সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / অস্ট্রেলিয়ার রাজকীয় বিমানবাহিনীতে বাংলাদেশের সোহান
অস্ট্রেলিয়ার রাজকীয় বিমানবাহিনীতে বাংলাদেশের সোহান

অস্ট্রেলিয়ার রাজকীয় বিমানবাহিনীতে বাংলাদেশের সোহান

১৩ বছর বয়সে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মা–বাবাকে হারিয়েছিলেন কিশোর নাজমুস সোহান। চোখের সামনে চেনা পৃথিবী ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ার পরও তিনি দমে যাননি। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে সুদূর অস্ট্রেলিয়ার রাজকীয় বিমানবাহিনীতে সরাসরি অফিসার পদে যোগ দেওয়া এবং অতি অল্প সময়ে উচ্চতর ‘ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট’ পদে পদোন্নতি পাওয়ার মধ্য দিয়েই তাঁর আসল লড়াইয়ের গল্প শুরু।

বাংলাদেশের একজন সাধারণ তরুণ কীভাবে অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি উন্নত দেশের রাজকীয় বিমানবাহিনীতে যোগ দিতে পারলেন, তা সত্যিই এক বিস্ময়। ব্যবসায়িক সাফল্যের শীর্ষে থাকা অবস্থাতেই ২০২৩ সালে এই সাহসী সিদ্ধান্ত নেন সোহান। প্রথাগত কোনো সামরিক বা উড়োজাহাজ চালনার ডিগ্রি ছাড়াই, শুধু দীর্ঘ আট বছরের ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি সরাসরি ‘ফ্লাইং অফিসার’ হিসেবে বিমানবাহিনীতে যোগ দেন।

এই বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তাঁকে পার হতে হয়েছে অত্যন্ত কঠিন পথ। এর মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় ছিল অস্ট্রেলিয়ার উত্তর কুইন্সল্যান্ডের এক গভীর ও জনমানবহীন জঙ্গলে তাঁর ‘কমব্যাট সারভাইভাল’ বা যুদ্ধকালীন বেঁচে থাকার নির্মম প্রশিক্ষণ। বিমানবাহিনীর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বা শত্রুপক্ষের সীমানায় আটকা পড়লে কীভাবে বেঁচে ফিরতে হয়, তা শেখানো হয় এই বিশেষ কোর্সে। সম্পূর্ণ একা, জনহীন জঙ্গলে চরম প্রতিকূল আবহাওয়া, হিংস্র বন্য প্রাণীর ভয় আর সীমিত রসদ নিয়ে দিনের পর দিন আত্মরক্ষার এই কৌশল রপ্ত করা ছিল শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। এই চরম পরীক্ষা সফলভাবে পার করেই মেধা ও কঠোর শৃঙ্খলার জোরে মাত্র তিন বছরের মাথায়, ২০২৬ সালের ২ জুন তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট’ পদে পদোন্নতি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডের এডিনবরা বিমানঘাঁটিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের দায়িত্বে নিয়োজিত।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com

এই রাজকীয় বাহিনীতে নিজের অবস্থান নিয়ে নাজমুস সোহান বলেন, ‘আমার জানামতে, এই সম্মানজনক কমিশনড অফিসার পদে একজন ইমাম (ধর্মীয় শিক্ষক) ছাড়া আর কোনো বাংলাদেশি এখন পর্যন্ত নেই। তবে আনন্দের কথা হলো, আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত যে এখন অনেক বাংলাদেশি তরুণ জুনিয়র পদে যোগ দিয়েছেন। অনেকেই নিয়মিত আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, কীভাবে এই বাহিনীতে আসা যায়, সেই খোঁজখবর নিচ্ছেন। আমিও সাধ্যমতো তাঁদের সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।’ তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অধ্যবসায়, সততা আর নিজের ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো কিছুই কঠিন নয়। সঠিক লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে গেলে যেকোনো দেশের রাজকীয় বাহিনীতেই বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করা সম্ভব।’

সোহানের পৈতৃক নিবাস সাতক্ষীরার তালা থানায় হলেও বাবার সরকারি চাকরি ও মায়ের নার্সের দায়িত্বের সুবাদে তাঁর বেড়ে ওঠা খুলনার ডুমুরিয়ায়। ডুমুরিয়ার স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ২০১৩ সালে ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে ব্যবসায় প্রশাসনে ভর্তি হন। পরে ২০১৫ সালে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নিয়ে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে মেলবোর্নের মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা শুরু করেন। সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ এবং অভিভাবকহীন জীবনের শূন্যতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন তিনি। ২০১৬ সালে তিনি সুরাইয়া মান্নানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার একটি শীর্ষস্থানীয় যোগাযোগ সংস্থায় ব্যবসায়িক বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায় আটকে না থেকে সোহানের ভেতরের উদ্যোক্তাসত্তা তাঁকে ব্যবসার দিকে টানে। বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় মেলবোর্ন থেকে ব্রিসবেন এবং পরে সিডনিতে ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শাখা বিস্তার করেন। ২০২০ সালে তিনি নিজের একটি নিবন্ধিত প্রশিক্ষণ কলেজ গড়ে তোলেন। ২০১৮ সালের মধ্যেই তিনি অ্যাডিলেডে নিজস্ব বাড়ি কেনেন। এই অর্জিত প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনামূলক দক্ষতাই পরবর্তী সময় তাঁকে অস্ট্রেলীয় বিমানবাহিনীতে সরাসরি অফিসার পদে নির্বাচিত হতে সাহায্য করে।

কঠোর সামরিক শৃঙ্খলার মধ্যেও সোহান ভুলে যাননি তাঁর ফেলে আসা ডুমুরিয়াকে। এক বছরের কন্যাসন্তান ‘সিজদা’ ও স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর সুখী পরিবার। এর বাইরে প্রচারের আড়ালে থেকে তিনি নিজ এলাকার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। ঘর তৈরি করে দেওয়া, শীতবস্ত্র বিতরণ, মসজিদ নির্মাণ এবং অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার মতো সমাজকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন তিনি।

About Editor Todaynews24

Check Also

‘ককরোচ’ আন্দোলনে কটূক্তিকারীদের পথভ্রষ্ট বললেন মোদি

ককরোচ আন্দোলনে তার বিরুদ্ধে কটূক্তি করা শিক্ষার্থীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাদের ‘পথভ্রষ্ট’ ও ‘বিভ্রান্ত সন্তান’ আখ্যা দিয়ে মোদি মন্তব্য করেন, শাস্তি নয়, বরং সঠিক পথ দেখানোই এখন দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *