সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / মন কেমনের দিনগুলো এত ভারী কেন
মন কেমনের দিনগুলো এত ভারী কেন

মন কেমনের দিনগুলো এত ভারী কেন

মাঝেমধ্যেই মনের ক্যানভাসটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যায়। পৃথিবীর সব রং হারিয়ে যায় অচেনা পথের বাঁকে। কোনো সংকেত ছাড়াই একরাশ এলোমেলো বিষণ্নতা এসে জেঁকে বসে মনের কার্নিশে। চারপাশের চেনা জগৎটা মুহূর্তেই অচেনা হয়ে যায়। প্রাণের স্পন্দন জোগানো গানগুলো নগরের ব্যস্ততম রাস্তার অসহ্য যান্ত্রিক কোলাহলে রূপ নেয়। প্রিয় জায়গা, কফিশপ, বারান্দা, গলির মোড়—কোথাও মন বসে না। মনে হয় যেন কোনো এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছি।

আমার ভেতরের এই গোলকধাঁধার সঙ্গে বাইরের জগতের কোনো লেনদেন নেই; সেখানে সবকিছু ঠিকঠাক। জানালার ফাঁক দিয়ে রোদ উঁকি দেয়, পাখি ডাকে, দখিনা বাতাস গা ছুঁয়ে যায়, দূরে কারও হাঁক শোনা যায়। সবকিছু ঠিকঠাকই চলতে থাকে, কিন্তু ভেতরে কোথাও এক অদৃশ্য অস্থিরতা এসে ভর করে। বুকের মধ্যে জমে থাকা সেই অনুভূতিকে ঠিক ব্যাখ্যা করা যায় না। যেন পুরোনো কোনো নদী শুকিয়ে গিয়ে ভেজা কাদার গন্ধ রেখে গেছে। মন তখন এমন একটা জায়গায় আটকে থাকে, যেখানে আনন্দও পৌঁছাতে পারে না, আবার স্পষ্ট দুঃখও নয়। শুধু একটা নিঃশব্দ ভার, যা সারা দিন অশরীরী ছায়ার মতো পিছু তাড়া করে ফেরে।

প্রিয় মানুষ, প্রিয় মুখ—যাদের সঙ্গে কথা বললে রাজ্যের সব ক্লান্তি নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে যায়, তাদের উপস্থিতিও তখন ভারী বোঝা মনে হয়। মনে হয় জগতের সব বন্ধন, মায়া, আনন্দ-উৎসব, কোলাহল অর্থহীন এক প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। এক অদ্ভুত বিষাদে সব সত্তা এমনভাবে ঢেকে যায়, মনে হয়—মনের আকাশে হাজার বছরের মেঘ জমে গুমোট মেরে আছে। মনে হয়, এই বুঝি সব ভাসিয়ে দিয়ে অঝোরধারায় বৃষ্টি নামবে। কিন্তু সেই বহু কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি আর নামে না। ভেতরের গুমোট বিষাদও বিরাম পায় না, গুমরে মরা হাহাকার হয়ে বুকের পাঁজরে অবিরত আঘাত করতে থাকে।

তখন খুব ইচ্ছে করে কাউকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে। ইচ্ছে করে কান্নার নোনাজলে বিষাদমাখা মনটাকে ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলতে। কিন্তু ইট-কাঠের এই ব্যস্ততম শহরে এমন মিত্র কোথায় পাব, যে তার ব্যস্ততার হাঁড়ি-কলস উল্টে রেখে আমার মন খারাপের গল্প শুনবে? মন কেমনের দিনে নির্দ্বিধায় পাশে এসে বসবে? এ রকম মানুষ এই দুর্মূল্যের বাজারে এখন আর পাওয়া যায় না। এমন মানুষের দেখা কেবল গল্প-সিনেমাতেই মেলে। মানুষ আসলে ভালোবাসে আলো-ঝলমলে সুখের গল্প শুনতে। সাফল্যের গল্প, প্রেমের গল্প, উৎসবের গল্প। দীর্ঘশ্বাসের শব্দ মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে।

এমন উদাস দিনে ভেতরে অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করে, তখন আর কোথাও স্থির থাকা যায় না। তাই কখনো কখনো বাইরে বেরিয়ে পড়ি, উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটি। গন্তব্য ছাড়া হাঁটার মধ্যে অদ্ভুত এক শান্তি আছে। শহরের ভাঙা ফুটপাত, ধুলাজমা বিলবোর্ড, মোড়ের বুড়ো বটগাছ, দূরে ঝুলে থাকা বিদ্যুতের তার, তারের ওপর বসা একলা পাখি—সবকিছু তখন নিজের মতো লাগে। মনে হয় এদেরও বাড়ি ফেরার কোনো তাড়া নেই। এরাও মানুষের বুকের ভেতরে জমে থাকা হাজার বছরের দীর্ঘশ্বাসের মতো দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে টিকে আছে।

ক্লান্ত পায়ে ফুটওভার ব্রিজে দাঁড়িয়ে মানুষের ছুটে চলা দেখি। চারপাশে এত ভিড়, এত আয়োজন, এত মানুষের আনাগোনা—তবু নিজেকে বড্ড একা লাগে। নগরের এই অবিরাম ব্যস্ততা যেন আমার ভেতরের নিঃসঙ্গতাকে আরও নির্মমভাবে উপহাস করে। পৃথিবীর বীভৎসতম একাকিত্ব বোধ হয় এটাই—সবার মধ্যে থেকেও নিজেকে ভীষণ একা মনে হওয়া।

মানুষের ভেতরে আসলে অনেকগুলো ঘর আছে। কিছু ঘরে আলো জ্বলে, কিছু ঘরে জমে থাকে নিকষ আঁধার। আমরা বুকের গভীরে খুব যত্নে এই অন্ধকার কক্ষগুলো লুকিয়ে রাখি। এখানে জমা থাকে না-বলা অভিমান, নীরব কান্না, অপূর্ণ ইচ্ছে, হারিয়ে যাওয়া সময়ের ক্ষত। বাইরের মানুষ শুধু সাজানো ড্রয়িংরুম দেখে, ভেতরের বন্ধ দরজাগুলোর খবর কেউ রাখে না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, অনেক সময় আমরা নিজেরাও সেই দরজাগুলোর সামনে দাঁড়াতে ভয় পাই। হয়তো নিজের কাছ থেকেই পালাতে চাই। কিন্তু নিজেকে রেখে কি আদৌ পালানো যায়? মানুষ আসলে জগৎ, সংসার, মায়া, পিছুটান—সবকিছু থেকে পালাতে পারলেও নিজেকে রেখে পালাতে পারে না। সারা জীবন বৃথা চেষ্টা করে যায় শুধু।

এই বিষণ্ন মুহূর্তগুলোতে চারপাশটাও কেমন যেন নিঝুম আর রহস্যময় হয়ে ওঠে। মনে হয়, জগতে কোনো মানুষ নেই, কোনো ভালোবাসা নেই, এমনকি কোনো কাম-বাসনাও নেই। নীড়ে ফেরার যে চিরন্তন আকুলতা মানুষকে ঘরমুখী করে, সেই অনুভূতিও তখন ভেতর থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। এই যে চিরচেনা পৃথিবী, খুব কাছের মানুষ—হঠাৎই তারা সবাই কেমন যেন অচেনা হয়ে যায়। তাদের হাসি, গল্পগুজব, জীবনকে উপভোগ করার ধরন—সবকিছুই ছায়াছবির মতো মনে হয়। তাদের মধ্যে সশরীর উপস্থিত থেকেও নিজেকে এক দুর্ভেদ্য কাচের খাঁচায় বন্দী আবিষ্কার করি। সেখান থেকে বাইরের কোলাহল দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু তার উচ্ছ্বাস হৃদয়ে পৌঁছায় না। মনে হয় পৃথিবীটা কেবল সুখী মানুষদের জন্য সাজানো, যেখানে আমার মতো আগন্তুকের কোনো ঠাঁই নেই।

নিজের সঙ্গে নিজের এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ি তখন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করি—পৃথিবীতে আমার আসলে কী করার ছিল আর আমি দিনশেষে কী করছি? যা পাওয়ার অধিকার আমার ছিল, তার কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি? চারপাশে যখন অন্য মানুষগুলো নিজেকে মেলে ধরছে, সুখের জাল বুনছে, ভালোবাসার মানুষকে জড়িয়ে থাকছে, তখন আমি কেন এই অন্ধকারে আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছি? স্পষ্ট বুঝতে পারি, আমি নিজেই নিজের সঙ্গে চরম অন্যায় করছি। নিজেকে নিজেই অবর্ণনীয় যন্ত্রণার আগুনে দগ্ধ করছি, কিন্তু কেন?

এই প্রশ্নের কোনো উত্তর জানা নেই। কেন আমি আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো জীবনটাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছি না? কেন নিজেকে এক অদৃশ্য কষ্টের জিঞ্জিরে বেঁধে অহর্নিশ পোড়াচ্ছি? কেন প্রতিদিন নিজের অজস্র চাওয়া-পাওয়াকে নিজ হাতে গলা টিপে হত্যা করছি? এই প্রশ্নগুলো উইপোকার মতো আমার অস্তিত্বকে কুরে কুরে খায়, কিন্তু এদের কোনো কূলকিনারা করতে পারি না।

আসলে কিছু দহন থাকে যা ভীষণ ব্যক্তিগত। সেগুলো কাউকেই বলা যায় না, চাইলেও বুঝিয়ে বলা সম্ভব হয় না। কাউকে বলার মতো জুতসই ভাষাও আমার জানা নেই। বলতে গেলে লোকে হয়তো এর অদ্ভুত কোনো নাম দেবে, পাগলের প্রলাপ বলবে, হয়তো শহরের কোনো নামকরা সাইকিয়াট্রিস্টের ঠিকানাও গুঁজে দেবে হাতে। এসব ভেবে কণ্ঠনালির ভেতরেই থেমে যায় বিষাদ, ভাষা হয়ে উঠে আসে না।

রাত হলে এই অনুভূতিগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চারপাশ নিস্তব্ধ হলে নিজের ভেতরের আওয়াজগুলো বেশি শোনা যায়। তখন পুরোনো স্মৃতি এসে বসে শিয়রের পাশে। হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কথা মনে পড়ে, অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো জেগে ওঠে। মনে হয়, জীবনটা যেন অর্ধেক লেখা কোনো উপন্যাস, যার শেষটা লেখা হয়নি। দীর্ঘশ্বাসগুলো তখন ঘরের অন্ধকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যায়। ঘুমদেবতারা অন্য পাড়ায় গিয়ে সুখী মানুষের কপালে রুপার কাঠি ছোঁয়ায়। দেয়ালঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দে আমার ঘুমহীন রাত ফুরিয়ে যায়।

বলি বলি করেও এসব যন্ত্রণা ব্যক্তিগতই থেকে যায়, যা অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সামর্থ্য ঈশ্বর আমাকে দেননি। বুকের মধ্যে যন্ত্রণার গর্তগুলোকে কবর দিয়ে, ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম হাসির রেখা টেনে সবাইকে আশ্বস্ত করি—পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটি আমিই। এই লুকোচুরি খেলতে খেলতেই হয়তো একদিন নিঃশব্দে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাব। হাসিমুখের আড়ালে একটা মানুষ যে প্রতিদিন তিল তিল করে মরে যাচ্ছিল, তা কেউ টেরও পাবে না।

নাটক বা সিনেমার রঙিন পর্দায় অভিনয় করা আর নিজের বাস্তব জীবনের সঙ্গে লড়াই করে অভিনয় করার মধ্যে বিশাল ব্যবধান। শুটিংয়ের সেটে দৃশ্য শেষ হলে পরিচালক যখন ‘কাট’ বলেন, তখন অভিনেতা তার মেকআপ ধুয়ে নিজের আসল সত্তায় ফিরে এসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারেন। কিন্তু আমার এই যাপিত জীবনের অভিনয়ের কোনো ‘কাট’ নেই, কোনো বিরতি নেই। এই ক্লান্তিহীন অভিনয়জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চলতেই থাকবে। ভালো থাকার অভিনয়, মিথ্যা ভালোবাসার নাটক, চারপাশের অযৌক্তিকতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার লড়াই—এসব করতে করতে ভেতর থেকে একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। এই অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এখানে চরিত্রটাই বেঁচে থাকে, কিন্তু মানুষটা ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়।

বুকের ভেতরের এই নীরব বিষাদ যখন সহ্যের শেষ সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন হয়তো কেউ কেউ জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত হয়। পৃথিবীর মানুষ জানতেও পারে না, এই শান্ত আর হাসিখুশি চেহারার আড়ালে একটা মানুষ প্রতিদিন কতটা প্রলয়ংকরী তুফান নিজের মধ্যে বয়ে বেড়াত। সবাই শুধু ঝিনুকের পরিপাটি রঙিন খোলসটাই দেখে; কিন্তু তার বুকের ভেতর চেপে রাখা বিষের বালির খবর কেউ রাখে না।

এই মন কেমনের কোনো মহৌষধ নেই আসলে। তাই অভিনয়টুকু সম্বল করেই দুর্গম পথে গন্তব্যহীন হেঁটে যাচ্ছি। না-বলা কথাগুলো বুকের গভীরেই চাপা দিয়ে রাখছি—পাছে কেউ টের পেয়ে যায়।

এই একাকিত্ব, এই শূন্যতা আর এই গন্তব্যহীন পথ চলা—এগুলোই এখন আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই মন কেমনের দিনে কোলাহল ছেড়ে নির্জনতাকে আঁকড়ে ধরতেই বেশি ভালোবাসি। যেখানে কোনো মিথ্যা অভিনয় নেই, কারও কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই—আছে শুধু আমি আর আমার বিষাদ। এই বিষাদ হয়তো আমাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে, আবার হয়তো এই বিষাদই আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে আমি এখনো বেঁচে আছি। মন কেমনের এই প্রহরগুলো তাই আমার কাছে একাধারে অভিশাপ এবং নিজের একান্ত সত্তার সঙ্গে মোলাকাতের একমাত্র উপলক্ষ।

হয়তো কোনো এক স্নিগ্ধ ভোরে বুকের এই হাজার বছরের গুমোট মেঘ কেটে গিয়ে সত্যিই অঝোরধারায় বৃষ্টি নামবে। হয়তো সেদিন কান্নার নোনাজলে ধুয়ে যাবে ভেতরের সব ক্লান্তি, সব না-বলা অভিমান। হয়তো সেদিন আর ভালো থাকার এই ক্লান্তিকর অভিনয়ের কোনো প্রয়োজন পড়বে না, চারপাশের চেনা জগৎটাকে আর অচেনা মনে হবে না। কিংবা কে জানে, হয়তো এমন কোনো দিন কখনোই আসবে না; এই বিষাদকেই চিরকালের সঙ্গী করে পাড়ি দিতে হবে অনন্তের পথে।

তবু অন্ধকারের বুক চিরে যেমন ভোরের আলো ফোটে, তেমনি হৃদয়ের গহিনেও কোথাও একটা ক্ষীণ আশা বেঁচে থাকে—একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, একদিন এই ক্লান্ত পথিক কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তির খোঁজ পাবে। আর ঠিক সেই দিনের অপেক্ষায় আপাতত এই মন কেমনের দিনের না–বলা কথাগুলোকে সঁপে দিলাম নিজেরই একান্ত ব্যক্তিগত ডায়েরির পাতায়।

About Editor Todaynews24

Check Also

ঢাকায় ৯ দিনে ৬ কনসার্ট, কে কবে কোথায় গাইবেন

ঢাকায় ৯ দিনে ৬ কনসার্ট, কে কবে কোথায় গাইবেন

আবার বর্ষায় নিয়মিত হচ্ছে গানের অনুষ্ঠান। ঢাকায় হতে যাচ্ছে ছয়টি কনসার্ট। যেখানে সংগীত পরিবেশন করবেন দেশ-বিদেশের বড় তারকারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *