সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / পাউ কুবারসি: কাঠমিস্ত্রির ছেলের বিশ্বজয়
পাউ কুবারসি: কাঠমিস্ত্রির ছেলের বিশ্বজয়

পাউ কুবারসি: কাঠমিস্ত্রির ছেলের বিশ্বজয়

২০০ জনেরও কম মানুষের একটি ছোট্ট গ্রামে জন্ম নিয়ে কি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের অন্যতম সেরা ফুটবলার হওয়া সম্ভব? কাঠমিস্ত্রির কারখানায় বড় হওয়া একটি ছেলে কি এফসি বার্সেলোনার দুর্দান্ত এক ডিফেন্ডারে পরিণত হতে পারে? আর প্রথম বিশ্বকাপ খেলেই, মাত্র ১৯ বছর বয়সে, আসরের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিততে পারে?

শান্ত, গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এক কিশোর কি এমন মানসিক দৃঢ়তা ও অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতা গড়ে তুলতে পারে, যা তাঁকে মাঠে এক ভয়ংকর যোদ্ধায় পরিণত করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এককথায়—হ্যাঁ, পারে। আর তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ পাউ কুবারসি।

মাত্র ১৯ বছর বয়সেই এবারের বিশ্বকাপে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন স্পেনের এই সেন্টার-ব্যাক। টুর্নামেন্টজুড়ে তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে। নিউ জার্সিতে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে মার্কোস সেনেসির নিশ্চিত গোলের সুযোগ ঠেকিয়ে দেন কুবারসি। সেই ট্যাকলই কার্যত স্পেনের শিরোপা নিশ্চিত করে। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে রানদাল কোলো মুয়ানির শট ঠেকিয়ে এমিলিয়ানো মার্তিনেজ যেমন আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন, তেমনি কুবারসির সেই ট্যাকলও স্পেনের শিরোপা জয়ে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

কুবারসির জন্ম জিরোনা প্রদেশের ছোট্ট গ্রাম এস্তানিওলে। নতুন ক্যাম্প ন্যু থেকে গাড়িতে সেখানে যেতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। ২০০ জনেরও কম মানুষের বসবাস এই গ্রামে। প্রায় ১ হাজার ২৫০ মিটার ব্যাসের একটি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ ঘিরেই গড়ে উঠেছে জনপদটি, যেখানে একসময় একটি ছোট চ্যাপেল ছিল।

এখন গ্রামটিতে আছে হাতে গোনা কয়েকটি রাস্তা, পাথরের তৈরি কিছু বাড়ি, একটি গির্জা, একটি কবরস্থান, দুটি বার এবং একটি কাঠের কারখানা। সেই কারখানাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কুবারসির পরিবারের কয়েক প্রজন্মের ইতিহাস।

‘ফুস্তেরিয়া কুবারসি’ নামের ওই কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর প্রপিতামহ, ১৯০৫ সালে। বর্তমানে এটি পরিচালনা করেন কুবারসির বাবা রবার্ত। পেশাদার ফুটবলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আগে গ্রীষ্মের ছুটিতে বাবার সঙ্গে এই কারখানায় কাজও করতেন কুবারসি। গ্রামটিতে কোনো ফার্মেসি বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রও নেই।

বিশ্বকাপের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার হাতে কুবারসি

বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেও নিজের গ্রামের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রেখেছেন কুবারসি। এমনকি মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ফুটবল থেকে অবসরের পরের জীবন নিয়েও তাঁর স্পষ্ট ভাবনা রয়েছ কিছুদিন আগে কাতালান দৈনিক লা ভানগুয়ার্দিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কুবারসি বলেছিলেন, ‘আমি চাই আমার সন্তানরা ছোট শহর বা গ্রামের পরিবেশেই বড় হোক। কারণ, আমি নিজেও গ্রামের মানুষ, শান্ত জীবনই বেশি পছন্দ করি। শহরে অনেক সুবিধা আছে, অনেক কিছু হাতের কাছেই পাওয়া যায়। কিন্তু আমার কাছে ছোট শহরের শান্ত পরিবেশই বেশি প্রিয়।’

এস্তানিওল গ্রামে কোনো স্কুল বা ফুটবল মাঠ না থাকায় ছোটবেলায় পাশের শহরের ক্লাব এফসি ভিলাবলারেইক্সে ফুটবল খেলা শুরু করেন কুবারসি। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর প্রতিভা নজর কাড়ে জিরোনার যুব একাডেমির। এরপর আর দেরি করেনি বার্সেলোনা। ২০১৮ সালে, মাত্র ১১ বছর বয়সে, তাঁকে দলে ভেড়ায় কাতালান ক্লাবটি।

এরপর কুবারসির ঠিকানা হয় লা মাসিয়া-বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি। কাতালোনিয়ার বাইরে থেকে আসা সম্ভাবনাময় তরুণ ফুটবলারদের গড়ে তোলার অন্যতম সেরা জায়গা এটি। লা মাসিয়াতেই লামিনে ইয়ামালের সতীর্থ ছিলেন কুবারসি।

২০২৩-২৪ মৌসুমে দুজনই প্রথম দলের সঙ্গে যুক্ত হন। তবে বার্সেলোনার জার্সিতে আনুষ্ঠানিক অভিষেকটা আগে হয় কুবারসির। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, ১৭তম জন্মদিনের কয়েক দিন আগে, কোপা দেল রের ম্যাচে তৃতীয় বিভাগের ক্লাব ইউনিয়োনিস্তাস দে সালামাঙ্কার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে বার্সেলোনার হয়ে মাঠে নামেন তিনি।

স্পেনের বয়সভিত্তিক দলগুলোর হয়ে খেলার পর ২০২৪-২৫ মৌসুমে কোচ হান্সি ফ্লিকের অধীন বার্সেলোনার প্রথম একাদশে নিজের জায়গা পাকা করে নেন কুবারসি। ১.৮৯ মিটার উচ্চতার এই ডান পায়ের সেন্টারব্যাক মৌসুমজুড়ে ৫৬টি ম্যাচ খেলেন। বার্সেলোনার জার্সিতে জেতেন নিজের প্রথম তিনটি শিরোপা-স্প্যানিশ সুপার কাপ, কোপা দেল রে এবং লা লিগা। একই মৌসুমে কোপা দেল রেতে আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে বার্সেলোনার হয়ে নিজের প্রথম গোলও করেন তিনি।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বার্সেলোনার সঙ্গে ২০২৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নতুন চুক্তি করেন কুবারসি। এরপর লা লিগার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনার অন্যতম ভরসার খেলোয়াড় হিসেবেই ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলতে যান তিনি।

২০২৪ সালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্পেন যে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, সেই দলে ছিলেন না কুবারসি। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের সঙ্গে আলোচনা করেই তিনি ইউরো না খেলার সিদ্ধান্ত নেন, যাতে প্যারিস অলিম্পিকে আরও সতেজ অবস্থায় খেলতে পারেন।

সেই সিদ্ধান্তই পরে সঠিক প্রমাণিত হয়। প্যারিস অলিম্পিকে স্পেনের সোনাজয়ী দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন কুবারসি। স্মরণীয় ফাইনালে ফ্রান্সকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে অলিম্পিকের স্বর্ণপদক জেতে স্পেন। গত রোববার বিশ্বকাপ শেষে টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন কুবারসি।

বিশ্বকাপে দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন কুবারসি

সম্প্রতি যেমন একটি দাতব্য কর্মসূচিতে তোলা লামিনে ইয়ামালের শিশু বয়সের লিওনেল মেসির সঙ্গে ছবি ভাইরাল হয়েছিল, তেমনি কুবারসিরও মেসির সঙ্গে শৈশবের একটি ছবি রয়েছে। রোজারিওর এই মহাতারকাকে নিজের অন্যতম আদর্শ মানেন কুবারসি।

কুবারসি বলেন, ‘মেসি অসাধারণ গুণসম্পন্ন একজন ফুটবলার। বার্সেলোনায় খেলার সময় থেকে বহু বছর ধরে তাঁকে দেখেছি, তাঁকে অনুসরণ করেছি।’

বিশ্বকাপ ফাইনালের পর মেসির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা জানিয়ে কুবারসি বলেন, ‘এর আগে কখনো তাঁকে সামনাসামনি দেখিনি। তিনি যখন এসে আমাকে শুভেচ্ছা জানালেন, তখনই যেন বিশ্বাস হলো—হ্যাঁ, আমরা সত্যিই এখানে আছি। তাঁর সঙ্গে একই মাঠে খেলতে পারাটা আমার জন্য বিশাল সৌভাগ্যের।’

কুবারসিকে কাছ থেকে চেনেন, এমন মানুষেরা বলেন, বয়সের তুলনায় তাঁর পরিণত চিন্তাভাবনা ও নেতৃত্বের গুণ অসাধারণ। তাঁর মানসিকতা একেবারেই আলাদা। নিয়মিত বই পড়া তাঁর দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ। ফুটবল নিয়েই ব্যস্ত থাকলেও ভবিষ্যতে ব্যবসায় প্রশাসন (বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) বিষয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন এই স্প্যানিশ ডিফেন্ডার।

দৃঢ় ব্যক্তিত্বের জন্য বার্সেলোনায় অনেকেই কুবারসিকে ক্লাব কিংবদন্তি কার্লেস পুয়োলের উত্তরসূরি হিসেবে দেখেন। তিনি যেমন দ্রুতগতির, তেমনি প্রতিপক্ষের আক্রমণ আগেভাগেই বুঝে তা ভেঙে দেওয়ার দক্ষতাও অসাধারণ।

লড়াই থেকে কখনোই পিছিয়ে যান না কুবারসি। ২০২৪ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগে রেড স্টার বেলগ্রেডের বিপক্ষে ম্যাচে দুর্ঘটনাবশত আঘাত পেয়ে মুখে একাধিক সেলাই নিয়েও খেলা চালিয়ে যাওয়ার দৃশ্যই তাঁর মানসিক দৃঢ়তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে কুবারসির পথচলা এখনো কেবল শুরু। তবে যেভাবে এগোচ্ছেন, তাতে অবসরের পর নিজের ছোট্ট জন্মগ্রামে ফেরার আগে ফুটবল ইতিহাসে আরও অনেক সোনালি অধ্যায় যোগ করবেন, এমন বিশ্বাস করাই যায়।

About Editor Todaynews24

Check Also

বিশ্বকাপ শেষ, মনটা কেন এত ফাঁকা? ‘পোস্ট-ইভেন্ট ব্লুজ’ কাটিয়ে ওঠার ১০টি সহজ উপায়

বিশ্বকাপ শেষ, মনটা কেন এত ফাঁকা? ‘পোস্ট-ইভেন্ট ব্লুজ’ কাটিয়ে ওঠার ১০টি সহজ উপায়

এক মাসের উন্মাদনা, রাতজাগা ম্যাচ আর অগণিত আবেগের পর বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বেজে গেছে। কিন্তু ট্রফি ওঠার পরও অনেকের মন যেন খালি খালি লাগে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *