সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার হলেই কি এমপিরা নির্দলীয় হয়ে যাবেন
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার হলেই কি এমপিরা নির্দলীয় হয়ে যাবেন

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার হলেই কি এমপিরা নির্দলীয় হয়ে যাবেন

সারকথা

এই প্রবন্ধে মূলত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, সংসদ সদস্যদের স্বাধীন সত্তা এবং বিশ্বব্যাপী দলীয় শৃঙ্খলার ধরন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রবন্ধের প্রথম পর্বে দেশের পণ্ডিত ও বিদগ্ধ মহলের ভাবনার ওপর আলোকপাতের পাশাপাশি পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের তাৎপর্য ও এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় পর্বে এসে এই সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে অবস্থান করেও একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদে কতটা স্বাধীন, গঠনমূলক ও সৃষ্টিশীল ভূমিকা রাখতে পারেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। পরিশেষে তৃতীয় পর্বে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদাহরণ টেনে দলীয় হুইপরা কীভাবে সংসদ সদস্যদের ওপর দলীয় সিদ্ধান্ত বজায় রাখেন এবং শৃঙ্খলার অজুহাতে তাঁদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রকে সীমাবদ্ধ করে রাখেন, সেটির একটি সংক্ষেপিত রূপ তুলে ধরা হয়েছে।

ভূমিকা

ক্ষমতার স্তরবিন্যাস অনেক জটিল। উঁচুতলা থেকে এক রকম দেখায়, আর নিচতলা থেকে অন্য রকম। আবার ভিন্ন ভিন্ন মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে একেবারেই আলাদা।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রসঙ্গটি প্রবলতর হয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশন এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রমের মাধ্যমে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সংবিধানে বিদ্যমান ৭০ অনুচ্ছেদ পুরোপুরি বিলোপ বা পরিবর্তন আনার ওপর জোরারোপ করা হয়। জুলাই জাতীয় সনদেও ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। ২০২৫ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর করেছে। বিএনপি সংসদের দুই–তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসে সরকার গঠন করেছে। এখন তারা চাইলেই দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে যেকোনো ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

প্রশ্ন হলো, সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বা জুলাই সনদ অনুযায়ী এই অনুচ্ছেদ ছেঁটে ফেললে বা পরিবর্তন করলেই কি সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে সংসদে তাঁদের ভোটাধিকার বা মতামত প্রদান করতে সক্ষম হবেন? এই প্রসঙ্গে অধিকতর স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির জন্য বাংলাদেশের মতো খুঁড়িয়ে চলা গণতান্ত্রিক দেশের আলোচনা আপাতত বাদ রেখে, অপেক্ষাকৃত উন্নত গণতন্ত্রের দেশগুলোতে আইনপ্রণেতারা সংসদে কতটা বাক্ ও ভোটের স্বাধীনতা উপভোগ এবং চর্চা করতে পারেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। তাহলেই বোঝা যাবে এই অনুচ্ছেদ বাতিল করলে বা এতে কিছু পরিবর্তন আনলে সংসদীয় চর্চায় সম্ভাব্য কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। অন্যথায় আমাদের সংসদ এবং সংসদ সদস্যদের কাজকর্মের ব্যাপারে জনপরিসরে এবং আশঙ্কা করি, বিদ্বৎসমাজেও বাস্তবতাবিবর্জিত অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষা তৈরি হবে। আইনপ্রণেতাদের ঘিরে উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেন বাস্তবভিত্তিক হয়, সে জন্যই এই নিবন্ধ।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যদি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়ে উক্ত দল থেকে পদত্যাগ করেন বা দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হবে। অনুচ্ছেদটিকে বাংলাদেশের পণ্ডিত ও বিশ্লেষকেরা সংসদীয় গণতন্ত্র বিকাশের একটি বিরাট বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের পদক্ষেপ হিসেবে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করে। সেই সংবিধান সংস্কার কমিশনও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করার প্রস্তাব করেছিল। তাদের প্রস্তাব—অর্থবিল ব্যতীত সকল প্রস্তাবে নিম্নকক্ষের সদস্যবৃন্দ তাদের মনোনয়নকারী দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রাখবেন (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫: ৫১)। পরে এই বিষয়টাকেই আবার ঐকমত্য কমিশনে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য পাঠানো হয়। ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়, ‘আস্থা ভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধন বিলের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত, এমন বিল বাদে সংসদ সদস্যরা দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারবেন’ (অনামা ২০২৫)।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি দুই–তৃতীয়াংশ সংসদীয় আসনে বিজয় লাভ করে সরকার গঠন করেছে। ফলে চাইলে দলটি ৭০ অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করতে পারে বা এতে যেকোনো ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। তাই বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে একটি নির্মোহ আলোচনা জরুরি। প্রশ্নটি সরাসরি করা জরুরি: যদি বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিলুপ্তি ঘটে, তাহলে কি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে? এই প্রবন্ধের যুক্তি হলো, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করলেই বা এতে গুণগত পরিবর্তন আনলেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ‘কার্যকর’ হয়ে উঠবে না, কিংবা গণতন্ত্র সুসংহত হবে না। কারণ, সংসদীয় গণতন্ত্র এমনভাবে বিকশিত হয়েছে, যাতে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল গণস্বার্থ–সংশ্লিষ্ট এজেন্ডাগুলো কিছু প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন করতে পারে। ৭০ অনুচ্ছেদ তুলে দিলেও, সংসদের রুলস অব প্রসিডিউর এবং হুইপদের ক্ষমতা ও কাজের ধরন যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হবে। রুলস অব প্রসিডিউর করা হয়েছে মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সরকারি দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। আর হুইপের কাজ হলো দল থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যেন ‘পার্টি লাইনের’ বা দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে থাকেন, তা নিশ্চিত করা। এই দুইয়ের মিলিত প্রভাবে ব্যক্তিগতভাবে সংসদ সদস্যদের পক্ষে তেমন কোনো ভূমিকা রাখা মুশকিল।

এই প্রবন্ধের প্রথম অংশে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আমাদের পণ্ডিত এবং বিদগ্ধজনের লেখা আলোচিত হবে। এর সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাও আলোচিত হবে। দ্বিতীয় অংশে ব্যক্তি সংসদ সদস্যদের পক্ষে সংসদে কতটা সৃষ্টিশীল হওয়া সম্ভব, তা আলোচনা করা হবে। আর তৃতীয় অংশে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের হুইপরা কীভাবে তাঁদের দেশের সংসদ সদস্যদের দলীয় শৃঙ্খলায় ‘বন্দী’ রাখেন, সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হবে।

আমাদের পণ্ডিতেরা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন, তা দিয়ে প্রথমে শুরু করা যাক। মওদুদ আহমদ লিখেছিলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ দলের স্বার্থকে দেশের স্বার্থের ওপরে স্থান দেওয়ার জন্য এবং সংসদ সদস্যদের ব্ল্যাকমেল বা জিম্মি করে রাখার জন্য সংবিধানে সংযোজন করা হয়েছিল (আহমেদ ১৯৯১: ১৩০)। নিজাম আহমেদ ও সাব্বীর আহমেদ আলাদা লেখায় মতপ্রকাশ করেন, যদিও এই অনুচ্ছেদ সরকারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক, তারপরও এর ফলে এমপি সাহেবদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সৃজনশীলতা ব্যাহত হয় (আহমেদ ২০০২; জালাল ও সাব্বীর ২০২৩: ৭১)। সাব্বীর আহমেদ লেখেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদ আইনপ্রণেতাদের সৃষ্টিশীল দিকগুলোকে উৎসাহিত করে না’ (জালাল ও সাব্বীর ২০২৩: ৭১)। তিনি আরও প্রস্তাব করেন, ‘আইনে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের একটি ধারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা দরকার’ (জালাল ও সাব্বীর ২০২৩: ৭২)। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে সংসদে দেওয়া সংসদ সদস্যদের কোনো বিবৃতি, বক্তৃতা বা ভোটসংক্রান্ত বিষয়াদির জন্য তাঁদের কোনো আদালতে নেওয়া তো দূরের কথা, আদালতে প্রশ্নও তোলা যাবে না। ফলে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতামত প্রকাশকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করা নিষ্প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে কামরান রেজা চৌধুরী লেখেন, ‘…অনুচ্ছেদ ৭০–এর কারণে সংসদ সদস্যরা দলের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন না, কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়।…উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৯ সালের নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনে আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলসহ একাধিক সংসদ সদস্য দলের কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ যেভাবে চলছে, তাতে দলের ভবিষ্যৎ ভালো নয়। হল–মার্ক কেলেঙ্কারির পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ‘চার হাজার কোটি টাকা কিছু না’ মন্তব্যের জেরে জলিলসহ দলের একাধিক সংসদ সদস্য তাঁকে দুঃখিত বলতে বাধ্য করেন।….শুধু আওয়ামী লীগের আমলে নয়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে (২০০১-২০০৬) বিএনপির দুই সংসদ সদস্য দলের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। একজন হলেন রাজশাহীর আবু হেনা এবং অন্যজন খুলনা-দৌলতপুর আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ আশরাফ হোসেন। তাঁর নির্বাচনী আসনে বাংলা ভাই ও বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করার পর ২০০৫ সালের ২৮ নভেম্বর আবু হেনাকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। কিন্তু তিনি সংসদের বাকি মেয়াদ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন’ (কামরান ২০২৫)।

মহব্বত খানের মত হলো, ৭০ অনুচ্ছেদ নির্বাহী কর্তৃত্ববাদের জন্ম দেয় (খান ২০০৬)। আবার সংবিধান সংস্কার কমিশনের বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, ‘স্থিতিশীলতার উদ্দেশ্যে এই বিধান রাখা হলেও, এটি রাজনৈতিক আলোচনা এবং দলীয় জবাবদিহিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এটি সংসদ সদস্যদের তাঁদের নির্বাচনী এলাকার স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করা ও স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগের ক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে’ (সংবিধান সংস্কার কমিশন: ৩৬)। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময়েও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিরুদ্ধ মত ছিল। সেই সময় আবুল মনসুর আহমদ দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দলবদল করাকে ‘পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র বিকাশের খুব বড় প্রতিবন্ধক’ বলে মনে করতেন। তবে তিনি একে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত না করে সাধারণ আইনে নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, ‘সংবিধানের ভিতরে বা বাইরে যেখানেই বিধান করা হউক, মেম্বরগিরিটা বাতিল করাইতে হইবে ভোটারদের দিয়াই। মনোনয়নদাতা দল আসলে সুপারিশকারী মাত্র। তাঁদের সুপারিশেই মেম্বর ভোট পাইয়া নির্বাচিত হইয়াছিলেন, এটা মানিয়া লইলেও তাঁরা ভোটারদের নির্বাচন বাতিল করিতে পারেন না। কারও সুপারিশে কেউ চাকুরি পাইলেও চাকুরিয়াকে বরখাস্ত করিবার মালিক চাকুরিদাতাই, সুপারিশকারী নন।’ তাঁর পরামর্শ ছিল, ‘তাঁদের সম্বন্ধে নির্বাচকমণ্ডলীর অনাস্থা বা ‘রিকলের’ বিধান’ (মনসুর ১৯৭২: ২, ৭)।

আবুল মনসুর আহমদের কথাই ধরা যাক। পাকিস্তানের আইন পরিষদের সদস্যদের ঘন ঘন দলবদলের ঘটনা আবুল মনসুর আহমদের চোখের সামনেই ঘটেছে। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, আইনপ্রণেতারা হীনস্বার্থে দলীয় ও জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। ফলে সরকার হয়ে উঠেছিল ক্ষণস্থায়ী। সেই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য পাকিস্তান আমলেই রাজনৈতিক মহলে আইনপ্রণেতাদের দলবদল ঠেকানোর জন্য এক ধরনের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এমনকি ১৯৬৯ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব যে গোলটেবিল বৈঠক করেন, সেখানেও এই ব্যাপারে ঐকমত্য হয়েছিল (অনামা ১৯৬৯: ১)। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানপ্রণেতারা পাকিস্তানের আইনপরিষদের ভয়াবহ স্মৃতির যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য দলত্যাগ নিরোধক ব্যবস্থাকে সাংবিধানিকভাবে পাকাপোক্ত করতে সচেষ্ট হন (জালাল ও সাব্বীর ২০২৩)। যাহোক, আবুল মনসুর আহমদ মনে করতেন সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা প্রার্থীদের বাছাই করেন। এই বক্তব্যের মধ্যে কিছুটা সত্যতা আছে। সারা দুনিয়াতে সংসদ নির্বাচনে শুধু প্রার্থীর যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া ভোটারের সংখ্যা খুবই কম। নিচের সারণিতে এর একটি তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

দেশ      ভোটারের কাছে দলের চেয়ে প্রার্থীর প্রধান্য বেশি

যুক্তরাজ্য            ≈ ১০-১৫% (নুনেজ ২০২১)

যুক্তরাষ্ট্র   < ১০% (এএনইএস)

কানাডা   ≈ ৪-৫ (স্টিভেনস ও অন্যান্য ২০১৯)

অস্ট্রেলিয়া           ≈ ১০–১২% (ক্যামেরন ও অন্যান্য ২০২২)

নিউজিল্যান্ড       ≈ ১০–১৫% (অনামা ২০১৯)

ভারত      ৩২% (অনামা ২০১৯)

টেবিল: শতকরা কত ভাগ ভোটার দল বা দলীয় নেতার চেয়ে প্রার্থীকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন [উৎস: বিভিন্ন গবেষণা থেকে লেখক এই টেবিল তৈরি করেছেন।]

আবুল মনসুর আহমদ যেমনটা লিখেছিলেন, দলের সুপারিশে ভোটাররা প্রার্থীকে ভোট দিয়ে থাকেন। সেদিক থেকে দল সুপারিশকারী মাত্র; নিয়োগদাতা নয়। কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশ থেকে নির্বাচনের আগের ও পরের জরিপের তথ্য থেকে স্পষ্ট, পৃথিবীর উন্নত গণতন্ত্রের দেশেও খুব কম সংখ্যক ভোটারই দলের নীতি ও নেতার চেয়ে প্রার্থীর যোগ্যতাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। সেদিক থেকে বলতে গেলে স্থানীয় পর্যায়ে ভোটাররা দলের মনোনীত একজন এজেন্ট বা প্রতিনিধিকে ভোট দিয়ে থাকেন মাত্র। ভোটার যে দল দেখে প্রার্থীকে ভোট দিল, সে দলের সঙ্গে যদি ওই প্রার্থীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়, তাহলে নির্বাচিত হওয়ার পর সেই প্রার্থী আর দলের এজেন্ট থাকলেন না। সেহেতু তাঁর সংসদ সদস্যপদ নৈতিকভাবে এবং আইনিভাবে খারিজ হতে পারে।

অনস্বীকার্যভাবে বাংলাদেশের সংবিধানের দলত্যাগনিরোধী অনুচ্ছেদের বিরোধিতা ১৯৭০-এর দশক থেকেই চলমান। এই সমালোচনার মাঝেও দক্ষিণ এশিয়ার অপর দুটি দেশ ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে ১৯৮৫ ও ১৯৯৭ সালে তাদের সংবিধানে আইনপ্রণেতাদের দলত্যাগনিরোধে পরিবর্তন এনেছে। আর দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুর, আফ্রিকার দেশ কেনিয়াতে দলত্যাগনিরোধী আইন বলবৎ আছে সেই গত শতকের ষাটের দশক থেকে। উপরন্তু একুশ শতকের গোড়ার দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা, এমনকি হাল আমলে (২০২২ সালে) মালয়েশিয়া কেন সংবিধান সংশোধন করে, অনুরূপ একটি সংশোধনী তাদের সংবিধানে যুক্ত করল? বিষয়গুলো গভীর ভাবনার দাবি রাখে। অনুসন্ধিৎসু যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, বর্তমান দুনিয়ার কোন দেশগুলোতে অনুরূপ বিধান বিদ্যমান? নিচের সারণি থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

টেবিল ১: যেসব দেশে দলত্যাগনিরোধী আইন (অ্যান্টি–ডিফেকশন আইন) আছে

তর্কাতীতভাবে পৃথিবীর উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে দলত্যাগনিরোধী আইন নেই। তবে গবেষকেরা স্বীকার করেন, এমন আইন সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এ কারণেই ভারত, ইসরায়েল এবং নিউজিল্যান্ডের মতো গণতান্ত্রিক দেশে দলত্যাগনিরোধক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে (নিকোলেনি ২০২১)। অন্যদিকে অবিকশিত বা উঠতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে—যেখানে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, দলীয় ব্যবস্থা ও দলীয় শৃঙ্খলা এখনো সুসংহত নয়—সেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ পরিবর্তন রাষ্ট্র পরিচালনায় অব্যাহতভাবে সমস্যা সৃষ্টি করে (মার্সন ও হেলার ২০০৩: ৫)। মালহোত্রা তাঁর গবেষণায় ৪০টি ব্রিটিশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশসহ মোট ৬৫টি দেশের দলত্যাগনিরোধী আইন নিয়ে এক তুলনামূলক চিত্র হাজির করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, যেসব দেশের আইনসভার ইতিহাসে দলত্যাগের ঘটনা ঘটেছে, শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে সেসব দেশে দলত্যাগনিরোধী আইন করা হয়েছে (মালহোত্রা ২০০৫: ১১১)। তাই আমাদের বিবেচনা করা উচিত, মননে-মগজে এবং চর্চার দিক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা কি তাঁদের সমগোত্রীয় অন্যান্য কম গণতান্ত্রিক দেশের দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পথকে অবলম্বন করবেন, নাকি অতি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের চর্চাকে একটি সর্বাত্মক সংস্কারের মাধ্যমে আয়ত্ত করার স্বপ্নে বিভোর থাকবেন।

কারণ, কোনো গণতন্ত্রে এমপি সাহেবদের পার্টির ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত হওয়ার পর ইচ্ছেমতো দল পরিবর্তনের স্বাধীনতা থাকবে নাকি থাকবে না, কিংবা কতটুকু থাকবে, তা নির্ভর করে দুটি বিষয়ে সামষ্টিক সিদ্ধান্তের ওপর: প্রথমত, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের দলীয়ব্যবস্থার প্রকৃতি কী এবং (তা উঠতি গণতন্ত্রের দেশ হলে) সেখানে শাসনব্যবস্থার (রিজিম) স্থিতিশীলতা ও জাতীয় সংহতিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন (স্পাইস ও পেহ্ল ২০০৪: ২২৪)।

দলত্যাগনিরোধী ব্যবস্থা কি আইনপ্রণেতাদের সৃষ্টিশীলতাকে হরণ করে?

বাংলাদেশ-বিষয়ক অধিকাংশ পণ্ডিত ও গণতন্ত্রকামী নাগরিকের মত হলো, ৭০ অনুচ্ছেদ এমপি সাহেবদের সৃষ্টিশীলতার পথে অন্তরায়। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে অনুচ্ছেদটি তুলে দিলে কিংবা সংশোধন করলে সংসদ সদস্যদের সৃষ্টিশীলতা বিকশিত হওয়ার কথা। সংসদীয় চর্চায় বা রাজনীতিতে কোনো গুণগত, পরিমাণগত বা উভয় রকম পরিবর্তন আসার কথা। বাংলাদেশে স্বল্প বা মধ্যমেয়াদে এ ধরনের পরিবর্তন বাস্তবসম্মতভাবে কতটা প্রত্যাশা করা যায়, সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের সাব্যস্ত করা দরকার, আইনপ্রণেতাদের সৃষ্টিশীলতা কীভাবে পরিমাপ করা যাবে। অন্য কথায়, আইনপ্রণেতারা যে সৃষ্টিশীল হয়েছেন, তা কী করে বোঝা যাবে। স্বাভাবিকভাবেই, কেউ আশা করবেন না যে তাঁরা কবি-সাহিত্যিক-গীতিকার-সুরকার বা চিত্রকর হয়ে যাবেন। বরং তাঁদের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে, অর্থাৎ আইন প্রণয়নে তাঁদের সৃষ্টিশীলতার ছাপ থাকবে।

আসুন দেখি, সংসদ সদস্যদের কাজ কী। ‘ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতিতে সংসদ যখন অধিবেশনে থাকে, তখন এমপি সাহেবদের কাজ মূলত তিনটি: আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সরকারি আয়-ব্যয়ের প্রস্তাব বিবেচনা করা’ (মার্ল্যান্ড ২০২০: ৩-৪)। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সংসদে আইনের প্রস্তাব ও বিল নিয়ে আসতে পারেন। তাঁরা সেই প্রস্তাব বা বিলের ওপর বিতর্ক, সংশোধনী প্রস্তাব এবং প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দিয়ে আইন প্রণয়নে অংশগ্রহণও করতে পারেন। সংবিধানের ৫৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, সরকারি কাজের চুলচেরা বিশ্লেষণ, যেমন: প্রশ্নোত্তর পর্বে তথ্য চাইতে, লিখিত প্রশ্ন জমা দিতে বা কোনো সরকারি-বেসরকারি নথি চেয়ে অনুরোধ করতে পারেন। কোনো বিষয়ের আলোচনাকে অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করলে তাঁরা সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থগিত করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জরুরি আলোচনার প্রস্তাবও দিতে পারেন। আবার সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিভিন্ন স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে বিভিন্ন আইনের খসড়া, সরকারের আয়-ব্যয়ের বিভিন্ন হিসাব নিরীক্ষণও করতে পারেন।

আমাদের সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়নে রাতারাতি ‘সৃষ্টিশীল’ হবেন কি না, সে প্রসঙ্গে পরে যাব। আগে দেখি আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতসহ পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেমন: যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত চেষ্টায় আইন প্রণয়নে কতখানি সৃষ্টিশীলতার ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আমরা এ দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখতে চাই দুটি কারণে: প্রথমত, এগুলোকে পৃথিবীর সবচেয়ে কার্যকর গণতন্ত্রের দেশ হিসেবে ধরা হয়; দ্বিতীয়ত, সেসব দেশে এমপি সাহেবদের কোনো বিলের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক বাধানিষেধ নেই (তবে অনানুষ্ঠানিক বাধা অনেক; সে ব্যাপারে এই প্রবন্ধের শেষের দিকে আলোচনা করব)। সৃজনশীলতা পরিমাপের একটি উপায় হতে পারে, কত সংখ্যক (বা কত শতাংশ) বেসরকারি সদস্যের বিল সংসদের চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে (সালফেল্ড ১৯৯৫: ৫৬১)। ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতিতে সংসদ সদস্যরা দুই ভাগে বিভক্ত। মন্ত্রী বা ক্যাবিনেটের সদস্যরা সরকারি সদস্য আর অন্য সদস্যরা—সরকারি দল, বিরোধী দল বা স্বতন্ত্র—বেসরকারি সদস্য হিসেবে পরিচিত। বেসরকারি সদস্যরা সংসদে যেসব বিল উপস্থাপন করেন, সেগুলোই বেসরকারি সদস্যের বিল। টমাস সালফেল্ড অবশ্য মত দিয়েছেন, ‘বেসরকারি সদস্যের বিল কতগুলো পাশ হয়, তা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী কতটা সক্রিয়, সেটা পরিমাপের ভাল নির্দেশক হতে পারে’ (সালফেল্ড ১৯৯৫: ৫৬১)।

২০১৫ সালের টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৪৭ সাল থেকে আজ অবধি ভারতে বেসরকারি সদস্যের বিল পাস হয়েছে মাত্র ১৪টি। সর্বশেষ বেসরকারি সদস্যের বিল পাস হয়েছে ১৯৭০ সালে (অনামা ২০১৫)। অথচ ভারতের সংসদ সদস্যদের জন্য দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা এসেছে ১৯৮৫ সালে। আর ১৯৭০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ভারতের এমপিরা একটি বেসরকারি সদস্যের বিলও পাস করাতে যেমন সক্ষম হননি, তেমনি দলত্যাগনিরোধী সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণের পরও কোনো বেসরকারি সদস্যের বিল আইনে পরিণত হয়নি। এর মানে, ভারতে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সুযোগ বন্ধ হওয়ার পর সংসদ সদস্যদের ‘সৃষ্টিশীলতা’ কমেনি বা বাড়েওনি।

যুক্তরাজ্যে ২০ বছরে (১৯৯৭-২০১৭) ৫.০৮ শতাংশ বেসরকারি সদস্যের বিল পাস হয়েছে (২৩০১টি উত্থাপিত আর মোট ১১৭টি বিল পাস) (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫)। কানাডায় বেসরকারি সদস্যদের উত্থাপিত বিলের ২ শতাংশের কম শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পায় (ওয়ালস ২০০২)। ১৯০৩ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র ২৪টি বেসরকারি সদস্যের বিল আইনে পরিণত হয়েছে (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫)। অস্ট্রেলিয়ার সংসদের এক হিসাব অনুযায়ী সংসদে মোট বিলের ৮.৫ শতাংশ উত্থাপন করেন বেসরকারি সদস্যরা (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫)। আর বাংলাদেশে ১৯৭৩ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে মাত্র সাতটি বেসরকারি সদস্যের বিল পাস হয়েছে (আহমেদ ২০১৪)। এর মানে কি এই দাঁড়ায় যে এমপিরা নিজের উদ্যোগে আইন প্রণয়নের কোনো চেষ্টাই করেন না? বিষয়টা মোটেও তেমন নয়।

স্পষ্টতই, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি বিলের তুলনায় খুবই নগণ্যসংখ্যক বেসরকারি সদস্যের বিল পাস হয়। এ জন্য দলত্যাগনিরোধী আইন বা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মোটেও দায়ী নয়। কারণ, নিউজিল্যান্ড ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো উন্নত গণতন্ত্রের দেশে এমন বিধান নেই। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বেসরকারি সংসদ সদস্যের পক্ষে সৃষ্টিশীলতার ছাপ রাখার সুযোগ কম। কারণ, সংসদের আসল শক্তি জনবল ও সময়। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল জনবলে বড়। আর তারাই সংসদের সময় নিয়ন্ত্রণ করেন। উপরন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা (বা সংসদ নেতা) সংসদের কার্যপ্রণালিও নিয়ন্ত্রণ করেন।

টেবিল ২: বেসরকারি সদস্যদের কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত দিন ও বরাদ্দকৃত সময়

[উৎস: বিভিন্ন দেশের সংসদ থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে প্রস্তুতকৃত]
[উৎস: বিভিন্ন দেশের সংসদ থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে প্রস্তুতকৃত]

সংসদের সময় এমনভাবে বণ্টন করা থাকে, যাতে সরকারি কর্ম-সম্পাদন প্রাধান্য পায়। টেবিল-২ থেকে স্পষ্ট যে বেসরকারি সদস্যদের পরিকল্পনামাফিক সংসদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংসদের মোট সময়ের কতটুকু বরাদ্দ থাকে। ওপরের টেবিল থেকে স্পষ্ট, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের সংসদে বেসরকারি সদস্যদের জন্য সবচেয়ে বেশি সময় বরাদ্দ। আর তা সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার সময়ের মাত্র ২০ শতাংশ (বা মোট সংসদীয় সময়ের এক–পঞ্চমাংশ)। বাংলাদেশের সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী বেসরকারি সদস্যদের জন্য সময় শুধু বৃহস্পতিবার। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে সরকারি সদস্যদের প্রস্তাবিত কার্যক্রম চলবে। স্পিকার চাইলে সপ্তাহের অন্য দিনেও বেসরকারি সদস্যদের বিল সম্পর্কে আলোচনার আয়োজন করতে পারেন, তবে তা সংসদ নেতার পরামর্শে হতে হবে [জাতীয় সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি: ধারা ২৫]।

সরকারের ইচ্ছার বাইরে একজন সংসদ সদস্যকে নিজের উদ্যোগে কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এক ঘণ্টার আলোচনাও সংসদে করতে হলে, তাঁকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। ধরা যাক, কোথাও কোনো সংঘাত-সংঘর্ষ হলো। হতাহত অনেক। একজন সংসদ সদস্য এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা করতে চান। তিনি একা কিছুই করতে পারবেন না। তাঁকে অন্ততপক্ষে আরও পাঁচজন সদস্যের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে যেদিন আলোচনা করতে চান তার কমপক্ষে দুই দিন আগে স্পষ্ট করে কোন বিষয়ে এবং কী আলোচনা করতে চান, তা স্পিকারের কাছে জমা দিতে হবে। সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে এমন নোটিশ পাওয়া সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার পর স্পিকার যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে বিষয়টি জরুরি এবং যথেষ্ট জনগুরুত্বপূর্ণ এবং সংসদে দ্রুত উত্থাপন করা প্রয়োজন, এবং সেই সঙ্গে বিষয়টি আলোচনার জন্য শিগগিরই আর কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে না, তাহলে তিনি নোটিশটি গ্রহণ করতে পারবেন। তিনি নোটিশটি গ্রহণ করলেও এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ দুটি এক ঘণ্টার আলোচনার আয়োজন করতে পারেন। আর তা–ও করতে হবে সংসদীয় নেতার সঙ্গে পরামর্শ করার পর। এর মানে, সংসদীয় নেতার কাছ থেকে সবুজ সংকেত না পেলে স্পিকারও যেকোনো জনগুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে আলোচনা আহ্বান করতে পারেন না [জাতীয় সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি: ধারা ৬৮-৬৯]।

অন্যদিকে সরকার–নির্ধারিত বিষয়গুলো সম্পন্ন করার জন্য সংসদ নেতার পরামর্শ নিয়ে স্পিকার সংসদ সচিবকে যে ধরনের নির্দেশনা দেবেন, সেই মোতাবেক সংসদের কার্যাবলি সম্পাদনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে [বাংলাদেশ সরকার কার্যবিধি: ধারা ২৬]। অন্যদিকে জনতার ম্যান্ডেট পাওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতৃত্বে গঠিত সরকারে এজেন্ডাকে এমন গুরুত্ব দেওয়া হয় যে সংসদ নেতার পরামর্শক্রমে স্পিকার কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আইন প্রণয়নের আগে যদি মনে করেন যে বিষয়টি জনগুরুত্বপূ্র্ণ, তাহলে যতটা সময় তাঁরা প্রয়োজনীয় মনে করেন, ততটা সময় আলোচনার জন্য বরাদ্দ রাখতে পারেন [জাতীয় সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি ১১৭(১)]। পার্লামেন্টে যেকোনো প্রস্তাব (বা মোশন) উত্থাপনের পর তা কতটা সময় নিয়ে সংসদে আলোচনা হবে, তা-ও নির্ভর করে সংসদ নেতা ও স্পিকারের ওপর [জাতীয় সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি ১৫৬]। এমনকি সংসদে গোপন কোনো অধিবেশনে বসবে কি না, তা–ও নির্ধারিত হবে সংসদ নেতা ও স্পিকারের যৌথ সিদ্ধান্তে [জাতীয় সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি ১৮১(১)]। তা ছাড়া সংসদে কোন বিষয় কীভাবে উত্থাপিত হবে এবং তারপর সেগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, সে ব্যাপারে স্পিকার তাঁর নেতৃত্বে অনধিক পনেরো (১৫) সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করতে পারেন। সরকারি বিলগুলো কত সময় ধরে আলোচিত হবে, সে বিষয়ে কমিটির মতামত গ্রহণের জন্যও স্পিকারের জন্য সংসদ নেতার সম্মতি প্রয়োজন [জাতীয় সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি: ধারা ১১৯ ও ২২০(১)]।

দেখা যাচ্ছে, এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচিত সরকার সংসদকে যেভাবে ব্যবহার করতে চায়, সংসদের কার্যপ্রণালি সেভাবেই ডিজাইন করা হয়েছে। ব্যক্তি সংসদ সদস্যদের জন্য সপ্তাহে মাত্র এক দিন সময় রাখা হয়েছে। সেই এক দিনের মধ্যেই তাঁদের জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সংসদে উত্থাপন করতে হবে; মন্ত্রীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে; সরকারের সমালোচনা করতে হবে, এমনকি নতুন আইন প্রণয়নের জন্য প্রস্তাবও উত্থাপন করতে হবে। আবার সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা যদি একযোগে কোনো প্রস্তাব আনতে চান, তাহলে যেকোনো ব্যক্তিগত উদ্যোগের জন্য সময় আরও সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে সবকিছু মিলে সংসদ সরকারি দলের কর্মসূচি বা এজেন্ডা বাস্তবায়নের একটি বিরাট আইনি-রাজনৈতিক যন্ত্রে পরিণত হয়। এই যন্ত্ররূপী সংসদের জ্বালানি হলো সংসদ সদস্যদের সম্মতি (এই সম্মতি কখনো কখনো ভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়)। আর সেই সম্মতি আদায়ের বা উৎপাদনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হলেন হুইপ (পদটি ইংরেজি ভাষা থেকে আমরা সরাসরি গ্রহণ করেছি। বাংলায় এর নাম হতে পারে—চাবুকদার বা চাবুকধারী)। যদি একাধিক হুইপ থাকেন, তাঁদের একজনকে সংসদ নেতা কিংবা বিরোধী দলের নেতা চিফ হুইপ হিসেবে মনোনয়ন দেন।

হুইপ কে

সরকারি বা বিরোধী দলের যে সংসদ সদস্য সামষ্টিক সংসদীয় কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁর দলের অন্য সদস্যদের অবগত রাখেন এবং যখন কোনো প্রস্তাবের বিষয়ে ভোটাভুটি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তখন তাঁদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকেন, তিনিই হুইপ (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫)। সাধারণত প্রতিটি দলের একজন চিফ হুইপ এবং একাধিক হুইপ থাকেন। হুইপরা আইনসভায় নির্বাচিত দলের সদস্যদের মধ্যে একটি যোগাযোগ-নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করেন এবং ভোটের জন্য আসা গুরুত্বপূর্ণ দলীয় পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সদস্যদের সংগঠিত করেন (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫)। যুক্তরাজ্যে চিফ হুইপ জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর মর্যাদা পান; প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতার পরেই তাঁর অবস্থান এবং তিনি ক্যাবিনেট সদস্য। যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নকক্ষে স্পিকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার পর সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি হলেন চিফ হুইপ; আর বিরোধী দলে তাঁর অবস্থান দ্বিতীয় (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫)। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে রিপাবলিকান দলের হুইপ সেই ১৮৯৭ সাল থেকে আর ডেমোক্রেটিক দলের হুইপ ১৮৯৯ সাল থেকে নিজ নিজ দলীয় নেতৃত্বকে দলের আইন প্রণয়নে এবং দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যাপকভাবে সহায়তা করে আসছেন (মেইনকি ২০১৬: ১৭৩)।

হুইপ ব্যবস্থার প্রথম কাজ আইনপ্রণেতাদের ভোটের জন্য সংগঠিত করা। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হুইপের কাজ হলো দলের কোনো পদক্ষেপের ব্যাপারে আইনপ্রণেতারা ব্যক্তিগতভাবে কে কোন অভিমত লালন করেন, তা সংসদের নেতৃত্বকে জানানো, যাতে করে সরকারের জন্য আইন প্রণয়নে সুবিধা হয়। সোজা কথায়, সংসদে ভোটাভুটির আগেই মাথা গোনা বা হেড কাউন্ট করার কাজটি হুইপ করেন। সংসদীয় ব্যবস্থায়, সরকারকে তার সব কর্মকাণ্ডের জন্য সংসদ সদস্যদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। সে জন্য ক্ষমতাসীন দলের যখন সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তখন আইন প্রণয়ন বা সরকারের কাজের বৈধতা দেওয়ার জন্য হুইপিংই কার্যকর একটি পন্থা। অনেক এমপি সংসদীয় বিষয়াদিতে হালনাগাদ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকেন না; অনেকে বিতর্ক শোনেন না। তাঁরা হঠাৎ করেই চেম্বারে ঢুকে হুইপকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী করব?’ হুইপের ইঙ্গিতে তাঁরা তখন সংসদে ভোট দেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের হুইপের কাজ হলো নেকড়ের শিকার থেকে বাঁচার জন্য পশুর পাল যেমন একসঙ্গে থাকে, ঠিক তেমনভাবে নিজেদের এবং দলের আদর্শিক অবস্থান ধরে রাখা (রেন্টন ২০০৪: ৩৩৪)। সম্মিলিতভাবে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর সমালোচনা বা বিরোধিতার কৌশল নির্ধারণে সাহায্য করাও বিরোধী হুইপের কাজ।

নিজ নিজ দলের পক্ষে সমর্থন জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে হুইপরা তাঁদের দল থেকে নির্বাচিত হওয়া বিভিন্ন মতের, রুচির ও স্বার্থের সদস্যকে চিহ্নিত করে তাঁদের নিয়ে আইনসভার মধ্যেই ভোটের জোট তৈরি করার চেষ্টা করেন। তাই প্রত্যাশিতভাবেই, চিফ হুইপের কাজ হলো দলের নাড়ির ওপর সব সময় আঙুল রাখা, যাতে করে তিনি কোনো নির্দিষ্ট নীতির প্রতি দলের সদস্যদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারেন এবং শেষ পর্যন্ত সংসদে ভোট নেওয়ার সময় সেই নীতির প্রতি দলের সদস্যদের আনুগত্যের সম্ভাব্য মূল্যায়নও করতে পারেন (আলেক্সেন্ডার ১৯৬২: xii)।

হুইপের দ্বিতীয় কাজ হলো তথ্য প্রচার। হুইপরা ‘পরামর্শ’ প্রস্তুত করে আইনপ্রণেতাদের সরবরাহ করেন। এসব পরামর্শ দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক এমনকি বার্ষিক কর্মসূচিরও হয়। এসব পরামর্শপত্রে উল্লেখ থাকে আগামী দিনগুলোতে সংসদে কী কী বিষয় উত্থাপিত হতে পারে, কবে অধিবেশন শুরু ও শেষ হবে (বা হতে পারে), কখন এবং কোন সংশোধনী ভোট হবে (বা হতে পারে)। কানাডায় আইনসভার অধিবেশন যখন থাকে না, আইনপ্রণেতারা যখন বাড়িতে থাকেন, তখন তাঁরা যেন দল যেসব বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, সেসব বিষয়ে যথেষ্ট অবগত থাকেন, সে জন্য হুইপের কার্যালয় থেকে ‘রিসোর্স প্যাকেট’ও প্রস্তুত করে সরবরাহ করা হয় (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫)। এমনকি আইনপ্রণেতাদের জন্য আসন ও অফিসকক্ষ বরাদ্দও হয় দলীয় হুইপের পরামর্শ অনুসারে (অনামা ২০২৫)। আবার ভারতীয় আদালতের অভিমত হলো, সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং দলের অবস্থানের পক্ষে ভোটের নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি সদস্যদের শৃঙ্খলা এবং সংসদের সম্মান বজায় রাখতে স্পিকারকে সহায়তা করাও তাঁদের দায়িত্বের আওতায় পড়ে (কশ্যপ ১৯৯৩: ১২০)। নিউজিল্যান্ডের হুইপের ক্ষমতা আরেক কাঠি বেশি। সেখানে হুইপ চাইলে তাঁর দলের পক্ষে সকল সংসদ সদস্যের ভোট দিয়ে দিতে পারেন। ফলে কোনো সংসদ সদস্য যদি দলের বিপক্ষে ভোট দিতে চান, তাহলে তাঁকে সেই ক্ষমতা দলের হুইপের কাছ থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে (কম ২০০৯: ৬)।

উন্নত গণতন্ত্রের দেশে হুইপগিরি কেমন হয়

বিলাতের পার্লামেন্টে ভিনসেন্ট গ্ল্যাডস্টোন তাঁর ছয় বছর চিফ হুইপের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন, ‘সরকারে থাকুন আর বিরোধী দলে থাকুন, চিফ হুইপ সব সময়ই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রধান ভরসা, তাঁর ডান হাত। সংসদে দলীয় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সব পরামর্শ তিনি দলের প্রধানকে দেন। দলের প্রত্যেক প্রভাবশালী ব্যক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যেমন তাঁর কর্তব্য, একই সঙ্গে প্রতিপক্ষ দলের ভেতরে কী চলছে, তার সঠিক এবং সবিস্তার তথ্য তাঁর কাছে থাকাও বিধেয়। নিজের দলের সদস্যদের আস্থা অর্জন শুধু নয়, তাঁদের ব্যক্তিগত অনুরাগ-বিরাগ, হিংসা, বিদ্বেষ, ক্ষোভ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা অন্য যেকোনো কারণে তৈরি হওয়া দলীয় সমস্যা বা বিপদ সৃষ্টি হওয়ার আগেই তার আগাম গন্ধ পাওয়া চিফ হুইপের কাজ’ (গ্ল্যাডস্টোন ১৯২৭: ৫২০)। গ্ল্যাডস্টোন যোগ করেন, ক্ষমতাসীন চিফ হুইপের কাজ সরকারের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন এবং সরকারের যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তাঁর পুরো মনোযোগ সংসদীয় দায়িত্ব পালনে নিবদ্ধ করা। আর বিরোধী দলের চিফ হুইপের কাজ হলো সরকারি দলের চিফ হুইপের সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ রাখা। সরকারি চিফ হুইপ তাঁকে সংসদের কার্যসূচি জানাবেন; পক্ষান্তরে বিরোধী দলের চিফ হুইপ তাঁকে বিরোধী দলের মতামত, ইচ্ছা ও পদক্ষেপ সম্পর্কে পরামর্শ দেবেন। মনে রাখা দরকার, সরকার দায়িত্বশীল আচরণ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আর বিরোধী দল যখন ইচ্ছা করবে তখন তাঁরা দায়িত্বশীল আচরণ করবেন (গ্ল্যাডস্টোন ১৯২৭: ৫২৫)। যুক্তরাজ্যে এখনো সরকার ও বিরোধী দলের চিফ হুইপের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমেই সংসদের আলোচ্যসূচি নির্ধারিত হয়। তবে ‘আলোচ্যসূচি সমঝোতার মাধ্যমেই হোক আর সমঝোতা ছাড়াই হোক, তা নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর হুইপরা স্ব-স্ব দলের সংসদ সদস্যদের সেই পরিকল্পনা মেনে চলতে বাধ্য করতে কাজ শুরু করেন’ (ক্রু ২০১৫: ১২৮)।

আগে যেমনটা বলেছি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদ সদস্যদের দলত্যাগ বন্ধ করার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি বাধা নেই। তা সত্ত্বেও কি সেসব দেশে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটে? তাঁরা কি যখন-তখন দল ত্যাগ করেন? করেন না। এর একটি বড় কারণ হলো, চিফ হুইপ ও অন্যান্য হুইপের কার্যকর ভূমিকা। বস্তুত কানাডার সংসদ সদস্যরা ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে দলীয় হুইপের নির্দেশনা মেনে চলেন। ১ শতাংশের কম সময় তাঁরা হুইপের নির্দেশনার বাইরে যান। বেসরকারি সদস্যের বিল বা গুরুত্বহীন কোনো প্রস্তাব বা মোশনের ক্ষেত্রেই সাধারণত নির্দেশনা অমান্যের ঘটনা ঘটে। যা–ই ঘটুক, কানাডার এমপিরা তাঁদের দলের বিরুদ্ধে কখনোই ভোট দেন না; দিলেও তা অত্যন্ত বিরল (মার্ল্যান্ড ২০২০: ৭)। যুক্তরাজ্যের এমপিদেরও পার্লামেন্টে নিজের দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ঘটনা বিরল—১ শতাংশের কম (স্ল্যাপিন ও অন্যান্য ২০১৮: ২০; কম ২০০৯)। ভোটে দলের বিরোধিতা করার চাইতে যুক্তরাজ্যের এমপি সাহেবরা কথা বা বক্তৃতার মাধ্যমে বিদ্রোহ প্রকাশ করে থাকেন (স্ল্যাপিন ও অন্যান্য ২০১৮: ২৮)। অস্ট্রেলিয়ায় লেবার পার্টিতে মোট ১৮ বার ফ্লোর-ক্রসিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। আর কোয়ালিশন পার্টিতে ঘটেছে ৪২৭ বার (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫)। কারণ, পুরো সংসদীয় সরকারের কাঠামোটাই এমনভাবে তৈরি যে ‘ভিন্নভাবে ভোট দেওয়া দলের প্রতি অবমাননা হিসেবে ধরা হয়; আর তা থেকে দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নও হয়ে যেতে পারে’ (মার্ল্যান্ড ২০২০: ৭)। এবার আসা যাক যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার থাকার কারণে তা কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া বা ভারতের সরকারব্যবস্থার থেকে একটু আলাদা। পরের দেশগুলো পরিচালিত হয় সংসদীয় সরকারের অধীনে; আর এই ব্যবস্থায় আইনসভা যদি সরকারদলীয় কোনো আইন অনুমোদন না করে, তাহলে সেই সরকারের পতন হবে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থায় কোনো প্রেসিডেন্ট যদি তাঁর মেয়াদকালে একটি আইনও পাস করাতে না পারেন, শুধু এই কারণে প্রেসিডেন্টের কিংবা প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগ করতে হবে না। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ভারতে তেমনটি নয়; এসব দেশের সরকার যদি সংসদে বাজেট বা অর্থবিল পাস করাতে ব্যর্থ হয়, তাহলেই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। এই কারণে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের স্বাধীনতা ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতিতে চলা দেশের আইনপ্রণেতাদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে একটু বেশি। কিন্তু সেখানেও শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে কংগ্রেস সদস্যরা দলের পক্ষে ভোট দেন (অনামা ২০২৩; মেইনকি ২০১৬)। নিচের সারণি থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

টেবিল: গত কয়েক দশকে দলীয় অবস্থানের (ইউনিটি ভোটের) পক্ষে ভোট দেওয়া কংগ্রেস সদস্যদের শতকরা হার

[উৎস: ব্রুকিংস ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অন কংগ্রেস, পাওয়া যাবে: https://www.brookings.edu/wpcontent/uploads/2017/01/vitalstats_ch8_full.pdf, নেওয়া হয়েছে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে]

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে সব বিলের ক্ষেত্রেই দলীয় বিভাজন থাকে না। কিছু কিছু বিল, যেমন জাতীয় নিরাপত্তা নীতিমালা, ভৌত অবকাঠামো, বীর যোদ্ধাদের স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সেবা, ডাক বিভাগের সেবা, সেমিকন্ডাক্টর বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের প্রতিযোগিতাবিষয়ক বিল, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে আইন ইত্যাদিতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই দলের সদস্যদেরই সমর্থন থাকে; এগুলোকে বলে বাই-পার্টিসান বা যৌথ-সমর্থনের বিল। অন্যদিকে অ্যাফরডেবল কেয়ার অ্যাক্ট (যা ওবামাকেয়ার নামে পরিচিত ছিল, করসংক্রান্ত বিল, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের অনুমোদন বা প্রেসিডেন্টের অভিসংশন বা অপসারণের মতো বিলে দলগুলো ভীষণভাবে দলীয় আনুগত্য প্রদর্শন করে। যৌথ সমর্থনে কত সংখ্যক আইন পাস হয় যুক্তরাষ্ট্রে, তার একটি ধারণা নিচের চিত্রটি থেকে পাওয়া যাবে।

হুইপরা কোন কৌশলে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখেন

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া রাজনৈতিক দলকে তার নিজস্ব অগ্রাধিকারের জননীতি বাস্তবায়ন করতে হয় সরকারের মাধ্যমে। এই রাজনৈতিক দলটি আবার বিচিত্র সব ব্যক্তিত্ব, মতাদর্শ আর স্বার্থের সমষ্টি; যার ফলে দলের সব অংশকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে পরিচালিত করতে চাইলে দলটির দিকে অখণ্ড মনোযোগ সব সময় রাখতে হবে; এতে নিয়মিত চর্চা করতে হবে, যাতে বিভিন্ন অংশের মধ্যে অনিবার্য ঘর্ষণ—যেমন বিরোধ, সংঘাত বা সংঘর্ষ—ক্ষতিকর পর্যায়ে না পৌঁছে; এবং দলটি যেন সর্বোচ্চ দক্ষতায় সচল থাকে (আলেক্সেন্ডার ১৯৬২: xi-xii)। আর সংসদীয় দল যাতে একটি লক্ষ্যে কাজ করতে সচেষ্ট থাকে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব হুইপের।

প্রশ্ন জাগতে পারে, হুইপরা কীভাবে সংসদ সদস্যদের আচরণে এমন শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম হন? কানাডার হুইপ অফিসের এক কর্মী এই প্রশ্নের জবাবে বলেন, হুইপের কাজ নিয়ে আলোচনা করাটাই সংবেদনশীল, তা যতই সাধারণ বা যত বিমূর্তভাবেই করা হোক না কেন (মার্ল্যান্ড ২০২০: ২৮)। অতিসংবেদনশীল হওয়ার কারণে এ বিষয়ে হুইপরা সাধারণত বলতে বা লিখতে অনিচ্ছুক থাকেন। সে জন্য হুইপের কার্যপদ্ধতি নিয়ে পদ্ধতিগত গবেষণা খুব কমই হয়েছে। তাই আমরা বিচ্ছিন্নভাবে লিপিবদ্ধ বিভিন্ন ঘটনাপঞ্জি থেকে তাঁদের কার্যপ্রণালি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করব। যত দূর জানা যায়, চিফ হুইপের অস্ত্রভান্ডারে মাত্র এই তিনটি অস্ত্র আছে—সাম (সুবিধার প্রতিশ্রুতি), দান (সুবিধা প্রদান) এবং দণ্ড (বলপ্রয়োগ বা জবরদস্তি)।

সাম (সুবিধা পাওয়ার আশা বা প্রতিশ্রুতি): এমপি সাহেবরাও মানুষ। তাঁদেরও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, আছে। অতীতে উচ্চপদে যাওয়ার জন্য এমপিরা চিফ হুইপের কাছে দেনদরবারও করতেন। নিচের পত্রাংশ থেকে সেটা স্পষ্ট:

প্রিয় ডগলাস,

আপনার অনুরোধে আমি আজ বিকেল ৫:৩০টায় সংসদে থাকব। আপনার অনুমতি পেলে বলি, যাঁর প্রতি আমার গভীর ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা আছে, তাঁর অনুরোধ রাখতে আমার সব সময়ই ভালো লাগে; যদিও আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, সাধারণভাবে দলের প্রতি আমার খুব একটা অনুরাগ অবশিষ্ট নেই। এখন পর্যন্ত আমার সঙ্গে অত্যন্ত অসম্মানজনক আচরণ করা হয়েছে। আমি দীর্ঘ ২৩ বছর যাবৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে সংসদীয় জীবন যাপন করছি; এই সময়ে আমি পাঁচটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে লড়াই করেছি; কখনো সামান্যতম সুদৃষ্টিও কারও কাছ থেকে পাইনি; যদিও বেশ কয়েক বছর ধরেই এটি সবাই জানত যে আমি একটি স্থায়ী পদপ্রত্যাশী ছিলাম। যা–ই হোক, আপনি যখনই ব্যক্তিগতভাবে আমাকে কোনো অনুরোধ করবেন, তখনই যেকোনো কঠিন দায়িত্ব পালনে আমার সাধ্যের মধ্যে যেকোনো কিছু করতে সব সময় প্রস্তুত থাকব।

            আপনার বিশ্বস্ত

            এ জি ডিকসন

চিফ হুইপ ডগলাসের কাছে লেখা এ জি ডিকসনের চিঠি থেকে জানতে পারি, প্রায় ২৩ বছর এমপি থাকার পরও তিনি উচ্চপদ প্রত্যাশী ছিলেন (আলেক্সেন্ডার ১৯৬২: ১৪৫-১৪৬)। কিন্তু বিশ শতকের শেষ দিকে এসে যুক্তরাজ্যের একজন প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন যে নবীন এমপিরা অতীতের তুলনায় অনেক বেশি পদাকাঙ্ক্ষী।

বেশির ভাগ নতুন নির্বাচিত এমপি ওয়েস্টমিনস্টারে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন; কেউ কেউ প্রত্যাশাও করতেন। ১৯৯২ সালে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে চারজন ১৯৯৩ সালে চিফ হুইপের সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁদেরকে কখন মন্ত্রী করা হবে। এ ধরনের প্রত্যাশা আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছে অকল্পনীয় ছিল (মেজর ১৯৯৯: ৩৪৭)।

এমপিদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয়ে একজন অস্ট্রেলীয় চিফ হুইপের মন্তব্য হলো, কোনো কোনো নাছোড়বান্দা এমপির ব্যাপারে তিনি শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘এই ব্যক্তিকে আপনার কিছু একটা দিতেই হবে’ (কম ২০০৯: ৩১)। ব্যক্তিগত সুবিধা (বা এর প্রতিশ্রুতি) এমপিদের বশে আনার জন্য কতটা কার্যকর, তা বোঝা যাবে ২০০৩ সালে বিপুলভাবে আলোচিত হওয়া আরেকটি ঘটনা থেকে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ‘ব্লেয়ার বেইব’ বা ব্লেয়ার-কন্যা হিসেবে পরিচিত একজন আকর্ষণীয় কৃষ্ণাঙ্গ এমপি। এ ঘটনার আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের গোপন নির্দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথ্য স্বাধীনতা বিল বা ফ্রিডম অব ইনফরমেশন বিলকে—যা ছিল তাঁদের দলের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি—এমন সুকৌশলে দুর্বল করে ফেলেছিল যে মন্ত্রীদের জন্য সেই সব তথ্য, যেগুলো তাঁরা জনগণকে জানাতে চান না—গোপন রাখা আগের চেয়েও সহজ হয়ে যায়। অথচ এই বিল ছিল তাঁদের দলের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। স্বাভাবিকভাবেই সেই এমপি ক্ষুব্ধ হয়ে ঘোষণা দেন যে তিনি বিলটির বিরুদ্ধে ভোট দেবেন।

এরপর একবার তিনি যখন কমন্স-সভার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন লেবার দলের একজন স্থূলদেহী হুইপ হুমকিস্বরূপ তাঁর গলা পেঁচিয়ে ধরেন। যখন তিনি প্রতিবাদ জানাতে ওয়েস্টমিনস্টারের সরকারি চিফ হুইপের অফিসে যান, তখন তিনি এমপির মোটা ফাইলটি খুলে তাঁকে জানান, পরবর্তী নির্বাচনের পর দল তাঁকে পরিবহন দপ্তরের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি নির্বাচিত করার কথা ভাবছে। কিন্তু যদি তিনি তথ্য স্বাধীনতা বিলের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তাহলে হুইপের ভাষায়, তিনি ‘নির্বাচনের অযোগ্য’ হয়ে পড়বেন। তা ছাড়া তাঁর নির্বাচনী এলাকায় আগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যে নতুন হাসপাতালটি নির্মিত হওয়ার কথা, তা অন্য কোথাও হবে; তাঁর এলাকার ভোটাররা তাঁদের গ্রামের পাশ দিয়ে যে বাইপাস সড়কটি চায়, দেখা যাবে যে তার জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, ক্ষুব্ধ এমপি হুইপের নির্দেশমতোই ভোট দেন। পরে তিনি পরিবহন দপ্তরের পদের চেয়ে বেশি মর্যাদার লর্ড চ্যান্সেলরের পার্লামেন্টারি আন্ডার-সেক্রেটারি হন (রেন্টন ২০০৪: ৩২৩-৩২৪)। তার মানে পুরস্কারের নেশায়, দলের এমপি তাঁদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকেও সাময়িকভাবে ভুলে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন। আসলে এমন কোনো পেশাজীবী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যিনি নিজের পেশায় এগিয়ে যেতে চান না। এমপি হয়ে পেছনের সারিতে বসে থাকা এমপিরা কেন সব সময় সেখানেই থাকতে চাইবেন? তাই তাঁরা ‘মন্ত্রীদের কাছে তদবিরের চেষ্টা করেন, আর বিনিময়ে মন্ত্রীরাও সংসদে ভোটের সময় ডিভিশন লবিতে তাঁদের সমর্থন প্রত্যাশা করেন’ (ক্রু ২০১৫: ১৩)।

হুইপরাও এমপিদের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে জিইয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকেন। অ্যান টেইলর যখন যুক্তরাজ্যের লেবার সরকারের চিফ হুইপ ছিলেন (১৯৯৮-২০০১), তখন তিনি দলের গোস্‌সা করা, বখে যাওয়া বা সম্ভাব্য বিদ্রোহী এমপিদের ম্যানেজ করার জন্য তাঁদের স্ত্রীদের কাছে গিয়ে অনুরোধ করতেন তাঁরা যেন স্বামীকে একটু বোঝান। তিনি তাঁদের আশ্বস্ত করতেন—প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁদের স্বামীর যোগ্যতা ও প্রতিভা এখনো পুরোপুরি স্বীকৃতি পায়নি, তবে ভবিষ্যতে অবশ্যই পাবে (রেন্টন ২০০৪: ৩২৫)। প্রসঙ্গত, তাঁর সময় প্রত্যেক হুইপকে একটি বা দুটি মন্ত্রণালয় ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। আবার গোটা দেশকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিটি অঞ্চলের ২০ থেকে ৩০ জন এমপিকে দেখভাল করার দায়িত্ব একেকজন হুইপকে দেওয়া হতো। হুইপরা প্রতি সপ্তাহান্তে তাঁদের সবাইকে কোনো না কোনো অজুহাতে ফোন করে—তাঁদের মানসিক অবস্থা কেমন, কোনো সমস্যা আছে কি না—এসব বিষয়ে খবর নিতেন।

দান (সুবিধা প্রদান)

আমরা আগের আলোচনায় দেখেছি, জনৈক ব্রিটিশ এমপি ডিকসন সাহেব যদিও দীর্ঘদিন দলের সুনজরে আসেননি, তারপরও সুনজরে আসার প্রত্যাশায় চিফ হুইপকে লিখেছিলেন, ‘যেকোনো কঠিন দায়িত্ব পালনে আমার সাধ্যের মধ্যে যেকোনো কিছু করতে সব সময় প্রস্তুত থাকব।’ পুরস্কারপ্রাপ্তির পর এমপি সাহেবদের মনোভাব কেমন হতে পারে, তার একটি ধারণা আমরা পাই নিচের পত্রাংশটি থেকে:

 ‘…আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে সমস্যা হতে পারে; সংসদের লবিতে বা আপনার নিজের কক্ষ থেকে অন্য কারও কানে কথা পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। আমার বাবার জন্য সম্মানসূচক ‘পিয়ারেজ’ (উচ্চকক্ষের সদস্যপদ, যা প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে রাজা/রানি প্রদান করেন) অর্জনে আপনার প্রচেষ্টার জন্য আমি আপনাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানানোর জন্য লিখছি। শুধু আপনি কষ্ট করেছেন বলেই নয়; বরং এমন একটি স্পর্শকাতর ও নাজুক বিষয় সামলানোর ক্ষেত্রে আপনি যে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন, সে জন্যও আমি কৃতজ্ঞ। যদি বলি আপনার বিচক্ষণতাই আপনাকে একজন দক্ষ চিফ হুইপ বানিয়েছে, তখন আপনি একে অতিরিক্ত প্রশংসা হিসেবে নেবেন না। আমি আর বেশি কিছু লিখছি না। তবে আমি এমন মানুষ নই যে উপকার ভুলে যাব; আর ভবিষ্যতের সময় ভালো হোক আর মন্দ হোক, আশা করি আপনি একজন ভালো বন্ধু হিসেবে আমার ওপর নির্ভর করতে পারবেন।’

চিঠির ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, চিফ হুইপ এত সঙ্গোপনে একজন এমপির পিতাকে লর্ডসভার সদস্য নির্বাচিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে এমপি সাহেব নিজেই সরমিন্দা ছিলেন এবং ভবিষ্যতে সেই দেনা শোধ করার প্রতিশ্রুতিও চিফ হুইপকে দিয়ে রেখেছিলেন (আলেক্সেন্ডার ১৯৬২: ১৪৬)। শতবর্ষ আগে, ডগলাস সাহেব একজন নবীন রাজনীতিবিদকে হুইপের কাজ সম্পর্কে পরামর্শ দিতে গিয়ে লিখেছিলেন (১৭ জানুয়ারি ১৯১১ তারিখে), এমপি সাহেবদের প্রত্যাশা থাকে চিফ হুইপ তাঁদের আদর-আপ্যায়ন, তোয়াজ-তোষণ করবেন (আলেক্সেন্ডার ১৯৬২: ১৪৮)। আর এখন দলীয় আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য সুবিধা প্রদানের—ক্ষেত্রবিশেষে সুবিধা বাতিলের—নীতিটি মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয় (মেইনকি ২০১৬: ১৫৫)। সংসদ সদস্যদের নজর শুধু ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার দিকেই নয়। কোনো এমপি হয়তো নিম্ন আয়ের পরিবারে সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় অধিকতর অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে চান, কেউ স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার চান, কেউবা তাঁর স্থানীয় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ চান ইত্যাদি। হুইপদের এসব বিষয়েও খেয়াল রাখতে হয়।

ফলে একজন সংসদ সদস্য যখন অতিরিক্ত সুবিধা পান এবং/কিংবা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যেতে সক্ষম হন, তখন তিনি দলের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দূরে থাকার ক্ষমতা হারান। তাই উইলসনের সরকার থেকে পদত্যাগের পর যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি ফ্রাঙ্ক অ্যালন মন্তব্য করেছিলেন, ‘পেছনের সারির এমপি হিসেবে তুমি যা খুশি বলতে পারো, যেকোনো ইস্যু হাতে নিতে পারো, অজনপ্রিয় ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, সংসদ সদস্য কিংবা সাংবাদিকদের সঙ্গে মিশতে পারো—এবং হুইপরা তোমাকে স্পর্শ করতে পারে না। কিন্তু যখনই দপ্তর বা পদ পাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তোমাকে পেয়ে বসে, কেবল তখনই তুমি আর স্বাধীন থাকো না’ (কম ২০০৯: ২৯)। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ‘স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে আনুগত্য আদায়ের ক্ষেত্রে পেশাগত অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি ও সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের নীতিটি বেশ কার্যকর হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এই কৌশল উপযোগিতা হারিয়ে ফেলে। তখন নেতাদের ভিন্নমতকে সীমিত করার জন্য দলীয় শৃঙ্খলা ও সামাজিক চাপের ওপর নির্ভর করতে হয়’ (কম ২০০৯: ২১)।

দণ্ড বা জবরদস্তি

যুক্তরাজ্যের সাবেক চিফ হুইপ অ্যারেটাস অ্যাকার্স–ডগলাস তাঁর অধিকাংশ কাজ মৌখিক নির্দেশের মাধ্যমেই সম্পন্ন করতেন (আলেক্সেন্ডার ১৯৬২: xii)। দলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে ‘সহমত’ প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁরই নেওয়া পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তিনি যে পত্র পান, তার খণ্ডাংশ নিচে দেওয়া হলো:

প্রিয় অ্যাকার্স–ডগলাস,

…আশা করি, গত রাতে আমি কোনো ভুল করিনি। আমার কোনো স্বাধীনতা ছিল না; বরং আমাকে জোর করে ঘরে ঢোকানো হয়েছিল আর বলা হয়েছিল, আপনি ডেকে পাঠিয়েছেন। হথফিল্ডকে খুব মনমরা দেখাচ্ছিল।

…গতকাল ক্যাবিনেটের একটা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আমি ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন, বিরক্ত এবং ব্যক্তিগতভাবে বিব্রত। বিচ আমার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

আপনার চিরদিনের

র‌্যান্ডলফ এস সি

এই চিঠি থেকে স্পষ্ট যে দলীয় নেতৃত্বের—মানে ক্যাবিনেটের—কিছু সিদ্ধান্তে এমপি র‌্যান্ডলফ বিচলিত ছিলেন এবং তাঁকে বাগে আনার জন্য চিফ হুইপের নির্দেশে কিছু লোক জোর করে রাতের বেলায় ধরে একটা ঘরে ঢুকিয়েছিল। ঘটনাটা উনিশ শতকের শেষ দিকের। বিশ শতকের শেষের দিকেও পরিস্থিতি প্রায় একই রকম ছিল। ‘১৯৮০–এর দশকে যুক্তরাজ্যের সংসদে ডেভিড লাইটবাউন নামে একজন টোরি এমপি হুইপ হিসেবে ছিলেন। ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলো তাঁকে “দ্য টার্মিনেটর” বলে লিখত। একবার দেখা গেল, সংসদ সদস্যদের প্রবেশপথে তিনি এক ব্যক্তিকে লাথি মারছেন। ভুক্তভোগী যখন কারণ জিজ্ঞেস করলেন, তখন মি. লাইটবাউন বললেন: কারণ, তুমি একজন টোরি এমপি হয়ে ভুল দিকে যাচ্ছিলে’ (ক্রু ২০১৫: ১৩৩)।

একুশ শতকে এসেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। জেরেমি করবিন যখন লেবার পার্টি থেকে নির্বাচিত নবীন এমপি ছিলেন, তখন নিয়মিত বিদ্রোহী হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। আর দলের বিদ্রোহী এমপিদের সঙ্গে অন্য এমপিরা মাখামাখি করা বা পরামর্শ নেওয়াকে কোনো হুইপই সুনজরে দেখেন না। গত শতকের শেষ দশকেই বিদ্রোহী এমপি হিসেবে নাম কুড়ানো জেরেমি করবিনের সঙ্গে একজন নবীন এমপি চা পান করছিলেন। এটা দেখে একজন হুইপ তাঁর কাছে এসে বললেন, ‘তোমাকে যদি এই লোকের সঙ্গে আবার দেখা যায়, তাহলে তুমি শেষ!’ (ক্রু ২০১৫: ৪৪)।

করবিনের মতো বিদ্রোহী এমপিদেরও হুইপরা শৃঙ্খলায় আনতে সদা তৎপর। চিফ হুইপ হিলারি আর্মস্ট্রং (২০০১-০৬) একবার করবিনকে অফিসে ডেকে আনেন। যাওয়ামাত্রই করবিনের দিকে একটি বই ছুড়ে দিয়ে ক্রুদ্ধভাবে বলেছিলেন, এটা কী জিনিস তুমি জানো? স্বাভাবিকভাবেই, করবিন জবাবে বললেন, ‘না। এটা কী?’ তখন চিফ হুইপ বললেন, ‘এটা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার। আর এটাকে আইনে পরিণত করতে সাহায্য করার জন্য তুমি কী করছ?’ করবিনও কড়া জবাব দিলেন এবং একপর্যায়ে বললেন, ‘আপনি আমার নিয়োগকর্তা নন।’ তখন আর্মস্ট্রং জবাবে বললেন, ‘বিশ্বস্ততা অর্জন করার সামর্থ্য তোমার নেই’ (ক্রু ২০১৫: ১৩৫)।

হুইপদের সাধারণ কার্যপদ্ধতি

হুইপরা শুধু সাম, দান ও দণ্ডের নীতি প্রয়োগ করেই ক্ষান্ত থাকেন না। উন্নত গণতন্ত্রের দেশগুলোতে হুইপের কার্যালয় থেকে যেসব নির্দেশনা আইনপ্রণেতাদের দেওয়া হয়, তার কিছু উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

ক) সপ্তাহে একবার দলের সদস্যরা সংসদের আসন্ন কার্যক্রম এবং দলের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা কীভাবে প্রকাশ করতে হবে, সে বিষয়ে তথ্য পান। হুইপরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, কখন সংসদে আপনার উপস্থিতি প্রয়োজন। সব সময় শুধু ভোটে জেতার জন্যই সংসদে উপস্থিতি দরকার হয় না; কখনো ভোট এড়ানোর জন্যও উপস্থিত থাকতে হয়। হুইপ সব সময় মনে করিয়ে দেন—আপনি সংসদ সদস্য হোন আর যা–ই হোন, দলের প্রতি অনুগত থাকতে আপনি বাধ্য। কেননা দলের সমর্থনের কারণেই আপনি সংসদে আসতে পেরেছেন (ক্রু ২০১৫: ১২৮)।

সাধারণত, এক লাইনের হুইপে উল্লেখ থাকে, ‘আজ ভোট হতে পারে, আপনাকে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’ দুই লাইনের হুইপে উল্লেখ থাকে, ‘আপনাকে উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।’ আর অন্যদিকে তিন লাইনের হুইপে উল্লেখ থাকে, ‘আপনার অনুপস্থিতি কোনো ক্রমেই গ্রহণযোগ্য হবে না।’ শুধু উপস্থিত থাকলেই হবে না। প্রশ্ন করতে হবে আগে থেকে জানিয়ে, কথা বলতে হবে মেপে মেপে। কোনো মন্ত্রীকে যদি প্রশ্ন করার বাসনা থাকে, তাহলে সেই মন্ত্রীকে তা আগে থেকেই সতর্ক করতে হবে। কোনোভাবেই গণমাধ্যমে মন্ত্রীদের ছাপিয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ, দলীয় এজেন্ডাকে বাস্তবায়ন করতে মন্ত্রীদের এই প্রচার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। যদি কোনো কারণে নবীন এমপিদের জাতীয় গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার প্রদান অনিবার্য হয়ে ওঠে, তাহলে তাঁর প্রতি নির্দেশনা থাকে, তিনি যেন দলের ও নেতাদের সবকিছুকেই সমর্থন করেন, নিজের দলের সাফল্য প্রচার করেন আর প্রতিপক্ষের মূর্খতা, অযোগ্যতা ও নৈতিক অধঃপতন তুলে ধরেন (ক্রু ২০১৫: ৪৫)। এ প্রসঙ্গে অ্যালেক্স মার্ল্যান্ড মন্তব্য করেন, ‘কানাডার এমপি সাহেবদের আচরণবিধির ওপর কোনো পুস্তক যদি থাকত, তাহলে তার প্রথম পৃষ্ঠায় বড় বড় অক্ষরে একটিমাত্র বাক্য লেখা থাকত: দলীয় বার্তার বাইরে প্রকাশ্যে কিছু বলার ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করুন’ (মার্ল্যান্ড ২০২০: ৫)।

খ) একজন হুইপ সব সময়ই প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বিভিন্ন সমঝোতা করেন। তাই তাঁকে নিশ্চিত করতে হয়, তাঁর পক্ষই সংসদে প্রভাবশালী। আর স্বাভাবিকভাবেই, প্রভাবশালীদের পক্ষে মিত্র তৈরি করা সহজ; তাঁদের মাধ্যমে অন্য সদস্যদের, বিশেষ করে সম্ভাব্য দ্বিধাগ্রস্ত সদস্যদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ আরও সহজ। চিফ হুইপের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো তাঁর তথ্য। টিম রেন্টনের অভিমত হলো, কোনো পেছনের সারির এমপিকে কখনোই বুঝতে দেওয়া যাবে না যে তিনি হুইপের চেয়ে বেশি দল ও রাজনীতির খোঁজখবর জানেন। চিফ হুইপ হিসেবে তিনিই সফল হবেন, যাঁর কথাকে যেন একই সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অথচ দুর্বোধ্য মনে হয়; তিনি আসলে কতটা জানেন, তা নিয়ে যেন সাধারণ সংসদ সদস্যদের মনে সন্দেহ তৈরি হয় (রেন্টন ২০০৪: ৩২৬)।

কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা: হুইপের শাসন ছাড়াও দলীয় দুটি কাঠামোগত কারণে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া এমপি সাহেবদের জন্য কঠিন।

১. অনস্বীকার্যভাবেই, নবীন এমপিরা নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নির্বাচিত হন। তারপর জটিল সংসদীয় ব্যবস্থার মুখোমুখি হন; সঙ্গে থাকে দলীয় শৃঙ্খলার খড়্গ। এই দুইয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ‘স্বাধীন’ এমপি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার কৌশল রপ্ত করতেই বছরের পর বছর সময় লাগে। ফলে সংসদীয় চর্চার মধ্যে কোন পরিবর্তন কীভাবে আনতে হবে, তা জানার আগেই অনেকের সংসদীয় কর্মজীবন শেষ হয়ে যেতে পারে। আর যাঁরা পুনর্নির্বাচিত হন, তাঁদের সিংহভাগই প্রচলিত নিয়মকানুন আর চর্চার বেড়াজালে বন্দী হয়ে পড়েন।

২. দলের প্রতি অনুগত সাধারণ সদস্যরা সব সময়ই বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের ‘আচরণ’ নিয়ে সরব থাকেন। এর সম্ভাব্য কারণ তিনটি। প্রথমত, তাঁদের একটা অংশ গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, তাঁদের দল গরিবি দূর করবে, অর্থনীতিটা বাঁচাবে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে, জলবায়ু পরিবর্তনকে থামিয়ে দেবে কিংবা জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে দল নির্বাচিত হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করবে। দ্বিতীয়ত, আরেকটি অংশ কৌশলগত কারণে সরব থাকেন; তাঁরা বর্তমানে দলের প্রভাবশালী অংশের সঙ্গে মানিয়ে চলছেন, যাতে করে পররর্তী সময়ে তাঁরা নিজেরাই দলের মধ্যে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারেন। আবার, তৃতীয় আরেকটি অংশ কতিপয় সংসদ সদস্যের অবাধ্যতাকে মাত্রাতিরিক্ত অহংকার, খামখেয়ালিপনা কিংবা ক্ষুদ্র স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার বাসনা হিসেবেই ধরে নেন। ‘বৃহত্তর স্বার্থে’ অন্য সহকর্মীরা যখন বিবেকের চাপ, জনমতের চাপসহ সব ধরনের চাপ দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেন, তখন কেউ যদি আলস্যবশত দলের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তাহলে তাকে চরম ঔদ্ধত্য মনে করেন।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে সংসদ সদস্যরা যথেষ্ট ক্ষমতাবান হওয়ার পরও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া তাঁদের জন্য শুধু কঠিন নয়, সুকঠিন। তাঁদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় দলের অবস্থানের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু জনসমক্ষে হয় চুপ থাকেন অথবা দলীয় অবস্থানকে হাসিমুখে পুরোপুরি সমর্থন করে যান। সমালোচকেরা এই আচরণকে কখনো অগণতান্ত্রিক, কখনো ‘জুতা চাটা’ আচরণ বলে থাকেন (স্টুয়ার্ট ১৯৭১: ১৫৯)। কিন্তু রাজনীতিবিজ্ঞানের পণ্ডিতেরা একে বলেন দলীয় শৃঙ্খলা। ‘দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অন্তর্দ্বন্দ্বের নিরসন হয় এবং সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হয়। এটি রুটিন, ধারাবাহিকতা ও স্পষ্টতাকে লালন করে। তা ছাড়া অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করার জন্যও দরকার দলীয় শৃঙ্খলা। দলে শৃঙ্খলা না থাকলে সরকার গঠনে ও পরিচালনায় সমস্যা হবে; তখন দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। কানাডার অন্যতম প্রধান সংসদীয় গণতন্ত্রবিষয়ক পণ্ডিত ডেভিড ই স্মিথ যুক্তি দেন, দলীয় শৃঙ্খলাকে কেবল বিচ্ছিন্নভাবে দেখলেই অগণতান্ত্রিক মনে হয়; যখন একে একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন তেমনটি মনে হয় না’ (স্মিথ ১৯৯৯; মার্ল্যান্ড ২০২০: ৯)।

দলীয় শৃঙ্খলার আরও সুবিধা আছে। ব্যক্তি এমপির পক্ষে প্রতিটি বিষয়েই বিশেষজ্ঞের মত নিয়ে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করা কঠিন; বরং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দলীয় অবস্থানে ভোট দেওয়া অনেক বেশি সহজ। ব্যক্তি রাজনীতিবিদেরা যখন প্রয়োজন হয়, তখন তাঁদের দলের ওপর দায় চাপাতে পারেন। আবার কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পক্ষে ব্যক্তি এমপিকে প্রভাবিত করা যতটা সহজ, দলকে প্রভাবিত করা ততটা সোজা নয়। আবার কোনো আইন বা নীতি পরিবর্তনের কারণে সংশ্লিষ্ট এমপির নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের তুলনামূলকভাবে ক্ষতি হলেও একই নীতি যদি বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে বিপুলভাবে এগিয়ে নেয়, সে ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট এলাকার এমপির পক্ষে জাতীয় স্বার্থে কথা বলাটা দুষ্কর; কিন্তু দলের এবং জাতীয় উন্নয়নের দোহাই দিলে সে ব্যাপারে ব্যক্তি এমপি ক্রুদ্ধ ভোটারদের থেকে রক্ষা পেতে পারেন। সহজ কথা, দলীয় শৃঙ্খলা টিমওয়ার্ককে উৎসাহিত করে। আর সংসদীয় গণতন্ত্র টিমওয়ার্ক ছাড়া অকেজো। তাই সংসদীয় গণতন্ত্রের পরীক্ষিত পদ্ধতিতে যাঁরা সংস্কার করতে চান, তাঁদের অতি সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন পণ্ডিতেরা (স্মিথ ১৯৯৯)।

হুইপিং ব্যবস্থা দুর্বল হলে কী হতে পারে? টমাস সালফেল্ডের অভিমত হলো, বেসরকারি সদস্যের বিল কতগুলো পাস হয়, সেটা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী কতটা সক্রিয়, তা পরিমাপের একটা ভালো নির্দেশক। কোনো সংসদে বেসরকারি সদস্যের বিল যত বেশি পাস হবে, সেই সংসদে বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠী তত বেশি সক্রিয়। আবার সংসদে হুইপদের তদারকি যত শিথিল, বেসরকারি সদস্যের বিল পাস হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি; অন্যদিকে হুইপদের তদারকি শক্তিশালী হলে বেসরকারি সদস্যের বিলের আইনে পরিণত হওয়ার হারও সাধারণভাবে কমে (সালফেল্ড ১৯৯৫: ৫৬১)।

বাংলাদেশে হুইপিং ব্যবস্থা কেমন

শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক যখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন সরকারদলীয় চিফ হুইপ ছিলেন খাজা সাহাবুদ্দিন। তিনিই আবার ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় পরিষদের চিফ হুইপের দায়িত্ব পান। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত চিফ হুইপ হিসেবে ছিলেন সরদার আমিন আজম খান। সে সময় সরকারের অস্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে যুক্তি দেওয়া হয়। পাকিস্তান আমলে হুইপরা কোনো ভূমিকাই যে রাখতে পারেননি, তার প্রমাণ আমরা পাই অনবরত সরকার পরিবর্তনে। স্বাধীন বাংলাদেশে চিফ হুইপ মন্ত্রীর এবং অন্য হুইপরা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করেন। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করেন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন (১৯৭৩-১৯৭৫)।

তাঁর পরে ক্ষমতাসীন দলের চিফ হুইপ ছিলেন যথাক্রমে আবুল হাসনাত, টি আই এম ফজলে রাব্বী চৌধুরী, এম এ সাত্তার, খন্দকার দেলোয়ার হোসেন, আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, মোহাম্মদ আবদুস শহীদ, এ এস এম ফিরোজ এবং নূর-ই-ইলাহী চৌধুরী। নবম সংসদে হুইপ ছিলেন পাঁচজন, দশম সংসদে ছয়জন এবং একাদশ সংসদে পাঁচজন। বাংলাদেশে হুইপদের মধ্যে সবচেয়ে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ছিল শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করার পর দল বদল করে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। জাতীয় পার্টির টিকিটে আবার সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং উপপ্রধানমন্ত্রী হন। জাতীয় পার্টি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি আবার দল পরিবর্তন করে বিএনপিতে যোগ দেন এবং দলের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আবার তিনি যে দলের চিফ হুইপ ছিলেন, সেই সরকারপ্রধানের হত্যা মামলার অন্যতম আসামিও তিনি ছিলেন। অন্য আটজন চিফ হুইপের মধ্যে দুজন—আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ ও নূরে আলম চৌধুরী—ছিলেন তৎকালীন সরকারপ্রধানের আত্মীয়। তাঁদের মধ্যে চিফ হুইপ হিসেবে দলীয় নেতৃত্বের প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন খন্দকার দেলোয়ার হোসেন। আবার বিএনপির মনোনীত একজন হুইপ আশরাফ হোসেন নিজেই নিজেদের সরকারের সমালোচনায় লিপ্ত ছিলেন (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫) এবং শেষ পর্যন্ত দল থেকে বহিষ্কৃতও হয়েছিলেন (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫)।

বাংলাদেশে দলব্যবস্থা এবং দলীয় শৃঙ্খলা এখনো যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি, তার অন্যতম উদাহরণ হলেন শাহ মোয়াজ্জেম ও আশরাফ হোসেনের মতো হুইপরা। যেখানে হুইপিং ব্যবস্থাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি, সেখানে এমপি সাহেবরা যদি অধিকতর স্বাধীনতা লাভের সুযোগ পান, তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও সরকারে ইতিবাচক বা নেতিবাচকভাবে পড়বে। নিজাম আহমেদ তাঁর বইয়ে একটি উদাহরণ দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে একবার মাত্র একটি সরকারি সদস্যের বিলের—যেটি আইনমন্ত্রী নিজে সংসদে উপস্থাপন করেছিলেন—বিরোধিতা করেছিলেন। কারণ ছিল, এমপিদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধাদি রাখা হয়নি (আহমেদ ২০০২)। চিফ হুইপ ফিরোজের সঙ্গে দশম সংসদে আরও পাঁচজন হুইপ ছিলেন (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫)। একাদশ ও দ্বাদশ সংসদে নূরে আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভ্রাতুষ্পুত্র) চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একাদশ সংসদে হুইপ ছিলেন ছয়জন (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫)।

দ্বাদশ সংসদে সাবেক ক্রিকেটার মাশরাফিসহ মোট পাঁচজন হুইপ ছিলেন (সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫)। কিন্তু গত দশকগুলোতে হুইপের কার্যালয় সংসদের ভেতরে বা বাইরে আইনপ্রণেতাদের বাক ও আচরণের ব্যাপারে কোনো রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন বলে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২১ সালে মুরাদ হাসান নামের এক সরকারদলীয় সংসদ সদস্য একজন চলচ্চিত্র অভিনেত্রীকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অশ্লীল ভাষায় হুমকি প্রদান করেছিলেন; কিন্তু হুইপরা এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা জানা যায়নি; তবে দল হিসেবে তৎকালীন শাসক দল আওয়ামী লীগ তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল (সমীর ২০২১)। ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে মো. নূরুল ইসলাম এবং আরও পাঁচজন হুইপ নির্বাচিত হন।

২০২৬ সালে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর জামায়াত-এনসিপি জোট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করে। নির্বাচনের পরপরই বিরোধী দলের হুইপ হিসেবে এনসিপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলামকে মনোনীত করা হয় (অনামা ২০২৬)। যেখানে নাহিদ ইসলামের দল থেকে মাত্র ছয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আর জামায়াতে ইসলামী দল থেকে ৬৮ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, সেখানে বিরোধীদলীয় জোট থেকে নাহিদ ইসলামকে চিফ হুইপ হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ছয়জন সদস্যের দল থেকে নির্বাচিত চিফ হুইপ কীভাবে সম্পূর্ণ অন্য একটি রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করবেন, তা কল্পনা করাও মুশকিল। সম্ভবত, দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য নয়; বরং বিরোধী দলের চিফ হুইপের যে সরকারি সুবিধা, তার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতেই ছোট দলের নেতাকে চিফ হুইপ হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ দুটি উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশে হুইপিং ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এখনো বহুদূরের পথ।

উপসংহার

অনুন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, যেখানে দলব্যবস্থা ও দলীয় শৃঙ্খলা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি, সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য আইনপ্রণেতারা যেনো ইচ্ছেমতো দল ত্যাগ করতে না পারেন, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য যেন নির্বাচনী এজেন্ডাকে ভূলুণ্ঠিত না করেন, সে জন্য তাদের দলত্যাগ নিরোধী আইন একটি অতি পরিচিত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটলেই যে দল থেকে নির্বাচিত সাধারণ আইনপ্রণেতারা প্রাণ খুলে সরকারের সমালোচনা করতে শুরু করবেন, এমন আশা দুরাশা। এমন ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটলে যে সংসদের বেসরকারি সদস্যরা আইন প্রণয়নে সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দেবেন, সে সম্ভাবনা যে কম, তা আমরা উন্নত গণতন্ত্রের দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি। কারণ, সংসদ ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিন্যস্ত করা হয়েছে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই। সর্বোপরি, হুইপদের কার্যক্রমের কারণেও আইনপ্রণেতারা বাক, আচরণ ও ভোটাধিকার প্রয়োগে দলীয় শৃঙ্খলার প্রতি প্রকাশ্যে আনুগত্য প্রদর্শন করে থাকেন। সবশেষে বলি, ত্রয়োদশ সংসদ চাইলে ৭০ অনুচ্ছেদ সংবিধান থেকে ছেঁটে ফেলে দিতে পারে বা পরিবর্তন করতে পারে; কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের ভোটে দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন হবে, এমন আশা পেশাদার রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা করেন না।

রচনাপঞ্জি

অনামা ১৯৬৯।। ‘Political Parties Act to Continue, says Zafar’, Dawn, March 8।

অনামা ২০১৫।।  ‘Just 14 private member’s bills have passed by Parliament till date; the last was in 1979’, 25 April, Times of India, https://timesofindia.indiatimes.com/india/Just-14-private-members-bills-passed-by-Parliament-till-date-the-last-was-in-1970/articleshow/47046338.cms , প্রবেশ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫।

অনামা ২০১৯।। ‘All India Postpoll NES 2019-Survey Findings’, Lokniti, https://www.lokniti.org/media/PDF-upload/1579771857_30685900_download_report.pdf, প্রবেশ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫।

 অনামা ২০২৫।। ‘ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা: ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন প্রশ্নে কাছাকাছি অবস্থানে দলগুলো’, প্রথম আলো, ৪ জুন। https://www.prothomalo.com/bangladesh/vgoqdxu3yo , প্রবেশ – ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫।  

অনামা ২০২৬।। ‘বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর, উপনেতা তাহের, চিফ হুইপ নাহিদ’, প্রথম আলো, ১৭ ফেব্রুয়ারি। https://www.prothomalo.com/politics/w2yhndqa3v, প্রবেশ ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫।

আলেক্সেন্ডার ১৯৬২।। Eric Alexander, Chief Whip: The Political Life and Times of Aretas Akers-Douglas, Toronto: University of Toronto Press।

আহমেদ ১৯৯১।। Maudud Ahmed, Era of Sheikh Mujibur Rahman, Dhaka: University Press Limited।

আহমেদ ২০০২।। Nizam Ahmed, The Parliament of Bangladesh, London: Routledge।

এএনইএস।। American National Election Studies, ‘the anes guide to public opinion and electoral behavior’, https://electionstudies.org/data-tools/anes-guide/anes-guide.html?chart=split_vs_straight_ticket_vote, প্রবেশ – ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫।

ওয়ালশ ২০০২।। Rob Walsh, ‘By the Numbers: A Statistical Survey of Private Member’s Bill’, Canadian Parliamentary Review, pp. 29-33 https://lop.parl.ca/sites/ParlInfo/default/en_CA/legislation/privateMembersBills , প্রবেশ – ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫।  

কশ্যপ ১৯৯৩।। Subhash C Kashyap, Anti-defection Law and Parliamentary Privileges, New Delhi: Universal Law Publishing Co।

কম ২০০৯।। Christopher J Kam, Party Discipline and Parliamentary Politics, New York: Cambridge University Press।  

কামরান ২০২৫।। কামরান রেজা চৌধুরী, ‘৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করলে হিতে বিপরীত হবে না তো?’, প্রথম আলো, ৪ জানুয়ারি, https://www.prothomalo.com/opinion/column/rzi420dpqq , প্রবেশ – ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

ক্যামেরন ও অন্যান্য ২০২২।। Sarah Cameron, Ian McAllister, Simon Jackman, Jill Sheppard, ‘The 2022 Australian Federal Election: Results from the Australian Election Study’, Australian National University ।  

ক্রু ২০১৫।। Emma Crewe, The House of Commons: An Anthropology of MPs at Work, London: Bloomsbury।

খান ২০০৬।। Mahammad Mohabbat Khan, Dominant Executive and Dormant Legislature: Executive Legislative Relations in Bangladesh, Dhaka: AH Development Publishing House।    

গ্ল্যাডস্টোন ১৯২৭।। Viscount Gladstone, ‘The Chief Whip in the British Parliament’, American Political Science Review, vol. 21, no. 3, pp. 519-528।

জান্ডা ২০০৯।। Kenneth Janda, ‘Law Against Party Switching, Defecting, or Floor-Crossing in National Parliaments, The Legal Regulation of Political Parties’, Working Paper 2, pp. 12-16।  

জালাল ও সাব্বীর ২০২৩।। জালাল ফিরোজ ও সাব্বীর আহমেদ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ: পক্ষে বিপক্ষে,  জালাল ফিরোজ ও সাব্বীর আহমেদ সম্পাদিত, ঢাকা: সেন্টার ফর পার্লামেন্টারি স্টাডিজ। 

নিকোলেনি ২০২১।। Gsaba Nikolenyi, ‘Government termination and anti-defection laws in parliamentary democracies’, West European Politics, vol. 45, no. 3, pp. 183-207 DOI: https://doi.org/10.1080/01402382.2021.1880719 প্রবেশ – ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫।

নুনেজ ২০২১।। Lucas Núñez, ‘The effects of local campaigning in Great Britain’, Electoral Studies, vol. 73, p. 102384। 

মনসুর ১৯৭২।। আবুল মনসুর আহমদ, ‘আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য রক্ষিত হউক’, ইত্তেফাক, ২২ অক্টোবর।

মালহোত্রা ২০০৫।। G C Malhotra, Anti-Defection Law in India and the Commonwealth, New Delhi: Metropolitan Book Co.।  

মার্সন ও হেলার ২০০৩।। Carol Mershon and William B. Heller, ‘Party Switching and Political Careers in the Spanish Congress of Deputies, 1982-1996’, Annual Meetings of the Midwest Political Science Association, Palmer House Hilton, Chicago, 3-6। 

মার্ল্যান্ড ২০২০।। Alex Marland, Whipped: Party Discipline in Canada, Vancouver: UBC Press।  

মেইনকি ২০১৬।। Scott R. Meinke, Leadership Organizations in the House of Representatives: Party Participation and Partisan Politics, Ann Arbor: University of Michigan Press।  

মেজর ১৯৯৯।। John Major, John Major: Autobiography, New York: HarperCollins।  

রেন্টন ২০০৪।। Tim Renton, Chief Whip: People, Power and Patronage in Westminster, London: Politico’s।

সংবিধান সংস্কার কমিশন ২০২৫।। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন, প্রথম খণ্ড, ঢাকা।

সমীর ২০২১।। সমীর কুমার দে, ‘দলের পদও হারালেন ডা. মুরাদ, তৎপর র‌্যাব-পুলিশ, ৭ ডিসেম্বর, ডিডব্লিও, https://www.dw.com/bn/a-60045568 প্রবেশ – ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫। 

সালফেল্ড ১৯৯৫।। Thomas Saalfeld, ‘On Dogs and Whips: Recorded Votes’ in Herber Doring ed. Parliament and Majority Rule in Western Europe, Campus Verlag: Saint Martin’s Press।

সিএসডিএস ২০১৯।। Centre for the Study of Developing Societies, All India National Postpoll NES 2019-Survey Findings, https://lokniti.org/national-election-studies ।   

স্টুয়ার্ট ১৯৭১।। Walter Stewart, Trudeau in Power, New York: Outerbridge and Dienstfrey।

স্টিভেনস ও অন্যান্য ২০১৯।। Benjamin Allen Stevens, Md Mujahedul Islam, Roosmarijn de Geus, Jonah Goldberg, John R. McAndrews, Alex Mierke-Zatwarnicki, Peter John Loewen2 and Daniel Rubenson, ‘Local Candidate Effects in Canadian Elections’, Canadian Journal of Political Science, 52, no 1, pp. 83–96।

স্পাইস ও পেহ্ল ২০০৪।। Clements Spiess and Malte Pehl, ‘Floor Crossing and Nascent Democracies–a Neglected Aspect of Electoral Systems? The Current South African Debate in the Light of the Indian Experience’, Law and Politics in Africa, Asia and Latin America, vol. 37, no. 2, pp. 195-224।

স্মিথ ১৯৯৯।। Jennifer Smith, ‘Democracy and the Canadian House of Commons at the millennium’, Canadian Public Administration, vol. 42, no. 4, pp. 398-421। 

স্ল্যাপিন ও অন্যান্য ২০১৮।। Jonathan B Slapin, Justin H Kirkland, Joseph A Lazzaro, Patrick A Leslie, Tom O’Grady, ‘Ideology, Grandstanding, and Strategic Party Disloyalty in the British Parliament’, American Political Science Review, Vol. 112, No. 1, pp. 15-30।

লেখক পরিচিতি

মামুন আল মোস্তফা একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারত। পাশাপাশি বেসরকারি গবেষণা-প্রতিষ্ঠান নীতিবীক্ষণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষাগ্রহণ করেছেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি আইডিয়ালাইজড ইসলামিক পাস্ট এবং লালনের রাজনীতি নামের বইয়ের রচয়িতা। তাঁর পঞ্চাশোর্ধ গবেষণা-প্রবন্ধ বিভিন্ন গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করতে ও গবেষণা শেখাতে তিনি ভালবাসেন।

About Editor Todaynews24

Check Also

সামনে–পেছনে পুলিশ দাঁড়ায় থাকে, সবাই নাটক দেখে: সারজিস আলম

সামনে–পেছনে পুলিশ দাঁড়ায় থাকে, সবাই নাটক দেখে: সারজিস আলম

সারজিস আলমকে বহনকারী গাড়ি সিলেটের দিকে চলে যেতে দেখা যায়। পরে সিলেট সা‌র্কিট হাউসে ফিরে সারজিস আলম বলেন, ‘ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা এই হামলা চা‌লিয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *