সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / যুদ্ধ শেষ, কিন্তু যুদ্ধ কি শেষ—‘দ্য অডিসি’ সেই প্রশ্নই তোলে
যুদ্ধ শেষ, কিন্তু যুদ্ধ কি শেষ—‘দ্য অডিসি’ সেই প্রশ্নই তোলে

যুদ্ধ শেষ, কিন্তু যুদ্ধ কি শেষ—‘দ্য অডিসি’ সেই প্রশ্নই তোলে

যুদ্ধ শেষ হলেও যুদ্ধ কি সত্যিই শেষ হয়? ‘দ্য অডিসি’ দেখে আমার মনে হয়েছে, না।
শুক্রবার ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য অডিসি’ দেখে সিনেমা হল থেকে বের হওয়ার পর অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিলাম। কারণ, এই সিনেমা শেষ হওয়ার পরও শেষ হয় না। পর্দা অন্ধকার হয়ে যায়, কিন্তু গল্পটা মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে। হোমারের প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্য ‘ওডিসি’ অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্র আমাদের পরিচিত এক কিংবদন্তিকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। আমরা সাধারণত ‘দ্য অডিসি’ বলতে একটি মহাকাব্যিক অভিযানের গল্প বুঝি, যেখানে এক বীর যোদ্ধা যুদ্ধ শেষে বহু বাধা পেরিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরছেন। কিন্তু ক্রিস্টোফার নোলান এই পরিচিত গল্পকে শুধু একটি রোমাঞ্চকর অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; তিনি এটিকে বানিয়েছেন যুদ্ধের পর মানুষের ভেতরে চলতে থাকা আরেক যুদ্ধের গল্প।

ট্রয় যুদ্ধ শেষ। বিজয়ী গ্রিক সেনাপতি ওডেসিয়াস (ম্যাট ডেমন) বাড়ি ফিরতে চান। কিন্তু ঘরে ফেরার পথটা শুধু সমুদ্রের নয়, নিজের ভেতরেরও। যুদ্ধ তাঁকে বদলে দিয়েছে। যে মানুষটি যুদ্ধের আগে স্ত্রী পেনেলোপি (অ্যান হ্যাথাওয়ে) ও ছেলে টেলেমাকাসকে রেখে গিয়েছিলেন, ফিরে আসার পথে তিনি আর সেই মানুষ নেই। এই পরিবর্তনই নোলানের সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

হোমারের মহাকাব্যে দেব-দেবী, দানব, সাইক্লোপস, সাইরেন, সার্সি, ক্যালিপসো—সবই আছে। নোলান এসব চরিত্রকে রেখেছেন, কিন্তু এগুলোকে শুধু ফ্যান্টাসির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং অনেক সময় মনে হয়েছে, এগুলো ওডেসিয়াসের মানসিক অবস্থারই প্রতীক। যুদ্ধের স্মৃতি, অপরাধবোধ, বিভ্রম আর অস্থিরতা যেন পৌরাণিক চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়েই প্রকাশ পেয়েছে। ফলে সিনেমাটি যতটা পৌরাণিক, ততটাই মনস্তাত্ত্বিক।

‘দ্য অডিসি’ সিনেমায় অ্যান হ্যাথওয়ে। আইএমডিবি

নোলানের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই। তিনি যুদ্ধকে বীরত্বের গল্প বানাননি; বরং দেখিয়েছেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মানুষের কী হয়। আজ আমরা যাকে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার বা পিটিএসডি বলি, সিনেমাটি যেন সেই অদৃশ্য ক্ষতের কথাই বলে। অনেক সৈনিক যুদ্ধ থেকে জীবিত ফিরে আসেন, কিন্তু মানসিকভাবে আর কোনো দিন পুরোপুরি ফিরে আসতে পারেন না। তাঁদের স্ত্রী, সন্তান কিংবা পরিবারও সেই যুদ্ধের বোঝা বহন করে। বিষয়টি নোলান অত্যন্ত সংযত অথচ শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছেন।

ছবির শুরুতেই ওডেসিয়াস স্ত্রীকে বলে যান, যদি তিনি যুদ্ধে মারা যান, তবে যেন পুনর্বিবাহ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, হেলেনকে নিয়ে যে যুদ্ধের গল্প সবাই জানে, সেটিই পুরো সত্য নয়। প্রেম ছিল অজুহাত। প্রকৃত লড়াই ছিল ক্ষমতা ও বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। এই ব্যাখ্যা আমার কাছে বেশ আকর্ষণীয় লেগেছে। কারণ, এটি যুদ্ধকে রোমান্টিক নয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভেতরে দাঁড় করায়।

‘দ্য অডিসির’ পোস্টার থেকে। আইএমডিবি

ট্রোজান হর্সের দৃশ্যটিও অসাধারণভাবে নির্মাণ করেছেন নোলান। আমরা যে গল্প শুনে বড় হয়েছি, সেখানে কাঠের ঘোড়াটি ট্রয় নগরের ভেতরে টেনে নেওয়া হয়। এখানে তিনি সেই ঘটনাকে নতুনভাবে কল্পনা করেছেন। সৈকতে পড়ে থাকা বিশাল কাঠের ঘোড়াটিকে মূল্যবান বস্তু ভেবে ট্রয়বাসীই নিজেদের শহরে নিয়ে যায়। পরিচিত একটি ঘটনাকে নতুনভাবে দেখানোর এই দক্ষতা নোলানের অন্যতম শক্তি।

অভিনয়ের দিক থেকেও সিনেমাটি বেশ সমৃদ্ধ। ম্যাট ডেমনকে এখানে কোনো অতিমানবীয় নায়ক মনে হয়নি; বরং ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, অপরাধবোধে ভরা একজন মানুষ মনে হয়েছে, যার একমাত্র ইচ্ছা বাড়ি ফেরা। অ্যান হ্যাথাওয়ে পেনেলোপি চরিত্রে অসাধারণ সংযত। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অনিশ্চয়তা আর অপমানের ভেতরেও তাঁর চরিত্রটি দৃঢ় থাকে। রবার্ট প্যাটিনসন অ্যান্টিনাউস চরিত্রে যথেষ্ট ভয়ংকর। টম হল্যান্ড টেলেমাকাস চরিত্রে নিজের বাবাকে খুঁজে বেড়ানো এক বিভ্রান্ত তরুণের অসহায়ত্ব ভালোভাবে তুলে ধরেছেন। জেনডায়ার অ্যাথেনাও পর্দায় উপস্থিতি দিয়ে আলাদা ছাপ ফেলেছেন।

চিত্রগ্রহণ নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়। হয়টে ভ্যান হয়টেমার ক্যামেরা যেন সমুদ্রকে আরেকটি চরিত্রে পরিণত করেছে। সমুদ্র কখনো মুক্তির, কখনো ভয়ের, কখনো আবার নিঃসঙ্গতার প্রতীক হয়ে ওঠে। আইম্যাক্স পর্দায় সেই বিশালতা সত্যিই মুগ্ধ করে। যুদ্ধের দৃশ্য যেমন চমৎকার, তেমনি নীরব দৃশ্যগুলোও অসাধারণ। বিশেষ করে মৃতদের জগতে ওডেসিয়াসের প্রবেশের দৃশ্যটি পুরো সিনেমার অন্যতম সেরা মুহূর্ত। সেখানে দেবতা, মৃত মানুষ আর জীবিতদের জগৎ এক অদ্ভুত সীমারেখায় এসে মিশে যায়।
তবে সিনেমাটি একেবারে নিখুঁত নয়। নোলান অনেক প্রতীক, পৌরাণিক ইঙ্গিত ও দর্শন একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন। ফলে কিছু অংশ সাধারণ দর্শকের কাছে জটিল মনে হতে পারে। সংলাপের কয়েকটি জায়গায় অতিনাটকীয়তাও চোখে পড়ে। আর যাঁরা খুব সরলভাবে একটি অ্যাডভেঞ্চার গল্প দেখতে চান, তাঁদের কাছে ছবিটি হয়তো কিছুটা ধীরগতিরও মনে হতে পারে।

তবু সব মিলিয়ে ‘দ্য অডিসি’ আমার কাছে শুধু একটি পৌরাণিক গল্পের চলচ্চিত্র নয়; এটি যুদ্ধ, স্মৃতি, অপরাধবোধ, ভালোবাসা এবং ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষার গল্প। এমন এক ঘরে ফেরা, যেখানে পৌঁছানোর পরও মানুষ আগের মানুষটি থাকে না। নোলান যেন বলতে চেয়েছেন, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ক্ষতি যুদ্ধক্ষেত্রে হয় না। হয় মানুষের ভেতরে।
তিন ঘণ্টার এই সিনেমা আমাকে কোনো সহজ শিক্ষা দেয়নি; বরং একটি কঠিন সত্য মনে করিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ শেষ হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের স্মৃতি অনেক সময় মানুষের জীবনে আজীবন থেকে যায়। আর সেই কারণেই ‘দ্য অডিসি’ শুধু একটি মহাকাব্যের চলচ্চিত্ররূপ নয়। এটি যুদ্ধের পর মানুষের বেঁচে থাকার গল্প। আমার কাছে এটিই সিনেমাটির সবচেয়ে বড় অর্জন।

About Editor Todaynews24

Check Also

প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ইসির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক

বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের ভোটাধিকার সুগম ও আরও কার্যকর করতে এক নীতি নির্ধারণী বৈঠকে বসতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে এই পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। ইসির 'ওসিভি-এসডিআই' প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মামুনুর হোসেন স্বাক্ষরিত এক আনুষ্ঠানিক আদেশের মাধ্যমে এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *