কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে—এমন আশঙ্কা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো বিনোদনশিল্পও। এআইয়ের প্রভাবে চীনের স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটক (ভার্টিক্যাল শর্ট ড্রামা) শিল্পে কাজ হারাচ্ছেন অভিনেতারাও।

এর বাস্তব উদাহরণ শু পেং। ৩০ বছর বয়সী এই অভিনেতা চীনের জনপ্রিয় ভার্টিক্যাল শর্ট ড্রামা ইন্ডাস্ট্রিতে পরিচিত ছিলেন ‘দাপুটে সিইও চরিত্রে’ অভিনয়ের জন্য। সিরিজটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সেন্ট্রাল একাডেমি অব ড্রামা থেকে পড়াশোনা করা শু পেং আগে টেলিভিশন নাটকেও অভিনয় করেছেন। পরে ২০২৫ সালে চীনে মাইক্রো-ড্রামার জনপ্রিয়তা বাড়লে তিনি এই ধারার নাটকে কাজ শুরু করেন।
সিদ্ধান্তটি শুরুতে সফল হয়। অভিনয়দক্ষতার কারণে দ্রুতই তিনি একের পর এক প্রধান চরিত্রের প্রস্তাব পেতে থাকেন। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা সময়ে প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত শুটিং করতে হতো তাঁকে।
কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় খুব দ্রুত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) চীনে প্রকাশিত প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটকের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজারই এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ, নতুন প্রকাশিত নাটকের ৯৫ শতাংশের বেশি নির্মাণে কোনো না কোনোভাবে এআই যুক্ত ছিল।
এর প্রভাব পড়ে শু পেংয়ের ক্যারিয়ারেও। একসময় যাঁর শুটিং–শিডিউল থাকত ব্যস্ততায় ভরা, তিনিই হঠাৎ করে অভিনয়ের কাজ হারিয়ে ফেলেন। চলতি বছরের শুরুতে শেষ শর্ট ড্রামার কাজ শেষ করার পর তিনি ঝেজিয়াং প্রদেশের হেংদিয়ান—চীনের অন্যতম বড় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নির্মাণকেন্দ্র ছেড়ে নিজের গ্রাম শানডংয়ে ফিরে যান।

সম্প্রতি জানা যায়, নিজের গ্রামের বাজারে দাদার সঙ্গে সবজি বিক্রি করছেন এই অভিনেতা। ক্যামেরার সামনে অভিনয় করা মানুষটিকে এখন দেখা যায় রোদে দাঁড়িয়ে সবজি বিক্রি করতে। তাঁকে এভাবে দেখে অবাক হয়েছেন অনেক আত্মীয়। আবার ভক্তদের কেউ কেউ খবর পেয়ে বাজারে গিয়ে তাঁর সঙ্গে ছবি তুলছেন।
তবে পেশার পরিবর্তন নিয়ে হতাশ নন শু পেং। চীনা সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘অভিনয় একটি পেশামাত্র। যদি অভিনয়ের কাজ না থাকে, তাহলে জীবিকা চালানোর অন্য পথ খুঁজে নেব। নিজের পরিশ্রমে সৎভাবে আয় করতে পারলে এমন কোনো বাধা নেই, যা আমি পার হতে পারব না।’
শু পেং আরও বলেন, বিনোদনজগৎ থেকে তাঁর পুরোপুরি বিদায় নেওয়া হয়নি, শুধু মঞ্চ বদলেছে। বলেন, ‘আমার পেশা বদলালেও আমি একই মানুষ আছি এবং সব সময় যেকোনো সুযোগের অপেক্ষায় আছি।’
শু পেং একা নন। চীনের শর্ট ড্রামা–শিল্পে এআইয়ের উত্থানে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান প্রভাবিত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
একসময় জনপ্রিয় শর্ট ড্রামার অভিনেতারা দিনে সর্বোচ্চ ২০ হাজার ইউয়ান (প্রায় ২ হাজার ৯৪০ মার্কিন ডলার) পর্যন্ত আয় করতেন। এখন অনেকেই দিনে ১ হাজার ২০০ ইউয়ান পারিশ্রমিকের কাজও খুঁজে পাচ্ছেন না।
বর্তমানে এআই যুক্ত হচ্ছে নাটক নির্মাণের প্রায় সব পর্যায়ে—চিত্রনাট্য লেখা, চরিত্র তৈরি, মডেলিং থেকে শুরু করে পোস্ট-প্রোডাকশনের সম্পাদনাতেও। ফলে যেখানে আগে মানুষের অংশগ্রহণে শুটিং করতে দীর্ঘ সময় ও বেশি অর্থ লাগত, সেখানে এআই দিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই অনেক কম খরচে নাটক তৈরি করা যাচ্ছে।
তবে অভিনয়ের স্বপ্ন ছাড়ছেন না শু পেং। তিনি অভিনয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা করছেন এবং একই সঙ্গে বাস্তব অভিনেতাদের নিয়ে তৈরি স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটকেও কাজ চালিয়ে যেতে চান।
এআইয়ের কারণে সৃষ্ট এই পরিবর্তনকে তিনি কঠিন বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, সৃজনশীল এই শিল্পে এআইয়ের প্রভাব এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়।
সিএনএ লাইফ স্টাইল অবলম্বনে