সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / সরলতার আড়ালে লুকানো শিল্প
সরলতার আড়ালে লুকানো শিল্প

সরলতার আড়ালে লুকানো শিল্প

কবিতার কোনো স্বতঃসিদ্ধ ও সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা নেই, তবে বিভিন্ন কবি ও কাব্য সমালোচক যুগে যুগে নানাভাবে কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করে গেছেন। এর মধ্যে ব্রিটিশ কবি জেফ্রি হিল তাঁর ‘ট্রাইয়াম্ফ অব লাভ’ বা ‘ভালোবাসার বিজয়’ শিরোনামে কবিতায় কবিতাকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন তা বাংলা করলে দাঁড়ায়: ‘কবিতা বিষণ্ন ও ক্রোধান্বিত সান্ত্বনা’ (পোয়েট্রি ইজ স্যাড অ্যান্ড অ্যাংরি কনসোলেশন)। অর্থাৎ কবি তাঁর প্রাত্যহিক জীবনের বিষণ্নতা বা ক্রোধ উভয়েরই সান্ত্বনা খোঁজেন কবিতার মাধ্যমে। তাই কোনো কবিতায় যেমন বিষণ্নতার ছাপ বেশি, কোনো কবিতায় প্রকাশ পায় ক্রোধ। তবে অদ্ভুতভাবে ইসমাইল সাদীর কবিতায় এই উভয় অনুভূতির এক অসাধারণ সংমিশ্রণ লক্ষণীয়।

কবিতার বইয়ের নাম তিন শব্দের চোখ একটি আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে, যা আপাতভাবে খুব সরল মনে হলেও ভালোভাবে লক্ষ করলে বোঝা যায় যে এই আপাত সারল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর অর্থময়তা। ইংরেজিতে যাকে বলা যায় ‘ডিসিপটিভ সিম্পলিসিটি’, অর্থাৎ ধোঁকাপূর্ণ সারল্য। তবে এই ধোঁকা নেতিবাচক অর্থে নয়, বরং এটি কবির শৈল্পিক দক্ষতার পরিচয়, যা পাঠকের ভেতর একধরনের বিশেষ আগ্রহ তৈরি করে। বইয়ের নামের আপাতসারল্য যেমন তার নিগূঢ় রহস্যকে আড়াল করে রাখে, সাদীর কবিতার ভেতরেও তেমনি একধরনের বাহ্যিক সারল্য আছে, যা অনেক অমনোযোগী পাঠক ভুল করে ছড়ার মতো সরল ভেবে হাল্কা চালে পাঠের চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু যখনই কবিতাকে আত্মস্থ করার চেষ্টা করবেন, তখন তার মর্মার্থ নতুন করে ভাবাবে। উদাহরণস্বরূপ—‘মেঘ ও জোছনা’ কবিতা থেকে কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করা যেতে পারে:

প্রেমের সড়কে নেই পাপের মিছিল
আঁধার নদীতে ভাসে মৃত গাঙচিল
স্মৃতির ফলা জেনো প্রীতির অধিক
বেদনার দাগে থাকে জলের লিরিক।

(পৃ. ১৮)

ইসমাইল সাদীর ‘তিন শব্দের চোখ’ বইয়ের প্রচ্ছদ

যাঁরা কবিতাকে কাব্যিকতা ও গীতিময়তা দিয়ে বিচার করেন, তাঁরা যেমন এ ধরনের কবিতায় আকৃষ্ট হবেন, আবার যাঁরা প্রথাগত কাব্যিকতার চেয়ে বরং বয়ান ও অনুভূতিনির্ভর সমসাময়িক কবিতার প্রতি বেশি অনুরক্ত, তাঁরাও একধরনের বিশেষ কৌতূহল বোধ করবেন সাদীর তুলনামূলক ভিন্নধর্মী কবিতার প্রতি।

মুক্তছন্দ বা গদ্যছন্দের যুগে এমন ছন্দোবদ্ধ ও গীতিময় কবিতা লেখা একটি দুঃসাহসিক কাজ বলা যায়। কবি সাদীর গবেষণার সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্ততা ও দীর্ঘদিনের বাচিক চর্চা এ ক্ষেত্রে একটি বড় প্রভাবকের ভূমিকা রাখতে পারে। ছন্দ যেন তাঁর কাছে সহজাত, আর শব্দচয়ন এক অপূর্ব শিল্প।

ছন্দে লেখা কবিতা যেমন তাঁর কবিতাকে একধরনের বিশিষ্টতা দান করে, আবার সমকালীন অনেক পাঠকের কাছে তা কীভাবে গৃহীত হবে, কিছুটা সেই ঝুঁকিও তৈরি করে হয়তো। আর সমকালীনতার প্রশ্নে কেবল ছন্দের দিক থেকেই নয়, শব্দচয়নের দিক থেকেও সাদী কিছুটা ঝুঁকি নিয়েছেন তুলনামূলক প্রাত্যহিক ও আটপৌরে শব্দকে এড়িয়ে কাব্যিক ও পরিশীলিত শব্দের ব্যবহার ঘটিয়ে। এ কারণেই তাঁর কাব্যরীতি এক অর্থে দুঃসাহসিক, কেননা সমসাময়িক অনেক কবি যখন কবিতাকে অতি কাব্যিকতা থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করে এমন একটি কবিতার ভাষা তৈরি করেছেন যেখানে কবিতা ও গদ্যের ভেদরেখা অবসিত মনে হয়, সেখানে সাদী তাঁর কবিতায় ‘পুনঃস্থাপন’ করেছেন কাব্যিকতা, ও ফিরিয়ে এনেছেন কবিতার সেই ‘ক্ল্যাসিক’ বা চিরায়ত স্বাদ। যাঁরা কবিতাকে কাব্যিকতা ও গীতিময়তা দিয়ে বিচার করেন, তাঁরা যেমন এ ধরনের কবিতায় আকৃষ্ট হবেন, আবার যাঁরা প্রথাগত কাব্যিকতার চেয়ে বরং বয়ান ও অনুভূতিনির্ভর সমসাময়িক কবিতার প্রতি বেশি অনুরক্ত, তাঁরাও একধরনের বিশেষ কৌতূহল বোধ করবেন সাদীর তুলনামূলক ভিন্নধর্মী কবিতার প্রতি। কবিতার ক্ল্যাসিক ধারার প্রতি সাদীর যে আনুগত্য, তার অন্যতম প্রকাশ এই বইয়ের বিশেষ করে দ্বিতীয় ভাগের সনেট সিকুয়েন্স, যা কিছুটা অস্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’-এর কথা। নিচে সাদীর ‘শ্রাবস্তী ৪’ সনেটের থেকে দ্বিতীয় স্তবকের উদ্ধৃতি হয়তো এই বক্তব্যকে সমর্থন করবে:

কাঁধের ঘ্রাণের মানে বোঝে না অকাল
প্রেমের তেমন ভোরে সময়ের ঢিল
হৃদয়ঘরের দিকে গোধূলি বিকাল
তাকিয়ে কঁকিয়ে বলে তুচ্ছ আবাবিল
ঘরের আড়ালে চলে মধুর যাপন
আকাশের দেহে দৃঢ় মেঘের কাঁপন

(পৃ. ২৮)

রাজনীতি ও সমকালীন জীবনের নানান সংকট সামনে নিয়ে আসার পাশাপাশি, সাদীর কবিতার আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো তাঁর প্রেমময়তা, যা অনেক সময় তাঁর পাঠককে, হয়তো তাঁদের নিজেদের অজান্তেই, আদিরস আস্বাদনের উপলক্ষ এনে দেয়, যেমন ‘অনুরাগ’ কবিতায় নিচের এই উদ্ধৃতিতে পরনারী বা পরপুরুষের প্রতি মানুষের আদিম আকর্ষণকে কাব্যিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে:

তবে সাদীর কবিতার অন্যতম বিশেষ দিক হলো, ভাষা ও প্রকাশে তা বাংলা কবিতার পূর্ববর্তী ও কিছুটা প্রাচীন কাব্যধারার অনুগামী হলেও অর্থের দিক থেকে তা শতভাগ সমসাময়িক। তাঁর কবিতা পাঠে এই উপলব্ধি হয় যে একজন সংবেদনশীল মানুষ ও কবি, যে তার চারপাশে ঘটে চলা প্রতিদিনের অনাচার, দুঃশাসন এবং অন্যায় দ্বারা আক্রান্ত ও আহত। তাঁর কবিতার গভীর রাজনৈতিক ও ইতিহাস চেতনা প্রায়ই প্রতিভাত হয় প্রকৃতি ও পরিবেশ–বিধ্বংসী বিবিধ সমকালীন বিভীষিকা প্রত্যক্ষণের অভিজ্ঞতাকে চিত্রায়িত করার মধ্য দিয়ে, বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রাণ ও প্রকৃতির প্রধান জীবনীশক্তি নদীর ওপর নিত্যনৈমিত্তিক আঘাত ও অত্যাচার। ‘ধলেশ্বরী’ শিরোনামের কবিতা থেকে নিম্নোক্ত উদ্ধৃতিতে এই বক্তব্যের সার্থকতা মিলবে:

নদীর ছড়ানো বুক দেশের মতোন
হিংসার বিঁধানে নখে কূলে ক্ষত হয়
মরণ জেয়ারে ভাসে দেখানো যতন
জলের গতরে ভয় জমিনের ক্ষয়
‘মানুষের’ মতো তারা আঁধারে ও প্রাতে
নদীর পাঁজর ভাঙে দু-পেয়ের দাঁতে

(পৃ. ৪৬)

অন্যদিকে রাজনীতি ও সমকালীন জীবনের নানান সংকট সামনে নিয়ে আসার পাশাপাশি, সাদীর কবিতার আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো তাঁর প্রেমময়তা, যা অনেক সময় তাঁর পাঠককে, হয়তো তাঁদের নিজেদের অজান্তেই, আদিরস আস্বাদনের উপলক্ষ এনে দেয়, যেমন ‘অনুরাগ’ কবিতায় নিচের এই উদ্ধৃতিতে পরনারী বা পরপুরুষের প্রতি মানুষের আদিম আকর্ষণকে কাব্যিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে:

তুমিই হয়তো যাচ্ছো রেখে দাগ
ভাবছি তোমার কীসের অনুরাগ

ঘন সন্ধ্যা কাছে আসে যত
অচিন দেহ টানে অবিরত

(পৃ. ১২)

দীর্ঘদিন সাহিত্যচর্চা ও আবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, তুলনামূলক এই বিলম্বিত প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রকাশ হয়তো একটি বার্তা বহন করে, আর তা হলো অবশেষে সাদী এই উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন যে এবার সময় হয়েছে তাঁর কবিতাকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসার। আবার অন্যভাবে দেখলে বলা যায়, তাঁর আবেগ ও অনুভূতি, যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা, সমসাময়িক বাস্তবতাকে তীক্ষ্ণভাবে অনুধাবন, এবং ইতিহাস ও রাজনীতিসচেতনতা তাঁর ভেতরে যে অনুরণন সৃষ্টি করে তার শৈল্পিক ও ভাষিক প্রকাশ হলো এই কাব্যগ্রন্থ।

তবে শারীরবৃত্তিক চাহিদার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের নিগূঢ়তম আবেগ ও অনুভূতির প্রকাশ শেষ পর্যন্ত সাদীর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে পাঠকের মনে স্থান করে নেবে। এ ক্ষেত্রে সম্ভবত ‘মতিহার’ শিরোনামের কবিতাটি অন্যতম, বিশেষ করে যারা কবির সমসাময়িক কালে বেড়ে উঠেছেন এবং মতিহার ক্যাম্পাস বলে খ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পরিচিত তাদের কাছে। এই কবিতা একই সঙ্গে একধরনের ঘোর লাগা স্মৃতিকাতরতা ও হৃদয় মথিত আবেগের জন্ম দেয় অপরূপ চিত্রকল্প ও অপূর্ব ভাষাশৈলী ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। এই কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েই এই লেখাটি শেষ করা যথাযথ হবে এই প্রত্যাশা রেখে যে ইসমাইল সাদীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ সেই মতিহারের সবুজ ক্যাম্পাসের মতো পাঠকের মনে চির সবুজ হয়ে স্থান করে নেবে:

আবেদনময়ী চাঁদ ফুলের শাখায়
স্নিগ্ধতা চাওয়া তার ব্যাকুল প্রাণের
হাতের শাঁখায় চাঁদ দারুণ দেখায়
জোছনা-মনের ধ্যান সুরের স্নানের
চিরকুট বারতায় শত উঁকিঝুঁকি
ধ্যানে জ্ঞানে মন যেন পশ্চিম পাড়ায়
কদাচিৎ পেলে সাড়া মনে আঁকিবুঁকি
অভিসারে গিয়ে ফেরে সাঁঝের তাড়ায়

মতিহারে নেই আর তেমন যাপন
গতি ফের আসবে না শরীরের বাণে
জারুল সড়কে আজও ফুলেল প্লাবন
প্যারিস গাছের তলে হাসি আর গানে
হারানো আবেগে ধস অতীতের পিঠে
কত মুখ প্রেমময় মনে কালোশিটে

(পৃ. ৩৭)

দীর্ঘদিন সাহিত্যচর্চা ও আবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, তুলনামূলক এই বিলম্বিত প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রকাশ হয়তো একটি বার্তা বহন করে, আর তা হলো অবশেষে সাদী এই উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন যে এবার সময় হয়েছে তাঁর কবিতাকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসার। আবার অন্যভাবে দেখলে বলা যায়, তাঁর আবেগ ও অনুভূতি, যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা, সমসাময়িক বাস্তবতাকে তীক্ষ্ণভাবে অনুধাবন, এবং ইতিহাস ও রাজনীতিসচেতনতা তাঁর ভেতরে যে অনুরণন সৃষ্টি করে তার শৈল্পিক ও ভাষিক প্রকাশ হলো এই কাব্যগ্রন্থ।

  • তিন শব্দের চোখ
    ইসমাইল সাদী

    প্রকাশক: অনিন্দ্য প্রকাশ
    প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৬
    প্রচ্ছদ: নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
    পৃষ্ঠা: ৬৪, দাম: ২০০ টাকা

About Editor Todaynews24

Check Also

কলকাতায় প্রীতি ম্যাচ খেলতে পারে ব্রাজিল, আলোচনায় বাংলাদেশও

কলকাতায় প্রীতি ম্যাচ খেলতে পারে ব্রাজিল, আলোচনায় বাংলাদেশও

প্রীতি ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ ব্যর্থতা ভুলে নতুন করে শুরুর পরিকল্পনা করছে সেলেসাওরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *