এআই-দুনিয়ায় সৃজনশীল পড়ালেখার গুরুত্ব কি কমে যাবে? লেখালেখির দায়িত্ব যদি চ্যাটজিপিটিই নিয়ে নেয়, মিডজার্নি যদি চট করে একটা ছবি এঁকেই দেয়, তাহলে চারুকলা, নাট্যকলার মতো বিষয়গুলো কি ক্রমেই গুরুত্ব হারাবে?
চারদিকে চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইয়ের মতো এআই প্ল্যাটফর্মগুলো নিয়ে হুলুস্থুল। অনেকে ভাবছেন, চারুকলা, সংগীত, নাট্যকলা বা সৃজনশীল বিদ্যা নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করছেন, তাঁদের বুঝি আর ‘ভাত নাই’। আমি বলি, অত চাপ নেওয়ার কিছু নেই। আসল খেলা তো সৃজনশীলদের হাতেই!
এই এআইয়ের কোনো মন নেই, ব্রেকআপের কষ্ট নেই। বৃষ্টির দিনে এক কাপ চা হাতে নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকার অনুভূতি ও বোঝে না। ও বড়জোর কোটি কোটি ডেটা ঘেঁটে একটা নিখুঁত ছবি বা গান বানিয়ে দেবে। কিন্তু চারুকলার একজন শিল্পী যখন ক্যানভাসে তুলির শেষ আঁচড়টা দেয়, ওই তুলির ডগার কাঁপনটা কি এআই নকল করতে পারবে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমনি এমনি বলেননি, ‘নয়নসম্মুখে তুমি নাই,/ নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই।’ এই যে চোখের আড়ালের মানুষকে মনের গহনে দেখার ক্ষমতা, এটা কি কোনো রোবট বুঝবে?
মঞ্চে যখন একজন অভিনেতা রক্তমাংসের শরীর নিয়ে দাঁড়ায়, প্রদীপের আলোর নিচে তার চোখের জল আর গলার কাঁপন সরাসরি দর্শকের বুকে গিয়ে আঘাত করে। এই যে জীবন্ত মানুষের সামনে জীবন্ত মানুষের অভিনয়, এই অনুভূতি সিলিকন চিপে কোনো দিন আসবে না।
লালন শাহও তো দেহের ভেতরের এই আসল মানুষের খোঁজ করতে গিয়ে গেয়েছেন, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়!’ এআইয়ের গান শুনলে কান জুড়াতে পারে, কিন্তু ভেতরের ওই অচিন পাখির প্রাণ জুড়াতে মানুষের তৈরি খাঁটি শিল্পেরই দরকার!
আসল মানুষ
আমরা যদি একটু খেয়াল করি, একটা সুন্দর সুর বা একটা অসাধারণ চিত্রকর্ম কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দেশের নয়, সবার। এ ব্যাপারে লেখক লিও তলস্তয় তাঁর হোয়াট ইজ আর্ট? বইয়ে খুব সুন্দর একটা কথা বলেছিলেন। তিনি মনে করতেন, শিল্পের মূল কাজই হলো একজনের ভেতরের অনুভূতিটা অন্য সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া, আর এই আদান-প্রদানের মাধ্যমেই মানুষের মধ্যে তৈরি হয় আসল ভালোবাসা আর একতা। সবচেয়ে বড় কথা কী জানেন? এআই আপনাকে দুনিয়ার সব তথ্য এনে দেবে, কিন্তু ‘মানুষ’ হওয়া শেখাবে না। শিল্প আর সংস্কৃতির চর্চা হলো আদতে রোবটের ভিড়ে আসল মানুষ হওয়ার পাঠশালা।
কিন্তু আমাদের দেশের ট্র্যাজেডিটা কোথায় জানেন?
আমাদের দেশের বাবা–মায়েরা সারাক্ষণ শুধু এক চিন্তায় বিভোর—ছেলেমেয়েকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার বানাতে হবে। আমরা দিন দিন ভেতর থেকে রোবট হয়ে যাচ্ছি, মানবিক হতে পারছি না। পরীক্ষার খাতায় একটা শিশুর ১০০–তে ১০০ পাওয়ার চেয়েও যে তার মনের ভেতর অন্যের জন্য মায়াবোধ থাকাটা জরুরি, মানবিক হওয়া জরুরি, সেটা আমরা ভুলেই গেছি। আর আমাদের যদি সত্যিই মানবিক হতে হয়, সমাজ থেকে এই হিংস্রতা দূর করতে হয়, তবে শিল্প আর সংস্কৃতির চর্চা করতেই হবে।
স্টেম নয়, স্টিম
যদি ভাবেন সৃজনশীল পড়াশোনার কোনো মূল্য নেই, ভুল ভাবছেন। একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন, উন্নত দেশগুলোতে এই সৃজনশীল পড়াশোনার একাডেমিক ও করপোরেট গুরুত্ব এখন অনেক। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) কিংবা হার্ভার্ডের মতো তুখোড় সব টেকনিক্যাল আর বিজনেস ইউনিভার্সিটিতে এখন ‘এসটিইএম’ (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাথমেটিকস) বদলে হয়ে গেছে ‘এসটিইএএম’। সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং আর ম্যাথের সঙ্গে তারা সগৌরব ‘আর্টস’ (কলা) যোগ করে নিয়েছে। তারা বুঝে গেছে, শুধু কোডিং আর ইকুয়েশন দিয়ে রোবট বানানো যায়, কিন্তু সেই রোবটের ডিজাইন যদি নান্দনিক না হয়, তবে বাজারে ওটা কেউ কিনবে না!
লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব আর্ট কিংবা অক্সফোর্ডের মতো জায়গায় ক্রিয়েটিভ থিঙ্কিং ও পারফর্মিং আর্টস নিয়ে রীতিমতো মিলিয়ন ডলারের গবেষণা হচ্ছে। গুগল, অ্যাপল কিংবা পিক্সারের মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলো যখন বড় বড় পদে লোক নেয়, তারা শুধু সিএসইর ডিগ্রি দেখে না; তারা খোঁজে কার চারুকলার জ্ঞান আছে, কে হিউম্যান সাইকোলজি বোঝে, কার নাট্যকলার ব্যাকগ্রাউন্ড আছে, যেন সে প্রেজেন্টেশনে ফাটিয়ে দিতে পারে! কারণ, এআইয়ের জমানায় টেকনিক্যাল কাজগুলো চ্যাটজিপিটিই করে দেয়। কিন্তু আইডিয়ার জন্য সেই সৃজনশীল মানুষদের কাছেই ধরনা দিতে হয়।
কেন আমরা পিছিয়ে
সমস্যা হলো, আমাদের দেশের সৃষ্টিশীল শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বা আধুনিক গবেষণা নিয়ে একদমই মাথা ঘামায় না। বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার জন্য যে উন্নত প্রযুক্তিজ্ঞান দরকার, থ্রি–ডি বা ডিজিটাল টুলসের ব্যবহার জানা দরকার, সেগুলো আমাদের ছেলেমেয়েরা শিখছে না। আমাদের শিক্ষাকাঠামোর দায়ও কম নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শুধু প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত করছে। বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার জন্য জোর দিতে হবে আধুনিক প্রযুক্তিগত পাঠ্যক্রম ও বাস্তবমুখী কারিগরি জ্ঞানের প্রতি। আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে উপস্থাপনায়। একটি চমৎকার ভাবনা বা শিল্পকর্মকে আন্তর্জাতিক স্তরে কীভাবে তুলে ধরতে হয়, কীভাবে গ্রাহকের সামনে উপস্থাপন করতে হয়, অনেক শিক্ষার্থীই তা জানে না। অথচ প্রযুক্তিতে দক্ষ ও কিছুটা চতুর হতে পারলেই কিন্তু এই যুগে আধিপত্যটা সৃজনশীলদেরই হতো!
এআই তো নিজে থেকে কিচ্ছু বানায় না, ও হলো ইন্টারনেটের দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নকলবাজ। মানুষ যদি নতুন কিছু সৃষ্টি করা বন্ধ করে দেয়, তবে এআইয়ের পেটেও কোনো নতুন ডেটা পড়বে না। চারুকলা, সংগীত, নাট্যকলা বা সৃষ্টিশীল পড়াশোনা আপনাকে ছকের বাইরে গিয়ে একদম নতুন কিছু ভাবতে শেখায়। আমাদের নিজস্ব লালন, রবীন্দ্রনাথ কিংবা লোকনৃত্যের যে একটা খাঁটি সুবাস আর ঐতিহ্য, সেটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই সৃজনশীল প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা আর সাধনা দরকার। যেটা আমরা এ দেশে করতে না পারায় সৃজনশীল অনেকে দিনে দিনে বাইরের দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
তাই বলি, টেনশন ঝেড়ে ফেলুন। রোবটের বাজারে আপনার ভেতরের রক্তমাংসের, বিবেকবান মানুষটাকে বাঁচিয়ে রাখুন। দেখবেন, জয় আপনারই।