সর্বশেষ খবর
Home / সকল আপডেট / শতদল: একটি সাহিত্যপত্রের মৃত্যু, নাকি ঐতিহ্যের অবসান
শতদল: একটি সাহিত্যপত্রের মৃত্যু, নাকি ঐতিহ্যের অবসান

শতদল: একটি সাহিত্যপত্রের মৃত্যু, নাকি ঐতিহ্যের অবসান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিককার শিক্ষার্থীদের সাহিত্যচর্চার ধরন কী রকম ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তখনকার প্রকাশিত বার্ষিকীগুলোতে। যে কয়টি বার্ষিক সাহিত্য পত্রিকায় তখনকার ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের সাহিত্যসাধনা করতেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ঢাকা হল থেকে প্রকাশিত ‘শতদল’ বার্ষিকী। এ ছাড়া জগন্নাথ হল থেকে প্রকাশিত ‘বাসন্তীকা’ আর ছাত্রীদের পক্ষে থেকে প্রকাশিত হতো ‘সুপর্ণা’। এই বার্ষিকীগুলো সাধারণত নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি দ্বারাই সম্পাদনা করা হতো।

আবার ঢাকাকেন্দ্রিক মুসলিম সাহিত্যসমাজের পক্ষে ‘শিখা’ নামের যে বার্ষিকী বের হতো, তার মধ্যেও তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল মুসলিম অধ্যাপক ও ছাত্রদের লেখা স্থান পেত।

বিভিন্ন হল থেকে প্রকাশিত এই বার্ষিকীগুলো প্রথম প্রবর্তন করেন ডক্টর নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, জগন্নাথ হলের প্রথম প্রভোস্ট। তারই ধারাবাহিকতায় অন্য হলগুলোও বার্ষিকী বের করা শুরু করে।

বর্ষানুক্রমিক সম্পাদকদের তালিকা

শতদল
‘শতদল’ ছিল ঢাকা হল ছাত্রদের সাহিত্যানুশীলনের পরিচয়পত্র। যার মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের চিন্তা পরিসর ও সাহিত্যসাধনার পরিচয় দিত। এটি ছিল তাঁদের চিন্তার ও দূরদৃষ্টির মুখপাত্র। যত দূর জানা যায়, ‘শতদল’ পূর্ব বাংলার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারা প্রকাশিত প্রথম সাহিত্যিক বার্ষিকী। শতদলের জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি ছিল যে প্রতিবছর শুধু শতদলের সম্পাদক পদেই আলাদা নির্বাচন হতো। ‘শতদল’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে। তবে এখন পর্যন্ত বার্ষিকীটির মোট বিশটা সংখ্যার তথ্য পাওয়া গেছে। যার মধ্যে কেবল পাঁচটি সংখ্যার মূল কপি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। বাকিগুলো হারিয়ে গেছে। ১৯৩৭–এর শতদলের ১৫তম সংখ্যায় ‘শতদলের আদিকথা ও ইতিপর্ব’ নামের একটা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়; সেখান থেকে এর ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা জানা যায়। তবে সেই প্রবন্ধ লেখকের নাম উল্লেখ ছিল না। প্রবন্ধটা উদ্ধৃতি করছি—

শতদলের আদিকথা ও ইতিপর্ব

‘স্মরণ করিবার ও করাইবার মত কিছু না হইলেও শতদলের আদি কথার একটু আলোচনা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। আমাদের ছাত্রাবাস পুরাতন ঢাকা কলেজেরই কক্ষচ্যুত বিদ্যায়তন। ঢাকা কলেজের সংস্পর্শ হইতে বিযুক্ত হইয়া কিরুপে আমাদের ছাত্র সহযোগিতা গড়িয়া উঠিয়াছিল তাহার স্মৃতিও বিলুপ্ত হইতে চলিয়াছে। কাহার উদ্দীপনায় প্রথম ছাত্র সমিতি গঠিত হয় এবং তাহাদের মুখপত্র প্রকাশিত হয়, তাহাও একপ্রকার অজ্ঞাত। তবু একথা জানিতে পারা যায় যে উহা ১৩৩০ সালে সর্বপ্রথম Lotus নামে ইংরেজী ও বাংলায় দ্বিভাষিক রূপে প্রকাশিত হইয়াছিল। Lotus নাম অধ্যাপক জি.এইচ. ল্যাংলী কর্তৃক প্রদত্ত হইয়াছিলো বলিয়া শুনিয়াছি।

১৯৩৯ সালের শতদলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উদ্ভোধন’ কবিতা

‘দ্বিতীয় বৎসরই ইহার যে রূপান্তর ঘটিল তাহা বাস্তবিকই চিত্তাকর্ষক। হঠাৎ সে বৎসরই ইহা সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায়ই “শতদল” নামে প্রকাশিত হয়। কিন্তু তখন এই পরিবর্তনের নিমিত্ত যে প্রতিবাদের সৃষ্টি হইয়াছিল তাহা লিপিবদ্ধ হয় নাই সত্য, কিন্তু ইহার কৈফিয়ৎ স্বরূপ সম্পাদক বলিয়াছিলেন,
ইংরেজী রাজার ভাষা; এ ভাষা শিখিতে হয় এবং শিক্ষার অনেক প্রয়োজনও আছে। কিন্তু সাহিত্য চর্চা ঠিক ইংরেজীর সাহায্যে হইয়া উঠে না।

‘এই পদ্ধতি প্রবর্তন আমাদের পক্ষে কতদূর মঙ্গলজনক হইয়াছে তাহা আজ উপলব্ধি করিতে পারিতেছি। কারণ, ইংরেজীতে লেখা ও সাহিত্যালোচনা অসাফল্যের আবরণে কতটুকু হাস্যাস্পদ হইয়া দাঁড়ায় তাহার বড় দৃষ্টান্ত প্রতিনিয়তই দেখিতেছি। এই সংখ্যায় তৎকালীন প্রভোস্ট মিঃ ওয়াল্টার এলান জেনকিন্স এই আসফাক্যের কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া ছোট একটি প্রবন্ধ বাংলায় লিখিয়াছিলেন—
যেদিন আমি শুনিলাম যে, এই বৎসর হইতে আমাদের হলের পত্রিকায় শুধু বাংলায় প্রবন্ধ ও অন্যান্য লেখা প্রকাশিত হইবে, তহাতে প্রথমে আমি দুঃখিত হইয়াছিলাম। কিন্তু এ বিষয়ে চিন্তা করিয়া দেখিলাম যে ইহাই যেন ভাল। যাঁহারা ইংরেজীতে প্রবন্ধ লিখিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাগাজিনে তাহা প্রকাশ করিতে পারিবেন। বিদেশী ভাষায় প্রবন্ধ লেখা অবশ্য ভাল বই মন্দ নয়। মনের ভাব প্রকাশ করিবার জন্য বিদেশী ভাষা একপক্ষে মাতৃভাষার অপেক্ষা অধিকতর উপযোগী। যখন আমরা মাতৃভাষায় প্রবন্ধ লিখি, তখন সময় সময় আমরা ধীরে ভাবে বিবেচনা না করিয়া যেন কতকটা আত্মহারা হইয়া হয় মিথ্যা কিংবা আংশিক সত্য ভাব প্রকাশ করি। আমার মনে হয়, বিদেশী ভাষায় লিখিলে সত্য ভাব আপন হইতে প্রকাশিত হয়। আবার স্পষ্ট করিয়া ভাব ব্যক্ত করিবার জন্য মাতৃভাষাই সর্বাপেক্ষা উপযোগী। এখন হইতে আমাদের ঢাকা হলের ছাত্রবৃন্দ তাহাদের মনোভাব ও চিন্তাশক্তির সম্যক বিকাশের উদ্দেশ্যে তাহাদের নিজের ভাষায় হল পত্রিকায় তাহাদের প্রবন্ধ প্রকাশ করিতে পারিবে। এজন্য আমি বিশেষ আনন্দিত এবং এ কার্য্যে তাহাদের সম্পূর্ণ সাফল্য কামনা করি।”’

রবীন্দ্রনাথ ও শতদল
এর পরের বছরই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় আসেন। ওই বছরের শতদলে রবীন্দ্রনাথের ঢাকায় অবস্থানকালীন সমুদয় ঘটনা লিপিবদ্ধ করা হয়। সপ্তম বর্ষে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ‘প্রার্থনার আবশ্যকতা’ নামের একটি প্রবন্ধ দিয়েছিলেন। এরপর ১৭তম সংখ্যায় তিনি ‘উদ্বোধন’ নামের আরেকটি কবিতা দিয়েছিলেন শতদলে। এ ছাড়া অধ্যাপক চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘রবীন্দ্র সাহিত্যের জীবনী ও বাণী’ নামক একটি তত্ত্ব ও তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের এই দুইটা লেখা এখন পর্যন্ত শতদল ছাড়া আর কোথাও ছাপানো হয়নি।

প্রার্থনার আবশ্যকতা—

“যে মানুষ চায় না, তাকে কেউ কিছু দিতে পারে না, দিলে দান বিফল হয়। চাওয়া এবং দেওয়া একটি চক্র, পরস্পরের যোগে পরস্পর সম্পূর্ণ। তুমি তোমার ছাত্রের কল্যাণার্থী, একান্ত মনে চাও যে তার শিক্ষা সার্থক হয়। কিন্তু তোমার ইচ্ছার পথ বন্ধ, সে যদি না চায়। আমাদের দেশে গুরুভক্তি অর্থই তাই, গুরুর নিজের জন্য ভক্তির প্রয়োজন নেই, কিন্তু তাঁর দানক্রিয়ার জন্য তার প্রয়োজন আছে—ভক্তি দ্বারা গুরুর কাছে ছাত্র আপন দাবীকে সত্য করে—তখন গুরুর কল্যাণ-ইচ্ছার বাধা দূর হয়। পাওয়ার জন্যই পাওয়ার বাধার মূল্য আছে। বাধা দূর করতে গিয়ে পাওয়ার শক্তি সচেষ্ট হয়ে ওঠে। তীর্থে পৌঁছানোর সার্থকতা তীর্থে যাত্রার কৃচ্ছ তার দ্বারাই পরিপূর্ণ। দেবতাকে না পাওয়াটাই দেবতাকে পাওয়ার ভূমিকা, মাঝে থাকে প্রার্থনা। যেটাকে পেয়েই আছি, সেটাকে আমরা সবচেয়ে কম পাই। এইজন্য ভগবান যদি চ নিজেকে দিয়েই রেখেছেন—তবু চেয়ে পাওয়ার দুঃখের ভিতর দিয়ে পাওয়ার আনন্দকে প্রগাঢ় করতে হবে। বস্তুত তাঁকে না পাওয়াটাই মায়া, এটে লীলা—যিনি আছেন তিনিই সেই হয়ে খেলা করেন, যিনি দিয়েছেন তিনি দেননি বলে ফাঁকি দেন। বাহ্য বিষয়েও তাই; জ্ঞানের বিষয়েও তাই, চাষ করে মানুষ অল্প পেয়েছে বলে তার সেই পাওয়া পশুর পাওয়ার চেয়ে বড়ো। পশুর জ্ঞান সহজবোধের সীমার বাইরে বেশি দূরে যায় না, মানুষের জ্ঞান সাধনা-সাধ্য জ্ঞান। সে জ্ঞান যেহেতু অসাধ্য নয় সেহেতু যেটা পেয়েছি, যেহেতু সাধনার অপেক্ষী সেই হেতু সেটা পাইনি। এই না পাওয়ার বাধার ভিতর দিয়ে মানুষের পাওয়ার গৌরব। ভগবানকে পাওয়া সম্বন্ধেও সেই একই কথা—তাকে পাওয়ার সাধনার দ্বারাই পাওয়ার যোগ্যতা গৌরবে মানুষ বড়ো হয়ে ওঠে। বড়ো না হয়ে উঠে কেউ বড়োকে পেতে পারে না। আঙ্গুলির মধ্যে সরোবরের জল তুলে নিতে পারো না। আকাশ থেকে ধারা বর্ষণ হচ্ছে জলাশয় তৈরী করা অর্থাৎ আকাশের জলকে নিজের বিশেষ চেষ্টার দ্বারা নিজের জল করে নেয়া। প্রার্থনার দ্বারাই অন্তরের মধ্যে জলাশয়কে বড়ো করা, গভীর করা হয়।

১৯৪০ সালের শতদলের কাভার

প্রার্থনা অনেক শ্রেণীর আছে। ধন প্রার্থনা, মান প্রার্থনা, বিদ্যা প্রার্থনা, পরীক্ষায় পাশ করার প্রার্থনা। এ সমস্ত প্রার্থনার ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি—বিশ্বব্যাপারের নিয়মের সঙ্গে নিজের যথার্থ ইচ্ছার ঘোষণার দ্বারাই এরা সফল হয়। অর্থাৎ বিশ্বশক্তির সঙ্গে আত্মশক্তির মিলন ঘটানো আবশ্যক। পর্বত লঙ্ঘন করতে চাও, ঠিক পথে শক্তি প্রয়োগ করো। কিন্তু স্বয়ং ভগবানকে প্রার্থনা—প্রেমকে প্রেমের দ্বারাই চাওয়া। মানবসংসারেই হোক আর অধ্যাত্মলোকেই হোক প্রেমের আত্মপ্রকাশ প্রার্থনাতে—সে প্রার্থনা সাজে সজ্জায় মিষ্টবাক্যে মিষ্ট ব্যবহারে সাধ্যসাধনায় অর্থাৎ আত্মত্যাগে। ভগবানের কাছেও আমাদের প্রার্থনা শুধু বাক্যে নয়, ত্যাগে কল্যাণে সে প্রার্থনা সার্থক। যাকে ভালোবাসি তাকে ফাঁকি দেই যে কেননা সে স্থলে ফাঁকি দেওয়া নিজেকেই বিড়ম্বিত করে—ভগবানকে যদি ভালোবাসি তবে শুধু কথায় তাকে ফাঁকি দিতে ইচ্ছেই হবে না, স্বভাবতই সত্যকার ত্যাগের দ্বারা তাঁকে প্রার্থনা করি। যদি বলো তাঁকে না ভালোবেসে তাঁর ভালোবাসা পাওয়া যাবে—সে তো পারবেই; নিমেষে নিমেষে নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে তোমার অস্তিত্বের মধ্যেই তাঁর ভালোবাসা—কিন্তু সে পাওয়াকে নিজের দেওয়ার দ্বারা তুমি আপন করে নিতে পারলে না বলেই সে পেয়েও না পাওয়া। প্রেমের প্রার্থনার দ্বারা ভগবানের প্রেমকে আপন করা হয়; সেই আপন করাই ভগবানকে পাওয়া।”

১৯৪০ সালের শতদলে সতেন্দ্রনাথ বসুর লেখা ভূমিকা

সাহিত্যিক মান
শতদলের যে কয়েকটি সংখ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে, সেগুলোর লেখা পর্যালোচনা করলেই বোঝার বাকি থাকে না যে এর সাহিত্যিক মান কতটা উন্নত ছিল। প্রকাশের দুই বছরের মধ্যেই ‘শতদল’ একটা সম্পূর্ণ সাহিত্যিক পত্রিকায় পরিণত হয়। পাঠকদের শুধুমাত্র বিনোদনের উপাদান না হয়ে চিন্তার গভীরতা ও আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

শতদলের ১৯৩৯–এর ১৭তম সংখ্যাটা বাকিদের থেকে একটু অনন্য। কারণ, এই একটা সংখ্যায় জগদ্বিখ্যাত বেশ কয়েকজনের লেখনী আছে। আগেই বলেছি রবীন্দ্রনাথ ‘উদ্ভোধন’ নামের একটা কবিতা দিয়েছিলেন, যেটা এই সংখ্যায় ছাপানো হয়। একই পত্রিকায় অধ্যাপক মোহিতলাল মজুমদার ‘সাহিত্য বিচার’ নামের একটি প্রবন্ধ লেখেন। আবার এই সংখ্যারই ভূমিকা লিখেছিলেন বিজ্ঞান আচার্য সতেন্দ্রনাথ বোস। কিংবদন্তি অর্থনীতিবিদ অমিয় দাসগুপ্ত ‘সংগ্রাম ও অর্থনীতি’ নামে একটি প্রবন্ধ দিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে একই পত্রিকায় জগদ্বিখ্যাত এসব মনীষার দেখা মেলা বেশ ভাগ্যেরও ব্যাপার।

শতদলের ১৮ সংখ্যায় শ্রীকিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত নামের এক ছাত্র লেখেন ‘বাংলা গদ্য ও প্রমথ চৌধুরী’। প্রবন্ধে সে প্রমথবাবুর লেখার নানান দিক তুলে ধরেছেন। প্রমথ চৌধুরী এবং তাঁর সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ পত্রিকা বাংলা সাহিত্যের গদ্যরীতিতে কথ্যভাষার যে নতুন ধারা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন, লেখক তাঁর প্রবন্ধে সেটা দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

এ ছাড়া গল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, সনেট, সাহিত্য সমালোচনা, সায়েন্স ফিকশন থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ—সব বিষয়েই লেখা থাকত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে শ্রী রবীন্দ্রনাথ পাল নামের এক শিক্ষার্থী ‘জাতীয়তাবাদের পরিণতি’ নামের একটি প্রবন্ধে লিখেছেন—
‘মতবাদের হিসেবে জাতীয়তাবাদের স্থান যে খুব উচ্চে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই মতবাদের বাস্তব যে পরিণতি ঘটিয়াছে, তাহা খুবই ভয়াবহ ও কুফলপ্রদায়ক। জাতীয়তাবাদ জাতির স্বদেশবাৎসল্য যতটুকু বাড়াইয়াছে জাতির ত্যাগ সেই পরিমাণ কমাইয়াছে।
জাতিগুলির ত্যাগ এবং একতা ছাড়া মঙ্গল বা শান্তির আর কোন উপায় নাই। যদি আমরা সমস্ত জগতের ও মানবজাতির কল্যাণের জন্য তৎপর হই, তবে স্বদেশ কল্যাণ এই সঙ্গেই হইয়া যাবে। The day may be close at hand when we shall no longer tear out the hearts of man even for the sake of national gods. সমস্ত জাতির স্বার্থ ভুলিয়া গিয়া পৃথিবীর লোক একতাবদ্ধ হইতে পারিলেই সকল দেশেরই কল্যাণ হইবে।’

তাঁর এই প্রবন্ধের প্রতিটা লাইন এক শ বছর পরের পৃথিবীতেও সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক। এরপর পঞ্চম বৎসরের পত্রিকাটা অনেক বিষয়ে উল্লেখযোগ্য। এ সংখ্যায় চাকচিক্যময় গল্প প্রবন্ধের পাশাপাশি কতগুলো হাস্যরসাত্মক গল্প ও লেখা বের হয়। যেমন ‘ঢাকশীলা’ নামক বৌদ্ধ জাতকের অনুসরণে লিখিত গল্পটি ও ষষ্ঠ বছরের ‘ছাত্রের ডায়েরি’ শীর্ষক গল্পটি উল্লেখযোগ্য। যদিও এই সংখ্যাগুলো এখন হারিয়ে গিয়েছে; তবে ‘আমাদের সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ নামক স্মৃতিগ্রন্থ থেকে কিছুটা জানা যায়।

১৯৪৪ সালের শতদলে সতেন্দ্রনাথ বসুর লেখা ভূমিকা

পুনর্জাগরণের প্রত্যাশা
ঢাকা হল বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল। সায়েন্সের শিক্ষার্থী হয়েও ল্যাবরেটরি আর টেক্সটবুকের গণ্ডির মধ্যে আটকে না থেকে সাহিত্যের বিচিত্র জগতে তাঁদের পদচারণ ছিল।

কিন্তু এখনকার বাস্তবতা?
বাস্তবতা হলো ‘শতদল’ এখন আর প্রকাশিত হয় না। ২০১৯–এ দায়সারাভাবে একটা সংখ্যা বের করা হয়েছিল। সর্বশেষ হুমায়ূন আহমেদ, হলের আবাসিক শিক্ষক থাকাকালীন এর শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯০–এ। বিগত ৩৬ বছরে শতদলের তেমন কোনো সংখ্যা আর প্রকাশিত হয়নি, যা এর পুরোনো ঐতিহ্য বহন করে। এই দীর্ঘ নীরবতা গভীরভাবে দুঃখজনক। এটা শুধু একটি পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, বরং সাহিত্যিক উৎকর্ষ, সৃজনশীল চিন্তা ও প্রগতিশীল চেতনার এক অসাধারণ ঐতিহ্যকে ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেওয়া।

শতদলকে তার হারানো ঐতিহ্য ও গৌরবসহ পুনরুজ্জীবিত করা উচিত। এই ঐতিহাসিক প্রকাশনাটির পুনর্জাগরণ কেবল একটি বার্ষিক সাহিত্যপত্র ফিরিয়ে আনার বিষয় নয়; বরং এটি হবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা, মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের সংস্কৃতিকে পুনরায় জাগিয়ে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি আবারও এমন একটি মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের চিন্তা, সাহিত্যিক প্রতিভা ও সামাজিক চেতনাকে একাডেমিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে প্রকাশ করতে পারবে।

আশা করি, শতদল তার পুরোনো গৌরব নিয়ে আবার ফিরে আসবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা শিক্ষার্থী আবারও মুক্তচিন্তা, প্রগতিশীল মূল্যবোধ ও সাহিত্যিক চেতনার গর্বিত ধারক হয়ে উঠবে। শতদল আবার জেগে উঠুক আলোকিত মননের কণ্ঠস্বর হয়ে। কখনো প্রেমের গান নিয়ে, কখনো দ্রোহের বাণী হয়ে।

শিক্ষার্থী, জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

About Editor Todaynews24

Check Also

বিতর্কের মুখে ক্ষমা চাইলেন ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো

বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে ফিফার টুর্নামেন্টের স্বত্ব বিক্রির বিতর্কিত প্রস্তাব নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে ক্ষমা চেয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো। মরক্কোর রাবাতে গভর্নিং বোর্ডের জরুরি বৈঠকে নিজের পরিকল্পনার ‘ভুল’ স্বীকার করলেও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সমর্থন পাওয়ায় তিনি স্বপদে বহাল থাকছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *