‘প্রতিটি যাত্রায় এমন একটি মুহূর্ত আসে, যা মনে করিয়ে দেয় কেন আপনি কখনো হাল ছাড়েননি। আজ আমার জীবনে সেই মুহূর্ত এসেছে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া এমন এক সম্মান, যা আমি সারা জীবন লালন করে রাখব,’ ভারতের ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান পাওয়ার পর আবেগঘন একটি বার্তা দিলেন ইয়ামি গৌতম। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া আর্টিকেল ৩৭০ ছবির জন্য এই সম্মান অর্জন করেছেন বলিউড অভিনেত্রী। অধ্যবসায়, দৃঢ়তা এবং অভিনয়ের প্রতি অটল বিশ্বাসের ফল হিসেবেই জাতীয় পুরস্কারের মতো স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন ইয়ামি। সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কারও জিতেছে আর্টিকেল ৩৭০। ফলে ছবির দলের জন্য এটি দ্বিগুণ আনন্দের উপলক্ষ।

ইয়ামির বাবা মুকেশ গৌতম পাঞ্জাবি সিনেমা দুনিয়ার জনপ্রিয় নির্মাতা। ফিল্মি পরিবারের মেয়ে হয়েও সাধারণভাবে ইয়ামির বেড়ে ওঠা। গ্ল্যামার দুনিয়ার চাকচিক্যের বাইরে অনুশাসনের মধ্যেই তিনি বড় হয়েছেন। প্রথম আলোকে এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামি বলেছিলেন, ‘আজও আমি সেই অনুশাসনের মধ্যে নিজেকে বেঁধে রেখেছি। যত সকালেই শুটিং থাকুক না কেন, রাত তিনটার সময় পূজা করে বের হই।’
হিমাচলের পাহাড়ে বেড়ে ওঠা মেয়েটি একদিন নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে চলে এসেছিলেন মায়ানগরী মুম্বাইতে। ছোট পর্দা দিয়ে অভিনয় যাত্রা শুরু করেছিলেন ইয়ামি। ২০০৮ সালে ‘চাঁদ কে পার’ চলো ধারাবাহিকে তাঁর অভিষেক। বাবা পাঞ্জাবি ছায়াছবির দুনিয়ার প্রতিষ্ঠিত পরিচালক হলেও কন্নড় ছবি দিয়ে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন ইয়ামি। ক্যারিয়ারের প্রথম হিন্দি ছবি ভিকি ডোনার-এ সবার নজর কেড়েছিলেন। সুজিত সরকার পরিচালিত এই ছবিতে তাঁকে বাঙালি মেয়ে অসীমা রায়ের ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। হিন্দি ছাড়া তামিল, তেলেগু, পাঞ্জাবি, মালয়ালম ছবিতে কাজ করেছে। এরপর আবার কাবিল ছবির কারণে আলোচনায় উঠে আসেন ইয়ামি। ছবিতে হৃতিক রোশনের সঙ্গে জুটি বেঁধে এসেছিলেন তিনি। ‘কাবিল’-এ তাঁর অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল। অনেকেই তখন বুঝেছিলেন এই মেয়েটি লম্বা রেসের ঘোড়া। এরপর তাঁর ক্যারিয়ারের চাকা তরতরিয়ে এগিয়ে চলে।

বড় পর্দার পাশাপাশি ওটিটিতেও ইয়ামির দাপট দেখা যায়। উরি: ‘দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’, ‘বালা’, ‘আ থার্সডে’, ‘লস্ট’, ‘দশবি’, ‘আর্টিকেল ৩৭০’, ‘হক’-এর মতো আরও সফল ছবি তাঁর ঝুলিতে আসে। নিজেকে ক্রমাগত অন্বেষণ করার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেন এই বলিউড নায়িকা। তাঁর মতে, কাজই তাঁর ধর্ম। আর কাজের প্রতি সব সময় সততা বজায় রাখেন।
বলেন, ‘ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আমি এমনটা করতে চেয়েছিলাম। কথায় আছে, যা তুমি মনপ্রাণ দিয়ে চাইবে, তা-ই পাবে। আজ আমি নিজের পছন্দের কথা কাজের মাধ্যমে বলতে পারছি। অনেক সময় অনেকে আমাকে অবমূল্যায়ন করেছেন, আর সেটাইকেই আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।’ অভিনেত্রী বলেন, তিনি চান অভিয়ের মাধ্যমে দর্শকের হৃদয়ে থাকতে। আর এ বিষয়ে ইয়ামি যে সফল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
‘আর্টিকেল ৩৭০’-এর মতো সিরিয়াস ছবির পাশাপাশি ‘ধুমধাম’-এর মতো হালকা মেজাজের ছবিতেও ইয়ামিকে দেখা গেছে। একটি প্রকল্প নেওয়ার সময় তিনি কী কী দেখেন, ইয়ামি বলেন, ‘চিত্রনাট্যই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম পাঠেই যে অনুভূতি আসে, সেই ‘আন্তরিক অনুভূতি’ই আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। কাহিনি যত বাস্তব হয়, তার প্রতি আগ্রহও তত বাড়ে। এরপর গুরুত্ব পায় চরিত্র ও পরিচালক।’

৩৭ বছর বয়সী ইয়ামি তাঁর পোস্টে বলেছেন, ‘সেরা অভিনেত্রীর স্বীকৃতি বছরের পর বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার ফল।’ তাঁর ভাষায়, ‘গত ১৪ বছর আমি শুধু আমার অভিনয়ের প্রতি সৎ থাকার চেষ্টা করেছি। নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছি এবং আমার অভিনয়কেই আমার হয়ে কথা বলতে দিয়েছি। এই সম্মান আমার সেই দীর্ঘ পথচলার পরিণতি, যে পথ ভরা ছিল আশা, অধ্যবসায়, দৃঢ়তা এবং সিনেমার প্রতি অটুট ভালোবাসায়। বহু বছর ধরে এই স্বপ্ন আমি হৃদয়ে লালন করেছি। আজ গভীর কৃতজ্ঞতা ও বিনয়ের সঙ্গে সেই স্বপ্নকে গ্রহণ করছি।’ তিনি লিখেছেন, ‘এটি কখনো আমার কাছে আর পাঁচটা ছবির মতো ছিল না। এটি এমন একটি গল্প, যার ওপর আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করতাম। প্রতিটি চ্যালেঞ্জ, প্রতিটি আলোচনা এবং শুটিংয়ের প্রতিটি দিন আমরা কাটিয়েছি এই গল্পটি সততা ও দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরার লক্ষ্যে।’

‘এই পুরস্কার কোনো স্বপ্নের সমাপ্তি নয়, বরং আরও বড় একটি দায়িত্বের শুরু। নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করা, ঝুঁকি নেওয়া এবং এমন গল্প বলা, যা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, এটাই এখন আমার লক্ষ্য। এই সম্মান সেই সব মানুষের জন্য, যাঁরা এখনো নিজেদের মুহূর্তের অপেক্ষায় আছেন। কখনো বিশ্বাস হারাবেন না,’ পোষ্টের শেষে লিখেছেন অভিনেত্রী।
২০২১ সালে নির্মাতা এবং পরিচালক আদিত্য ধরের সঙ্গে সাত পাকে বাঁধা পড়েন ইয়ামি। ২০২৪ সালে ইয়ামির কোল আলো করে আসে পুত্রসন্তান বেদাভিদ। অভিনয়ের পাশাপাশি ছেলে, স্বামী নিয়ে এক সুখী পারিবারিক জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। প্রতিষ্ঠিত নায়িকা হয়ে আজও তিনি বলিউডের ঝলমলে দুনিয়ার বাইরে সাদামাটা জীবন কাটান। তাঁর মতে, জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখা সবচেয়ে জরুরি। ইয়ামি জানান, তাঁর পরিবারই তাঁর শক্তি।