শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৬০০টি ক্যাডেট মডেলের স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সম্ভবত উচ্চপর্যায়ের পরামর্শে আপাতত থমকে গেছে। তবে বিদ্যমান স্কুলের মানোন্নয়ন ও মানসম্পন্ন নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠার চাহিদা ভুললে চলবে না। দেশে গত তিন-চার দশকে স্কুলপর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জেলা-উপজেলায় সরকারি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে বেসরকারি খাত।
আমাদের স্কুলপর্যায়ে শিক্ষার মানের অবনতির পেছনে উদ্যোক্তাদের শিক্ষার আদর্শ-উদ্দেশ্য সম্পর্কে চিন্তাভাবনা ছাড়াই নিজের বা পৃষ্ঠপোষকের নামে তড়িঘড়ি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন অন্যতম কারণ। উদ্যোগ নেওয়ার সময় পরিচালন ব্যয়, অবকাঠামো বা শিক্ষার মান রক্ষার বিষয় সাধারণত যথাযথ গুরুত্ব পায় না।
বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সবার জন্যই শিক্ষার সুযোগ তৈরি, ডিজিটাল অবকাঠামোসমৃদ্ধ ব্যবস্থা প্রবর্তন, পাঠক্রমের আধুনিকায়নসহ দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। শিক্ষায় ক্রমশ মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এবারের বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোয় এই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বাস্তবে ঘটবে বলে আশা করা যায়। সম্ভবত এরই ধারাবাহিকতায় সরকার ভালো স্কুলের অভাব পূরণের কথা ভাবছে।
আশা করি, স্কুল স্থাপনের স্থান নির্ধারণে সংসদীয় এলাকার পরিবর্তে প্রকৃত চাহিদাই বিবেচনায় নেওয়া হবে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, যদি বাস্তবতার সঙ্গে না মেলে, তাহলে ভালো উদ্যোগেও অভীষ্ট ফল মেলে না। ফলে ঢালাও চিন্তা বা তাড়াহুড়া করে কিছু করা যাবে না। কাজের আগে যথাযথ ম্যাপিংয়ের প্রস্তাব করেছেন শিক্ষা আন্দোলনের সংগঠক রাশেদা কে চৌধূরী।

২.
সত্যি বলতে কি, নতুন স্কুল স্থাপন নিয়ে সরকারের চিন্তা আমাদের জানা নেই। কোনো কোনো পত্রিকার অনুমান যখন আমাদের জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশের চিন্তার সঙ্গে মিলে গিয়ে ক্যাডেট কলেজকে মডেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধরে কথাবার্তা হয়, তখন এ বিষয়ে কিছু আগাম বলে রাখা দরকার মনে করি। ক্যাডেট কলেজ–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বা পরবর্তী সংশোধিত আইনের ভিত্তিতে বলা যায়, এগুলো ব্রিটিশ সামরিক একাডেমি ও পাবলিক স্কুলের একটা মিশ্র রূপ। এগুলো পরিচালিত হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এখান থেকে প্রধানত সামরিক-বেসামরিক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তৈরিই থাকে লক্ষ্য।
এ সূত্রে দেড় যুগ আগের একটা কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। খুব শ্রদ্ধেয় পরিচিত এক বয়োজ্যেষ্ঠ সুহৃদ খানিকটা আফসোস করে আমাকে বলেছিলেন, যদি দেশের সব স্কুল ক্যাডেট কলেজের মতো হতো, তাহলে কী ভালোই না হতো। শুনে আমি তক্ষুনি বলেছিলাম, তো দেশে কি জসীমউদ্দীন, আব্বাসউদ্দীন, জয়নুল আবেদিন লাগবে না? বলেছিলাম, শিক্ষাব্যবস্থা যদি সবার জন্য পার্থিব সাফল্যে চৌকস মানুষ তৈরির লক্ষ্যে পরিচালিত হয়, তবে জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভাবুক, দার্শনিক, গাইয়ে, আঁকিয়ে—এমনকি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মীরা আসবেন কোথা থেকে?
মেধাবী, চৌকস মানুষ যে আমাদের প্রয়োজন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সব নাগরিককে এই একই ছাঁচে তৈরি করতে চাইলে সম্ভবত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা উপেক্ষিত হবে—১. শিক্ষার মূল দর্শন এবং ২. জাতির মানবসম্পদের চাহিদা। প্রথম বিষয়ে সংক্ষেপে বলা যায়, দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি উচ্চতর জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত ভিত্তিও স্কুলপর্যায়েই হওয়া দরকার। জীবনবোধ, মানবিক মূল্যবোধ এবং সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ ও শিল্পরস উপভোগের রুচির সূচনাও এখানেই হতে হবে।
দ্বিতীয় প্রসঙ্গে বলব, আসলে জাতির মানবসম্পদের যে চাহিদা, তার মৌলিক দক্ষতা ও মানসিক ভিত্তি তো সবার জন্য এক, যা স্কুলপর্যায়েই অর্জিত হবে। এর পরের ধাপে গিয়ে জাতীয় জীবনের বিচিত্র চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে শিক্ষার বিভিন্ন ধারা, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, বৃত্তিমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা সংগত। সবার জন্যই জীবন যেমন জটিল ও কঠিন, তেমনি সংবেদনশীল ও গভীর অনুধাবনের বিষয়। তাই প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে স্কুলপর্বটি সবচেয়ে দীর্ঘ। আর এ কারণেই আমরা স্কুলপর্যায়ে মোটাদাগে তিন ধারার শিক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ, এতে সূচনাপর্বেই জাতির মানস বিভক্ত হয়ে পড়ছে।
আমরা মানবিক গুণাবলি ও সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের যে কথা বলেছি, তা যে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে, তা স্কুলে ক্রীড়া ও সংস্কৃতির পাঠ ও অনুশীলন যুক্ত করার পরিকল্পনা থেকে বোঝা যাচ্ছে। তবে সঙ্গে এ-ও মনে রাখতে হবে যে শিশু নানা বিষয় চর্চা করবে; কিন্তু সবই পরীক্ষার বিষয় হয়ে পড়লে শিক্ষার আনন্দ হারিয়ে যাবে; শিক্ষার্থীর ওপর চাপ কমানো দরকার। তাই পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত বিষয়ের আধিক্য নিয়েও ভাবা জরুরি।
এ বিষয়ে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন বলে মনে করি। খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার (গান, বাদ্য, নৃত্য, অভিনয়, চিত্রকলা ইত্যাদি) ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার দিয়ে উৎসাহিত করার ঝোঁক বেশি। এ প্রক্রিয়ায় কোনো স্কুলই পিছিয়ে পড়তে চায় না বলে মূলত দক্ষরাই বারবার সুযোগ পায়, বৃহত্তর বাকি অংশ বঞ্চিত ও উপেক্ষিত থাকে। স্কুলপর্যায়ে তাই প্রতিযোগিতার চেয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোই জরুরি। কারণ, এটা তাদের প্রস্তুতিপর্ব, তারই অংশ হিসেবে কিছু প্রতিযোগিতা থাকবে।
যদিও সর্বজনীন শিক্ষা অধিকার হিসেবেই স্বীকৃত, তবু মানের সংকট থাকায় সন্তানের সুশিক্ষার জন্য উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা ক্রমেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই ঝুঁকছেন। কেবল আমলাতান্ত্রিক খবরদারি বাড়িয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। বাড়াতে হবে শিক্ষায় বরাদ্দ, যার প্রতিশ্রুতি এবারের বাজেটে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে একেবারে গোড়ার বিষয় হলো শিক্ষকের মান বৃদ্ধি। আরও জরুরি হচ্ছে, মেধাবীদের স্কুলের শিক্ষকতায় যুক্ত করা।
৩.
শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র ব্যক্তি হলেও তাদের বিদ্যায়তনিক অর্জনের মূল্যায়ন হয় সামষ্টিক পর্যায়ে। জ্ঞানের যুগপৎ বৈচিত্র্য ও অসীমতাকে ক্ষুণ্ন না করেই নিজের কাজটা করতে হয় বলেই শিক্ষকতাও ব্যাপকার্থে এক সৃজনশীল কাজ। বিপরীতে মুখস্থ ও পরীক্ষানির্ভর চলমান ব্যবস্থায় আমাদের শিক্ষা দক্ষ ও জ্ঞানী—কোনো ধারার মানুষ তৈরি করতে পারছে না।
আবার দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবস্থাই চলমান থাকায় এরই ভেতর থেকে উঠে আসা স্কুলশিক্ষকদের মেধা, সৃজনশীলতার ঘাটতি মারাত্মক। এ ছাড়া পেশা হিসেবে স্কুলশিক্ষকতা আকর্ষণ হারানোয় মেধাবী জ্ঞানান্বেষী মানুষ এ পেশায় আসছেন না। পাশাপাশি অর্থ ও মর্যাদার ঘাটতির কারণে এ পেশায় নিযুক্তরাও উদ্দীপনা ও
অনুপ্রাণনা শক্তি হারিয়ে ফেলেন। কিছু ব্যতিক্রম বাদে তাঁরাও অবস্থা ও ব্যবস্থার সুযোগকে কোচিং–বাণিজ্যেই নিয়োজিত করতে বাধ্য হন।
উল্লেখ্য, মানুষের চরিত্র ও মূল্যবোধ গঠিত হয় বাস্তব জীবন থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার শিক্ষা থেকে। বইয়ের পাঠ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার এলোমেলো ধারণাগুলোকে নির্দিষ্ট মূল্যে (ভ্যালু) বাঁধতে পারে। বাড়িতে মেহমানের বন্দিজীবন কাটিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতায় বঞ্চিত থেকে সরাসরি বইয়ের যে পাঠ, তাকে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়, ‘পুরোটাই লোকসানি মাল।’ তাই আমাদের শিক্ষিত মানুষের মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের এত সংকট।
৪.
এ সমাজে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য প্রকট, বিত্তের বিচারে পরিবারগুলো কয়েকটি স্তরে বিভক্ত। যদিও সর্বজনীন শিক্ষা অধিকার হিসেবেই স্বীকৃত, তবু মানের সংকট
থাকায় সন্তানের সুশিক্ষার জন্য উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা ক্রমেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই ঝুঁকছেন। কেবল আমলাতান্ত্রিক খবরদারি বাড়িয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। বাড়াতে হবে শিক্ষায় বরাদ্দ, যার প্রতিশ্রুতি এবারের বাজেটে রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে একেবারে গোড়ার বিষয় হলো শিক্ষকের মান বৃদ্ধি। আরও জরুরি হচ্ছে, মেধাবীদের স্কুলের শিক্ষকতায় যুক্ত করা। এটাই সবচেয়ে দুরূহ কাজ। কারণ, আজকাল চৌকস মেধাবীরা শিক্ষার সর্বোচ্চ পীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায়ও আকৃষ্ট হচ্ছেন না! তাঁরা পর্যাপ্ত মর্যাদাও পাচ্ছেন না। শিক্ষকদের অমর্যাদার প্রান্তিকতায় ফেলে রেখে শিক্ষার উন্নতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
শিক্ষার পাশাপাশি তাই শিক্ষকেরও মান বাড়ানো আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এবারের বাজেটের বাড়তি বরাদ্দের বড় অংশ এই দুই ক্ষেত্রে ব্যয় করা
জরুরি। এ পথে এগিয়েই সরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করে আমাদের শিক্ষার মানের সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে।
● আবুল মোমেন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক
* মতামত লেখকের নিজস্ব