একটি ভেঙে পড়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কারণে বাব আল-মানদেবের পানি এখন রক্তে লাল হচ্ছে। আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বের দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মানদেব একই সঙ্গে লাগাতার আক্রমণের মুখে পড়েছে। এটি কেবল একটি সংকট নয়, এটি যুদ্ধ–পরবর্তী সামুদ্রিক সমঝোতার অবসান।
আসুন ভয়াবহতার হিসাবটা দেখি। সংঘাতের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল খনিজ তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত। এটি বিশ্বের মোট খরচের এক-পঞ্চমাংশ। আর ২০২৩ সালে বাব আল-মানদেব দিয়ে প্রতিদিন গেছে আরও ৯৩ লাখ ব্যারেল। আজ হুতিদের অবরোধ সৌদি আরবের শেষ বিকল্প পথটিকেও বন্ধ করার হুমকি দিচ্ছে। সেটি হলো ইয়ানবুর মধ্য দিয়ে লোহিত সাগরের পথ। ঠিক এমন এক সময়ে এটি ঘটছে, যখন হরমুজ প্রণালিও প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এর সম্মিলিত ফল কী? বিশ্ববাজারের ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ তেল সরবরাহ এক জায়গায় আটকে যেতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি এখন অনুমান করছে যে মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদকদের তেল সরবরাহে ক্ষতির পরিমাণ ১৩০ কোটি ব্যারেল ছাড়িয়ে গেছে। নর্থ সি ডেটেড অপরিশোধিত তেলের দাম এখন ব্যারেলে যুদ্ধ–পূর্ব স্তরের দ্বিগুণের বেশি।
এগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, এগুলো অর্থনৈতিক ধস, আমদানিকারক দেশগুলোতে দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৭৩ সালের তেলসংকটের পর সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ।
এই সংকট ইতিহাসের সবচেয়ে কালো অধ্যায়গুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৮০-এর দশকের ‘ট্যাংকার যুদ্ধে’ ইরান ও ইরাক বছরের পর বছর ধরে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ চালিয়েছিল। যার ফলে শুরু হয়েছিল ‘অপারেশন আর্নেস্ট উইল’। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামরিক জাহাজের সবচেয়ে বড় অভিযান ছিল। তবে সেই সংঘাত দুটি রাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
কিন্তু আজকের শত্রু আরও অনেক বেশি বিপজ্জনক। তারা কোনো রাষ্ট্র নয়, তেহরানের অস্ত্র নিয়ে তারা ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকা থেকে যুদ্ধ করছে। আন্তর্জাতিক আইনের অস্পষ্টতার সুযোগ তারা নিখুঁতভাবে নিচ্ছে।
হুতিরা আইনের এই অস্পষ্টতাকে হাতিয়ার করেছে। ১৮৫৬ সালের প্যারিস ঘোষণা এবং সান রিমো ম্যানুয়ালের অবরোধ আইনকে তারা একটি আইনি জালে পরিণত করেছে। এটি প্রতিটি নৌ কমান্ডারের সিদ্ধান্তকে ব্যাহত করছে। যখন একটি অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী অবরোধ ঘোষণা করে, তখন সামুদ্রিক আইনের পুরো কাঠামো কেঁপে ওঠে।

সৌদি আরবের কৌশলগত দুর্বলতা পাইপলাইনের স্টিলে লেখা একটি বড় ট্র্যাজেডি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি সামলাতে ১৯৮০-এর দশকে ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পেট্রোলাইন’ তৈরি হয়েছিল। ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার মরুভূমির ওপর দিয়ে যাওয়া এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে যাচ্ছে। এখন এটি পূর্ণ ক্ষমতায় চলছে। এটি কোনো টেকসই কৌশল হতে পারে না, এটি পুরো রাষ্ট্রের একটি একক ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট।
এই পাইপলাইন এমন সব এলাকার মধ্য দিয়ে গেছে, যা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র, হুতি ড্রোন হামলা এবং ভেতরের নাশকতার কাছে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এর পাম্পিং স্টেশনগুলো উন্মুক্ত; ইয়ানবুর টার্মিনালটি সহজ লক্ষ্যবস্তু। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব তার ৭০ শতাংশের বেশি তেল ইয়ানবু দিয়ে পাঠাচ্ছে।
কিন্তু সেই শেষ চেষ্টাও এখন ভেস্তে যেতে বসেছে।
হুতির হুমকি আসার পর মাত্র দুই সপ্তাহে সৌদি আরবের লোহিত সাগর টার্মিনালগুলো থেকে সাপ্তাহিক তেল উত্তোলন ৩৬ শতাংশ কমে গেছে। প্রতিদিন ৯৫ লাখ ব্যারেল থেকে কমে তা ৬১ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে।
ওয়াশিংটন অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় সেই খালি জায়গা পূরণ করবে চীন। তারা বেল্ট অ্যান্ড রোডের সামুদ্রিক পথগুলোকে সামরিক কাজে ব্যবহারের গতি বাড়াবে। বৈশ্বিক সম্পদ সংঘাতের অঞ্চলে পরিণত হবে। এখন কৌশলগতভাবে স্পষ্ট হওয়ার সময় এসেছে।
চ্যাটাম হাউসের নিল কুইলিয়াম বলেছেন, হুতিরা ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা ‘ইয়েমেনের ভূখণ্ড থেকে লোহিত সাগরের সামুদ্রিক এলাকায় লড়াই ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত’। এটি কেবল অবরোধ নয়; এটি সরাসরি ধ্বংস করার চেষ্টা।
এ সংকটের মূল নীতিগত জটিলতা অত্যন্ত স্পষ্ট। আধুনিক সামরিক বাহিনীকে এমন এক যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করতে হচ্ছে, যা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। এরা আইনি অস্পষ্টতা ও তথ্যের ধোঁয়াশাকে ব্যবহার করছে। প্রতিটি সামরিক আক্রমণে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকে। প্রতিটি দেরিতে ব্যর্থতার ঝুঁকি বাড়ে। প্রতিটি গোয়েন্দা তথ্য নির্দিষ্ট নিশ্চিত বিষয়ের বদলে কেবল একটি অনুমানে পরিণত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র এখন টানা ১০ রাত ধরে ইরানে হামলা চালিয়েছে। তারা ইরানের কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র–সুবিধা এবং সামুদ্রিক কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করেছে। ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে হামলা চালিয়ে জবাব দিচ্ছে। এখান থেকে কমার কোনো রাজনৈতিক পথ দেখা যাচ্ছে না। কাতার ও পাকিস্তান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু এটি মূল নিরাপত্তাসংকট সমাধানের বদলে কেবল একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। মধ্যস্থতাকারীদের চাপ দেওয়ার বা বড় কোনো প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষমতা নেই। তারা কেবল যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে হুতিদের মূল সমর্থক ইরান এই আইনি সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। তারা সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের ‘কার্যকর নিয়ন্ত্রণ’ পরীক্ষার বিচারে সরাসরি দায় এড়াতে নিজেদের নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখছে। প্রক্সি যুদ্ধের এটিই মূল কৌশল, যেখানে প্রমাণ হাজির করলেই রাষ্ট্রের দায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব খুবই ভয়াবহ। যদি দুটি প্রণালিই দীর্ঘদিন ধরে অস্থির থাকে, তবে বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। শিপিং পথগুলো ঘুরে আফ্রিকা মহাদেশের উত্তমাশা অন্তরীপের দিকে চলে যাবে। এতে সপ্তাহে সপ্তাহে সময় বাড়বে এবং লাখ লাখ ডলার খরচ বাড়বে। বিমাবাজার যুদ্ধের ঝুঁকি অঞ্চলগুলোকে নতুন করে চিহ্নিত করবে। ফলে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরে শিপিং বিমা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। সুয়েজ খালের গুরুত্ব কমবে। ফলে মিসরের ভূরাজনৈতিক প্রভাব দুর্বল হবে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় সেই খালি জায়গা পূরণ করবে চীন। তারা বেল্ট অ্যান্ড রোডের সামুদ্রিক পথগুলোকে সামরিক কাজে ব্যবহারের গতি বাড়াবে। বৈশ্বিক সম্পদ সংঘাতের অঞ্চলে পরিণত হবে। এখন কৌশলগতভাবে স্পষ্ট হওয়ার সময় এসেছে। হুতিদের অবরোধ কোনো সাধারণ প্রতিরোধ নয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতির বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুঝতে হবে যে পুরোনো আইনি কাঠামো এখন অকার্যকর।
এখন একটি নতুন সামুদ্রিক ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন। অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর সামুদ্রিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকার দিয়ে একটি ‘চোকপয়েন্ট ট্রানজিট রেজিম’ তৈরি করতে হবে। আগাম অনুমতি পাওয়া সুনির্দিষ্ট নিয়মে একটি স্থায়ী নৌবাহিনী গঠন করতে হবে। বাণিজ্যকারী দেশগুলোর তহবিলে একটি স্থায়ী বিমা পুল তৈরি করা দরকার। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়, টিকে থাকার ন্যূনতম শর্ত।
হয় আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আধুনিকায়ন করতে হবে, না হয় এর পতন হবে পরবর্তী বড় ধাক্কায়। শত্রু গোষ্ঠীগুলো ইতিমধ্যে বর্তমান আইনের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
এখন বাজিটা অনেক বড়। বিশ্ব যদি এখন চোখ বন্ধ করে রাখে, তবে তার মাশুল দিতে হবে। খরা, মূল্যস্ফীতি, উন্নয়নশীল অর্থনীতির ধস এবং বিশ্ব ক্ষমতার স্থায়ী পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই মূল্য চোকাতে হবে। হরমুজ ও বাব আল-মানদেব কেবল দুটি জলপথ নয়, এগুলো বিশ্ব অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালনের পথ। আর সে ব্যবস্থা এখন হৃদ্রোগে আক্রান্ত।
কুরনিয়াওয়ান আরিফ মাসপুল দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়াবিষয়ক গবেষক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত