সর্বশেষ খবর
Home / কলাম / পাবর্ত্য চট্টগ্রাম: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভুল উন্নয়নদর্শন 
পাবর্ত্য চট্টগ্রাম: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভুল উন্নয়নদর্শন 

পাবর্ত্য চট্টগ্রাম: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভুল উন্নয়নদর্শন 

সম্প্রতি টানা ভারী বর্ষণে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবানসহ চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত হয়। এই বিপর্যয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রতি বর্ষায় একই অঞ্চলে বন্যা ও পাহাড়ধস আর শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানিসংকট দেখা দিচ্ছে। মৌসুমভেদে এই দুই বিপরীত বাস্তবতা একই পরিবেশগত সংকটের ভিন্ন প্রকাশ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক দুর্যোগের কারণ হিসেবে সাধারণত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস, খরা ও আকস্মিক বন্যার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্বিচার পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অবকাঠামো নির্মাণ এবং আদিবাসীদের পরিবেশগত জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক চর্চার অবমূল্যায়নও এ সংকটের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

চট্টগ্রামের এ পরিবেশগত সংকটের শিকড় ঔপনিবেশিক শাসনামল পর্যন্ত বিস্তৃত। ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় আদিবাসীদের অংশগ্রহণ ও সম্মতি ছাড়াই সংরক্ষিত বন ব্যবস্থাপনার সূচনা হয় এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর প্রথাগত অধিকার খর্ব করা হয়। নামে সংরক্ষিত বন হলেও সাঙ্গু সংরক্ষিত বন ছাড়া অধিকাংশ বনই সেগুনসহ বাণিজ্যিক বৃক্ষের বাগানে রূপান্তরিত হয়।

আলীকদম-থানচি সড়কের ব্যাঙঝিরির পামিয়া ম্রোপাড়ার পাড়াবনের শতবর্ষী গাছগুলো পাচারকারীরা কেটে ফেলেছে।

এ ঔপনিবেশিক বন ও উন্নয়নদর্শন পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলেও নতুন রূপে বিস্তৃত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয়তাবাদী ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক উন্নয়নদর্শন। পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণে লক্ষাধিক মানুষ, যাঁদের অধিকাংশই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর, বাস্তুচ্যুত হন।

বাংলাদেশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার অংশ হিসেবে সমতল অঞ্চল থেকে চার লক্ষাধিক বাঙালিকে পুনর্বাসন করা হয়। পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি, বন ও পরিবেশ সম্পর্কে তাঁদের অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান ছিল না। একই কথা প্রযোজ্য নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যুক্ত রাজনৈতিক নেতা, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং অন্যদের ক্ষেত্রেও। ফলে ভূমি ব্যবহার, বনসম্পদ ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক দুর্যোগ প্রকৃতির প্রতি আমাদের দীর্ঘদিনের অবিচার এবং প্রচলিত উন্নয়নদর্শনের সীমাবদ্ধতার ফল। তাই এ সংকটের সমাধান শুধু ত্রাণ, পুনর্বাসন বা অবকাঠামো নির্মাণে সম্ভব নয়। উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আমাদের বিদ্যমান দর্শন, নীতি ও চর্চার মৌলিক পুনর্বিবেচনা জরুরি। 

সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটনকেন্দ্রিক রিসোর্ট, সড়ক, সীমান্ত সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ পাহাড়ের ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশগত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেই এগিয়ে চলেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসীদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পরিবেশ-সম্পর্কিত চর্চাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে বন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা, পানির প্রবাহে পরিবর্তনসহ অন্যান্য পরিবেশগত দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশের মোট বনভূমির প্রায় ৪৩ শতাংশ এবং প্রায় ৮০ শতাংশ জীববৈচিত্র্যের আধার অবস্থিত। এ অঞ্চল কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, চেঙ্গী, কাসালং, হালদাসহ অসংখ্য নদ–নদী ও ঝিরি–ঝরনার উৎস কিংবা প্রবাহপথ। শত শত বছর ধরে এসব নদ–নদী পাহাড় ও সমতলের মধ্যে পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধ গড়ে তুলেছে। কৃষি, মৎস্য, শিল্প ও পানির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এগুলো পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও সমতলের বাঙালি সমাজের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান ও পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তি।

বাংলাদেশের অর্থনীতিও পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম বন্দরের নাব্যতা ও কার্যক্রম সচল রাখতে অপরিহার্য। একইভাবে হালদা নদী দক্ষিণ এশিয়ায় কার্পজাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের সুপেয় পানির অন্যতম উৎস।

হালদা নদীর তীর, জলাধার ও সমগ্র অববাহিকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় উজানের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বাঁশঝাড় ও বন সংরক্ষণের ভূমিকা অপরিসীম। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের বন, পাহাড় ও নদী ধ্বংস হলে শুধু পাহাড় নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের পানিসম্পদ, জীববৈচিত্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ও সামগ্রিক অর্থনীতি। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ রক্ষা তাই কোনো আঞ্চলিক স্বার্থের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো পাড়াবন, যার গুরুত্ব জাতীয় বননীতি ২০২৫-এ স্বীকৃতি পেয়েছে। আদিবাসীদের প্রথাগত প্রতিষ্ঠান, সামাজিক নিয়ম ও সামষ্টিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরিচালিত এ ব্যবস্থা বহু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বন ব্যবস্থাপনার চেয়েও কার্যকরভাবে বন, জীববৈচিত্র্য ও পানির উৎস সংরক্ষণ করেছে।

এসব বন থেকে উৎসারিত ঝিরি-ঝরনা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পানীয় জল, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবিকার প্রধান ভিত্তি। প্রকৃতির সঙ্গে আদিবাসীদের সম্পর্ক তাদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস, প্রথাগত শাসনব্যবস্থা, জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত। নদী, পাহাড়, বন, গুহা, পাথর ও প্রাচীন বৃক্ষ তাদের কাছে শ্রদ্ধা, আধ্যাত্মিকতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। 

বান্দরবানে টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চল। ডুবে গেছে ঘরবাড়ি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক দুর্যোগ প্রকৃতির প্রতি আমাদের দীর্ঘদিনের অবিচার এবং প্রচলিত উন্নয়নদর্শনের সীমাবদ্ধতার ফল। তাই এ সংকটের সমাধান শুধু ত্রাণ, পুনর্বাসন বা অবকাঠামো নির্মাণে সম্ভব নয়। উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আমাদের বিদ্যমান দর্শন, নীতি ও চর্চার মৌলিক পুনর্বিবেচনা জরুরি। 

প্রকৃতিকে শোষণের সম্পদ নয়; বরং শ্রদ্ধা, পারস্পরিক নির্ভরতা ও সহাবস্থানের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। এ জন্য উন্নয়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থানীয় ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর প্রথাগত জ্ঞান, বিশ্বাস, প্রতিষ্ঠান ও অভিজ্ঞতাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পরিবেশ ও অর্থনীতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্ব বিবেচনায় এ অঞ্চলের বন, নদী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে শুধু আঞ্চলিক বা পরিবেশগত ইস্যু নয়; বরং দেশের পরিবেশগত নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং জলবায়ু–সহনশীল ভবিষ্যতের জাতীয় অপরিহার্যতা হিসেবে দেখতে হবে।

ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায় পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সার্কেলের প্রধান ও আইনজীবী

ড. হরিপূর্ণ ত্রিপুরা গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

* মতামত লেখকের নিজস্ব

About Editor Todaynews24

Check Also

ক্যাশলেস স্বপ্ন বনাম বাস্তবতার বাংলা কিউআর

ক্যাশলেস স্বপ্ন বনাম বাস্তবতার বাংলা কিউআর

বাংলাদেশে ক্যাশলেস অর্থনীতির যাত্রা নতুন নয়। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট আর ডিজিটাল ওয়ালেটের পথ ধরে এবার বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে এসেছে ‘বাংলা কিউআর’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *