১৯৯০-এর দশকে সৌরজগতের বাইরে প্রথম গ্রহ আবিষ্কারের পর থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত হাজার হাজার এক্সোপ্ল্যানেট খুঁজে পেয়েছেন। নাসার ক্যাটালগ ঘাঁটলে এখন এমন ৬ হাজারের বেশি নিশ্চিত এক্সোপ্ল্যানেটের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত আমরা নিশ্চিতভাবে একটিও এক্সোমুনের দেখা পাইনি। এক্সোমুন মানে ভিনগ্রহের চাঁদ। আমাদের সৌরজগতে যেখানে উপগ্রহের ছড়াছড়ি, সেখানে অন্য নক্ষত্রজগতেও যে চাঁদ থাকবে, সেটা তো সাধারণ যুক্তিই বলে। তারপরও এদের দেখা পাওয়া এত কঠিন কেন?
এই দীর্ঘ খরা হয়তো এবার কাটতে চলেছে। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এমন এক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন, যা শুধু একটি চাঁদই নয়, বরং চাঁদ বা গ্রহ বলতে আমরা কী বুঝি; সেই সংজ্ঞাই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
বাদামি বামনগুলো সাধারণ নক্ষত্রের মতোই জন্ম নেয়, কিন্তু এদের ভর এতই কম থাকে যে এদের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন ফিউশন হয়ে হিলিয়াম তৈরির প্রক্রিয়াটি শুরু হতে পারে না।
কী পাওয়া গেল অদ্ভুত নক্ষত্রজগতে
ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ৭৩ আলোকবর্ষ দূরের একটি অদ্ভুত নক্ষত্রজগতের ওপর নজর রাখছিলেন, যার নাম CD-35 2722। এই নক্ষত্রটির ভর আমাদের সূর্যের ভরের প্রায় অর্ধেক। মজার ব্যাপার হলো, এই নক্ষত্রটিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে একটি বাদামি বামন নক্ষত্র।
বাদামি বামন জিনিসটা কী, তা কি আপনি জানেন? এগুলো সাধারণ নক্ষত্রের মতোই জন্ম নেয়, কিন্তু এদের ভর এতই কম থাকে যে এদের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন ফিউশন হয়ে হিলিয়াম তৈরির প্রক্রিয়াটি শুরু হতে পারে না।

এরা সাধারণ গ্যাসীয় গ্রহদের চেয়ে বড়, আবার সবচেয়ে ছোট নক্ষত্রদের চেয়ে ছোট। এদের ভর সাধারণত বৃহস্পতির ভরের ১৩ থেকে ৮০ গুণ বা আমাদের সূর্যের ভরের ০.০১৩ থেকে ০.০৮ গুণের মতো হয়ে থাকে।
সবচেয়ে বড় চমকটি লুকিয়ে আছে এখানেই! বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, এই সিস্টেমে একটি নতুন বস্তু রয়েছে। তবে আমাদের সৌরজগতের চাঁদগুলো যেমন কোনো গ্রহকে কেন্দ্র করে ঘোরে, এই বস্তুটি তা করছে না। এটি ঘুরছে ওই বাদামি বামন বা ব্যর্থ নক্ষত্রটিকে কেন্দ্র করে!
হোয়ের ভাষায়, ‘এই সিস্টেমের সমস্যার কারণে আমরা একে একটি চাঁদই বলতে চাইছি, যদিও এটি আমাদের সৌরজগতের ছোট ও পাথুরে চাঁদগুলোর মতো মোটেই নয়।’
এটা কি গ্রহ, নাকি চাঁদ
চিলির ইউনিভার্সিদাদ ডিয়েগো পোর্টালেস এবং মিলেনিয়াম নিউক্লিয়াস অব ইয়াং এক্সোপ্ল্যানেটস অ্যান্ড দেয়ার মুনস-এর গবেষক দলের প্রধান কেভিন হোয় বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, আমাদের সৌরজগতের ‘গ্রহ’ বা ‘চাঁদ’ শব্দগুলো দিয়ে এই সিস্টেমটিকে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন। এই নতুন এক্সোস্যাটেলাইট বা ভিনগ্রহের উপগ্রহটি এতটাই বিশাল যে একে অনায়াসেই একটি গ্রহ বলা যায়। কিন্তু এটি কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে না, বরং এমন একটি বস্তুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, যা নিজে একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে।
হোয়ের ভাষায়, ‘এই সিস্টেমের সমস্যার কারণে আমরা একে একটি চাঁদই বলতে চাইছি, যদিও এটি আমাদের সৌরজগতের ছোট ও পাথুরে চাঁদগুলোর মতো মোটেই নয়।’ ২২ জুলাই বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ তাঁদের এই যুগান্তকারী গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষক দল এখনই জোর গলায় এই বস্তুটিকে এক্সোমুন হিসেবে দাবি করতে পারছে না। কারণ তেমনটা করতে হলে চাঁদের সংজ্ঞাতেই বড়সড় পরিবর্তন আনতে হবে।
বর্তমানে চিলিতে এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ নির্মাণের কাজ চলছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এক্সোমুন এবং নতুন নতুন এক্সোস্যাটেলাইট খোঁজার ক্ষেত্রে এটি বিশাল ভূমিকা রাখবে।
দলের আরেক সদস্য অ্যালিস জুরলো ব্যাপারটি আরও পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানান, আবিষ্কৃত উপগ্রহটি আসলে একটি বিশাল গ্যাসীয় পিণ্ড, যা বৃহস্পতির চেয়েও কয়েক গুণ ভারী একটি বস্তুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। আমাদের সৌরজগতে গ্রহ এবং সূর্যের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য আছে। তাই চাঁদকে সংজ্ঞায়িত করা খুব সহজ। কিন্তু CD-35 2722 সিস্টেমে নক্ষত্র, গ্রহ এবং চাঁদের মধ্যকার সেই চেনা সীমারেখা একেবারেই ঝাপসা হয়ে গেছে।
তবে শ্রেণিবিন্যাস ভবিষ্যতে যা-ই হোক না কেন, জুরলো এবং তাঁর সহকর্মীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারেন যে এটি একটি এক্সোস্যাটেলাইট এবং এ ধরনের আবিষ্কার জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটাই প্রথম।

বর্তমানে চিলিতে এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ নির্মাণের কাজ চলছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এক্সোমুন এবং নতুন নতুন এক্সোস্যাটেলাইট খোঁজার ক্ষেত্রে এটি বিশাল ভূমিকা রাখবে।
যত দিন না নতুন এই বস্তুর রহস্য পুরোপুরি উন্মোচিত হচ্ছে, অন্তত একটি বিষয় তো পরিষ্কার; সেই প্রথম এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কারের পর থেকে বিজ্ঞানীরা যে আনন্দে বলে আসছিলেন, আমাদের মহাবিশ্বের গ্রহমণ্ডলগুলো সত্যিই বিচিত্র, অদ্ভুত এবং চমৎকার, এই আবিষ্কার সেই কথাটিকেই যেন আবারও নতুন করে প্রমাণ করল!