সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / যুদ্ধের মধ্যেও তেলের দাম কেন অতটা বাড়ছে না, ৫ কারণ
যুদ্ধের মধ্যেও তেলের দাম কেন অতটা বাড়ছে না, ৫ কারণ

যুদ্ধের মধ্যেও তেলের দাম কেন অতটা বাড়ছে না, ৫ কারণ

চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যতটা বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, ততটা বাড়েনি। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ আছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর পর বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করেছিলেন, অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার, এমনকি ২০০ ডলারেও উঠতে পারে।

এ আশঙ্কা ভিত্তহীন ছিল না। কেননা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ যে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই পথ হঠাৎ করেই বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল।

বাস্তবে ব্রেন্ট ক্রুডের আগাম দাম সর্বোচ্চ প্রায় ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। ২০০৮ সালে আর্থিক সংকটের সময় তেলের দাম উঠেছিল সর্বোচ্চ ১৪৭ ডলার, সে তুলনায় এবার দাম অনেক কম ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ব্রেন্টের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলার। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুদ্ধ বিরতির ঘোষণা পর্যন্ত এ দাম ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার।

যুদ্ধবিরতির পর তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। জুলাইয়ের শুরুতে তা সাময়িকভাবে যুদ্ধ-পূর্ব ৭০ ডলারের পর্যায়ে নেমে আসে। এখন আবার দাম বাড়ছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু এবার দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়েনি। কেন দাম লাগামহীনভাবে বাড়ল না, তার কিছু কারণ তুলে ধরা হলো:

১. চীনের চাহিদা অপ্রত্যাশিতভাবে কমে যাওয়া

সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ চীন। জুন নাগাদ দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। একই সঙ্গে দেশটি পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি কমিয়ে দেয়। এ সময় দেশটিতে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর গাড়ির বদলে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বেড়েছে। দেশটির পেট্রোকেমিক্যাল খাতেও তেলের ব্যবহার কমেছে।

২. যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন বেড়েছে

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন আরও বেড়েছে। এপ্রিল মাসে দেশটির দৈনিক উৎপাদন রেকর্ড ১ কোটি ৩৯ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে উঠে যায়। পাশাপাশি মার্চে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে বাজারে তেল ছাড়ে। এতে সরবরাহে বিঘ্নের প্রভাব কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র নিট রপ্তানিকারকে পরিণত হয়।

৩. ট্রাম্পের বক্তব্যে বাজারে অনিশ্চয়তা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তিচুক্তি কিংবা হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার তেল পরিবহন শুরু হবে, এ সম্ভাবনা নিয়ে বারবার মন্তব্য করেছেন। এতে তেলের দাম আরও বাড়বে—এমন প্রত্যাশা যাঁরা করছিলেন, সেই বিনিয়োগকারীরা বারবার চাপে পড়েন।

ট্রাম্পের এ মন্তব্যের কারণে হয়েছে কি, বাজার ঘুরে দাঁড়াবে, এ ঝুঁকির কারণে অনেক ব্যবসায়ী বড় ধরনের বিনিয়োগে যাননি। অর্থাৎ মজুত করেননি। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের ইলিয়া বুচুয়েভ বলেন, এখন সবাই মনে করছেন, তেলের দাম বাড়বে, কিন্তু কেউ বড় মজুত বা বিনিয়োগে যাচ্ছেন না।

যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়তে পারে—এমন ধারণা নিয়ে অনেক বিনিয়োগকারী আগে থেকেই তেলবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু জুলাইয়ের শুরুতে তাঁরা সেই বিনিয়োগ অনেক কমিয়ে ফেলেন। যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যে বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তার জেরে এ পরিস্থিতি হয়।

এরপর ১৪ জুলাই শেষ হওয়া সপ্তাহে তাঁরা আবার কিছুটা আস্থা ফিরে পেয়ে তেলের দামে ঊর্ধ্বগতির প্রত্যাশায় নতুন করে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেন। সাপ্তাহিক হিসাবে দেখা যায়, গত ছয় মাসে আর কোনো সপ্তাহে এত বেশি নতুন বিনিয়োগ হয়নি।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিনিয়োগ বাড়লেও তা এখনো আগের মতো বেশি নয়। বর্তমানে তেলের দাম বাড়বে—এমন প্রত্যাশায় যে পরিমাণ অর্থ বাজারে রয়েছে, তার মূল্য প্রায় ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৪৮০ কোটি ডলার। কিন্তু মার্চের শেষ দিকে এ অঙ্ক ছিল এর দ্বিগুণের বেশি।

৪. হরমুজের বিকল্প পথ

উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। এতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ কমে যাওয়ার ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া গেছে।

জুন মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন সাময়িকভাবে আবার শুরু হওয়ার পর বাজারে সরবরাহসংক্রান্ত উদ্বেগ কমেছে। তবে জুলাইয়ে যুদ্ধ আবার তীব্র হলে হরমুজে জাহাজ চলাচল আবার কমে যায়।

৫. তাৎক্ষণিক সরবরাহে ঘাটতি নেই

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বর্তমানে বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত অপরিশোধিত তেল রয়েছে। ফলে সংঘাত বাড়লেও দামে তার প্রভাব পড়ছে না।

বিষয়টি হলো, বাজারে কিছু ধরনের তেল তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ করা যায়, যেমন ইউরোপের উত্তর সাগরের ফোর্টিজ গ্রেডের তেল। বাজারে প্রকৃত অর্থেই তেলের সংকট থাকলে ফোর্টিজ এখন প্রিমিয়ামে বা বেশি দামে বিক্রি হতো। অথচ এই তেল বাস্তবে এখন ছাড়ে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ বাজারে পর্যাপ্ত তেল আছে; ক্রেতাদের মধ্যে তেমন আতঙ্ক নেই। সে কারণে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লেও তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি।

তেল ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ মুহূর্তে বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহের জন্য বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আছে। তবে এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী না–ও হতে পারে।

About Editor Todaynews24

Check Also

এস আলম গ্রুপ সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা লুটপাট ও পাচার করলো কীভাবে

এস আলম গ্রুপ সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা লুটপাট ও পাচার করলো কীভাবে

বিএফআইইউয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে সেই টাকা আন্তর্জাতিক বানিজ্য ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করে এস আলম গ্রুপ। এস আলম গ্রুপের মুল ব্যক্তিরা বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব নেওয়ায় পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়ায় কী জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিস্তারিত দেখুন ভিডিওতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *