাই সমাধান হবে।

ড. আশেক মাহফুজ

পোর্টফোলিও লিড, লার্জ স্কেল ফুড ফোর্টিফিকেশন অ্যান্ড ভ্যালু চেইন, গেইন

অস্বচ্ছ প্যাকেজিংই ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদনের সময় ভিটামিন ‘এ’-এর মাত্রা কিছুটা বেশি রাখা যেতে পারে। আমি ২০১০ সাল থেকে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ ফোর্টিফিকেশন নিয়ে কাজ করছি। আমরা জানি, স্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ে আলো প্রবেশ করলে ভিটামিন ‘এ’ নষ্ট হয়। খোলা তেলে এ ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ, সূর্যের আলোয় ভিটামিন ‘এ’-এর ক্ষয় শুরু হয়। এ ছাড়া খোলা তেল যেসব ড্রামে বিক্রি হয়, সেগুলোর অনেকই ফুড-গ্রেড নয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

অনেকে মনে করেন, প্যাকেটজাত তেলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রান্তিক ব্যয় খুবই সামান্য। তাই ভোজ্যতেল ফুড-গ্রেড অস্বচ্ছ প্যাকেজিংয়েই বাজারজাত করা উচিত।

২০২২ সালে খোলা তেল বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে দ্রুত তা কার্যকর ও নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের জন্য ফুড-গ্রেড ও শনাক্তযোগ্য বাল্ক প্যাকেজিং এবং সাধারণ ভোক্তাদের জন্য ছোট প্যাকেটজাত তেল নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান পিইটি বোতল সহজলভ্য প্রযুক্তির মাধ্যমেই অস্বচ্ছ করা সম্ভব।

গুলশান আরা

সহযোগী বিজ্ঞানী, আইসিডিডিআরবি

সম্প্রতি সারা দেশ থেকে তেলের নমুনা সংগ্রহ করে আমরা ভিটামিন ‘এ’-এর মাত্রা পরীক্ষা করেছি। খুশির বিষয় হলো, বাজারে থাকা ব্র্যান্ডেড তেলের ৬০ শতাংশের বেশি নমুনায় নির্ধারিত মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, ফোর্টিফিকেশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ভালো অগ্রগতি হচ্ছে।

খোলা তেলের ক্ষেত্রে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো খোলা তেল ব্যবহার করেন, যেখানে তেলের উৎস, ধরন ও মেয়াদ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে নমুনা পরীক্ষায় প্রায় ৪০ শতাংশ খোলা তেলে নির্ধারিত মাত্রার ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া গেছে। নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো গেলে এ অবস্থার আরও উন্নতি সম্ভব।

ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণে অস্বচ্ছ ও ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, আলোতে এলে ভিটামিন ‘এ’ নষ্ট হয়ে যায়। একই সঙ্গে অস্বচ্ছ প্যাকেজিং চালুর ক্ষেত্রে ভোক্তার ধারণা পরিবর্তন জরুরি। স্বচ্ছ তেল মানেই ভালো বা নিরাপদ—এমন ধারণা দূর করতে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

কুতুবুল আলম

সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক, মেঘনা গ্রুপ

ভোজ্যতেল সরবরাহে বাল্ক ও কনজ্যুমার প্যাক—দুই ব্যবস্থাই চালু আছে। সরকার বাল্ক তেল বন্ধের নির্দেশনা দিলেও বাজারের চাহিদার কারণে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমানে আমাদের ৪০ শতাংশ তেল বোতলে এবং ৬০ শতাংশ ড্রামে যাচ্ছে।

অস্বচ্ছ বোতলে যেতে হলে নতুন প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই এ বিষয়ে গবেষণা ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। আমাদের ল্যাব পরীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমান পিইটি বোতলেও ভিটামিন ‘এ’–এর মাত্রা নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে। তবে অস্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। আমরা ফুড–গ্রেড বোতল ব্যবহার করি এবং রিসাইকেল প্লাস্টিক ব্যবহার করি না। আমাদের পর্যবেক্ষণে, ভিটামিন ‘এ’–এর মাত্রা নির্ধারিত ১৫ থেকে ৩০ পিপিএমের মধ্যেই থাকে। তাই অস্বচ্ছ প্যাকেজিং চালুর আগে বাস্তবতা, প্রযুক্তি ও ভোক্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

কে এম ইকবাল হোসেন

সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন

অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত কোনো বাধা নেই। বর্তমান পিইটি বোতল তৈরির যন্ত্রপাতিতেই ফুড–গ্রেড অ্যাডিটিভ ও সাদা মাস্টারব্যাচ ব্যবহার করে বোতলকে অস্বচ্ছ বা আধা অস্বচ্ছ করা সম্ভব। এ জন্য নতুন প্রযুক্তি বা সম্পূর্ণ নতুন যন্ত্রপাতির প্রয়োজন নেই; প্রান্তিক ব্যয়ও খুব বেশি নয়।

অস্বচ্ছ প্যাকেজিং আলো ও অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব কমিয়ে ভোজ্যতেলের ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণে সহায়তা করবে। আরও বেশি সুরক্ষা প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে মাল্টিলেয়ার প্রযুক্তির কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে, যদিও বর্তমান বাস্তবতায় তা সহজ নয়।

রিসাইকেল করা প্লাস্টিক নিয়েও একপেশে ধারণা ঠিক নয়। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পরীক্ষিত ও সনদপ্রাপ্ত রিসাইকেলড উপাদান নিরাপদভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। তাই ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার চেয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়নই এখন বেশি জরুরি।

ফিরোজ আলম সুমন

প্রথম যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি

খোলা ভোজ্যতেলের বড় একটি অংশ রেস্তোরাঁ খাতে ব্যবহৃত হয়, এখনো বেশির ভাগ ভোজ্যতেল খোলা ড্রাম থেকে আসে। আমরা বাজার থেকে কেনা তেলই ব্যবহার করি, কিন্তু তেলের নিম্নমানের দায় উৎপাদকের হলেও জরিমানা গুনতে হয় রেস্তোরাঁর মালিকদের। তাই সমাধান খুঁজতে হবে উৎপাদন পর্যায় থেকে।

খোলা তেলের উৎস ও পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না। অনেক ড্রামে তেলের ধরন বা উৎপাদনকারীর তথ্যও থাকে না। এতে ভোক্তা প্রতারিত হন। তাই অস্বচ্ছ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং ও সঠিক লেবেলিং নিশ্চিত করা জরুরি।

মানুষ এখন অনেক বেশি স্বাস্থ্যসচেতন। তাই ছোট আকারের নিরাপদ প্যাকেটজাত তেল সহজলভ্য করতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে খোলা তেল বিক্রি বন্ধে কার্যকরভাবে বাধ্য করতে হবে।

এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, জবাবদিহি এবং উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত কঠোর নজরদারি। তবেই ভিটামিন ‘এ’ সংরক্ষণ, নিরাপদ ফুড–গ্রেড প্যাকেজিং ও ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

অংশগ্রহণকারী:

কাজী ইমদাদুল হক, মহাপরিচালক (সচিব), বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই);

সেবাষ্টিন রেমা, মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর;

সুলতান আলম, যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা), শিল্প মন্ত্রণালয়;

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব, সদস্য (খাদ্যশিল্প ও উৎপাদন), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ;

অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী, সভাপতি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ;

অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী, বিভাগীয় প্রধান, রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট;

মুশতাক হাসান মুহ. ইফতিখার, সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ;

ডা মুশতাক হোসেন, জনস্বাস্থ্যবিদ ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর;

শহীদুজ্জামান ফারুকী, সাবেক মহাপরিচালক, খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট (এফপিএমইউ);

এ এস এম কামাল উদ্দিন, সাবেক সভাপতি,  বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স;

ড. রোকেয়া বেগম, অধ্যাপক, ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল;

ড. মু. নাজমুস সাকিব, সহকারী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়;

ড. আশেক মাহফুজ, পোর্টফোলিও লিড, লার্জ স্কেল ফুড ফোর্টিফিকেশন অ্যান্ড ভ্যালু চেইন, গেইন;

গুলশান আরা, সহযোগী বিজ্ঞানী, আইসিডিডিআরবি;

কুতুবুল আলম, সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক, মেঘনা গ্রুপ;

কে এম ইকবাল হোসেন, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স  অ্যাসোসিয়েশন;

ফিরোজ আলম সুমন, প্রথম যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি।

সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।

About Editor Todaynews24

Check Also

বাংলার বর্ষা ঋতু ইংরেজদের কাছে কেন বিভীষিকাময় স্মৃতি

বাংলার বর্ষা ঋতু ইংরেজদের কাছে কেন বিভীষিকাময় স্মৃতি

১৮০০ সালের নভেম্বর। কয়েক মাসের টানা বর্ষার পর কলকাতায় নেমেছে হালকা শীত। এই সময় শহরের ইউরোপীয় অধিবাসীরা আয়োজন করলেন এক জাঁকজমকপূর্ণ থ্যাঙ্কসগিভিং ভোজের। টেবিলভর্তি খাবার-পানীয়, ঝলমলে পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষ—সব মিলিয়ে যেন উৎসবের আবহ। তবে এই আনন্দের কারণ ছিল বিলাসিতা নয়; বরং তারা বিশ্বাস করতেন, ভয়ংকর বর্ষা অতিক্রম করে এখনো জীবিত থাকার জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানানো…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *