গতকাল ১ আগস্ট কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং করার সময় আকাশ থেকে সমুদ্রে পড়ে শৌভিক রায় নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে, দেশে পরিচালিত প্যারাসেইলিং কার্যক্রম কতটা নিরাপদ এবং নিরাপত্তার মানদণ্ড কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে।
সমুদ্রকে পাখির চোখে দেখার স্বপ্ন অনেক ভ্রমণপ্রেমীর। নীল আকাশে ভেসে থাকা, নিচে উত্তাল ঢেউ দেখা—এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার নাম প্যারাসেইলিং। কক্সবাজারে গেলে তাই অনেকেরই ‘বাকেট লিস্টে’ থাকে এই অ্যাডভেঞ্চার। দরিয়ানগর, ইনানী উপকূলসংলগ্ন সালসা বিচসহ কয়েকটি স্থানে প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক প্যারাসেইলিং করেন। তবে রোমাঞ্চের এই অভিজ্ঞতা নিতে গিয়ে নিরাপত্তায় সামান্য ঘাটতিও মুহূর্তের মধ্যে আনন্দকে পরিণত করতে পারে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। কয়েক মিনিটের উড়ালই হয়ে উঠতে পারে আজীবনের ট্র্যাজেডি।
শনিবার দুপুরে দরিয়ানগর এলাকায় সি স্পোর্টস পরিচালিত একটি প্যারাসেইলিং পয়েন্টে উড়ার সময় নিরাপত্তা হারনেস থেকে ছিটকে সমুদ্রে পড়ে যান খুলনার বাসিন্দা শৌভিক রায় (২৮)। তিনি নয় সদস্যের একটি পর্যটক দলের সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই হারনেস থেকে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তাঁকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। শৌভিকের মৃত্যুর পর আবারও আলোচনায় এসেছে কক্সবাজারে পরিচালিত প্যারাসেইলিং কার্যক্রমের নিরাপত্তা।
এটি প্রথম ঘটনা নয়
কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে দুর্ঘটনার ঘটনা এর আগেও ঘটেছে।
২০২৫ সালের ২০ মে দরিয়ানগর সৈকতে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় একসঙ্গে দুই পর্যটককে নিয়ে উড্ডয়নের সময় একটি পর্যটক দম্পতি সমুদ্রে ছিটকে পড়ে আহত হন। পরে জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরঞ্জাম জব্দ করে কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।
একই বছরে আরেক নারী পর্যটকও প্যারাসেইলিং চলাকালে সমুদ্রে পড়ে আহত হন। সেবারও নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট এক পর্যটক প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে ঝাউগাছের মাথায় আটকে দীর্ঘ সময় ঝুলে ছিলেন। পরে তাঁকে উদ্ধার করা হলেও ওই ঘটনার পরও প্রশাসন সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেয়।
গত কয়েক বছরে একই ধরনের একাধিক দুর্ঘটনা ঘটলেও স্থায়ী ও কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা
শৌভিকের মৃত্যুর পর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে তাঁর স্বজন ও সফরসঙ্গীদের আহাজারির পাশাপাশি ক্ষোভও দেখা যায়। তাঁরা প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার মান, সরঞ্জামের সক্ষমতা এবং সরকারি তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং পরিচালিত হলেও আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই প্রশিক্ষিত অপারেটরের অভাব, সরঞ্জামের নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা, উদ্ধার নৌযান এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত অপারেটর, নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা, কার্যকর তদারকি এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাঁদের মতে, নিরাপত্তার মান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রেখে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত।
নিরাপদ প্যারাসেইলিংয়ের জন্য যেসব বিষয় জরুরি
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্যারাসেইলিং পরিচালনার ক্ষেত্রে সাধারণত নিচের বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক হিসেবে বিবেচিত হয়—
১. প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও লাইসেন্সধারী অপারেটর
২. আন্তর্জাতিক মানের হারনেস, প্যারাসুট ও টো-রোপ
৩. প্রতিদিন সরঞ্জামের কারিগরি পরীক্ষা
৪. সমুদ্রে প্রস্তুত উদ্ধারকারী স্পিডবোট ও প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড

৫. জরুরি চিকিৎসাসেবা ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা
৬. আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করে বৈরী পরিস্থিতিতে কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা
৭. প্রতিটি ফ্লাইটের আগে নিরাপত্তাবিষয়ক ব্রিফিং
৮. দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত উদ্ধার ও জরুরি প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি
এছাড়া, পর্যটকদেরও থাকতে হবে সচেতন
যেকোনো অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে অংশ নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় নিজ দায়িত্বে যাচাই করা জরুরি।
লাইফ জ্যাকেট ও হারনেস ঠিকভাবে পরানো হয়েছে কি না নিশ্চিত করুন।

অপারেটর নিরাপত্তা নির্দেশনা দিচ্ছেন কি না খেয়াল করুন।
বৈরী আবহাওয়া, প্রবল বাতাস বা বৃষ্টির সময় প্যারাসেইলিং থেকে বিরত থাকুন।
উদ্ধারকারী নৌযান প্রস্তুত আছে কি না জেনে নিন।
কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ হলে সেই প্রতিষ্ঠানের সেবা গ্রহণ করবেন না।

রোমাঞ্চের আগে জীবন
প্যারাসেইলিং নিঃসন্দেহে দারুণ এক অভিজ্ঞতা। কিন্তু যেকোনো অ্যাডভেঞ্চারের প্রথম শর্তই নিরাপত্তা। কক্সবাজারের সাম্প্রতিক এই মৃত্যু এবং এর আগের একাধিক দুর্ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, কেবল ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি পর্যটকের নিরাপদে ফিরে আসা নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। সমুদ্রের আকাশে কয়েক মিনিটের উড়াল যেন আর কোনো পরিবারের জন্য শোকের কারণ না হয়—এটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো
ছবি: এআই ও ইন্সটাগ্রাম